বঙ্গোপসাগরের গভীরে টুনাসহ উচ্চমূল্যের সামুদ্রিক মাছের বিশাল সম্ভাবনা থাকলেও তা কাজে লাগাতে পারছে না বাংলাদেশ। আধুনিক গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার জাহাজ, প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও বেসরকারি বিনিয়োগের অভাবে প্রতিবছর হাজার কোটি টাকার সম্ভাব্য রপ্তানি আয় হাতছাড়া হচ্ছে। অথচ প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ ও অবকাঠামো গড়ে তুলতে পারলে শুধু টুনা মাছ রপ্তানি করেই বছরে প্রায় ৩০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, অর্থাৎ প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি আয় করা সম্ভব বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। স্যাটেলাইটভিত্তিক সমুদ্র পর্যবেক্ষণ, সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা (এসএসটি), ক্লোরোফিলের ঘনত্ব এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণে বঙ্গোপসাগরের গভীরে টুনা মাছের উপস্থিতির শক্ত প্রমাণ পাওয়া গেছে। বিশেষ করে সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড, বাংলাদেশের দক্ষিণের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (ইইজেড) এবং আন্দামান সাগরের দিকে গভীর সমুদ্র টুনা আহরণের জন্য সবচেয়ে সম্ভাবনাময় এলাকা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। প্রায় ১ লাখ ১৯ হাজার বর্গকিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে রয়েছে ইয়েলোফিন টুনা ও স্কিপজ্যাক টুনাসহ ৮টি প্রজাতির টুনা মাছ। তবে এ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে না পারায় বাংলাদেশ প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় অনেক পিছিয়ে রয়েছে।
২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, শ্রীলঙ্কা বছরে ১ লাখ ১২ হাজার ৪৯৪ মেট্রিক টন, ভারত ৫২ হাজার ২২ মেট্রিক টন টুনা ও বিলফিশ আহরণ করেছে। বিপরীতে বাংলাদেশের আহরণ মাত্র ১৪ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন, যার বেশির ভাগই ট্রলারের পার্শ্ব-আহরণ (বাইক্যাচ)। বিশেষজ্ঞদের মতে, টুনা শিকারের জন্য ২০ থেকে ৪০ মিটার দৈর্ঘ্যরে আধুনিক লংলাইন পদ্ধতির মাছ ধরার জাহাজ প্রয়োজন। বর্তমানে বাংলাদেশে এ ধরনের বহর প্রায় নেই বললেই চলে। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) তাদের এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, বাংলাদেশের সামুদ্রিক অর্থনীতির সবচেয়ে বড় অপ্রয়োগিত ক্ষেত্রগুলোর একটি হলো গভীর সমুদ্রে টুনা আহরণ। একই সঙ্গে সামুদ্রিক মাছ চাষ (মেরিকালচার), সামুদ্রিক শৈবাল, ঝিনুক, কাঁকড়া ও সামুদ্রিক খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্পেও বড় ধরনের বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে।
বিডা জানিয়েছে, ২০৩৫ সালের মধ্যে ২৫ থেকে ৫০টি আধুনিক জাহাজের বহর গড়ে তোলা গেলে বছরে ৩০ থেকে ৫০ হাজার মেট্রিক টন টুনা আহরণ সম্ভব হবে।
এতে বছরে প্রায় ৩০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার রপ্তানি আয় হতে পারে।
১০টি জাহাজ নিয়ে একটি বাণিজ্যিক বহর গঠনে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগ প্রয়োজন হলেও পাঁচ বছরের মধ্যে সেই বিনিয়োগ উঠে আসতে পারে বলেও হিসাব দেওয়া হয়েছে।
বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুণ বলেন, বাংলাদেশের জন্য গভীর সমুদ্রে মৎস্য আহরণ একটি নতুন খাত। তাই আধুনিক প্রযুক্তি, বিশেষায়িত জাহাজ ও বিদেশি অভিজ্ঞতা প্রয়োজন। এ কারণে জাপানসহ কয়েকটি দেশের বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। তিনি বলেন, ইতোমধ্যে দুটি বিদেশি প্রতিষ্ঠান গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার উপযোগী জাহাজ নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেছে। আমরা দেশীয় উদ্যোক্তাদের সঙ্গে যৌথ বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করছি, যাতে বাংলাদেশের বরাদ্দ থাকা গভীর সমুদ্রের সম্পদ নিজেরাই কাজে লাগাতে পারি।
পরিবেশ ও সামুদ্রিক প্রতিবেশ সংরক্ষণ নিশ্চিত করেই এ খাতের উন্নয়ন করা হবে।
বাংলাদেশের সামনে শুধু টুনা নয়, সামুদ্রিক অর্থনীতির আরও বড় সুযোগ রয়েছে। কক্সবাজার-টেকনাফ, সেন্ট মার্টিন, মহেশখালী-সোনাদিয়া, কুতুবদিয়া, সন্দ্বীপ এবং খুলনা-সাতক্ষীরা উপকূলকে সামুদ্রিক মাছ চাষ, সামুদ্রিক শৈবাল, ঝিনুক ও কাঁকড়া চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
ইতোমধ্যে এসব খাতে পরীক্ষামূলক সফলতা মিলেছে এবং স্মার্ট অ্যাকুয়াকালচার ও প্রযুক্তিনির্ভর খামার গড়ে তোলার কাজও শুরু হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাছ উৎপাদনের পাশাপাশি হ্যাচারি, উন্নত বীজ উৎপাদন, পশুখাদ্য, কোল্ড চেইন, আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেজিং, রপ্তানি, ডিজিটাল ট্রেসেবিলিটি ও পরিবেশ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থায়ও বড় বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে।