রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ পঞ্চম বছরে এসে নতুন মোড় নিয়েছে। যুদ্ধ বন্ধে পুতিনকে বাধ্য করতে ইউক্রেন ৪০ দিনের বিশেষ অভিযান শুরু করেছে। এ অভিযানের অংশ হিসেবে ইউক্রেন রাশিয়ার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে একের পর এক ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। এ হামলায় ক্রেমলিন কিছুটা চাপে পড়লেও পুতিন যুদ্ধ চালিয়ে যেতে অনড়। তিনি ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সাথে সরাসরি বসার প্রস্তাব প্রত্যাখান করে নিজেদের শক্তি আরো সুসংহত করে আক্রমণ চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেছেন। ইউক্রেনের ড্রোন হামলার জবাবে রাশিয়াও আকাশ এবং স্থলপথে পাল্টা হামলা চালাচ্ছে।
যুদ্ধের শুরুর দিকে রাশিয়া বেছে বেছে ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামো, বিদ্যুৎ কেন্দ্র, সাবস্টেশন এবং হিটিং প্ল্যান্টগুলোতে হামলা চালিয়ে ধ্বংস করার কৌশল নিয়েছিল। এ কৌশলের মূল উদ্দেশ্য ছিল সাধারণ জীবনযাত্রাকে দুর্বিষহ করে তুলে বেসামরিক নাগরিকদের মনোবল ভেঙে দেওয়া। এখন ইউক্রেন পাল্টা সেই কৌশলই প্রয়োগ করছে রাশিয়ার ওপর। ইউক্রেন এখন বেছে বেছে রাশিয়ার ভূখণ্ডের গভীরে থাকা তেল শোধনাগার, তেল টার্মিনাল, নৌযান, অস্ত্র কারখানা ও স্যাটেলাইট যোগাযোগ কেন্দ্রের মত কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা চালাচ্ছে। নতুন কৌশলে তারা যথেষ্ট সফলও। যুদ্ধের উত্তাপ দরজায় দেখে রাশিয়ার জনগণও এখন উদ্বিগ্ন, শঙ্কিত। ৫ বছরের যুদ্ধ এমনিতেও রাশিয়ার অর্থনীতির ওপর প্রচল চাপ সৃষ্টি করেছে। সেই চাপ এখন আরো প্রবল হয়েছে। ইউক্রেন চাইছে, রাশিয়ার যুদ্ধ অর্থনীতির ওপর চাপ আরো বাড়াতে, যাতে রাশিয়া যুদ্ধ বন্ধ করতে বাধ্য হয় অথবা যুদ্ধের জন্য তাদের আরো বেশি মূল্য দিতে হয়।
বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ জ্বালানী উৎপাদনকারী দেশ রাশিয়ায় তেলের পাম্পে এখন লম্বা লাইন, যা দেশটির ইতিহাসে নজিরবিহীন। তেলের জন্য মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে; যা তাদের বিরক্ত করছে, উদ্বিগ্ন করছে। ইউক্রেনের কাছ থেকে দখল করা ক্রিমিয়ায় জ্বালানি বিক্রি স্থগিত করা হয়েছে এবং উপদ্বীপটিতে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে।
শুরুতে ইউক্রেনের ড্রোন হামলাকে পাত্তা না দিলেও এখন এমনকি পুতিন নিজেও জ্বালানী সঙ্কটের কথা স্বীকার করেছেন। জ্বালানী সঙ্কট মোকাবিলায় বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। প্রয়োজনে ডিজেল রপ্তানি বন্ধ করে দেয়ার কথাও ভাবছেন পুতিন। গত সপ্তাহে উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে জরুরি বৈঠকে পুতিন স্বীকার করেন, জ্বালানী তেলের মজুদ অস্বস্তিকর মাত্রায় নেমে এসেছে। রাশিয়ার কৃষি খাত ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বলে স্বীকার করে পুতিন বলেছেন, ‘আমাদের বেসামরিক লক্ষ্যবস্তু ও অবকাঠামোয় সন্ত্রাসী হামলার প্রভাব সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনতে হবে।’
যুদ্ধের শুরুতে ইউক্রেন রাশিয়ার ওপর এখনকার মত চাপ সৃষ্টি করতে পারেনি। কারণ তাদের যুদ্ধ সক্ষমতা অনেকটাই পশ্চিমা সমর্থন নির্ভর ছিল। কিন্তু ইউক্রেন এখন ড্রোনের এক বিশাল অভ্যন্তরীণ শিল্প গড়ে তুলেছে। তারা এখন বছরে ৬০ থেকে ৭০ লাখ ড্রোন উৎপাদন করছে। সীমান্ত এলাকায় স্থলযুদ্ধে পারা সম্ভব নয় বুঝতে পেরে ইউক্রেন দূরপাল্লার ড্রোন দিয়ে রাশিয়ার অনেক ভেতরে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে সুনিপুণভাবে আঘাত হানতে পারছে। সামরিক শক্তিতে পাল্লা দেয়া সম্ভব নয় জেনে ইউক্রেন এখন যুদ্ধে মনস্তাত্বিক ও কৌশলগত ভাবে এগিয়ে থাকতে চাইছে।
যুদ্ধে ইউক্রেনের এ আপাত সাফল্য জেলেনস্কিকে কিছুটা এগিয়ে দিয়েছেও। এমনকি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, যিনি একসময় জেলেনস্কির ওপর বিরক্ত ছিলেন, তিনিও এখন তার সাহসের প্রশংসা করছেন। ন্যাটোও আরো দৃঢ়ভাবে ইউক্রেনের পাশে দাড়ানোর কথা বলছে। নিজের নতুন কৌশলে আত্মবিশ্বাসী জেলেনস্কি বলছেন, ’সঠিক সমর্থন পেলে ইউক্রেন দ্রুত এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে, যেখানে রাশিয়া শান্তি বেছে নিতে বাধ্য হবে।’
কিন্তু ইউক্রেনের ড্রোন কৌশলের কাছে পুতিন নতি স্বীকার করবেন, এমনটা ভাবলে ভুল হবে। পুতিনকে যারা চেনেন, তারা জানেন অন্তত চাপ দিয়ে তাকে ভাঙ্গা যাবে না। ইউক্রেনের পাল্টা হামলার মুখে রাশিয়ার অগ্রযাত্রা কিছুটা মন্থর হলেও থেমে নেই। রাশিয়া ইউক্রেনজুড়ে ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং গ্লাইড বোমা হামলা অব্যাহত রেখেছে, যার ফলে প্রতিনিয়ত ইউক্রেনীয় বেসামরিক নাগরিক হতাহত হচ্ছেন।
সামগ্রিকভাবে যুদ্ধ নতুন গতি পেলেও তা বন্ধের মত পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি। গত ২৫ বছর ধরে রাশিয়ার সর্বেসর্বা ভ্লাদিমির পুতিন। কেজিবি থেকে ক্রেমলিন- সর্বত্র তার একাধিপত্য। সামরিক বাহিনী এবং প্রশাসনকে এমনভাবে সাজিয়েছেন, যাতে ভেতর থেকে কোনো ঝুঁকি নেই বললেই চলে। পশ্চিমাদের নানামুখী অবরোধ থেকে রাশিয়ার অর্থনীতিকে রক্ষায় পুতিন চীন, ভারত, ইরানের সাথে মিলে বিকল্প রাস্তা বের করেছেন। তারচেয়ে বড় কথা পুতিন জানেন, তার হাতে থাকা পারমাণবিক অস্ত্রই তার সবচেয়ে বড় রক্ষাকবচ। পশ্চিমারা দূর থেকে যতই জেলেনস্কিকে উসকানি দিক, অস্ত্র দিক; সরাসরি রাশিয়ায় হামলা চালিয়ে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ বাধানোর ঝুঁকি কেউ নেবে না।