Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : ৭ আগস্ট, ২০১৯ ১৬:১০

আতঙ্কে কলকাতায় অবস্থানরত কাশ্মীরি ব্যবসায়ীরা

দীপক দেবনাথ, কলকাতা

আতঙ্কে কলকাতায় অবস্থানরত কাশ্মীরি ব্যবসায়ীরা
ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী

বন্ধ মোবাইল, ল্যান্ডলাইন ফোন, ইন্টারন্টে পরিষেবা, ব্রডব্যান্ড, কেবল টেলিভিশন। একাধিক জায়গায় জারি করা হয়েছে ১৪৪ ধারা, সেই সাথে চলছে কারফিউ। বিভিন্ন গণমাধ্যম সূত্রে খবর গোটা ভারতের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন কাশ্মীর। 

কারণ একটাই ভারতের সংসদে জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা খারিজ ও রাজ্যকে ভেঙে দুইটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল গঠনে বিল পেশ হতেই উদ্বেগ চরমে উঠেছে সমগ্র উপত্যকা জুড়ে। সহিংসতা, অশান্তি, গোলযোগ ঠেকাতেই আগাম সতর্কবার্তা হিসেবে এই পদক্ষেপ কেন্দ্রের। কিন্তু কেন্দ্রের এই সিদ্ধান্তের ফলে উদ্বেগে আছেন ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কাশ্মীরিরা। নিজের মাতৃভূমিতে পরিবারের কাছের মানুষজন, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব কেমন আছেন তা নিয়ে উৎকণ্ঠায় দিন কাটাতে হচ্ছে তাদের। 

কলকাতার নিউমার্কেটসহ একাধিক এলাকা আছেন যেখানে কাশ্মীর থেকে অনেকেই এখানে আসেন ব্যবসা করতে বা অনেকের নিজেদের দোকানও রয়েছে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতে অনেকেই নিজের রাজ্যে ফিরে গিয়ে তারা প্রিয় মানুষরা নিরাপদে রয়েছেন কি না তা দেখতে চাইছেন। উপত্যকায় থমথমে পরিবেশের কারণে কেউ আবার আসন্ন কোরবানি ঈদে নিজের মাতৃভূমিতে যাওয়ার পরিকল্পনা বাতিল করতে হয়েছে। 

কর্মসূত্রে নিজের ঘর (জম্মু-কাশ্মীর), বৃদ্ধ বাবা-মা, স্ত্রী এবং দুই সন্তান ছেড়ে কয়েকশত কিলোমিটার দূরে কলকাতায় অবস্থান করছেন আহমেদ ভাট। নিউমার্কেট এলাকায় ‘কাশ্মীরি এম্পোরিয়াম’ এর ম্যানেজার ভাট জানান, ‘যোগাযোগ করাটাই এখন প্রধান বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে পরিবারের সদস্যদের জন্য প্রচণ্ড দুশ্চিন্তায় রয়েছি। গত রবিবার থেকে পরিবারের কারও সাথে যোগাযোগ করতে পারছি না। একাধিক সূত্র মারফত জানতে পারছি যে পরিস্থিতি এখনও স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা কম। আগামী ১৫ আগস্ট পর্যন্ত এটা চলতে পারে বলে মনে হচ্ছে। সবমিলিয়ে পরিস্থিতি খুবই উদ্বেগজনক।’ 

ভাট আরও জানান, ‘আমি পরিবারের লোকদের সাথে দেখা করার জন্য জম্মু-কাশ্মীরে যাচ্ছি। ঈদ উৎসবে গ্রামের বাড়িতে সময় কাটানোর পরিকল্পনা থাকলেও কয়েকদিন আগেই সেখানে চলে যেতে হচ্ছে। কলকাতায় ব্যবসার কাজে কর্মরত আমার অনেক কাশ্মীরি বন্ধুরাই এখন বাড়ির দিকে রওনা হচ্ছেন। 

জম্মু-কাশ্মীর থেকে ৩৭০ ধারা প্রত্যাহার নিয়ে কেন্দ্রের সিদ্ধান্ত নিয়ে ভাটের জবাব, ‘ক্ষমতাসীন দল বলছে এটা সঠিক পদক্ষেপ কিন্তু বিরোধীরা বলছে, যে পদ্ধতিতে এই ধারার বিলোপ ঘটানো হল তা অগণতান্ত্রিক। অধিকাংশ কাশ্মীরবাসীর অভিমত হল এটা নিয়ে প্রথমে রাজ্য বিধানসভায় আলোচনার দরকার ছিল। 

‘কাশ্মীর হাট’এর মালিক রিয়াজ আহমেদ মীর জানিয়েছেন, ‘আমার বাবা-মা উপত্যকায় থাকেন। গতকাল থেকে আমি তাদের সাথে যোগাযোগ করতে না পারার কারণে খুবই শঙ্কায় রয়েছি। আমার মনে হয় না ৩৭০ ধারা প্রত্যাহার উপত্যকার জন্য সুখবর বয়ে নিয়ে আসবে। ১৯৪৭ সালে শেখ আবদুল্লাহর সাথে জওহরলাল নেহেরুর মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল কিন্তু এই সরকার (কেন্দ্র) তা ভঙ্গ করেছে।’ 

মীরের অভিমত, ‘আমরা জানতাম ভারত একটা ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র কিন্তু বিজেপির নেতৃত্বে এখন এটা হিন্দুরাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। এটা একেবারেই ঠিক নয়। এটা নিয়ে কাশ্মীরের সাধারণ মানুষ ও রাজনীতিবিদদের সাথে আলোচনার দরকার ছিল কিন্তু তা না করে দুই ভাবে বিভক্ত করে দেওয়া হল।’

ঈদের সময় শ্রীনগরে বাসায় স্ত্রী ও সন্তানদের সাথে উৎসবে সামিল হওয়ার পরিকল্পনা ছিল কলকাতার এসপ্ল্যানেড চত্বরে কাশ্মীরের হস্তশিল্প বিক্রেতা আজহার নামে এক ব্যক্তির। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে তা বাতিল করতে বাধ্য হয়েছেন তিনি। 

আজহার জানান, ‘এই মুহুর্তে ঘরে ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনা বাতিল করতে বাধ্য হয়েছি। এখন যাওয়াটা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যাবে। কারণ শুধুমাত্র ১৪৪ ধারাই নয়, কারফিউ জারি রয়েছে। অতএব পুলিশের গুলি চালানোর নির্দেশ রয়েছে।’

অনেক কাশ্মীরি ব্যবসায়ীদেরই অভিমত উপত্যকার সাথে যোগাযোগ স্বাভাবিক না হলে আগামী কয়েক সপ্তাহ ব্যবসায় প্রভাব পড়তে পারে। যদিও কারও কারও অভিমত ৩৭০ ধারা প্রত্যাহারের ফলে কাশ্মীরের বাইরে থাকা ভারতীয় যেমন কাশ্মীরে জমি কিনে সেখানে স্থায়ীভাবে বসবা করতে পারবেন, সম্পত্তি কিনতে পারবেন, তেমনি শিল্পস্থাপন থেকে ব্যবসা, শিক্ষা, জীবিকার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা থাকল না অর্থাৎ লগ্নির পথটিও সুগম হল।

তবে ভারতের অন্য অংশ থেকে যারা শ্রমিক বা অন্য কাজ করতে উপত্যকায় ঘাঁটি স্থাপন করতে হয়েছে তারাও পড়েছেন দুর্ভোগে। একদিকে তারাও যেমন পরিবারের সদস্যদের সাথে যোগাযোগ করতে পারছেন না। তেমনি রোজগার বন্ধ থাকায় সড়কপথে বাড়ি ফিরে আসতে চাইলেও যানবানহের অভাবের ফলে সমস্যায় পড়ছেন আবার বিমানে করে আসার মতো অর্থ সামর্থ্যও নেই তাদের। 


বিডি-প্রতিদিন/বাজিত হোসেন


আপনার মন্তব্য