মেক্সিকানদের স্বপ্ন বারবার এসে থেমে যেত একই জায়গায়। হাজারো সমর্থকের উন্মাতাল সমর্থন, গ্যালারিজুড়ে সবুজ জার্সির ঢেউ, তবু নকআউট পর্বে জয়ের দেখা ছিল না। অবশেষে সেই দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান হলো। ৪০ বছরের আক্ষেপ ঘুচিয়ে বিশ্বকাপের শেষ ষোলো নিশ্চিত করেছে স্বাগতিক মেক্সিকো। গতকাল মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক আজটেকা স্টেডিয়ামে ইকুয়েডরকে ২-০ গোলে হারিয়ে ইতিহাস গড়েছে হাভিয়ের আগুইরের দল। ১৯৮৬ সালের পর এই প্রথম বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে জয় পেল মেক্সিকো।
ঘরের মাঠ পেলেই জ্বলে ওঠে মেক্সিকানরা। এর প্রমাণ আবারও দিল দলটা। ১৯৮৬ সালে শেষ ষোলোর বাধা পাড়ি দিয়েছিল মেক্সিকো। খেলেছিল কোয়ার্টার ফাইনালে। এরপর ১৯৯৪ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত টানা সাতটা বিশ্বকাপে নকআউট পর্বে খেলেও কোনো জয়ের দেখা পায়নি তারা। অবশেষে কাক্সিক্ষত জয়ের দেখা পেল মেক্সিকো। অবশ্য জয়টা সহজ ছিল না। প্রবল ঝড় আর বজ্রপাতের কারণে এক ঘণ্টা পিছিয়ে যায় মেক্সিকো-ইকুয়েডর লড়াই। কিন্তু প্রকৃতির বাধা মেক্সিকোর ফুটবলারদের ছন্দ নষ্ট করতে পারেনি, বরং ঝড় থামার পর আজটেকায় যেন আরেক ঝড় তুললেন স্বাগতিক ফুটবলাররা। শুরু থেকেই ইকুয়েডরের ওপর চড়াও হয় মেক্সিকো। প্রথম ১০ মিনিটেই তৈরি করে চারটি গোলের সুযোগ। মাঝেমধ্যে পাল্টা আক্রমণে যাওয়ার চেষ্টা করেছে ইকুয়েডর। জন ইয়েবোয়ার একটি শট পোস্টে লেগে ফিরে না এলে ম্যাচের চিত্র ভিন্নও হতে পারত। তবে সেটিই ছিল তাদের সবচেয়ে বড় সুযোগ। বাকি সময়টা ছিল মেক্সিকোর দখলে। ২৮ মিনিটে গ্যালারিতে উৎসবের সূচনা করেন হুলিয়ান কিনিওনেস। বাঁ দিক দিয়ে দ্রুতগতিতে এগিয়ে এসে ভিতরে ঢুকে নিখুঁত শটে বল জড়িয়ে দেন জালে। বিশ্বকাপে এটি তার তৃতীয় গোল। গ্যালারিতে তখন শুধু একটাই শব্দ, ‘মেক্সিকো, মেক্সিকো।’ প্রথম গোলের রেশ কাটতে না কাটতেই ব্যবধান দ্বিগুণ করেন রাউল হিমেনেস। ইকুয়েডরের ডিফেন্ডার হোয়েল অরদোনেজের ভুলের সুযোগ নিয়ে উলভারহ্যাম্পটনের এই ফরোয়ার্ড দারুণ ফিনিশিংয়ে গোল করেন। প্রথমার্ধেই ম্যাচের ভাগ্য প্রায় নির্ধারণ হয়ে যায়। বিরতির পর ইকুয়েডর কিছুটা আক্রমণাত্মক ফুটবল খেললেও মেক্সিকোর রক্ষণভাগে ফাটল ধরাতে পারেনি। ম্যাচের শেষ দিকে ইকুয়েডরের হতাশা আরও বাড়ে। অতিরিক্ত সময়ে প্রতিপক্ষের সঙ্গে কথা বলার সময় মুখ ঢেকে রাখার কারণে লাল কার্ড দেখেন পিয়েরো ইনকাপিয়ে। চলতি বিশ্বকাপে এই কারণে দ্বিতীয় ফুটবলার হিসেবে লাল কার্ড দেখলেন তিনি। বিশ্বকাপে চার ম্যাচে টানা চার জয় মেক্সিকোর। আছে আট গোল। এখনো কোনো গোল হজম করেনি দলটি। বিশ্বকাপে এমন নিখুঁত শুরু এর আগে খুব কমই দেখা গেছে। আরও বড় কথা, আজটেকা স্টেডিয়াম আবারও হয়ে উঠেছে তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত এই স্টেডিয়ামে খেলতে এসে অনেক দলই স্বাভাবিক ছন্দ হারিয়ে ফেলে। আর ৮০ হাজারের বেশি সমর্থকের গর্জনে প্রতিপক্ষের ওপর মানসিক চাপও তৈরি হয়। সেই সুবিধাটাই দারুণভাবে কাজে লাগাচ্ছে স্বাগতিকরা। বিশ্বকাপে আজটেকায় এখন পর্যন্ত ১০টি নকআউট ও গ্রুপ পর্বের ম্যাচ খেলেছে মেক্সিকো। একবারও হারেনি। এবার সেই দুর্গেই ৪০ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটাল তারা। এখন তাদের সামনে আরও বড় পরীক্ষা। কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে প্রতিপক্ষ হবে ইংল্যান্ড অথবা ডিআর কঙ্গো। তবে বর্তমান ফর্ম, আত্মবিশ্বাস আর ঘরের মাঠের সমর্থন বিবেচনায় মেক্সিকোকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। চার দশকের আক্ষেপ ঝেড়ে ফেলা দলটি এখন নতুন স্বপ্নে বিভোর। সেই স্বপ্নের পথে কতটা যেতে পারবে মেক্সিকো?