মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের পর শুরু হওয়া দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে নিহতের সংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়েছে। বুধবার এ তথ্য জানিয়েছে সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন এন্ড ইভেন্ট ডাটা প্রোজেক্ট (এসিএলইডি)।
এসিএলইডি জানায়, ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে চলমান সহিংসতায় এখন পর্যন্ত এক লাখ ১১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে এটি এশিয়ার সবচেয়ে ভয়াবহ ও প্রাণঘাতী সংঘাতগুলোর একটি।
২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে, সেনাবাহিনী নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে এবং গণতন্ত্রপন্থী নেতা অং সান সু চিকে আটক করার পর দেশজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়। পরে আন্দোলনকারীদের অনেকেই বিভিন্ন জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। সেই সংঘাতই ধীরে ধীরে পূর্ণাঙ্গ গৃহযুদ্ধে রূপ নেয়।
সরকারিভাবে নিহতের নির্ভরযোগ্য কোনো পরিসংখ্যান প্রকাশ না হলেও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, প্রকৃত প্রাণহানির সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। যুদ্ধের সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছেন সাধারণ মানুষ। বিমান হামলা, গোলাবর্ষণ ও সংঘর্ষে অসংখ্য পরিবার স্বজন হারিয়েছে।
রাখাইন রাজ্যের ৪৯ বছর বয়সী বাসিন্দা থেইন আয়ে নু জানান, সম্প্রতি এক বিমান হামলায় তার স্বামী নিহত হয়েছেন। তিনি বলেন, এই দুর্ভোগ যেন শেষ হওয়ার নয়। কার ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করবেন, সেটিও আর বুঝে উঠতে পারছেন না।
সাম্প্রতিক সময়ে সীমিত পরিসরে একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত বহু এলাকায় ভোটগ্রহণ হয়নি। অং সান সু চির দলও কার্যত নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি। ফলে গণতন্ত্রপন্থী মহল এই নির্বাচনকে ক্ষমতা ধরে রাখার কৌশল হিসেবে দেখছে। অন্যদিকে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোও শান্তি আলোচনার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, সংঘাতের কারণে ৩৭ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। একই সঙ্গে দারিদ্র্য ও খাদ্যসংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বর্তমানে প্রতি পাঁচজনের একজন তীব্র খাদ্যসংকটে ভুগছেন।
সংঘাত পর্যবেক্ষকদের মতে, দেশজুড়ে এক হাজার ২০০টিরও বেশি সশস্ত্র গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে। ২০২৩ সালের শেষ দিকে বিদ্রোহীরা বড় ধরনের অগ্রগতি অর্জন করলেও পরে সামরিক বাহিনী আবারও কৌশলগত সুবিধা ফিরে পায়।
এদিকে সৈন্যসংকট মোকাবিলায় ২০২৪ সালে বাধ্যতামূলক সামরিক সেবার আইন চালু করে সামরিক সরকার। এর আওতায় প্রায় ৫০ হাজার নাগরিককে সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য করা হয়েছে। একজন পালিয়ে আসা সাবেক সেনার ভাষ্য, নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ছাড়াই যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হচ্ছে।
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, মিয়ানমারের এই গৃহযুদ্ধের প্রভাব সীমান্ত পেরিয়েও ছড়িয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ ও থাইল্যান্ডে শরণার্থীর সংখ্যা বাড়ছে, ফলে শরণার্থী শিবিরগুলোতে চাপও ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। পাশাপাশি মাদক উৎপাদন, পাচার এবং অনলাইন প্রতারণা চক্রের বিস্তারও সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলছে।
সূত্র : আরব নিউজ
বিডি-প্রতিদিন/টিএ