মঙ্গলবার, ২৯ জুন, ২০২১ ০০:০০ টা

দুর্ঘটনার তদন্তে কমিটি হয় সুপারিশ বাস্তবায়ন হয় না

হাই কোর্টের জারি করা রুল শুনানিরও উদ্যোগ নেই

আরাফাত মুন্না

রাজধানীর পুরান ঢাকার নিমতলী ট্র্যাজেডি থেকে চকবাজারের চুড়িহাট্টার ভয়াবহ বিস্ফোরণে অগ্নিকান্ড। এরপর রাজধানীর অভিজাত এলাকা বনানীর বহুতল ভবনের ভয়াবহ আগুন। গত বছর নারায়ণগঞ্জে মসজিদে বিস্ফোরণ। একের পর এক ঘটা এসব দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে কমিটির পর কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিগুলো দুর্ঘটনার কারণ খুঁজে বের করার পাশাপাশি এসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে লম্বা লম্বা সুপারিশও দিয়েছে। কিন্তু আদতে এসব সুপারিশের বাস্তবায়ন নেই বললেই চলে। বিস্ফোরণ বা অগ্নিকান্ড ছাড়াও লঞ্চ বা ট্রেন দুর্ঘটনায়ও একাধিক কমিটি গঠন হয়। সেই সব কমিটির সুপারিশও থেকে যায় ফাইলবন্দী।

সর্বশেষ মগবাজার বিস্ফোরণে ভবনধসে প্রাণহানির ঘটনায়ও পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও বিস্ফোরক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর পৃথক তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তবে এসব কমিটির সুপারিশও আগেরগুলোর মতোই ফাইলবন্দীই          থেকে যাবে বলে ধারণা সংশ্লিষ্টদের। কমিটিগুলোর সুপারিশ বাস্তবায়ন হলে দুর্ঘটনা ৮০ শতাংশ রোধ করা সম্ভব ছিল বলে মনে করে হাই কোর্ট। বিশেষজ্ঞরা বলেন, কমিটিগুলোতে যারা থাকেন, সুপারিশ দেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের আরেকটু দায়িত্ব নিতে হবে। এসব সুপারিশ কোন প্রতিষ্ঠান বাস্তবায়ন করবে প্রতিবেদনে তা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করে দিতে হবে। তাহলে জবাবদিহিটা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে মনে করেন তারা। দুই বছরেরও বেশি সময় আগে ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে পুরান ঢাকার চুড়িহাট্টায় ভয়াবহ বিস্ফোরণে অগ্নিকান্ডের ঘটনায় প্রাণ হারান ৭০ জন। এরপর ২০১০ সালে ঢাকার নিমতলীতে ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের পর এ ধরনের দুর্ঘটনা রোধে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচ্চ পর্যায়ের কমিটির দেওয়া ১৭ দফা সুপারিশ বাস্তবায়ন না হওয়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছিল হাই কোর্ট। সে সময় হাই কোর্ট বলে, দেশের উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রী পরিশ্রম করলেও আমলারা একটি সুপারিশও বাস্তবায়ন করতে পারছেন না। ওই সুপারিশগুলো বাস্তবায়িত হলে ৮০ শতাংশ দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। পরে ওই সুপারিশ বাস্তবায়নের বিষয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে রুলও জারি করেছিল আদালত। তবে এই রুল শুনানির উদ্যোগও নেয়নি কেউ। সংশ্লিষ্ট আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ব্যারিস্টার এ বি এম আবদুল্লাহ আল মাহমুদ বাশার বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, যাদের বিরুদ্ধে রুল জারি হয়েছিল, তারা রুলের জবাব দিয়েছেন। রিটকারীরা এখনো রুল শুনানির উদ্যোগ নেননি। যদি কেউ উদ্যোগ না নেন, তাহলে রাষ্ট্রপক্ষই এই রুল শুনানির উদ্যোগ নেবে।

জানা গেছে, ২০১০ সালে নিমতলী ট্র্যাজেডির পর উচ্চপর্যায়ের কমিটি ১৭ দফার সুপারিশ করে। এরপর চুড়িহাট্টার ঘটনায়ও গঠন করা হয় ছয়টি তদন্ত কমিটি। ছয়টি তদন্ত কমিটি হয়েছে বনানীর আগুনের ঘটনায়ও। নারায়ণগঞ্জে মসজিদে বিস্ফোরণের ঘটনায়ও জেলা প্রশাসক, তিতাস, ফায়ার সার্ভিস ও বিস্ফোরক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের পক্ষ থেকে পৃথক চারটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছিল। প্রতিটি কমিটিই দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানের ফলাফলের সঙ্গে দুর্ঘটনা রোধে নিজেদের পর্যবেক্ষণ সুপারিশ আকারে তুলে ধরেছে। কিন্তু বাস্তবে এসব সুপারিশের বাস্তবায়ন ফল শূন্য রয়েছে বলেই জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। জানতে চাইলে ফায়ার সার্ভিসের সাবেক মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবু নাঈম মো. শহিদুল্লাহ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, এটা একদমই ঠিক, দুর্ঘটনার বিষয়ে তদন্ত কমিটিগুলোর সুপারিশ বাস্তবায়ন হয় না। তিনি বলেন, একসময় তদন্ত কমিটিগুলো যেসব প্রতিবেদন দিত, তা প্রকাশই পেত না। এখন একটা বিষয়ে উন্নতি হয়েছে, গণমাধ্যমের কল্যাণে মানুষ সেসব সুপারিশ জানতে পারছে। সুপারিশ বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর এই প্রতিবেদন বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না, তা তদারক করার কথা। জবাবদিহিটা তাদেরই নিশ্চিত করতে হবে। তদন্ত কমিটিতে যারা থাকেন, তাদেরও সুপারিশ দেওয়ার ক্ষেত্রে কোন প্রতিষ্ঠান এই সুপারিশ বাস্তবায়ন করবে তা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করে দিতে হবে বলে মনে করেন ফায়ার সার্ভিসের সাবেক এই ডিজি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে উচ্চ আদালতে জনস্বার্থে মামলা পরিচালনাকারী আইনজীবী ও হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘প্রতিটি দুর্ঘটনার পর কমিটিগুলো যেসব সুপারিশ করছে, আমাদের দুর্ভাগ্য এটাই, অনেক কিছু বলা হয়, অনেক অনেক সুপারিশ হয়, আইনেও অনেক বিষয় আছে, কিন্তু কেউ এসবের ধার ধারে না।’ তিনি বলেন, আইনের যদি ধার ধারত, তাহলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি যেসব খাতে রয়েছে, যেমন গ্যাস-বিদ্যুৎ, এসব তো সব সময় মনিটরিংয়ের আওতায় আনা হতো। তাদের লোকবলও রয়েছে। এর পরও মনিটরিং করে না। আবার দুর্ঘটনার পরও মনিটরিং না করার জন্য যারা দায়ী, তাদের কোনো শাস্তি হয় না। দুর্ঘটনার পর কমিটি হচ্ছে, কমিটি রিপোর্ট দিচ্ছে, একসময় সেই রিপোর্ট হারিয়েও যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেন এই আইনজীবী।