যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা ইতিবাচক দিকে এগোচ্ছে—এমন ইঙ্গিতের পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেল সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ অনেকটাই কমেছে। এর প্রভাবে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দামে বড় ধরনের পতন ঘটেছে। ব্রেন্ট এবং পশ্চিম টেক্সাস মধ্যবর্তী সূচকের উভয় ধরনের অপরিশোধিত তেলের দাম নেমে এসেছে গত চার মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্কের অগ্রগতি নিয়ে ইতিবাচক মন্তব্যের পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ১ শতাংশের বেশি কমেছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ১ দশমিক ৩৮ ডলার বা ১ দশমিক ৮৯ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৭১ দশমিক ৫৭ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে, পশ্চিম টেক্সাস মধ্যবর্তী সূচকের অপরিশোধিত তেলের দাম ৯২ সেন্ট বা ১ দশমিক ৩২ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৬৮ দশমিক ৫৮ ডলারে নেমেছে। দুই সূচকই মার্চের পর সর্বনিম্ন দামে লেনদেন শেষ করেছে।
এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স পৃথকভাবে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা যথাক্রমে ‘খুব ভালো’ এবং ‘অত্যন্ত ভালো’ভাবে এগোচ্ছে।
রয়টার্সের আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বুধবার তেলের দাম ১ শতাংশের বেশি কমে মার্চের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে। কাতারে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আলোচনা ইতিবাচকভাবে এগোচ্ছে বলে ট্রাম্পের মন্তব্যের পর বাজারে সরবরাহ নিয়ে শঙ্কা কমে যায়।
স্যাক্সো ব্যাংকের বিশ্লেষক ওলে হ্যানসেন বলেন, কাতারে চলমান আলোচনাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা হচ্ছে। ফলে তেলের দাম আরও কমেছে এবং সামনে আরও কমার সম্ভাবনাও রয়েছে।
বুধবার ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক ‘খুব ভালো’ অবস্থায় রয়েছে এবং কাতারে সাম্প্রতিক বৈঠকগুলোও ইতিবাচক হয়েছে।
সরাসরি আলোচনার সঙ্গে যুক্ত একটি সূত্র এবং ইরানের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখা এবং স্থায়ী যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করতে দোহায় কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান।
তবে অন্তর্বর্তী সমঝোতার ব্যাখ্যা নিয়ে দুই দেশের অবস্থানে এখনো পার্থক্য রয়েছে। এমনকি গত সপ্তাহেও উভয় পক্ষ একে অপরের বিরুদ্ধে হামলা চালিয়েছে।
প্রাইস ফিউচার্স গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক ফিল ফ্লিন বলেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে আরও বেশি তেল পরিবহনের সম্ভাবনায় বাজারে আশাবাদ তৈরি হয়েছে। তার মতে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে বিশ্বে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরও বেশি তেল উৎপাদনের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচল যুদ্ধ শুরুর আগের পর্যায়ে ফিরে এসেছে। তবে এ বিষয়ে তিনি কোনো পরিসংখ্যান দেননি।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহে দেশটির অপরিশোধিত তেলের মজুত ৩৮ লাখ ব্যারেল কমে ৪০ কোটি ৮৪ লাখ ব্যারেলে নেমেছে। ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরের পর এটি সর্বনিম্ন মজুত। ৪ জুলাইয়ের ছুটিকে সামনে রেখে দেশটির শোধনাগারগুলোর চাহিদা বাড়ায় এই মজুত কমেছে। তবে রয়টার্সের জরিপে বিশ্লেষকদের ৪৫ লাখ ব্যারেল কমার যে পূর্বাভাস ছিল, প্রকৃত হ্রাস তার চেয়ে কম।
রয়টার্সের আরেক জরিপে দেখা গেছে, টানা পাঁচ মাস বাড়ার পর এবং ইরান-সংঘাত শুরুর পর প্রথমবারের মতো ২০২৬ সালের তেলের দামের পূর্বাভাস কমিয়েছেন বিশ্লেষকেরা। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি পুনরায় সচল থাকায় দীর্ঘমেয়াদে বৈশ্বিক তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাও কমেছে।
এ পরিস্থিতিতে চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে ব্রেন্ট তেলের দাম প্রায় ৪৫ ডলার কমেছে, যা ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের পর সবচেয়ে বড় ত্রৈমাসিক দরপতন। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেলের দাম কমেছে প্রায় ৩১ ডলার, যা ২০২০ সালের কোভিড-১৯ মহামারির পর সবচেয়ে বড় ত্রৈমাসিক পতন।
বিডি-প্রতিদিন/শআ