বিশ্বকাপে নকআউট পর্বের লড়াইয়ে মুখোমুখি নরওয়ে-আইভরি কোস্ট। ম্যাচের ৮৫ মিনিট পর্যন্ত আরলিং হলান্ডকে যেন খুঁজেই পাওয়া যাচ্ছিল না। আইভরি কোস্টের ডিফেন্ডাররা নিশ্চয়ই মনে মনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছিলেন। আর ভাবছিলেন, দানবটাকে আটকে রাখা গেছে! কিন্তু ফুটবলে হলান্ডের গল্প ঠিক এমনই। তিনি পুরো ম্যাচ নীরব থাকেন, তার পর হঠাৎ এক মুহূর্তে সবকিছু নিজের করে নেন। ম্যাচের তখন ৮৬তম মিনিট। একটি বল। একটি স্পর্শ। একটি গোল। তার পরই বদলে যায় ইতিহাস। নরওয়ে ২-১ গোলে হারায় আইভরি কোস্টকে। প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউট ম্যাচ জেতে স্ক্যান্ডিনেভিয়ার দেশটি। আর সেই ইতিহাসের কেন্দ্রে আবারও একটাই নাম, আরলিং হলান্ড। হলান্ডকে দেখে অনেক সময় মনে হয়, তিনি গোল করেন না; গোল যেন তাকে খুঁজে নেয়। মাঠে হয়তো তিনি দীর্ঘ সময় অদৃশ্য। ক্যামেরাও তাকে খুব বেশি খুঁজে পায় না। কিন্তু প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডাররা জানেন, এই নীরবতাই সবচেয়ে ভয়ংকর। কারণ, একবার সুযোগ পেলেই শেষ। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড তারকা আমাদ দিয়ালো ম্যাচ শেষে তাই আক্ষেপ করেই বললেন, ‘দ্বিতীয় গোলটা খুব সহজ ছিল। কিন্তু হলান্ডের মতো একজন স্ট্রাইকারকে এক মুহূর্তের জন্য ফাঁকা ছেড়ে দিলে সে আপনাকে শাস্তি দেবে।’ এই কথার মধ্যেই লুকিয়ে আছে হলান্ডের পরিচয়।
বিশ্বকাপে তিন ম্যাচ খেলেই পাঁচ গোল। তার চেয়ে বেশি গোল আছে কেবল লিওনেল মেসি ও কিলিয়ান এমবাপ্পের (দুজনেরই ছয়টি করে গোল)। অথচ গ্রুপ পর্বে ফ্রান্সের বিপক্ষে একটি ম্যাচে বিশ্রামও পেয়েছিলেন তিনি। অর্থাৎ তিন ম্যাচেই পাঁচ গোল। সংখ্যা যতটা অবিশ্বাস্য, তার চেয়েও বেশি ভয় ধরানো। ম্যাচ শেষে নরওয়ের কোচ সোলবাক্কেন কোনো রাখঢাক না রেখেই ঘোষণা দিলেন, ‘বর্তমান বিশ্বে হলান্ডই সেরা গোলদাতা। আমি তাকে বদলে অন্য কাউকে নেব না।’ এই কথার পেছনে যুক্তিও আছে। শেষ ১৩টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে হলান্ড করেছেন ২৫ গোল। পরিসংখ্যানটি ভিডিও গেমের মতো শোনায়। বাস্তবে এমন ধারাবাহিকতা খুব কম ফুটবলারই দেখাতে পেরেছেন। আন্তর্জাতিক ফুটবলে মাত্র ৫৩ ম্যাচে করেছেন ৬০ গোল। এই মাইলফলকে এত দ্রুত কেউ পৌঁছতে পারেননি। মেসি কিংবা রোনালদো, কেউ নন। এখন প্রশ্ন উঠছে, হলান্ড থামবেন কোথায় গিয়ে? ইংল্যান্ডের কিংবদন্তি ওয়েন রুনিও মুগ্ধ হলান্ডে, ‘নরওয়ে আজ যে দল, তার সবচেয়ে বড় কারণ হলান্ড। সে ম্যাচে খুব বেশি দেখা যায় না। কিন্তু যখন দেখা যায়, তখনই ম্যাচ জিতে যায় নরওয়ে। সে ভয়ংকর।’ ‘ভয়ংকর’ শব্দটি হয়তো হলান্ডের জন্যই তৈরি। গোল করার পর সতীর্থদের নিয়ে বিখ্যাত ‘ভাইকিং রো’ উদ্?যাপনে মেতে ওঠেন হলান্ড। যেন শত শত বছর আগের ভাইকিং যোদ্ধারা আবারও যুদ্ধজয় উদ্্যাপন করছেন। গ্যালারিতে তখন শুধু উল্লাস। আর হলান্ডের কণ্ঠে একটাই বাক্য, ‘এটা অবিশ্বাস্য। এটাই ইতিহাস।’ এবার সামনে ব্রাজিল। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে নরওয়ে থাকবে আন্ডারডগ। ইতিহাসও তাদের পক্ষে নয়। কিন্তু ইতিহাসের আরেকটি নিয়মও আছে, হলান্ড মাঠে থাকলে কোনো হিসাবই শেষ কথা নয়। কারণ, তিনি এমন এক স্ট্রাইকার, যিনি পুরো ম্যাচ অপেক্ষা করেন মাত্র একটি মুহূর্তের জন্য। সেই মুহূর্তটি এলেই ডিফেন্ডারদের সব পরিশ্রম, গোলরক্ষকের সব প্রস্তুতি, কোচের সব পরিকল্পনা অর্থহীন হয়ে যায়। ফুটবলে অনেক স্ট্রাইকার আছেন, যারা বল পেলে গোল করেন। আরলিং হলান্ড তাদের মতো নন। তিনি গোলের গন্ধ পান। আর সেই গন্ধ পেলেই ইতিহাসের পাতায় নিজের নামটা আরও একটু গাঢ় করে লিখে নেন।