শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ২৮ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৮ মার্চ, ২০২০ ০০:৪৪

মনে হয় পাগল হয়ে যাব, মানুষ এত অসহায়

পীর হাবিবুর রহমান

মনে হয় পাগল হয়ে যাব, মানুষ এত অসহায়

করোনাভাইরাসের ভয়াবহতায় লন্ডভন্ড দুনিয়া লকডাউনে নীরব নিথর। মৃত্যুর সঙ্গে মানুষ লড়ছে। রাত-দিন জেগে থাকা সব পথ শহর নগর এখন জনশূন্য-ফাঁকা। ঢাকা তো কারফিউতেও এমন ফাঁকা হয়নি। গোটা ইউরোপ এখন মৃত্যু উপত্যকা। আমেরিকার মতো দেশের নিউইয়র্কেই এক দিনে ২০০ জনের বেশি মানুষের জীবনের করুণ অবসান। স্বজনহীনভাবে পৃথিবী থেকে কী মর্মান্তিক বিদায়! বিশ্বে আক্রান্তের সংখ্যা সাড়ে পাঁচ লাখ ছাড়িয়েছে। মৃতের সংখ্যা ২৬ হাজারের বেশি। আক্রান্ত আর মৃতের খবরই দুনিয়ার গণমাধ্যমে।
চীনের অভিশপ্ত উহানে মৃত্যুর বিভীষিকার পর উন্নত দুনিয়াও প্রস্তুতি নেয়নি। এখন সব অচল করে দিয়ে কেবল জীবন রক্ষার লড়াই করছে। ইতালির পর স্পেন ফ্রান্সে লাশের পাহাড়। ব্রিটেনের অবস্থাও শোচনীয়। জার্মানি, কানাডা কোথায় নেই করোনার থাবা? ইসলামিক আইনের শাসনে থাকা ইরানেও সর্বনাশা ছায়া! অশ্রু দীর্ঘশ্বাস আফসোস যন্ত্রণা। শোকস্তব্ধ পৃথিবী শোক করতেও ভুলে গেছে। বেঁচে থাকার আকুতিতে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের কথাও ভুলে গেছে দুনিয়া! মানুষ এখন বাঁচার আশা নিয়ে আল্লাহ আল্লাহ করছে।
দু’শ দেশ আক্রান্ত। আক্রান্ত হয়েছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন। ব্রিটিশ রাজপুত্র প্রিন্স চার্লসও বাদ যাননি। ব্রিটেনের জনগণের নির্ভরতার প্রাসাদ বাকিংহাম প্যালেস নিরাপদে নেই। এমন এক রোগ যার চিকিৎসা নেই। কেবল গৃহবন্দী। কেবল নিঃসঙ্গ আর সঙ্গরোধ। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাই শক্তি। পিপিই থেকে চিকিৎসা সরঞ্জাম, শয্যা থেকে লোকবল, ভেন্টিলেশনে সংকট বা অপর্যাপ্ততা- সব মিলিয়ে দুঃসময়! ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে গোটা দেশের জনগণ বৃহস্পতিবার রাত ৮টায় একসঙ্গে তুমুল করতালিতে করোনার সঙ্গে যুদ্ধে অবতীর্ণ চিকিৎসক দলসহ সবাইকে সম্মান ভালোবাসা ও সাহস জুগিয়েছে। পৃথিবীর সব যোদ্ধাকে আজ এ অভিবাদন।
লড়াই করে চিকিৎসক, ধর্মযাজক, ইমাম মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছেন। তবু মানবতাই মানুষের ধর্ম। পৃথিবীর সব কাজ থেমে গেছে। একটাই যুদ্ধ, জীবন বাঁচানোর। নিজে বাঁচার। সকল ক্ষমতার দুর্গ, পানশালা থেকে বিনোদন, মনোরঞ্জন, রূপচর্চা, সুগন্ধি, নাচের ঘর, ক্যাসিনো, বিদ্যাশালা থেকে ধর্মশালা সব বন্ধ। কেবল খাবার আর ওষুধের দোকান, অ্যাম্বুলেন্স, গণমাধ্যম খোলা।
পথে সেনাবাহিনী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জরুরি সেবাদানকারীরা ক্লান্তিহীন ছুটছে। বিমর্ষ বিপন্ন বিষাদগ্রস্ত পৃথিবীর মানুষ বাধ্যতামূলক গৃহবন্দী। রাষ্ট্রনায়করা বিধ্বস্ত, বিপর্যস্ত, হতাশ। আসমানের দিকে তাকিয়ে আছেন ভাঙা হৃদয়ে।
বিজ্ঞান, গবেষণাগার, জগৎশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী, প্রতাপশালী রাষ্ট্র, বিত্তশালী ওষুধ কারখানার মালিক সবাই অসহায়। ঘাম ঝরছে। পারমাণবিক অস্ত্রের মজুদ সম্ভব মারণাস্ত্র তৈরি কোনো বিষয় না। এক মুহূর্তে যুদ্ধ বাধানো যায়, যে কোনো রাষ্ট্র দখল করা যায়। কিন্তু পৃথিবীর ঘুম শান্তি কেড়ে নেওয়া একটি ছোট্ট ভয়ঙ্কর জীবাণু করোনাভাইরাস থেকে মানুষ বাঁচানোর ওষুধ বা ভ্যাকসিন আবিষ্কার সম্ভব নয়। এমনকি চিকিৎসা সরঞ্জামাদিও নেই! সব শক্তিধর অসহায়!
বাংলাদেশও লড়ছে। লকডাউন চলছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কার্যকর পদক্ষেপে লড়াইয়ে নামিয়েছেন। বিদেশ থেকে দেদার আসার পথ বন্ধ বা পরীক্ষা না করে ছেড়ে দেওয়া অথবা প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে নিতে না পারার মাশুল দিতে হচ্ছে। একদল মন্ত্রীর দায়িত্বহীন কথা, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সময়মতো পদক্ষেপ গ্রহণের ব্যর্থতা আছে। এক কথায় সময় প্রচুর হাতে  থাকতেও প্রয়োজনীয় প্রতিরোধ গড়তে না পারার ব্যর্থতা। যাক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাষ্ট্রনায়কোচিত ভাষণ, পদক্ষেপ, ঘোষণা, গণভবন থেকে সারা দেশ মনিটরিংয়ে রাখায় দেশ ঐক্যবদ্ধভাবে লড়ছে।
মানবতার লড়াইয়ে একাত্তরের মতো এক মোহনায় মানুষ। তখন শত্রু ছিল দৃশ্যমান, এখন অদৃশ্য। শত্রু একটাই- শুধু বাংলাদেশেরই নয়, সমস্ত পৃথিবীর একটা মহাশক্তিধর জীবাণু করোনাভাইরাস। আমাদের পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণের বাইরে নয়। দু-তিন সপ্তাহ গেলে চিত্র উন্মোচিত হবে। চীনের খবরে সত্যতা প্রশ্নবিদ্ধ। পুতিনের রাশিয়া আগাম সতর্ক হয়ে ভালো আছে। তাও কতটা সত্য খবর এ নিয়ে অনেকের রয়েছে সংশয়। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে ভারত আমাদের সবচেয়ে শক্তিশালী সাহায্য সমর্থন দিয়েছে। তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন দিয়েছে। বন্ধু ভারতের অবস্থা এবার আমাদের চেয়ে খারাপ। তবু যেটুকু হোক সাহায্য নিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছে। আমরা আজীবন তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ। একাত্তরে চীন বিরুদ্ধে ছিল কিন্তু এবার তাদের যুদ্ধ আগে হয়েছে। এখনো শেষ হয়নি। তবে এবারের যুদ্ধে চীন পাশে দাঁড়িয়েছে। কিট, পিপিই, মাস্কসহ অনেক চিকিৎসা সরঞ্জামাদি দিয়েছে ভালোবাসার নৌকায় তুলে। আমাদের প্রচুর সরঞ্জামাদি দরকার। আমেরিকার মতো দেশ অসহায় হয়ে চারদিকে চাইছে। আমাদের সারা দেশে ল্যাব, আইসিইউ, ভেন্টিলেশন দরকার। আমদানি দরকার। সাহায্য দরকার। প্রধানমন্ত্রী ডাকলে দেশের বিত্তবানরা এগিয়ে আসবেন। কিন্তু গার্মেন্ট মালিকরা কেন পিপিই মাস্ক দিতে পারেননি দ্রুত তৈরি করে? গার্মেন্ট মালিকদের সংগঠনের সাবেক নেতা আতিকুল ইসলাম উত্তরের মেয়র হতে গিয়ে চা বানিয়ে খাওয়ালেন মানুষকে। শফিউল আহমেদ মহিউদ্দিন এমপি হলেন করোনা আক্রান্ত দেশে পাঁচ শতাংশ ভোটারের অংশগ্রহণের নির্বাচনে। এই বিপদে তারা কী করলেন? কেন তারা সবাই পিপিই মাস্ক দিতে এগিয়ে আসেননি? গার্মেন্ট মালিকরা তিন মাস শ্রমিকের বেতন দিতে পারবেন না কেন বুঝি না! তাদের ঘামঝরা শ্রমে লাভ করেননি এতকাল?
যারা ব্যাংক লুটেছেন, শেয়ারবাজার লুটেছেন, বিদেশে অর্থ পাচার করেছেন সেসব লুটেরারা কই? এই দুঃসময়ে ধরে এনে গরিবের পাশে, মানুষের পাশে কেন দাঁড় করানো হচ্ছে না?
বঙ্গবন্ধুকন্যা শ্রমিকদের জন্য পাঁচ হাজার কোটি টাকা দিলেন, কোটি দিনমজুর ভাসমান মানুষের দায় নিলেন। তারা খালি নেবেন, দেবেন না? কী দেবেন তার অগ্নিপরীক্ষা তো এখনই। প্রধানমন্ত্রী যথার্থই বলেছেন, মনুষ্যত্ববোধের পরিচয় বিপদেই দিতে হয়। এখনই আপনাদের দেওয়ার সময়। আর গুজব সৃষ্টি করবেন না, সরকার নয়, মানুষ ক্ষমা করবে না। মুনাফাখোর হবেন না। শুধু সরকার নয়, জনগণের রোষ থেকেও বাঁচবেন না। এই যুদ্ধ মানুষের জীবন রক্ষার। এ যুদ্ধে জিততেই হবে।
আমার হৃদয় মেরামতের চিকিৎসা প্রখ্যাত হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ইউনাইটেড হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগের পরিচালক ড. মোমিনুজ্জামানের হাতেই শুরু হয়েছিল। পরে দিল্লির এস্কট হাসপাতালের অশোক শেঠ এনজিওগ্রাম করেছিলেন। তারপর লন্ডনের বিখ্যাত কার্ডিওলজিস্ট দেখেছেন ক্রমওয়েল  হাসপাতালে। নিউইয়র্কের লংআইল্যান্ডের জুইশ হসপিটালের ড. আলেকজান্ডারও এনজিওগ্রাম করেছেন। তবে নিয়মিত পরম নির্ভরতায় ল্যাবএইডের কার্ডিওলজি বিভাগের সিনিয়র কনসালট্যান্ট মাহবুবর রহমান হৃদয়ে তিন রিংয়ের দুটি পরিয়েছেন অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে। বন্ধু মাহবুবর রহমান আমাকে নিয়মিত দেখভাল করেন। সম্প্রতি আমেরিকা গেলেন সেমিনারে। সঙ্গে ভাবি। বলে গেলেন ফিরবেন কিছু দিন পর। করোনা এখন আটকে দিয়েছে তাদের। দেশে ছেলে একা। মন খারাপ তার, রাতে ফোনে কথা হলো। বললেন, ফ্লাইট শুরু হলেই ফিরবেন। আমার অ্যাজমার সমস্যা, হার্টের সমস্যা। বললেন, অফিস বাইরে যাওয়া বন্ধ। সংক্রমিত হলে সর্বনাশ। আমি টকশোতে অনেক দিন কোথাও যাই না। কারণ বিষণœতা। দলকানাদের ভিড়ে বলতে না পারার যন্ত্রণা। মতিউর রহমান চৌধুরীর টকশোতে ডাক পড়লে না করতে পারি না। সেদিন গিয়ে দেখি নেই। মনে হলো ভুল হয়েছে, অনুশোচনা হলো। মানুষকে সতর্ক করি কিন্তু নিজে হই না। টকশোর দরকারও নেই। স্টুডিওর পরিবেশ দেখে মনে হলো জীবাণুতে ভরপুর। সঙ্গরোধও হয় না।
যাক দুই দিন থেকে গৃহবন্দী। রাত জাগি, দেরিতে উঠি। ফোন নীরব রাখি। ফেসবুক, ইউটিউব দেখি, পোর্টালে খবর দেখি, বই পড়ি, গান শুনি। ছেলের সঙ্গে ভিডিওকলে কথা বলি। সিনেমা দেখি, খবরে ভাসি সঙ্গে গুজবও দেখি। আজব মতামত দেখি। মানুষের লড়াই দেখি। ফাঁকা ঢাকার শূন্য সড়কের চিত্র দেখি। গ্রুপে অফিস সংযোগে থাকি। কোথাও মন বসে না।
টিভির রিমোট বাটন টিপে যাই। অস্থিরতা ভয় দম বন্ধ লাগে। রুম আর ডাইনিংয়ে দৌড়। বাতাসে জীবাণু তাই জানালা খুলে আকাশ দেখি না। সবকিছুই অসহ্য লাগে। চন্দ্রস্মিতা আহ্লাদি করে। মনে করে আমার শিক্ষাঙ্গন বন্ধের লেখালেখির কারণে তার স্কুলসহ সব বন্ধ। সে বাইরে যেতে না পারলে মেজাজ বিগড়ে যায়। একাত্তরে ছোট্ট আমি হানাদার বাহিনীর আক্রমণে গ্রামে ছুটেছি। কাদাপানিতে খেলেছি। গ্রামে ঘুরেছি অনেক মাস।
সামরিক শাসকদের নিষ্ঠুর শাসন, কারফিউ কত দেখেছি-ভঙ্গ করেছি। এরশাদ জমানায় দেড় মাস জেল খেটেছি- তাও সব এখন আনন্দের মনে হচ্ছে। আজকের এই বন্দীজীবন অসহ্য। কত অসহায় আজ। এই করোনাভাইরাস প্রকৃতির অভিশাপ নাকি কোনো সুপার পাওয়ারদের সৃষ্টি সে নির্মম সত্যও এক দিন পরিষ্কার হবে। কবে মুক্তি, কবে বের হব, বুকভরে শ্বাস নেব তাও জানি না। মনে হয় পাগল হয়ে যাব দুই দিনেই। তবু এর বিকল্প নেই। আল্লাহকে ডাকি। শোকরিয়া আদায় করি আক্রান্তদের কথা ভেবে। সকল মানবের নিরাপদ জীবন চাই। এমন পৃথিবীর আঁধার মুখ দেখব বুঝিনি। প্রিয়জনের মেজাজি চেহারা, কালো আঁধার বিরক্তিকর কত কিছু আজ পৃথিবীর এ ভয়ার্ত অসহায়ত্বের অশ্রুজলে ভেসে গেছে। কেবল বেঁচে থাকা, বুকভরে শ্বাস নেওয়ার প্রবল ইচ্ছেই জাগে। মানুষের কাছে জীবাণুমুক্ত দেশে আড্ডায় ডুবতে ইচ্ছে করে। জানালার বাইরে তাকিয়ে উড়ে যাওয়া পাখিকে দেখে আমার চেয়ে সুখী মনে হয়। লকডাউনে দূষণমুক্ত পৃথিবী এখন দেখছে আমাদের পাপের শাস্তি। অসহায়ত্ব।

 


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর