৬ জুন, ২০২২ ১৭:২৩

৪২ বছর পর সেই বাউল দাদার দেশে প্রত্যাবর্তন

লাবলু আনসার, যুক্তরাষ্ট্র

৪২ বছর পর সেই বাউল দাদার দেশে প্রত্যাবর্তন

বাউল দাদা খ্যাত সানোয়ার আহমেদ

দীর্ঘ প্রায় ৪২ বছর পর যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে বাংলাদেশে ফিরে গেলেন বাউল দাদা খ্যাত সানোয়ার আহমেদ। জীবনের শেষ দিনগুলো পরিবারের সাথে কাটাতে ২ জুন যুক্তরাষ্ট্র ছাড়েন তিনি। জ্যাকসন হাইটসের ৭৩ স্টিটে নবান্ন রেস্টুরেন্টের সামনে রাস্তার ধারে ঝালমুড়ি আর পান বিক্রি করে সবার নজর কাড়েন বাউল দাদা। রোদ-বৃষ্টি-শীত-বরফ উপেক্ষা করে বছরের পর বছর ওই জায়গায় সরব অবস্থান ছিল বাউল দাদার। এই প্রবাসে তিন-চার ফুট পরিসরের এই খোলা জায়গাটিই যেন ছিল বাউল দাদার আপন ভুবন। তবে সব সময় নিরাপদ-নিশ্চিন্তে থাকতে পারেননি তিনি। পোহাতে হয়েছে মাঝেমধ্যেই অনেক কাঠ খড়। কখনও কখনও তার ওপর নেমে আসে প্রশাসনের খড়গ। কোন কোন স্বদেশী তার প্রতিপক্ষ হন। ফুটপাথ থেকে বারবার উচ্ছেদের শিকার হন তিনি। ঝালমুড়ি ও পান বিক্রির সরঞ্জাম কেড়ে নিয়ে যায় প্রশাসনের লোকজন। কমিউনিটি নেতৃবৃন্দ, নাগরিক অধিকার আন্দোলনের কর্মীদের সহায়তায় আবার তা ফিরেও পান। অনেক ঝড়-ঝাপটা উপেক্ষা করেও ৭৩ স্ট্রিটের ওই জায়গাটুকু আঁকড়ে ধরে ছিলেন বাউল দাদা। কিন্তু করোনা মহামারির কারণে এ ব্যবসায় আর টিকে থাকা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। করোনা আর অসুস্থতার কারণে দেশে যাওয়ার আগ পর্যন্ত অবসরে ছিলেন।

৪১ বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রে এসেই রেস্টুরেন্টে ডিশ ওয়াশার আর শেফের কাজ করেন দীর্ঘ সময়। বৃদ্ধ বয়সে কেউ কাজে রাখতে চায় না। তাই বাধ্য হয়েই রোদ-বৃষ্টি-ঝড়, প্রচণ্ড গরম ও ঠাণ্ডার মধ্যেও সপ্তাহে সাত দিন ঠায় দাঁড়িয়ে থেকে ঝালমুড়ি ও পান বিক্রির ব্যবসা চালিয়েছেন।

বাউল দাদা ফেরার আগে জানান, দীর্ঘ একাকী প্রবাস জীবনের অবসান ঘটিয়ে স্বেচ্ছায় দেশে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। যুব বয়সে উন্নত জীবনের স্বপ্ন নিয়ে আমেরিকায় এসেছিলাম। সে সময় কাজকর্মেরও সুযোগ ছিলো, পেয়েছিলাম ওয়ার্ক পারমিট।

উল্লেখ্য, রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়েছিলেন, সফল হননি। শেষ জীবনে এসে ওয়ার্ক পারমিটও হারিয়েছেন আইনি জটিলতায় পড়ে।

যে সোনার হরিণের জন্য এসেছিলেন সেটির নাগাল না পেয়ে অনেকটা মানবেতর জীবনযাপনকে বেছে নিতে হয় তাকে। যে আমেরিকান স্বপ্নের জন্য স্ত্রী, সন্তানকে ছেড়ে আসলেন, গ্রিনকার্ড নামক সেই সোনার হরিণ না পেয়েই তাকে ফিরতে হলো নিজ দেশে। এদেশে বেওয়ারিশভাবে মৃত্যুবরণ করতে চান না বাউল দাদা। তার দেশে ফেরাসহ সব বিষয়ে সাহায্য করেছে নিউইয়র্ক অঞ্চলে অভিবাসীদের অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে লড়াইরত ড্রাম (দেশিজ রাইজিং আপ এ্যান্ড মুভিং)। । ড্রামের সংগঠক কাজী ফৌজিয়া জানান, ‌‘দাদা নির্লোভ মানুষ ছিলেন, কখনো হাত পেতে চলা পছন্দ করতেন না। ২ জুন সকালে জেএফকে এয়ারপোর্টে বিদায়কালে চোখের পানি আড়াল করে যখন বিদায় দিচ্ছিলাম দাদা হঠাৎ করে পকেট থেকে টাকা বের করে আমাকে বলে কিছু খেয়ে নিও! আমি শুধু বললাম আপনি কি বলছেন এসব। এমনই ছিলেন আমাদের বাউল দাদা!’

কাজী ফৌজিয়া আরও জানান, এক ব্যক্তি বাউল দাদাকে টিকিটের ব্যবস্থা করে দেবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই ব্যক্তির কাছ থেকে টিকিট পাননি দাদা।

বাউল দাদার জন্ম সিলেটের মোলভীবাজারের দক্ষিণ বালিগ্রামে। বিয়ে করেছিলেন ১৯৭১ সালে। দালাল ধরে ভ্রমণ ভিসায় আমেরিকায় এসেছিলেন। সেই সময় দালালকে তিন লাখ টাকা দিয়েছিলেন। দেশে রেখে এসেছিলেন স্ত্রী ছায়া বেগম, দুই মেয়ে ছানারা বেগম, রায়না বেগম, ছেলে ছোবান মিয়া, পারভেজ মিয়া এবং মজনু মিয়া। এর মধ্যে ছেলে মজনু মিয়া নিখোঁজ রয়েছেন। এক মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলেন। ২০১১ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় বড় মেয়ের স্বামী মারা যায়। সেই সময় তিনি অনুমতি নিয়ে বাংলাদেশে গিয়েছিলেন। ৪২ বছরে এই একবারই স্ত্রী এবং সন্তানদের দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন। দেশে ছিলেন সাড়ে ৪ মাস। আবারও চলে আসেন আমেরিকায়। 

উল্লেখ্য, বাউল দাদার ব্যবহৃত খাট এবং বিছানাপত্র সংরক্ষণ করেছে ব্রুকলিনের একটি জাদুঘর। ব্রিটেনের এক চলচ্চিত্রকার অভিবাসীগণের নিদারুণ কষ্টের একটি প্রামাণ্যচিত্র বানিয়েছেন বাউল দাদার জীবনের আলোকে।

বিডি প্রতিদিন/ফারজানা

এই রকম আরও টপিক

সর্বশেষ খবর