বছরের পর বছর অপেক্ষার পরও মিলছে না গ্যাস সংযোগ। ডিমান্ড নোটের টাকা পরিশোধ করেও উৎপাদনে যেতে পারছে না সাড়ে পাঁচ শতাধিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান। এতে গ্যাস সংযোগের দীর্ঘসূত্রতায় চরম সংকটে পড়েছে দেশের শিল্প খাত। প্রয়োজনীয় সব প্রক্রিয়া শেষ করে এরই মধ্যে ডিমান্ড নোটের টাকা জমা দিয়ে গ্যাস সংযোগের জন্য চার-পাঁচ বছর ধরে অপেক্ষায় রয়েছে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো। দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষা করেও তারা পাচ্ছে না কাঙ্ক্ষিত গ্যাস সংযোগ। শিল্প খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দীর্ঘদিনের এই অনিশ্চয়তার অবসান ঘটিয়ে দ্রুত গ্যাস সংযোগ নিশ্চিত করা না গেলে দেশের শিল্পায়নের গতি আরো মন্থর হয়ে পড়বে এবং বিনিয়োগ পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, দেশের বিভিন্ন গ্যাস বিতরণ কম্পানির কাছে শিল্প খাতে নতুন সংযোগের জন্য বর্তমানে এক হাজার ৮০০টিরও বেশি আবেদন জমা রয়েছে। কিন্তু গ্যাসসংকট ও নীতিগত সীমাবদ্ধতার কারণে বেশির ভাগ আবেদনই বছরের পর বছর ধরে ঝুলে আছে।
এর ফলে নতুন কারখানা চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। অনেক উদ্যোক্তার স্থাপনা প্রস্তুত থাকলেও উৎপাদন শুরু করতে না পারায় ব্যাংকঋণের সুদ, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় এবং অন্যান্য আর্থিক চাপ বাড়ছে। এতে নতুন বিনিয়োগে নিরুৎসাহ হচ্ছেন উদ্যোক্তারা।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সরকারের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতেও একই চিত্র। শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করতে গড়ে তোলা এসব অঞ্চলের অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় অবকাঠামো প্রস্তুত করেও গ্যাস সংযোগের অভাবে উৎপাদনে যেতে পারছে না। এতে অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা এখন অত্যন্ত জরুরি। ডিমান্ড নোটের অর্থ জমা দিয়ে বছরের পর বছর অপেক্ষমাণ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে দ্রুত সংযোগ দেওয়া এবং একই সঙ্গে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধি ও সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন ছাড়া বর্তমান সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
শিল্প উদ্যোক্তাদের দাবি, সংযোগের জন্য নির্ধারিত ডিমান্ড নোটের অর্থ পরিশোধের পরও বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হচ্ছে, অথচ কবে সংযোগ মিলবে সে বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা জানানো হচ্ছে না। এই অনিশ্চয়তা ব্যবসা পরিচালনা এবং নতুন বিনিয়োগ পরিকল্পনাকে কঠিন করে তুলছে।
গ্যাস বিতরণ কম্পানিগুলোর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানান, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নতুন গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে না বাড়িয়েই বিপুলসংখ্যক শিল্প সংযোগের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। ডিমান্ড নোট বাবদ শত শত কোটি টাকা আদায় করা হলেও বহু প্রতিষ্ঠান আজও সংযোগ পায়নি। ফলে ব্যাংকঋণ নিয়ে কারখানা নির্মাণ করা অনেক উদ্যোক্তা উৎপাদনে যেতে না পেরে ঋণখেলাপির ঝুঁকিতে পড়েছেন।
এ বিষয়ে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিসন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসির মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন ডিভিশন) প্রকৌশলী কাজী মোহাম্মদ সাইদুল হাসান বলেন, ‘বর্তমানে তিতাসের কাছে ডিমান্ড নোট পরিশোধ করা প্রায় ৪৯০টি প্রতিষ্ঠান গ্যাস সংযোগের অপেক্ষায় রয়েছে। একই সঙ্গে শুধু তিতাসেই নতুন সংযোগের জন্য আরো প্রায় এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৩০০টি আবেদন জমা রয়েছে। তবে প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ না থাকায় এসব আবেদন নিষ্পত্তি করা সম্ভব হচ্ছে না।’ তিনি বলেন. ‘এসব আবেদন ও তালিকা এরই মধ্যে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এটি পুরোপুরি মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত। মন্ত্রণালয় যাদের অনুমোদন দেবে আমরা তাদেরই সংযোগ দেব।’
মোহাম্মদ সাইদুল হাসান আরো বলেন, ‘বর্তমানে আমরা আমাদের চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস পাচ্ছি না। কবেনাগাদ পর্যাপ্ত গ্যাস পাওয়া যাবে, সেটাও নিশ্চিতভাবে বলতে পারছি না। দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমে যাওয়ায় বর্তমানে যে দুটি এফএসআরইউ (ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল) রয়েছে, সেগুলোর মাধ্যমে বাড়তি গ্যাস সরবরাহ চলছে। এই সক্ষমতার বাইরে অতিরিক্ত গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব নয়। তবে সরকার নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান, অনশোর ও অফশোরে টেন্ডার এবং নতুন এফএসআরইউ স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে। তবে এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় লাগবে।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিল্প খাতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে উৎপাদন, কর্মসংস্থান, রপ্তানি আয় এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিসহ সব ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তাই দ্রুত গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো, বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণ এবং সংযোগ প্রদানে স্বচ্ছ ও সময়ভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন তাঁরা।
এদিকে এই পরিস্থিতিতে গত মাসে সচিবালয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের সভাপতিত্বে শিল্পে গ্যাস সংযোগ বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে জ্বালানি সচিব মো. সাইফুল ইসলামসহ দেশের সব গ্যাস বিতরণ কম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালকরা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে জানানো হয়, গত চার থেকে পাঁচ বছরে শিল্পে কার্যত নতুন কোনো গ্যাস সংযোগ দেওয়া হয়নি। অথচ তিতাস, জালালাবাদ, কর্ণফুলী ও বাখরাবাদ গ্যাস বিতরণ কম্পানির কাছে ডিমান্ড নোট বাবদ হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থ জমা রয়েছে। বৈঠক শেষে জ্বালানিমন্ত্রী বলেন, শিল্পে গ্যাস সংযোগ দেওয়ার বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। বিষয়টি নিয়ে আরো কয়েকটি বৈঠক হবে। তবে সংযোগ দেওয়া হলে ডিমান্ড নোটের অর্থ আগে জমা দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। তিনি আরো বলেন, আগের সরকারের সময়ে শিল্পে গ্যাস সংযোগের ক্ষেত্রে নিয়মনীতি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। জ্বালানি খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সময় লাগবে।
বৈঠকে আলোচনা হয়, আপাতত নতুন আবেদনকারীদের গ্যাস সংযোগ দেওয়া সম্ভব নয়। তবে যেসব শিল্পপ্রতিষ্ঠান সরকারের প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে ডিমান্ড নোটের অর্থ জমা দিয়েছে, তাদের সংযোগ দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। এ ছাড়া অদক্ষ ক্যাপটিভ বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত গ্যাস কমিয়ে সেই গ্যাস শিল্প খাতে সরবরাহের প্রস্তাবও আলোচনায় আসে।
জ্বালানি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ছয়টি গ্যাস বিতরণ কম্পানির কাছে শিল্পে গ্যাস সংযোগের জন্য এক হাজার ৮০০টি আবেদন রয়েছে। এসব সংযোগ দিতে হলে প্রতিদিন অতিরিক্ত এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুট বাড়তি গ্যাস প্রয়োজন হবে।
পেট্রোবাংলার তথ্য মতে, বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের মোট চাহিদা প্রায় চার হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। বিপরীতে গত শনিবার সরবরাহ করা হয় মাত্র ২৭০৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। এর মধ্যে আমদানীকৃত ব্যয়বহুল এলএনজি থেকে সরবরাহ করা হয় ১০৬৬ মিলিয়ন ঘনফুট। দৈনিক ঘাটতি ছিল প্রায় ১৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। ফলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিল্প-কারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং সার কারখানাগুলো চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় গ্যাস পাচ্ছে না।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী (পারভেজ) বলেন, ‘বর্তমান শিল্পকারখানাগুলোই যখন পর্যাপ্ত গ্যাস পাচ্ছে না, তখন নতুন শিল্প স্থাপনের কথা বলা বাস্তবসম্মত নয়। বিদ্যমান শিল্পের উৎপাদন ব্যাহত হলে সরকারের প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও অর্জন করা কঠিন হবে।’
তিনি বলেন, ‘সরকার বন্ধ কারখানাগুলোকে আর্থিক সহায়তা দিয়ে চালুর কথা বলছে। কিন্তু যেসব কারখানা এখনো চালু রয়েছে, সেগুলোই যদি গ্যাসসংকটের কারণে বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে, তাহলে শুধু অর্থায়নের মাধ্যমে এরই মধ্যে বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানা সচল করা সম্ভব হবে না।’
আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী আরো বলেন, ‘সরকারের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে থাকা শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আগে সহায়তা দেওয়া, কেন সেগুলো সংকটে পড়ছে তা চিহ্নিত করা এবং পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করে বিদ্যমান শিল্পকে টিকিয়ে রাখা। নতুন শিল্প বা নতুন বিনিয়োগের চেয়ে এই মুহূর্তে চলমান শিল্পকারখানার সমস্যার সমাধানেই সরকারের বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।’
দেশের সবচেয়ে বড় গ্যাস বিতরণ কম্পানি তিতাস গ্যাসের কাছে বর্তমানে এক হাজার ৩০০টিরও বেশি আবেদন জমা রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৫০০টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান ডিমান্ড নোটের অর্থ এরই মধ্যে পরিশোধ করেছে। তিতাসের পর সবচেয়ে বেশি আবেদন রয়েছে কর্ণফুলী গ্যাস বিতরণ কম্পানিতে, যেখানে ৩০০টিরও বেশি আবেদন জমা আছে।
অর্থনৈতিক অঞ্চলেও উৎপাদন আটকে
গ্যাস সংকটের কারণে ময়মনসিংহ বিভাগের প্রথম সরকারি জামালপুর অর্থনৈতিক অঞ্চলেও শিল্প উৎপাদন পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এখানে পোশাক, কৃষিভিত্তিক শিল্প, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ভোগ্যপণ্য উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো প্রস্তুত থাকার পরও গ্যাস সংযোগের অভাবে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে এবং শিল্পায়নের সম্ভাবনা বাস্তবায়ন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) জানিয়েছে, প্রায় ৪০০ একর জমির ওপর গড়ে ওঠা এ অর্থনৈতিক অঞ্চলে ১৯টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান জমি বরাদ্দ পেয়েছে। প্রস্তাবিত বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ২০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। কিন্তু এখন পর্যন্ত গ্যাস সংযোগ পেয়েছে মাত্র একটি প্রতিষ্ঠান। ২০২২ সালেই শিল্প প্লট পর্যন্ত গ্যাস পাইপলাইনের অবকাঠামো নির্মাণ শেষ হলেও সংযোগ না থাকায় অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান উৎপাদন শুরু করতে পারেনি। গ্যাস সংযোগ না পাওয়ায় কিছু প্রতিষ্ঠান বিকল্প হিসেবে ব্যয়বহুল এলপিজি ব্যবহার করে উৎপাদনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
সুইফট শিল্ড বাংলাদেশ লিমিটেড প্রায় ১.১৭ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগে ল্যাটেক্স এক্সামিনেশন গ্লাভস কারখানা স্থাপন করেছে। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুহাম্মদ শরীফ খান জানিয়েছেন, প্লট বরাদ্দ পাওয়ার এক বছরের বেশি সময় এবং গ্যাস সংযোগের জন্য আবেদন করার আট মাস পার হলেও এখনো সংযোগ মেলেনি। কারখানার অবকাঠামোগত কাজ প্রায় শেষ। গ্যাস সংযোগ পেলেই উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হবে। আপাতত এলপিজি ব্যবহার করে পরীক্ষামূলক প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে; কিন্তু এতে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাচ্ছে।
সৌজন্যেঃ কালের কণ্ঠ