ঘটনাটি ইংল্যান্ডের। দেশটির কেমব্রিজশায়ারের একটি চিড়িয়াখানায় কুমিরের খাঁচায় তিন বছরের এক শিশুকে ছুড়ে ফেলা হয়।
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, গত মাসে কেমব্রিজশায়ারের হান্টিংডনের জনসনস অব ওল্ড হার্স্ট চিড়িয়াখানায় এই ভয়াবহ ঘটনাটি ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, ৩০ বছর বয়সী এক ব্যক্তি নিরাপত্তা বেড়া টপকে তিন বছর বয়সী ওই শিশুকে প্রায় ১৫ ফুট নিচে কুমিরের খাঁচার ভেতরে ছুড়ে ফেলেন। নিচে পড়তেই শিশুটির ওপর হামলা চালায় একটি কুমির।
এ সময় চিড়িয়াখানার মালিক ট্রেসি জনসন নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে খাঁচার ভেতরে নেমে শিশুটিকে উদ্ধার করেন। পরে তার স্বামী অ্যান্ডি জনসন এবং ছেলে এডওয়ার্ডও উদ্ধার অভিযানে যোগ দেন। ঘটনাটি স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং ট্রেসি জনসনকে অনেকেই ‘সত্যিকারের নায়িকা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
একাধিক অস্ত্রোপচার
শিশুটির পরিবারের সহায়তায় অর্থ সংগ্রহের জন্য অনলাইন তহবিল গোফান্ডমি-তে একটি প্রচারণা শুরু করেছেন লুসি লকেট।
তিনি জানিয়েছেন, দ্রুত উদ্ধার এবং হাসপাতালে নেওয়ার ফলে শিশুটির প্রাণ রক্ষা সম্ভব হয়েছে। একাধিক জটিল অস্ত্রোপচারের পর তার শারীরিক অবস্থা এখন স্থিতিশীল হলেও সামনে রয়েছে দীর্ঘ চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের পথ।
তিনি বলেন, শিশুটির বাবা-মা সার্বক্ষণিক হাসপাতালে তার পাশে রয়েছেন। তারা সন্তানের শারীরিক চিকিৎসার পাশাপাশি ভয়াবহ মানসিক আঘাত কাটিয়ে উঠতেও সহায়তা করছেন।
লুসি লকেট আরও জানান, সংগৃহীত অর্থ শিশুটির চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং পরিবারের আর্থিক সংকট মোকাবিলায় ব্যয় করা হবে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত অর্থ থাকলে তা অ্যাডেনব্রুকস ট্রাস্ট-এর অধীন বিভিন্ন দাতব্য প্রতিষ্ঠানে দেওয়া হবে, যাতে একই ধরনের বিপর্যয়ের শিকার অন্য পরিবারগুলোকেও সহায়তা করা যায়।
তিনি পরিবারের পক্ষ থেকে অনুরোধ জানিয়েছেন, শিশুটির পরিচয় ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা যেন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ না করা হয়।
পরিবারের কৃতজ্ঞতা
কেমব্রিজশায়ার পুলিশ প্রকাশিত এক বিবৃতিতে শিশুটির পরিবার জানায়, চিড়িয়াখানার কর্মীদের সাহসিকতা না থাকলে তাদের সন্তানকে বাঁচানো সম্ভব হতো না।
বিবৃতিতে তারা বলেন, “আমাদের সন্তানকে খাঁচা থেকে উদ্ধার করা চিড়িয়াখানার কর্মীদের প্রতি আমরা আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ। পাশাপাশি হাসপাতালের চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী এবং শুভাকাঙ্ক্ষীদের প্রতি আমাদের গভীর কৃতজ্ঞতা।”
পরিবারটি জানায়, বর্তমানে তাদের সব মনোযোগ শিশুটির সুস্থতা নিশ্চিত করার দিকেই নিবদ্ধ রয়েছে।
তদন্তের মুখে সন্দেহভাজনের পরিচর্যা সংস্থা
ঘটনার পর ৩০ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়। তবে পুলিশ জানায়, মানসিক ও স্বাস্থ্যগত অবস্থার কারণে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের উপযুক্ত মনে করা হয়নি। পরে তাকে জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়।
ব্রিটিশ গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, ওই ব্যক্তি বুদ্ধিপ্রতিবন্ধকতা বা শেখার সক্ষমতাজনিত সমস্যায় (লার্নিং ডিফিকাল্টিজ) ভুগছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এ ঘটনার পর তাকে তত্ত্বাবধানকারী পরিচর্যা সংস্থার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য ও সামাজিক পরিচর্যা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা কেয়ার কোয়ালিটি কমিশন (সিকিউসি) জানিয়েছে, তারা সংশ্লিষ্ট পরিচর্যা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ এবং পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে ঘটনার তদন্ত করছে।
প্রয়োজনে সংস্থাটি সতর্কবার্তা দেওয়া, বিশেষ তত্ত্বাবধানে নেওয়া, জরিমানা কিংবা আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের মতো পদক্ষেপ নিতে পারে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ
ঘটনাস্থলে উপস্থিত কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী দাবি করেছেন, অভিযুক্ত ব্যক্তির সঙ্গে থাকা পরিচর্যাকারীরা তার প্রতি যথাযথ নজরদারি করছিলেন না।
একজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, পরিচর্যাকারীরা তার থেকে প্রায় ১০ মিটার দূরে দাঁড়িয়ে নিজেদের মধ্যে কথা বলছিলেন এবং মোবাইল ফোন ব্যবহার করছিলেন।
আরেকটি সূত্রের দাবি, ঘটনার পর তারা অভিযুক্তকে দ্রুত গাড়িতে তুলে সেখান থেকে চলে যাওয়ার চেষ্টা করেন। তবে চিড়িয়াখানার একজন কর্মী তাদের বাধা দেন এবং পুলিশ আসা পর্যন্ত আটকে রাখেন।
গুরুতর আহত শিশু
ঘটনার সময় শিশুটি কংক্রিটের ওপর পড়ে পরে পানিতে গড়িয়ে যায়। এরপর কুমিরের আক্রমণে তার একটি হাত ও শ্রোণি (পেলভিস) মারাত্মকভাবে ভেঙে যায়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শিশুটির মায়ের সামনেই পুরো ঘটনাটি ঘটে। তার সঙ্গে তখন আরেকটি ছোট শিশুও ছিল।
ঘটনার প্রায় ১০ মিনিটের মধ্যে এয়ার অ্যাম্বুলেন্স ঘটনাস্থলে পৌঁছে শিশুটিকে হাসপাতালে নিয়ে যায়।
এদিকে হাসপাতালের প্রায় ৪০ জন এনএইচএস কর্মী অনুমতি ছাড়াই শিশুটির ব্যক্তিগত চিকিৎসা নথি দেখেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনাতেও পৃথক তদন্ত শুরু হয়েছে এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
আবারও খুলে দেওয়া হয়েছে কুমিরের খাঁচা
যে খাঁচায় ঘটনাটি ঘটেছে সেখানে অন্তত ১৫টি কুমির ও অ্যালিগেটর রয়েছে। এর মধ্যে ‘রোমিও’ ও ‘কাডলস’ নামে দুটি বিশাল নীল নদের কুমিরের দৈর্ঘ্য ৯ থেকে ১১ ফুট এবং একটি কুমিরের ওজন প্রায় ৪৮৫ পাউন্ড পর্যন্ত।
ঘটনার পর সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হলেও কুমিরের ওই প্রদর্শনী এলাকা আবারও দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে।
ডেইরি খামার হিসেবে যাত্রা শুরু করা জনসনস অব ওল্ড হার্স্ট বর্তমানে একটি খামারবাড়ি, মাংসের দোকান, ফার্ম শপ, টি রুম, স্টেক হাউস এবং চিড়িয়াখানা পরিচালনা করছে। সেখানে বর্তমানে সিংহ, বাঘ, ভালুক, ক্যাপিবারা, মিরক্যাটসহ শতাধিক প্রাণী রয়েছে।
এই ঘটনায় যুক্তরাজ্যজুড়ে শিশুদের নিরাপত্তা, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের তত্ত্বাবধান এবং চিড়িয়াখানার নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সূত্র: ডেইলি মেইল
বিডি প্রতিদিন/একেএ