বৃহস্পতিবার, ৮ ডিসেম্বর, ২০২২ ০০:০০ টা

বেদুইন তাঁবুতে বিশ্বকাপ উৎসব

খিমার নাম বেনেট। এখানে কাতারি পরিবারের বিয়ের উপযুক্ত মেয়েরা থাকে। পরিবারের অন্যদের চেয়ে একটু আলাদা। তাদের বিনোদনের আয়োজনটাও ভিন্ন রকমের হয়ে থাকে। বাচ্চা আর বুড়োদের চেয়ে ভিন্ন। এ যেন বাইরের দৃষ্টি থেকে তাদের আড়ালে রাখারই একটা চেষ্টা। বেনেটের চেয়ে বড় বড় আরও দুটো খিমা। সেগুলোর একটার নাম মজলিস। মানে আড্ডার স্থান। তবে গতানুগতিক নয়। এ স্থানে বসে কাতারের মানুষ খাবার গ্রহণ করে। আড্ডা দেয়। আবার এখানে বারবিকিউসহ নানা রকমের রান্নার ব্যবস্থাও আছে অন্য খিমাটা পরিবারের প্রধানের জন্য। মজলিসের রকমফের আছে। বাইর আর ভিতর। বাইরের মজলিসে সিসা পান করে। আকাশের চাঁদ দেখতে দেখতে নানা গল্পে মেতে ওঠে। ইচ্ছা হলে উনুনে তৈরি করে কোনো সুস্বাদু খাবার। কাতারের বেদুইন তাঁবুগুলোকে খিমা বলে ডাকা হয়। এ খিমা তৈরির জন্য বেশ কষ্ট করতে হয়। ছয় মাসের জন্য সরকারের কাছ থেকে লিজ নিতে গেলে খরচ হয় বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৪ লাখ। কাতারের হিসাবে ১৩ হাজার রিয়াল। এক পাশে বালির বিশাল পাহাড় রেখে গড়ে তোলা হয় খিমা। মরুঝড় থেকে বাঁচার জন্যই এ ব্যবস্থা। এখানে চার ধরনের খিমা থাকে। পাশাপাশি থাকে মসজিদ। শীতকালে মরুভূমিতে গড়ে তোলা এসব তাঁবুতে সপ্তাহে এক দিন করে কাটিয়ে আসে পুরো পরিবার। সেখানে তারা পূর্বপুরুষের কষ্টকর দিনগুলোর কথা স্মরণ করে। বর্তমানে এসব তাঁবুতে চলছে বিশ্বকাপের উন্মাদনা। প্রতিটি খিমাতেই বিশাল বিশাল টিভি ফিট করা হয়েছে। খিমার পাশে স্থাপন করা হয়েছে ডিশ অ্যান্টেনা। মরুভূমিতে শীতকালের আনন্দ উপভোগ চলছে বিশ্বকাপের উন্মাদনায়। কাতার বিশ্বকাপ চূড়ান্ত পর্যায়ে চলে এসেছে। ৩২ দলের লড়াইয়ে এখন টিকে আছে কেবল আটটি দল। কাদের হাতে উঠবে বিশ্বকাপের ট্রফি? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। কাতারের মানুষ এখন আর কে বিশ্বকাপ জিতবে, তা নিয়ে ভাবে না। গ্রুপ পর্ব খেলে বিদায় নেওয়া স্বাগতিক দেশটি কেবল বিশ্বকাপের উন্মাদনাই উপভোগ করছে। কখনো ব্রাজিলকে, কখনো আর্জেন্টিনাকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। এ উন্মাদনার অনেকটাই স্টেডিয়াম কেন্দ্র করে। তবে কনকনে শীতে মরুভূমির রাতও বিশ্বকাপের উন্মাদনায় উত্তাপ ছড়াচ্ছে।

কাতারের একটি বিখ্যাত মরুভূমি আল খারারা। এ মরুভূমিতে দর্শনীয় বেশ কয়েকটি স্থান আছে। দেখা যায় উট আর দুম্বার খামার। মরুভূমির বালির পাহাড়ের আড়ালে-আবডালে লুকিয়ে আছে বেশ কয়েকটি শ্যামল গ্রাম। তবে রুক্ষ মরুর বিশালতা এতই, অজানা কারও পক্ষে সেসব গ্রাম খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব। আল খারারা মরুভূমি কাতারের দক্ষিণ দিকে। আল ওয়াকরাহ শহর থেকেও প্রায় ৪০ কিলোমিটারের মতো দূরে। সেই মরুভূমিতে নানা স্থানে দৃষ্টিনন্দন বালির পাহাড় কেন্দ্র করে কাতারি শেখরা গড়ে তুলেছেন আলিশান বেদুইন তাঁবু। একসময় কাতারের মানুষ ছিল বেদুইনদের মতোই যাযাবর। তারা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ঘুরে বেড়াত খাদ্যের সন্ধানে। সেদিন বহু পেছনে ফেলে এসেছে দেশটি। প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর কাতার এখন পৃথিবীর অন্যতম ধনী দেশ। তবে নিজেদের অতীত ভুলে যায়নি ওরা। সময় ও সুযোগমতো বেদুইন তাঁবু তৈরি করে সেখানে নিয়ে যায় পরিবারের অন্য সদস্যদের। আধুনিক সুযোগ-সুবিধায় সুসজ্জিত হলেও তারা স্মরণ করে পূর্বপুরুষের কষ্টকর দিনগুলোর কথা। আল খারারা মরুভূমিতে বেদুইন তাঁবু তৈরির দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশি সামিজ উদ্দিন বলছিলেন, ‘কাতারের মানুষ এ তাঁবুতে এসে সপ্তায় এক দিন কাটিয়ে যায়। তারা নিজেদের ঐতিহ্য ধরে রেখেছে যুগ যুগ ধরে।’ বেদুইনদের এসব তাঁবুতে এখন অতীত পর্যালোচনা বাদ দিয়ে চলছে বিশ্বকাপের উন্মাদনা। চলবে ১৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত। এর পরও হয়তো বহুদিন বিশ্বকাপের কথা কাতারের মানুষের আড্ডায় প্রধান বিষয় হয়ে থাকবে!

সর্বশেষ খবর