সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়েছে দেশের প্রথম জাতীয় যাত্রীবাহী রেলসেবা। দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে মঙ্গলবার ভোরে প্রথমবারের মতো যাত্রী নিয়ে যাত্রা শুরু করে ইতিহাদ রেল পরিচালিত ‘ডেজার্ট এক্সপ্রেস’ নামের এই ট্রেন। পর্যায়ক্রমে এটি দেশের ১১টি শহরকে একই রেল নেটওয়ার্কের আওতায় নিয়ে আসবে।
নতুন এই রেলসেবা উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে সড়কনির্ভর পরিবহন ব্যবস্থার পাশাপাশি আরও টেকসই ও পরিবেশবান্ধব যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে বড় একটি পদক্ষেপ নিল আমিরাত।
ফুজাইরাহ থেকে আবুধাবি
স্থানীয় সময় মঙ্গলবার ভোর ৫টা ৩৪ মিনিটে ওমান উপসাগর তীরবর্তী ফুজাইরাহ থেকে প্রথম ট্রেনটি যাত্রা শুরু করে। প্রায় ২৫০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে এটি সকাল ৭টা ১৯ মিনিটে আবুধাবির মোহাম্মদ বিন জায়েদ সিটি স্টেশনে পৌঁছায়। পুরো যাত্রায় সময় লাগে ১ ঘণ্টা ৪৫ মিনিট।
প্রথম দিন মোট ছয়টি ট্রেন চলাচলের মাধ্যমে পরীক্ষামূলক বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করেছে ইতিহাদ রেল।
প্রতিষ্ঠানটির তথ্যানুযায়ী, উদ্বোধনের আগেই নতুন রেলসেবার জন্য ১০ হাজারের বেশি টিকিট বিক্রি হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের ব্যাপক আগ্রহেরই প্রমাণ।
আধুনিক সুযোগ-সুবিধা
ইতিহাদ রেল জানিয়েছে, যাত্রীদের জন্য ট্রেনে থাকছে আধুনিক ও আরামদায়ক ভ্রমণের সব ধরনের সুবিধা। প্রতিটি ট্রেনে রয়েছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, উচ্চগতির ওয়াই-ফাই, মোবাইল ও ল্যাপটপ চার্জ দেওয়ার জন্য বিদ্যুৎ সংযোগ, সংরক্ষিত আসন এবং উন্নতমানের যাত্রীসেবা।
এছাড়া বেশি আরাম ও অতিরিক্ত সুবিধা চান এমন যাত্রীদের জন্য রাখা হয়েছে প্রিমিয়াম ক্লাস।
ইতিহাদ রেলের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা আজ্জা আল সুয়াইদি বলেন, “আজকের প্রথম যাত্রা শুধু একটি ট্রেনের যাত্রা নয়, এটি বহু বছরের একটি জাতীয় স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেওয়ার মুহূর্ত। এই রেলপথ দেশের মানুষকে একে অপরের সঙ্গে, নতুন সম্ভাবনার সঙ্গে এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে আরও সহজে যুক্ত করবে।”
পর্যায়ক্রমে যুক্ত হবে ১১ শহর
ইতিহাদ রেলের পরিকল্পনা অনুযায়ী, চলতি বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর দুবাই ও আল ধাইদ স্টেশন চালু হবে। এর তিন মাস পর চালু হবে আল ধাফরা অঞ্চলের স্টেশনগুলো।
আগামী বছরের মার্চের শেষ দিকে শারজাহ স্টেশন চালুর মধ্য দিয়ে পুরো রেলপথের কাজ সম্পন্ন হবে।
সব স্টেশন চালু হলে এই রেলপথ ওমান উপসাগর থেকে শুরু করে পারস্য উপসাগরসংলগ্ন অঞ্চল, বিভিন্ন আমিরাত, আবুধাবির অভ্যন্তরীণ এলাকা এবং সৌদি আরব সীমান্তবর্তী গুওয়েইফাত পর্যন্ত বিস্তৃত হবে।
ভাড়া ও ট্রেনের ধারণক্ষমতা
নতুন এই রেলসেবায় কমফোর্ট ক্লাসের ভাড়া শুরু হয়েছে ৫৫ আমিরাতি দিরহাম (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১ হাজার ৮৫০ টাকা) থেকে।
অন্যদিকে প্রিমিয়াম ক্লাসের টিকিটের মূল্য ১২০ দিরহাম (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪ হাজার টাকা)।
বর্তমানে ইতিহাদ রেলের বহরে রয়েছে ১৩টি ট্রেন। প্রতিটি ট্রেনে একসঙ্গে প্রায় ৪০০ যাত্রী ভ্রমণ করতে পারবেন।
পরিবেশবান্ধব যোগাযোগব্যবস্থার অংশ
প্রায় ৯০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই জাতীয় রেল নেটওয়ার্ক আমিরাত সরকারের পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন পরিকল্পনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প।
সরকারের লক্ষ্য, ব্যক্তিগত গাড়ির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে কার্বন নিঃসরণ হ্রাস করা এবং টেকসই গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
ট্রেনের সঙ্গে বাস ও ট্যাক্সির সমন্বয়
আমিরাতে ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার অত্যন্ত জনপ্রিয় হওয়ায় নতুন রেলসেবাকে কার্যকর করতে স্টেশন থেকে যাত্রীদের গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার জন্য বাস, ট্যাক্সি এবং অন্যান্য গণপরিবহনের সঙ্গে সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে।
সমন্বিত পরিবহন কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক আবদুল্লাহ হামাদ আল ঘাফেলি বলেন, ইতিহাদ রেলের সঙ্গে যৌথভাবে এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছে, যাতে যাত্রীরা ট্রেন থেকে নেমেই সহজে বাস, ট্যাক্সি কিংবা অন্যান্য পরিবহন ব্যবহার করে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেন।
পর্যটনে কতটা প্রভাব ফেলবে?
যদিও নতুন রেলসেবা চালু হওয়ায় আমিরাতজুড়ে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা গেছে, তবে আন্তর্জাতিক পর্যটনে এর প্রভাব কতটা হবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
জনপ্রিয় রেলভ্রমণ বিষয়ক ওয়েবসাইট ‘দ্য ম্যান ইন সিট ৬১’-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং রেলবিশেষজ্ঞ মার্ক স্মিথের মতে, এই রেলপথ বর্তমানে আমিরাতকে অন্য কোনও দেশের সঙ্গে যুক্ত করছে না। ফলে আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছে এর আকর্ষণ কতটা হবে, তা সময়ই বলে দেবে।
তবে দেশটির অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ, ব্যবসা-বাণিজ্য, পর্যটন এবং টেকসই পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নে নতুন এই জাতীয় যাত্রীবাহী রেলসেবা একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সূত্র: সিএনএন
বিডি প্রতিদিন/একেএ