নিউইয়র্কের নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে তখন গনগনে গরম। কিন্তু সেই তাপমাত্রাকে অনায়াসেই হার মানাল ফরাসি ফুটবলের উত্তাপ। সুইডেনকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে কিলিয়ান এমবাপের দল যখন কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট কাটছে, তখন প্রতিপক্ষ শিবিরের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়াটাই স্বাভাবিক। মাঠের দুর্দান্ত ফুটবলের পাশাপাশি ফরাসি শিবিরের ভেতরের যে ইস্পাতকঠিন একতা, সেটাই এখন বিশ্বমঞ্চের বাকি দলগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ম্যাচের প্রথমার্ধে এমবাপের দারুণ ফিনিশিংয়ে যখন ডেডলক ভাঙল, তখন এক অদ্ভুত আবেগী দৃশ্যের সাক্ষী থাকল গোটা স্টেডিয়াম। গোল উদযাপন করতে এমবাপ্পে মাঠের সীমানা পেরিয়ে সোজা ছুটে গেলেন ডাগআউটের দিকে। জড়িয়ে ধরলেন কোচ দিদিয়ের দেশমকে। মাত্র কয়েকদিন আগেই মাতৃত্ববিয়োগের ধাক্কা কাটিয়ে ফ্রান্সে মায়ের শেষকৃত্য সম্পন্ন করে ডাগআউটে ফিরেছেন ফরাসি মাস্টারমাইন্ড। অধিনায়কের দেখাদেখি বাকি দলটাও এসে এক ফ্রেমে বাঁধা পড়ল এক আবেগঘন গ্রুপ হাগে। শোকের কালো মেঘ কাটিয়ে দেশমের মুখে চওড়া হাসি ফিরিয়ে দিল তার শিষ্যেরা। ম্যাচের পর দেশম নিজেই অকপটে স্বীকার করলেন, এই দলের আসল শক্তি তাদের একতাবদ্ধ মানসিকতা। মাঝমাঠের তারকা অরেলিয়েন চুয়ামেনিও জানালেন, কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাওয়া কোচকে একটুখানি আনন্দ দিতেই তারা মাঠে নিজেদের উজাড় করে দিচ্ছেন।
সুইডেনের বিপক্ষে ম্যাচে এমবাপের জোড়া গোলের মাঝে জালের দেখা পেয়েছেন ব্র্যাডলি বারকোলাও। এই জোড়া গোলে এবারের গোল্ডেন বুটের দৌড়ে আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসির পাশে বসার পাশাপাশি এক অনন্য কীর্তি গড়েছেন ফরাসি অধিনায়ক। বিশ্বকাপ ইতিহাসে এখন তার গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৮-তে, যা মেসির চেয়ে মাত্র এক গোল কম। সাবেক ইংলিশ তারকা ইয়ান রাইটের মতে, এবারের বিশ্বকাপে ফ্রান্সের মতো এত পরিষ্কার ফেভারিট দল তিনি খুব কমই দেখেছেন। তার সাবেক আর্সেনাল সতীর্থ প্যাট্রিক ভিয়েরার গলাতেও একই সুর, ফ্রান্স সবাইকে বুঝিয়ে দিয়েছে যে তারাই টুর্নামেন্টের সেরা দল।
পরিসংখ্যানও বলছে ফরাসিদের এই ‘ক্লাস অব ২০২৬’ কতটা বিধ্বংসী। এবারের আসরে টানা পাঁচ ম্যাচে তিন বা তার বেশি গোল করার অনন্য রেকর্ড গড়েছে লে ব্লুজরা। ওসমানে দেম্বেলে আর মাইকেল অলিসের মতো তারকারা প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে নাচিয়ে ছাড়ছেন। বিশেষ করে অলিসের অ্যাসিস্টের মহড়া আর মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ ফরাসি আক্রমণভাগকে আরও ধারালো করে তুলেছে। সুইডিশ বস গ্রাহাম পটারও ম্যাচ শেষে মেনে নিয়েছেন যে, এমন এক অপ্রতিরোধ্য ফ্রান্স দলের কাছে হেরে বিদায় নেওয়াতে লজ্জার কিছু নেই, কারণ এই মুহূর্তে এর চেয়ে ভালো কোনো দল তার চোখে পড়েনি।
আগামী শনিবার ফিলাডেলফিয়ায় শেষ ষোলোর লড়াইয়ে প্যারাগুয়ের মুখোমুখি হবে ফ্রান্স। তবে এখনই ট্রফি জয়ের জোয়ারে ভেসে যেতে রাজি নন কোচ দেশম। সংবাদ সম্মেলনে অতি-উৎসাহী সাংবাদিকদের কিছুটা থামিয়ে দিয়ে তিনি মনে করিয়ে দিলেন, এখনো অনেক উন্নতি করার জায়গা বাকি আছে এবং এখনই পা মাটিতে রাখার সময়। তবে দেশম যতই সতর্ক থাকুন না কেন, যে ছন্দে এমবাপ্পে-দেম্বেলে জুটি এগোচ্ছে, তাতে ফুটবল বিশ্ব এখন থেকেই হিসেব কষতে শুরু করেছে; এই ফরাসি মহাকাব্য থামানোর সাধ্য আসলে কার আছে?
সূত্র: বিবিসি
বিডি প্রতিদিন/এনএইচ