পানি বণ্টন ইস্যুতে ভারতের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই কড়া ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়েছে পাকিস্তান। দেশটির দাবি, আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুযায়ী পাকিস্তানের প্রাপ্য পানির প্রবাহ বন্ধ করার চেষ্টা করা হলে সেই ‘হাত কেটে ফেলা হবে’। একই সঙ্গে ইসলামাবাদের অভিযোগ, ভারত পানিকে রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হিমালয়, তিব্বত মালভূমি ও পীর পাঞ্জাল পর্বতমালা থেকে উৎপন্ন ছয়টি নদীর পানি ভারত ও পাকিস্তান ভাগাভাগি করে। এসব নদীর উৎস তিব্বত, লাদাখ, জম্মু-কাশ্মীর এবং ভারতের হিমাচল প্রদেশে।
দেশভাগের পর দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘সিন্ধু পানি চুক্তি’কে বিশ্বের অন্যতম সফল পানি বণ্টন চুক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। চুক্তির মূল উদ্দেশ্য ছিল উভয় দেশের জন্য পানির প্রবাহ নিশ্চিত করা। তবে সাম্প্রতিক কূটনৈতিক উত্তেজনার কারণে এই চুক্তির কার্যকারিতা নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে পাকিস্তানের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রী মুসাদিক মালিক বলেন, ‘আমরা ঘোষণা করেছি, আমাদের পানি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলে সেই হাত কেটে ফেলা হবে। শুধু ঘোষণা দিইনি, গত এক থেকে দেড় বছরে সেটি করে দেখিয়েছিও।’
ভারতের সাম্প্রতিক বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় তিনি এ মন্তব্য করেন। নয়াদিল্লি জানিয়েছিল, পাকিস্তানে এক ফোঁটা পানিও যেতে দেওয়া হবে না। এর জবাবে মুসাদিক মালিক বলেন, বিষয়টি শুধু ন্যায়বিচারের প্রশ্ন নয়। তার ভাষায়, ‘আমাদের সামরিক বাহিনীও দেখিয়ে দিয়েছে, শুধু পানির ক্ষেত্রেই নয়, আকাশযুদ্ধেও আমরা তোমাদের হাত কেটে দিতে পারি।’
গত বছরের মে মাসে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে চার দিনের সংঘর্ষের প্রসঙ্গ টেনে তিনি আরও বলেন, প্রতিবেশী দেশের প্রধানমন্ত্রীর হাতে পানির কলের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে এবং তিনি বলছেন, পাকিস্তানে এক ফোঁটা পানিও যেতে দেবেন না।
এ সময় তিনি ভারতের পানিসম্পদমন্ত্রী সি. আর. পাতিলের জুন মাসের শুরুর দিকের একটি মন্তব্যের কথাও উল্লেখ করেন। ওই মন্তব্যে পাতিল বলেছিলেন, গত বছর কাশ্মীরে হামলার পর ভারত সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিত করেছে এবং এরপর থেকে পাকিস্তানে ‘এক ফোঁটা পানিও’ যেতে না দেওয়ার লক্ষ্যে কাজ করছে। ওই হামলার পর দুই দেশ প্রায় পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল।
মুসাদিক মালিক বলেন, পাকিস্তানের ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ মানুষ কৃষিকাজের জন্য এই পানির ওপর নির্ভরশীল। পানির প্রবাহে বাধা সৃষ্টি হলে খাদ্যনিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও জাতীয় অর্থনীতি মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় হওয়া সিন্ধু পানি চুক্তির আওতায় সিন্ধু অববাহিকার ছয়টি নদীর পানি দুই দেশের মধ্যে ভাগ করা হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, পশ্চিমাঞ্চলের সিন্ধু, ঝিলাম ও চেনাব নদীর পানির অধিকার পাকিস্তানের। অন্যদিকে পূর্বাঞ্চলের রাভি, বিয়াস ও শতদ্রু নদীর পানির অধিকার ভারতের।
ভারতের ভূখণ্ড থেকে প্রবাহিত এসব নদীর পানি পাকিস্তানের লাখো মানুষের জীবন ও জীবিকার প্রধান ভিত্তি। কৃষিকাজ, সুপেয় পানির সরবরাহ এবং জলবিদ্যুৎ উৎপাদনে দেশটি এই পানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
চুক্তি অনুযায়ী, প্রতি বছর চার কোটি ৩০ লাখ একর-ফুট পানি পাকিস্তানে প্রবাহিত হতে দিতে হয় ভারতকে। এটি পাকিস্তানের মোট ভূ-পৃষ্ঠস্থ পানির প্রায় ৮০ শতাংশ, যা দেশটির কৃষি, নগরজীবন ও জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পাকিস্তানের অভিযোগ, ভারত পানিকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। সীমান্তবর্তী নদীগুলোর স্বাভাবিক প্রবাহ পরিবর্তনের যেকোনো উদ্যোগকে তারা ‘যুদ্ধ ঘোষণা’ হিসেবে বিবেচনা করবে বলেও জানিয়েছে।
বিডি-প্রতিদিন/শআ