বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের যে ভয়াবহ প্রভাব পড়ছে, তার সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি এবার লেগেছে মহাসাগরগুলোতে। চলতি বছরের জুন মাসে বিশ্বের মহাসাগরগুলোর উপরিভাগের তাপমাত্রা অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে।
ইউরোপের জলবায়ু পর্যবেক্ষণ সংস্থা ‘কপারনিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিস’-এর উপগ্রহ, জাহাজ ও সাগরে ভাসমান বয়ার সম্মিলিত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত ২১ জুন বৈশ্বিক সমুদ্রপৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রা রেকর্ড ২০ দশমিক ৮৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে (৬৯.৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট) পৌঁছায়। এটি ২০২৪ সালের জুনে হওয়া আগের সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে গেছে। সাগরের পানির এই নজিরবিহীন উষ্ণতা বিশ্বজুড়ে চরম আবহাওয়া এবং সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের জন্য বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনছে বলে সতর্ক করেছেন বিজ্ঞানীরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মহাসাগরের এই অস্বাভাবিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির পেছনে মূল কারণ প্রাকৃতিক জলবায়ু চক্র ‘এল নিনো’র সক্রিয় হওয়া। প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় ক্রান্তীয় অঞ্চলে অস্বাভাবিক উষ্ণ জলের প্রবাহের কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, সবেমাত্র শুরু হওয়া এই ‘এল নিনো’ আগামী মাসগুলোতে আরও শক্তিশালী হয়ে সাম্প্রতিক দশকের অন্যতম তীব্র রূপ ধারণ করতে পারে। তবে এর অবয়বের নিচে রয়েছে মানুষের তৈরি জলবায়ু সংকট। গত কয়েক দশক ধরে মানুষ জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে যে অতিরিক্ত তাপ উৎপন্ন করেছে, তার ৯০ শতাংশই শুষে নিয়েছে মহাসাগরগুলো, যা গ্রহের মূল ‘হিট সিংক’ বা তাপ শোষক হিসেবে কাজ করছে।
ব্রিটিশ অ্যান্টার্কটিক সার্ভের সমুদ্রবিজ্ঞানী মাইকেল মেরেডিথ সাগরের এই দ্রুত উষ্ণায়নকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে আখ্যা দিয়েছেন। কপারনিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিসের পরিচালক কার্লো বুওনটেম্পো আশঙ্কা প্রকাশ করে জানিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতি একটি নতুন ও বিপজ্জনক পর্যায়ের সূচনা নির্দেশ করছে, যা মানবজাতিকে এক সম্পূর্ণ ‘অচেনা অঞ্চলের’ দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এল নিনোর প্রভাবে আগামী মাসগুলোতে তাপমাত্রার আরও অনেক রেকর্ড ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সাগরের এই তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রভাব কেবল পানির নিচেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা বৈশ্বিক আবহাওয়ার ধরন পুরোপুরি বদলে দেবে। তপ্ত মহাসাগর বাতাসকে আরও গরম করে তুলবে, যা স্থলভাগে তীব্র দাবদাহ সৃষ্টি করবে। একইসঙ্গে এটি সামুদ্রিক ঝড়গুলোকে আরও শক্তিশালী ও বিধ্বংসী করে তুলবে এবং বাষ্পীভবন বাড়িয়ে দিয়ে অতিবৃষ্টি ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। এর পাশাপাশি সমুদ্রের অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে প্রবাল প্রাচীরের ব্যাপক ক্ষয় বা ব্লিচিং ঘটবে, যার ফলে অসংখ্য সামুদ্রিক প্রাণীর মৃত্যুসহ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাবে।
সূত্র: সিএনএন
বিডি প্রতিদিন/কেএইচটি