Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১৬ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৬ জুলাই, ২০১৯ ০০:০৪

আজ এরশাদের দাফন

ঢাকায় দুই দফা জানাজা, রাষ্ট্রপতিসহ সর্বস্তরের শ্রদ্ধা

নিজস্ব প্রতিবেদক

আজ এরশাদের দাফন

আজ সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের দাফন হবে রাজধানীর বনানীর সামরিক কবরস্থানে। এর আগে মরহুমের লাশ নিয়ে যাওয়া হবে রংপুরে। এর মধ্যে রংপুরের জাতীয় পার্টির নেতা-কর্মীরা দাবি জানিয়েছেন, লাশ সেখানে দাফন করতে হবে। তবে জাতীয় পার্টি সূত্র জানিয়েছে, রংপুরে জানাজা শেষে লাশ ঢাকায় আনা হবে। এদিকে গতকাল সাবেক রাষ্ট্রপতি জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতার দ্বিতীয় জানাজা সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় অনুষ্ঠিত হয়। এরপর সাবেক রাষ্ট্রপতির কফিনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে তার সামরিক সচিব মেজর জেনারেল মিয়া মুহাম্মদ জয়নুল আবেদীন। স্পিকারের পক্ষে সার্জেন্ট অ্যাট আর্মস এবং ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বি মিয়া শ্রদ্ধা নিবেদন করেন বিরোধীদলীয় নেতার কফিনে। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে দলের সিনিয়র নেতৃবৃন্দ, জাতীয় পার্টির পক্ষ থেকে জাতীয় পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ কাদের দলীয় নেতাদের নিয়ে কফিনে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন। জানাজার আগে দক্ষিণ প্লাজায় মরহুমের বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে স্মৃতিচারণ করেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টাম লীর সদস্য তোফায়েল আহমেদ ও এরশাদের স্ত্রী বিরোধীদলীয় উপনেতা রওশন এরশাদ। এরশাদের সংক্ষিপ্ত জীবনী পাঠ করেন জাতীয় পার্টির মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গা। পরিবারের পক্ষ থেকে বক্তব্য দেন এরশাদের ছোট ভাই গোলাম মোহাম্মদ কাদের। বক্তব্য দেওয়ার সময় আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েন জি এম কাদের। রওশন এরশাদ জানাজায় এসেছিলেন ছেলে শাদ এরশাদকে নিয়ে। জানাজায় অংশ নেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বি মিয়া, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, কৃষিমন্ত্রী আবদুর রাজ্জাক, তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ, বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি, রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন, সংসদের প্রধান হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরী প্রমুখ। এ ছাড়া আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যে তোফায়েল আহমেদ, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, মাহবুব-উল আলম হানিফ, মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন, বিএনপি নেতা ব্যরিস্টার মওদুদ আহমদ ও জি এম সিরাজ, জাতীয় পার্টির নেতাদের মধ্যে রুহুল আমিন হাওলাদার, কাজী ফিরোজ রশীদ, সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা, মুজিবুল হক চুন্নু, জাতীয় পার্টির (জাফর) মোস্তফা জামাল হায়দার, আহসান হাবিব লিংকন, নওয়াব আব্বাস আলী খান, এ এস এম শামীমসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ জানাজায় অংশ নেন। তোফায়েল আহমেদ বলেন, অতীত বাদ দিলে এরশাদ রাজনীতিতে সফলতার সঙ্গে টিকে ছিলেন এবং দল পরিচালনা করেছেন। নেতা হিসেবে তিনি দলের কাছে ভালো ছিলেন। আমরা তার মৃত্যুতে শোকাহত। তিনি বলেন, আমরা নিজেরাও ভালোমন্দ মিলিয়ে মানুষ। তার যেমন ভালো গুণ আছে, তেমনি ব্যর্থতাও আছে। সুতরাং কেউ মৃত্যুবরণ করলে তার গুণাবলি তুলে ধরা প্রয়োজন। তোফায়েল আহমেদ বলেন, এরশাদ ব্যক্তিগতজীবনে বিনয়ী ও মার্জিত ছিলেন। জাতীয় সংসদের সব বক্তব্য তিনি মার্জিত ভাষায় দিয়েছেন। সবসময় তিনি গঠনমূলক সমালোচনা করেছেন। তিনি যেন জান্নাতবাসী হোন সেই কামনাই করি। এরশাদের স্ত্রী রওশন এরশাদ সবার কাছে এরশাদের জন্য দোয়া চান। তিনি বলেন, সাবেক এই রাষ্ট্রপতির ব্যবহারে কেউ আঘাত পেয়ে থাকলে ক্ষমা করবেন। কারও কাছে এরশাদের দেনা-পাওনা থাকলে তা-ও তাকে জানাতে অনুরোধ করেন। পরে তার লাশ নিয়ে যাওয়া হয় কাকরাইলে দলীয় কার্যালয়ে। সেখানে দলের নেতা-কর্মীরা তাকে শ্রদ্ধা জানান। এ সময় দলের নেতা-কর্মীরা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তারা চোখের জলে প্রিয় নেতাকে বিদায় জানান। তৃতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয় বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে। আজ সকালে হেলিকপ্টারে করে সাবেক এই রাষ্ট্রপতির মরদেহ নেওয়া হবে রংপুরে। বাদ জোহর জেলা শহরের ঈদগাহ মাঠে রংপুরের সন্তান এরশাদের চতুর্থ জানাজা হবে। জানাজা শেষে মরদেহ ঢাকায় ফিরিয়ে আনার পর বিকালে রাজধানীর বনানীর সামরিক কবরস্থানে দাফন করা হবে। কাকরাইল অফিসে এরশাদের শেষ চার ঘণ্টা : ফুলেল শ্রদ্ধা আর চোখের জলে দলীয় কার্যালয় থেকে প্রয়াত চেয়ারম্যান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদকে শেষ বিদায় জানালেন জাতীয় পার্টির নেতা-কর্মীরা। এরশাদের মরদেহ রাজধানীর কাকরাইলে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে নেওয়া হয় দুপুর ১২টায়। তারপর থেকে প্রায় চার ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও শেষই হচ্ছিল না মানুষের লাইন। সাবেক এই রাষ্ট্রপতিকে একনজর দেখা ও শ্রদ্ধা জানানোর জন্য ভিড় করেন জাতীয় পার্টিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের নেতারা। ৬৬ পাইওনিয়ার রোডের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনের লাইন রাজস্ব ভবনের গেটে গিয়ে ঠেকে। পার্টি অফিসের মূল ফটকের সামনে লাশবাহী শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গাড়িটি রাখা হয়। শ্রদ্ধার জন্য মরদেহের মাথার কাছে গাড়ির দরজা খুলে দেওয়া হয়। আর গ্লাসের ওপর দিয়ে শেষ দর্শন করেন সর্বস্তরের মানুষ। শ্রদ্ধা নিবেদনের লম্বা লাইন দাঁড়িয়ে অনেকে হাউমাউ করে কেদে আর্তনাদ করেন। এ সময় কান্নাজড়িত কণ্ঠে লিয়াকত হোসেন খোকা বলেন, আমরা শোকাহত। দলীয় কার্যালয়ে জাপার নেতাদের মধ্যে ফুলেল শ্রদ্ধা জানান, জাতীয় পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জি এম কাদের, মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা, সাবেক মহাসচিব এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার, কেন্দ্রীয় নেতা সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা, শেখ সিরাজুল ইসলাম, সাঈদুর রহমান টেপা, মীর আবদুস সবুর আসুদ, কাজী মামুন, আলমগীর শিকদার লোটন, লিয়াকত হোসেন খোকা, জহিরুল আলম রুবেল, নোমান মিয়াসহ হাজার হাজার নেতা-কর্মী এতে অংশ নেন। জাপার ঢাকা মহানগরী ছাড়াও বিভিন্ন জেলা থেকে আগত অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন। অনেক আমলাকেও শ্রদ্ধা নিবেদন করতে দেখা গেছে। এ ছাড়াও জেএসডি, জাসদ, বাংলাদেশ পিপলস পার্টি, জনদলসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে এরশাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়। ইনস্টিটিউট অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, ডিপিডিসি শ্রমিক ইউনিয়নসহ বেশকিছু পেশাজীবী সংগঠন ফুল দিয়ে শেষ বিদায় জানান সাবেক এই রাষ্ট্রপতিকে। বায়তুল মোকাররমে মানুষের ঢল : বিকাল ৪টা ৫০ মিনিটে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্স বায়তুল মোকাররম মসজিদের এক নম্বর গেটে নেওয়া হয়। নেতা-কর্মীদের ভিড়ে অ্যাম্বুলেন্সের তখন গতি ছিল খুব সীমিত। সাবেক এই রাষ্ট্রপতির জানাজায় অংশ নিতে জাতীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে বিকাল থেকেই মুসল্লিদের ঢল নামে। বাদ আসর তার তৃতীয় জানাজা সম্পন্ন হয়। বায়তুল মোকাররম মসজিদ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে আশপাশের রাস্তায়ও দাঁড়িয়ে জানাজায় অংশ নেন অনেকেই। ইমামতি করেন জাতীয় মসজিদের খতিব মিজানুর রহমান। জানাজায় ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ আবদুল্লাহসহ জাতীয় পার্টির নেতা-কর্মী, বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতারা ও সর্বস্তরের মানুষ অংশ নেন। জানাজার আগে এরশাদের জন্য সবার দোয়া চেয়ে পার্টির মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা মুসল্লিদের সামনে এরশাদের সংক্ষিপ্ত জীবনী তুলে ধরেন। এরশাদের ছোট ভাই ও জাতীয় পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জি এম কাদের বলেন, দেশ ও জাতি, ইসলাম ও ধর্মের জন্য, মানুষের জন্য এরশাদের অবদান আছে। মানুষের ভুলত্রুটি থাকে, ওনারও ভুলত্রুটি ছিল, আপানারা সেগুলো মাফ করে দেবেন। আমি আপনাদের কাছে দোয়া চাই ওনার জন্য। জানাজা শেষে মরদেহ পুনরায় সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের (সিএমএইচ) হিমঘরে রাখা হয়। অন্যদিকে এরশাদের মৃত্যুতে গতকাল শোক জানিয়েছেন তৃণমূল বিএনপি ও জাতীয় জোট বিএনএ’র চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করিম পীর চরমোনাই। বিভিন্ন রাষ্ট্রদূতের শোক বইয়ে স্বাক্ষর : হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যুতে শোক বইয়ে স্ব^াক্ষর করেছেন বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতরা। গতকাল বেলা ১১টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের বনানী অফিসে রাখা শোক বইয়ে তারা স্বাক্ষর করে এরশাদের রাজনৈতিক আদর্শ এবং সাফল্য নিয়ে মন্তব্য করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের আর্ল ই মিলার, জার্মানির পিটার ফারেন হোলটজ, কুয়েতের রাষ্ট্রদূত আদেল হায়াত, ভারতের হাইকমিশনার রিভা গাঙ্গুলী দাশ, ফিলিস্তিনের ইউসেফ এস.ওয়াই রামাদান, যুক্তরাজ্যের রবার্ট সি ডিকসন এবং আফগানিস্তানের প্রথম সেক্রেটারি শোক বইয়ে স্বাক্ষর করেছেন। তারা এরশাদের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তেজগাঁও থেকে নেওয়া হবে : আজ সকাল সাড়ে ১০টায় তেজগাঁও বিমানবন্দর থেকে হেলিকপ্টারে করে রংপুর নেওয়া হবে এরশাদের কফিন। সঙ্গে যাচ্ছেন জি এম কাদের এমপি, রাহগির আল মাহি সাদ এরশাদ, মসিউর রহমান রাঙ্গা এমপি, এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার, সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা, মেজর (অব.) খালেদ আখতার, আজম খান, এটিইউ তাজ রহমান ও শফিকুল ইসলাম সেন্টু।

প্রেসিডেন্ট পার্কে ঢুকতে পারেননি বিদিশা : সাবেক স্বামী হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যুর খবর শুনেই ভারত থেকে দেশে ছুটে এসেছেন বিদিশা। রবিবার রাতেই ভারতের আজমির শরিফ থেকে ঢাকায় পৌঁছেন তিনি। এরপর গতকাল সকাল সোয়া ৭টা নাগাদ তিনি এরশাদের বারিধারার প্রেসিডেন্ট পার্কের বাসভবনে যান। সন্তান এরিককে একবার দেখার জন্য আকুতি জানান তিনি। কিন্তু তাকে বাসার ভিতরে ঢুকতে দেওয়া হয়নি।

এই অভিযোগ করে বিদিশা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আমার ছেলে এরিকের অবস্থা ভালো নয়। আমি কিছুই চাই না। আমার সন্তানকে দেখতে চাই। সে ভালো নেই। সে একা রয়েছে। কান্নাকাটি করছে। তার সঙ্গে দেখা করতে দেন, এমন অনুরোধ করার পরও তারা আমাকে ঢুকতে দেননি। প্রেসিডেন্ট পার্কের নিরাপত্তাকর্মী ও দলের কিছু কর্মী আমাকে বাসায় প্রবেশ করতে দেননি। তিনি বলেন, এরিক একটি স্পেশাল চাইল্ড। আমাদের আত্মীয়দের কাছে ফোন করে এরিক জানিয়েছে তার সঙ্গে খারাপ আচরণ করা হচ্ছে। তাকে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। যত দ্রুত সম্ভব আমি আমার সন্তানকে আমার কাছে ফেরত চাই। এইচ এম এরশাদের দাফনের পর এ নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করবেন বলেও জানান বিদিশা। উল্লেখ্য, ২০০৫ সালে বিদিশার সঙ্গে বিচ্ছেদ হয়ে যায় এরশাদের। এরশাদ-বিদিশা দম্পতির সন্তান এরিক এরশাদ। বিচ্ছেদের পরে আদালতের আদেশে এরিকের দায়িত্ব পান এরশাদ। এরিকের বয়স এখন ১৮ বছর। এরিক বারিধারার প্রেসিডেন্ট পার্কে বাবার সঙ্গে থাকতেন।


আপনার মন্তব্য