ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আনোয়ার সিদ্দিকীর আপিল মঞ্জুর করেছেন সর্বোচ্চ আদালত। গতকাল প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন চার বিচারপতির আপিল বেঞ্চ এ রায় দেন। সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা জানান, প্রার্থী হিসেবে আসলাম চৌধুরী অযোগ্য হওয়ায় রায়ে তাঁর প্রার্থিতা বাতিল করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে আসনটিতে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত আসলাম চৌধুরীকে হারাল বিএনপি। আদালতে জামায়াতের প্রার্থীর পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। তাঁর সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী মোহাম্মদ সাদ্দাম হোসেন ও যায়েদ বিন আমজাদ। আসলাম চৌধুরীর পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন ও মো. মিফতাহ উদ্দিন চৌধুরী। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী রোকন উদ্দিন মো. ফারুক। এ ছাড়া ব্যাংক এশিয়ার পক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী কামাল উল আলম এবং যমুনা ব্যাংকের পক্ষে আইনজীবী এ এস এম শাহরিয়ার কবির শুনানি করেন। রায়ের পর আইনজীবী শিশির মনির সাংবাদিকদের বলেন, ‘এই রায়ের মাধ্যমে ঋণখেলাপি হিসেবে নির্বাচনে আসলাম চৌধুরীর অংশগ্রহণ অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে।
অর্থাৎ তিনি প্রার্থী হিসেবে ডিসকোয়ালিফাইড (অযোগ্য) হলেন।’ ওই আসনে এখন কী হবে, সে বিষয়ে এই আইনজীবী বলেন, ‘সাধারণ নিয়ম হচ্ছে কোনো আসনে প্রথম ব্যক্তি (যিনি সর্বোচ্চ ভোট পান) ডিসকোয়ালিফাইড হলে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া ব্যক্তিকে নির্বাচিত হিসেবে ঘোষণা করা হয়ে থাকে। কিন্তু এর বাইরেও আপিল বিভাগ বিশেষ কোনো নির্দেশনা দেন কি না, তা পূর্ণাঙ্গ রায় পেলে বিস্তারিত জানা যাবে।’ আপিল বিভাগের এ রায়কে নজিরবিহীন উল্লেখ করে শিশির মনির বলেন, ‘এ রায় একটি নজির হয়ে থাকবে এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে এই রায় একটা যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে গণ্য হবে।’
গত ৩ জানুয়ারি আসলাম চৌধুরীর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। পরে তাঁর বিরুদ্ধে ঋণখেলাপির অভিযোগ এনে ইসিতে আপিল করেন একই আসনে জামায়াতের প্রার্থী আনোয়ার সিদ্দিকী ও দুইটি ব্যাংক। শুনানি নিয়ে ১৮ জানুয়ারি আপিল খারিজ করে দেয় ইসি। ফলে আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা বহাল থাকে। পরে ইসির সিদ্ধান্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে আনোয়ার সিদ্দিকী ও ব্যাংক কর্তৃপক্ষ থেকে পৃথক রিট আবেদন করা হয়। শুনানির পর ২৭ জানুয়ারি হাই কোর্ট রিট খারিজ করে দেন। ফলে আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা আবারও বহাল থাকে। হাই কোর্টের এই আদেশের বিরুদ্ধে আপিলের অনুমতি চেয়ে (লিভ টু আপিল) আবেদন করেন আনোয়ার সিদ্দিকী। নির্বাচনের আগে ৩ ফেব্রুয়ারি সেই আবেদন মঞ্জুর করে আনোয়র সিদ্দিকীকে আপিল করার অনুমতি দেন আপিল বিভাগ।
আদেশে বলা হয়, আসলাম চৌধুরী নির্বাচনে জয়লাভ করলেও আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তাঁর ক্ষেত্রে নির্বাচনের ফলাফল স্থগিত থাকবে। এরপর ১২ ফেব্রুয়ারি দেশে নির্বাচন হয়। সর্বোচ্চ আদালতের আদেশ মেনে ইসি আসলাম চৌধুরীর ফলাফল ঘোষণা স্থগিত রাখে। তবে বেসরকারি ঘোষণায় আসলাম চৌধুরী ১ লাখ ৪২ হাজার ৬৭৪ ভোট পেয়েছেন বলে জানা যায়। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আনোয়ার সিদ্দিকী পান ৮৯ হাজার ২৬৮ ভোট।
নির্বাচনের পর ৩১ মার্চ আনোয়ার সিদ্দিকী আপিল করেন। অন্যদিকে হাই কোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে ব্যাংক এশিয়া পিএলসি একটি লিভ টু আপিল (আপিল করার অনুমতি চেয়ে আবেদন) করে। যমুনা ব্যাংক পিএলসিও হাই কোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে একটি আবেদন করে। এসব আপিল ও আবেদনে শুনানির এক পর্যায়ে ১০ জুন আপিল বিভাগ দুইজন অ্যামিচি কিউরি (আইনি মতামতদানকারী) হিসেবে নিয়োগ দেন। তাঁরা হলেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এম কামরুল হক সিদ্দিকী ও প্রবীর নিয়োগী। ১৫ জুন তাঁরা আদালতে মতামত দেন। ওই দিনই আদালত ৩০ জুন রায় ঘোষণার জন্য রেখেছিলেন।
এদিকে চট্টগ্রাম-৪ আসন নিয়ে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। আদালতের আদেশের কপি পেলে তা পর্যালোচনা করে করণীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ। তিনি বলেন, ‘আদালত যেভাবে নির্দেশ দেবেন আমরা সেভাবে ব্যবস্থা নেব। আদালত যদি নতুন করে তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন করার নির্দেশ দেন তাহলে এ আসনে নতুন করে নির্বাচন হবে। আর যদি নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীকে বিজয়ী ঘোষণা করে গেজেট প্রকাশের নির্দেশ দেন, তাহলে সে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
অপরদিকে ঋণখেলাপির দায়ে আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা বাতিলের খবরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে সড়ক অবরোধ, বিক্ষোভ করেছেন তাঁর অনুসারী নেতা-কর্মীরা। আপিল বিভাগের রায়ের পর বিকালে তাঁর অনুসারীরা মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে অবরোধ করেন। এতে দীর্ঘ যানজটে ভোগান্তি পোহাতে হয় যাত্রী ও চালকদের।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রায় ঘোষণার পর থেকে মহাসড়কের বড় দারোগাহাট, ছোট দারোগাহাট, ভাটিয়ারি, কুমিরা, বাড়বকুণ্ডসহ একাধিক স্থানে সড়কে গাছের গুঁড়ি ফেলে এবং গাড়ি দাঁড় করিয়ে সড়কে যান চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। টানা দুই ঘণ্টা এমন অবরোধে চট্টগ্রামের সিটি গেট থেকে মিরসরাই উপজেলার বারইয়ারহাট পর্যন্ত দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়। এতে হাজার হাজার যাত্রী ও মালবাহী যানবাহন সড়কে আটকে পড়ে। এ সময় আসলামের সমর্থকরা বিভিন্ন স্লোগান দেন। এমন পরিস্থিতিতে আসলাম চৌধুরী এক ভিডিওবার্তায় কোনো ধরনের অবরোধ সৃষ্টি না করতে নির্দেশনা দেন। এরপর সন্ধ্যার কিছু আগে নেতা-কর্মীরা সড়ক থেকে সরে গিয়ে বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ মিছিল সমাবেশ করতে থাকেন। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনলে মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়। বিক্ষোভ সমাবেশে নেতা-কর্মীরা দাবি করেন, জনগণের বিপুল ভোটে নির্বাচিত আসলাম চৌধুরী দলের দুঃসময়ের নেতা। তিনি দীর্ঘ সময় কারাভোগ করেছেন। কিন্তু বর্তমানে তিনি ষড়যন্ত্রের শিকার। এই ঘটনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রতিবাদ করছেন বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের স্থানীয় নেতারা।