শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ২৩:৫০

অস্তিত্ব সংকটে সাতক্ষীরার বেতনা

ন দী র কা ন্না

মনিরুল ইসলাম মনি, সাতক্ষীরা

অস্তিত্ব সংকটে সাতক্ষীরার বেতনা
দখলদারদের কবলে পড়ে অস্তিত্ব সংকটে বেতনা নদী -বাংলাদেশ প্রতিদিন

সাতক্ষীরা জেলা সদরের বুক চিরে প্রবহমান বেতনা নদী। একসময় এ নদীতে চলত লঞ্চ, স্টিমারসহ বড় বড় গয়নার নৌকা। গ্রামগঞ্জের অধিকাংশ মানুষ নৌকায় চড়ে জেলা সদরে আসত নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজে। ব্যবসা-বাণিজ্য আর যোগাযোগের ক্ষেত্রে নদীটি জেলা সদরের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত থাকায় বেতনার তীর ঘেঁষে গড়ে উঠেছিল বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। এখান থেকে মাত্র ১৫-২০ বছর আগেও নদীর হিংস্র থাবায় বর্ষা মৌসুমে দুই কূল ভাসিয়ে ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি হতো। নদীতে মাছ ধরে অনেকে জীবিকা নির্বাহ করত। আর শুষ্ক মৌসুমে নদীর পানি সেচকাজে ব্যবহার করে কৃষক জমিতে ফলাত সোনার ফসল। কালের আবর্তনে দখল আর দূষণের কবলে পড়ে আশীর্বাদের সেই বেতনা নদী এখন মৃত। ঝিনাইদহ জেলার মহেশপুরের ভৈরব নদ থেকে বেতনার উৎপত্তি। নদীটি সাতক্ষীরা জেলার কলারোয়া উপজেলা থেকে শুরু করে আশাশুনি উপজেলার চাপড়া এলাকার মরিচচাপ নদীতে গিয়ে মিশেছে। একসময়ের প্রবল খরস্রোতা সেই বেতনার খেয়াপারে মাছ ধরতে বর্ষায় ছুটে চলা মাঝিমাল্লাদের আর দৌড়ঝাঁপ নেই। জেলার ৪৬ কিলোমিটার নদীর বুকে ইটভাটা, অবৈধ স্থাপনা গড়ে ওঠায় জোয়ার-ভাটা বছর দশেক আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। নদীর বুকে চর ভরাট করে অসংখ্য ইটভাটা, বসতবাড়ি, মৎস্য ঘের তৈরি করায় নদীটি এখন অস্তিত্ব সংকটে। পরিবেশবিদদের মতে, নদীর বুকে পিলার স্থাপন করে পানি উন্নয়ন বোর্ড অপরিকল্পিতভাবে অসংখ্য ব্রিজ নির্মাণের ফলে বেতনা নদী এক দশকের মধ্যেই মরণদশায় নিপতিত হয়েছে। সরেজমিন দেখা গেছে, কলারোয়া উপজেলা থেকে সাতক্ষীরার সদর উপজেলার বিনেরপোতা হয়ে মাছখোলা পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে ছোট ছোট বাঁধ দিয়ে দখল করে ইটভাটার কাজ করায় পলি পড়ে হুমকির মুখে এখন নদীটি। কোথাও কোথাও নদী পানিশূন্য হয়ে পড়েছে। দখলদার আর ইটভাটা মালিকরা নদীকে এমনভাবে গ্রাস করেছে যে, বেতনা নদীর অস্তিত্বই এখন বোঝা মুশকিল। তবে এসব ভাটা মালিকের বিরুদ্ধে রহস্যজনক কারণে কোনো সময় ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ডের অসাধু কর্মকর্তাদের। মাঝেমধ্যে পত্রপত্রিকায় রিপোর্ট হলে অসাধু কর্মকর্তারা ভাটা মালিকসহ দখলদারদের বিরুদ্ধে নোটিস জারি করলেও পরবর্তী সময়ে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে তাদের বিরুদ্ধে আর কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায় না। ফলে বিশেষ করে ইটভাটা মালিকরা নদী দখলে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। কলারোয়া উপজেলা থেকে সাতক্ষীরার সদর উপজেলার মাছখোলা পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটারের মধ্যে নদীর তীর ও নদীর বুক দখল করে প্রায় ৩৫টির মতো ইটভাটা গড়ে উঠেছে। এসব ভাটা মালিকের কারণে বেতনা নদী মরণদশায় পরিণত হয়েছে। ফলে বর্ষা মৌসুমে পানি নিষ্কাশনের অভাবে বিপাকে পড়তে হয় কৃষক ও এলাকাবাসীকে। বেতনা ও এর সংযুক্ত খাল দখলের কারণে পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে জলাবদ্ধতার কবলে পড়তে হয় তাদের। সরেজমিন দেখা গেছে, বিনেরপোতা থেকে মাছখোলা পর্যন্ত নদীর তীরে ও বুকে চর দখল করে অসংখ্য ইটভাটা গড়ে তুলেছেন প্রভাবশালী কিছু ভাটা মালিক। এ ব্যাপারে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) নীরব থাকায় তাদের বিরুদ্ধে নানা প্রশ্ন তুলছেন এলাকাবাসী। সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ড-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আরিফুজ্জামান খান জানান, বেতনা নদীর অবৈধ দখলদার ও ভাটা মালিকদের তালিকা করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। নির্দেশ এলেই উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হবে। বর্তমানে দেবহাটা উপজেলার পারুলিয়ার সাপমারা খালের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের কাজ চলছে। এদিকে বেতনা নদীর মতো সাতক্ষীরা জেলার কপোতাক্ষ, কাকশিয়ালী, মরিচচাপ, যমুনা, সোনাই, বলুয়া, গলঘেঁষিয়া, গুঁতিয়াখালী, সাপমারা নদীসহ ছোট-বড় ২৭টি নদ-নদীর অধিকাংশ দখল ও দূষণের কারণে মরা খালে পরিণত হয়েছে।


আপনার মন্তব্য