নদনদীর পানি কমতে শুরু করলেও উত্তরের বিভিন্ন জেলায় দেখা দিয়েছে ভয়াবহ ভাঙন। হারিয়ে যাচ্ছে বসতভিটা ও ফসলি জমি। আতঙ্কে দিন কাটছে নদী তীরের বাসিন্দাদের। এদিকে চলতি মাসে দেশের তিন অঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যার শঙ্কা রয়েছে বলে আভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। গতকাল জুলাইয়ের দীর্ঘমেয়াদি আবহাওয়া পূর্বাভাসসংক্রান্ত অধিদপ্তরের বুলেটিনে এ শঙ্কার কথা প্রকাশ করা হয়।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) মো. নুরুল করিম বলেন, এ মাসে দেশের প্রধান নদনদীর পানিসমতল সামগ্রিকভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে। এ ছাড়া ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে উত্তরাঞ্চল, উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। জুলাই
মাসে দেশে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা থাকলেও বঙ্গোপসাগরে এক থেকে দুটি লঘুচাপ সৃষ্টি হতে পারে, যার মধ্যে একটি মৌসুমি নিম্নচাপে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সারা মাস দিন এবং রাতের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা বেশি থাকতে পারে। এ ছাড়া দেশের কোথাও কোথাও এক থেকে দুটি বিচ্ছিন্ন মৃদু তাপপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে। তাপমাত্রা ৩৬ থেকে ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকলে তাকে ‘মৃদু তাপপ্রবাহ’ ধরা হয়। কৃষি আবহাওয়ার পূর্বাভাসে নুরুল করিম বলেন, জুলাই মাসে দেশের দৈনিক গড় বাষ্পীভবন ২.৫ থেকে ৪.৫ মিলিমিটার এবং গড় সূর্য কিরণকাল ৩.৭৫ থেকে ৫.৭৫ ঘণ্টা থাকতে পারে। আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর- সিরাজগঞ্জ : যমুনার পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভাঙনে হারিয়ে যাচ্ছে বসতভিটাসহ ফসলি জমি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাটবাজার। সেই সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে মানুষের স্বপ্ন। হারিয়ে যাচ্ছে তাদের জন্মস্থান ও মানুষের মৃত্যুর পরের ঠাঁই নেওয়া ঠিকানা কবরস্থানও। নদীতীরের মানুষের চোখের সামনে নদীতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে তাদের চিরচেনা শেষ সম্বলটুকু। এগুলো অশ্রু ঝরিয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া আর যেন কিছুই করার থাকছে না তাদের। পানি উন্নয়ন বোর্ডও নিচ্ছে না কার্যকর ব্যবস্থা। কয়েক সপ্তাহ ধরে যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় সিরাজগঞ্জ পয়েন্টে যমুনা নদীর পানি ১২ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে। দুই সপ্তাহ ধরে সিরাজগঞ্জ সদরের কাওয়াকোলা ইউনিয়ন, কাজিপুর উপজেলার চরগিরিশ, ভেটুয়া, চৌহালী উপজেলার চর সলিমাবাদ, শাহজাদপুর উপজেলার সোনাতনী ইউনিয়ন ও কৈজুরীতে শত শত বসতবাড়ি, মসজিদ, মাদ্রাসা, স্কুল, দোকানপাট ও কবরস্থানসহ অসংখ্য গাছপালা এবং শত শত বিঘা আবাদি জমি যমুনার গর্ভে বিলীন হয়েছে। এ ছাড়াও পানি বাড়ায় প্রতিদিনই নতুন নতুন এলাকা ভাঙনের মুখে পড়ছে। বসতভিটা হারানোর আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটছে নদীপারের মানুষের। সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি বিরাজ করছে কাজিপুর উপজেলার চরগিরিশ ইউনিয়নে। একসময় যেখানে ৫০০ থেকে ৬০০ পরিবার বাস করত, এখন পুরো গ্রামটি ভাঙনের কবলে পড়েছে। মাত্র দুই সপ্তাহে অন্তত ৩০ থেকে ৪০টি বসতবাড়ি নদীতে বিলীন হয়েছে। নদীতীর যেভাবে ভাঙছে তাতে আরও শতাধিক পরিবার যেকোনো সময় গৃহহীন হয়ে পড়বে। এ ছাড়াও ২০ জুন বিকালে সদর উপজেলার বাহুকা এলাকায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ তীররক্ষা বাঁধের প্রায় ৩০ মিটার অংশ নদীতে ধসে পড়েছে। ৩০ মিটার জায়গায় ১৫ লাখ টাকা ব্যয় করে জিওব্যাগ ফেলে ভাঙন প্রতিরোধ করা হয়েছে। তবে স্থানীয়দের আশঙ্কা, পানি আরও বাড়লে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। এ ছাড়াও নিচু এলাকায় পানি প্রবেশ করায় ফসলের ক্ষতি হচ্ছে। কাওয়াকোলা ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক আবদুর রাজ্জাক জানান, পানি বাড়ায় বর্নি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। বেশ কয়েকটি বসতবাড়ি বিলীন হয়ে গেছে। হুমকির মুখে রয়েছে মাদ্রাসা, মসজিদসহ ফসলি জমি এবং বহু বসতবাড়ি। ভাঙনের কারণে চরাঞ্চলবাসী আতঙ্কে বসবাস করছে। রংপুর : রংপুরের মহিপুর এলাকায় দ্বিতীয় তিস্তা সড়ক সেতু রক্ষা বাঁধে নতুন করে ভাঙন দেখা দিয়েছে। কোলকোন্দ, আলমবিদিতর, নোহালী, সদর, লক্ষ্মীটারী ও মর্ণেয়া ইউনিয়নের অন্তত ২০টির বেশি গ্রামের নিম্নাঞ্চল পানি ঢুকে পড়েছে। এতে বাগডহরা, মিনারবাজার, আনন্দবাজার, বিনবিনা, চর মটুকপুর, চিলাখাল, বাগেরহাট, চর শংকরদহ, কাশিয়াবাড়ী, ইচলি ও চর ছালাপাকসহ বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়েছে।
কুড়িগ্রাম : কুড়িগ্রামে নদনদীর পানি কমে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও ভয়াবহ আকার নিয়েছে নদীভাঙন। বিভিন্ন নদীতীরে ৩৬টি পয়েন্টে তীব্র ভাঙনে প্রতিদিনই নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে বসতভিটা, ফসলি জমি ও স্থাপনা। একদিকে ঘর হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছে হাজারো পরিবার, অন্যদিকে বন্যার পানিতে তলিয়ে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শত শত হেক্টর কৃষিজমি।
গতকাল বিকাল ৩টার সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ধরলা নদীর কুড়িগ্রাম সেতু পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার অনেক নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। তিস্তার পানি বাড়লেও তা বিপৎসীমার নিচ দিয়ে বইছে। ফলে জেলার প্রধান চারটি নদনদী তীরবর্তী সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। তবে পানি নামার সঙ্গে সঙ্গেই ধরলা, দুধকুমার, তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্রের তীরজুড়ে শুরু হয়েছে ভয়াবহ ভাঙন। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ভূরুঙ্গামারী উপজেলার আন্ধারিঝাড় ইউনিয়নের ধাউরারকুটি, পাইকেরছড়া ইউনিয়নের পাইকডাঙ্গা, নাগেশ্বরীর বামনডাঙ্গা, চিলমারীর কড়াই বরিশাল, রাজারহাটের রামহরি এবং সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের বানিয়াপাড়া ও সরকারপাড়া এলাকা।
ভূরুঙ্গামারী উপজেলার আন্ধারিঝাড় ইউনিয়নের ধাউরারকুটি গ্রামের ফারুক হোসেন বলেন, দফায় দফায় পানি উন্নয়ন বোর্ডে জিওব্যাগ ফেলার আবেদন করেছি, কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। গত পাঁচ দিনে আমাদের গ্রামের ৩০ থেকে ৩৫টি বাড়ি নদীগর্ভে চলে গেছে। এখন আমরা সবকিছু হারিয়ে ভূমিহীন। আমরা চাই স্থায়ী ব্যবস্থা।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জেলার নিম্নাঞ্চল ও চরাঞ্চলের ৪৯৯ হেক্টর জমির পাট, চীনাবাদাম, আউশ, আমনের বীজতলা ও মরিচের খেত বন্যার পানিতে আক্রান্ত হয়েছে। এতে কৃষকদের বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আবদুুল্লাহ আল মামুন ৯ উপজেলার এসব নিমজ্জিত ফসল পানি দ্রুত নেমে গেলে আংশিক রক্ষা হতে পারে বলে জানান। তবে শাকসবজি, মরিচ, বীজতলা অনেক নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
লালমনিরহাট : তিস্তার পানি কমতে শুরু করলেও দুর্ভোগ কমেনি। নদী তীরবর্তী এলাকার অন্তত ২০ হাজার পরিবার এখনো পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে। বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে চরাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থা। পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন এলাকায় দেখা দিয়েছে নদীভাঙন। গত দুই দিনে রংপুর অঞ্চলের পাঁচ জেলা রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা ও নীলফামারীতে নদীভাঙনের শিকার হয়েছে ৬৫ হাজার পরিবার বলে জানিয়েছেন রংপুর অঞ্চলের পাউবোর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আহসান হাবীব।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, আবারও পানি বাড়ার শঙ্কা থাকায় উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন তিস্তা তীরবর্তী চরাঞ্চলের বাসিন্দারা। চরাঞ্চলবাসীদের সতর্ক থাকার জন্য মাইকিং করা হয়েছে বলেও জানিয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের এই কর্মকর্তা।
রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, গতকাল দুপুর ১২টায় দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজের ডালিয়া পয়েন্টে পানিপ্রবাহ রেকর্ড করা হয়েছে ৫১ দশমিক ৮৫ মিটার, যা বিপৎসীমার ৩০ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। গত ১২ ঘণ্টায় এ পয়েন্টে পানি ১৩ সেন্টিমিটার কমেছে। এখানে বিপৎসীমা ধরা হয় ৫২ দশমিক ১৫ মিটার। একই সময়ে কাউনিয়া তিস্তা সেতু পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ২৩ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।
এদিকে তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানি কখনো বাড়ছে আবার কমছে। এ পরিস্থিতিতে পাঁচ জেলার নিম্নাঞ্চলে নদীর কোলঘেঁষা অন্তত ২০ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে মহিপুর এলাকায় দ্বিতীয় তিস্তা সড়ক সেতু রক্ষা বাঁধে নতুন করে ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে। ভাঙছে তিস্তার লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রাম অংশেও। পাঁচ জেলার বিভিন্ন এলাকার শত শত বাড়িঘর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গ্রামীণ সড়ক ও ফসলি জমি এখন হাঁটুপানির নিচে। আমন ধানের বীজতলা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কাসহ গবাদি পশুখাদ্যের সংকট, বিশুদ্ধ খাবার পানিসহ খাদ্য সংকটে পড়েছে এসব এলাকার মানুষ।