শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ৩০ মার্চ, ২০২০ ২৩:৫৪

সর্বোচ্চ সতর্কতা কারাগারে

ডিআইজি-জেল সুপারদের জন্য ২০ নির্দেশনা, প্রতি বিভাগে ১টি করে কোয়ারেন্টাইন সেন্টার, ৬৮ কারাগারে ফোন বুথ স্থাপন ও কমিটি

সাখাওয়াত কাওসার

সর্বোচ্চ সতর্কতা কারাগারে

বিশ্বব্যাপী নভেল করোনাভাইরাস মোকাবিলার অংশ হিসেবে দেশের সবকটি কারাগারে সর্বোচ্চ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিয়েছে কারা অধিদফতর।

৬৮টি কারাগারেই কারা অধিদফতর থেকে পাঠানো হয়েছে ২০টি বিশেষ নির্দেশনা। এর বাইরে প্রত্যেক বিভাগের ১টি কেন্দ্রীয় কারাগারে স্থাপন করা হয়েছে কোয়ারেন্টাইন সেন্টার। পর্যায়ক্রমে সেগুলোকে আইসোলেশন সেন্টারে রূপান্তরের ব্যবস্থা নিয়ে রেখেছে কারা অধিদফতর। করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে প্রত্যেক কারাগারে স্থাপন করা হয়েছে জরুরি ফোন বুথ। শর্তসাপেক্ষে তাদের কথা বলার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া বন্দী হাজিরা স্থগিত করতে আইন মন্ত্রণালয়ে কারা অধিদফতরের প্রস্তাবনা সর্বশেষ সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশকে বিশেষ সাফল্য হিসেবে দেখছে কারা অধিদফতর ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। কারা অধিদফতর সূত্র বলছে, করোনা সন্দেহজনক রোগীদের ব্যবস্থাপনায় প্রত্যেকটি বিভাগে একটি করে কোয়ারেন্টাইন সেন্টার স্থাপন করেছে কারা প্রশাসন। এক্ষেত্রে ওইসব কারাগারগুলোর পুরাতন ভবন কিংবা কম গুরুত্বপূর্ণ ভবনকে বেছে নিয়ে সার্বিক সুবিধা সংযোজন করা হয়েছে। তবে ঢাকা এবং ময়মনসিংহ বিভাগের জন্য কিশোরগঞ্জ জেল-২ ভবনকে এবং খুলনা এবং বরিশাল বিভাগের জন্য পিরোজপুর জেল-২ ভবনকে বেছে নিয়েছে কারা অধিদফতর। রংপুর বিভাগের জন্য দিনাজপুর জেল-২, চট্টগ্রাম বিভাগের জন্য ফেনী জেল-২ ভবনকে বেছে নেওয়া হয়েছে। রাজশাহী বিভাগের জন্য কারা ফটকের বাইরে ডিআইজির বাসভবনকে কোয়ারেন্টাইন সেন্টার হিসেবে তৈরি করা হয়েছে। একই সঙ্গে করোনা প্রতিরোধে দেশের সবকটি কেন্দ্রীয় কারাগার এবং পুরাতন জেলা কারাগারে করোনা প্রতিরোধে জেল সুপারের নেতৃত্বে ৫ সদস্য এবং জেলা কারাগারে ৩ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে।

সূত্র আরো জানায়, দেশের ৬৮টি কারাগারের মধ্যে মাদারীপুর কারাগার লকডাউন করা হয়েছে। বাগেরহাট কারাগারে নতুন বন্দী তিন চাইনিজ নাগরিককে কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে। মাদারীপুরে অধিকসংখ্যক বিদেশফেরত প্রবাসীদের কারণে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে কারা অধিদফতর। দেশে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর থেকে প্রতিটি কারাগারে নতুন বন্দীষ্টদের জন্য আলাদা সেল খোলা হয়েছে। এই সেলে রাখা হয়েছে ১৪টি কক্ষ। নিরাপত্তা নিশ্চিতে বন্দীদের পর্যায়ক্রমে ১৪টি কক্ষে নেওয়া হচ্ছে। ‘নতুন আমদানি সেল’ নামে এই সেলে বন্দী আনার আগেই তাদের পরীক্ষা ও তল্লাশি করার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।

কারা অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক কর্নেল মো. আবরার হোসেন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, বিশ্ব মহামারী ঘোষণার আগেই অর্থাৎ ফেব্রুয়ারির শুরতেই আমরা কারাগারে এ সংক্রান্তে প্রস্তুতিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করছি। সবগুলো কারাগারে এ সংক্রান্তে চিঠি দেওয়া হয়েছিল। নির্দেশগুলো বাস্তবায়ন করা হচ্ছে কিনা কারা অধিদফতর থেকে তা মনিটরিং করা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, এখন কোয়ারেন্টাইন সেন্টার ঘোষণা করা হলেও সেগুলোকে আইসোলেশন সেন্টার করার মতো প্রস্তুতি আমরা নিয়ে রেখেছি। রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিও (আইসিআরসি) এ বিষয়ে কারা কর্তৃপক্ষকে সহায়তার জন্য এগিয়ে আসছে। আগামী বৃহস্পতিবার কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারে পিপিইসহ বিভিন্ন উপকরণ দিচ্ছে আইসিআরসি। এই প্রতিষ্ঠানটি প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তাদের সহযোগিতা অব্যাহত রাখার।

২০ নির্দেশনায় যা আছে : ডিআইজি প্রিজন এবং জেল সুপারকে পাঠানো নির্দেশনায় বলা হয়েছে : ১. কারা উপমহাপরিদর্শকরা প্রতি সপ্তাহে চক্রাকারে তার অধীনস্থ অন্তত ২টি করে কারাগার পরিদর্শন করবেন। ২. গৃহীত ব্যবস্থাদি সরেজমিন যথাযথভাবে তদারকি ও প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা প্রদান করবেন। ৩. পরিদর্শনে পরিলক্ষিত বিষয়াদি ও নির্দেশনা প্রতিপালনের জন্য বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে কারা অধিদফতরে প্রতিবেদন দাখিল করতে হবে। ৪. প্রত্যেক কারাগারের মূল ফটকে সাবান/হ্যান্ডওয়াশ/ স্যানিটাইজার স্থানীয় ব্যবস্থাপনায় প্রস্তুত রাখতে হবে। নতুন বন্দীর হাত মুখ অন্তত ২০ সেকেন্ড ভালোভাবে ধোয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। কোনোভাবেই যেন করোনা লক্ষণ রয়েছে এমন দর্শনার্থী বন্দী কারা ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে না পারে। ৫. শরীরের তাপমাত্রা পরীক্ষার জন্য সরবরাহকৃত ‘ইনফ্রারেড থার্মোমিটার’ ব্যবহার করতে হবে। কারো করোনার লক্ষণ দেখা দিলে তৎক্ষণাৎ তাকে পৃথক করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ৬. নতুন বন্দীদের অন্তত ১৪ দিন পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে। ৭. কারা ফটকে দর্শনযোগ্য স্থানে করোনা শনাক্তকরণ সংক্রান্ত জাতীয় হটলাইন নম্বরসমূহ প্রদর্শন করার ব্যবস্থা নিতে হবে। ৮. পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত জেলকোড পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসরণকরত হাজতি বন্দীদের প্রতি ১৫ দিন অন্তত এবং কয়েদিদের প্রতি ৩০ দিন অন্তর সাক্ষাতের অনুমতি পাবেন। প্রতি বন্দীর সঙ্গে সর্বোচ্চ ২ জন সাক্ষাৎপ্রার্থী দেখা করতে পারবেন। ৯. বন্দীদের জন্য ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার তথা ভিটামিন সি এর  দৈনিক চাহিদা পূরণের ব্যবস্থা করতে হবে। ১০. করোনা আক্রান্ত সন্দেহজনক কোনো বন্দীর জামিননামা এলে তাকে জামিনে ছাড়ার আগে স্থানীয় সিভিল সার্জনকে অবগত করতে হবে। ১১. কারা আবাসিক এলাকায় রোলকলে স্বাস্থ্যঝুঁকি ও করণীয় সম্পর্কে সবাইকে অবগত করতে হবে। ১২. কারা অভ্যন্তরে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বুট/জুতা ক্লোরিন কিংবা পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গনেটযুক্ত পানি দিয়ে জীবাণুমুক্ত করার পদক্ষেপ নিতে হবে। ১৩. সদ্য সরবরাহকৃত স্প্রে মেশিন দিয়ে কারাগারের প্রতিটি কক্ষ জীবাণুমুক্ত করতে হবে। ১৪. জরুরি প্রয়োজন ব্যতীত কারা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সব প্রকার ছুটি নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। ১৫. কারা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিদেশফেরত আত্মীয়স্বজনদের কারা ক্যাম্পাস থেকে বিরত রাখতে হবে। ১৬. কর্মস্থলে সবার উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। ১৭. বন্দীদের শরীরচর্চা, মাসিক বন্দী দরবার, মাসিক প্র্যাকটিস অ্যালার্ম, যে কোনো জনবহুল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, গণশিক্ষা কার্যক্রম ইত্যাদি স্থগিত করা হলো। ১৮. শর্তসাপেক্ষে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বন্দীদের ফোনে কথা বলার সুযোগ দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে, পরিবারের সদস্যরা হবেন : মা, বাবা, স্ত্রী, ভাই, বোন, সন্তান। শুধু দেশীয়/স্থানীয় নম্বরে কথা বলা যাবে। কোনোভাবেই বিদেশি বা অস্বাভাবিক নম্বরে নয়। জেএমবি, নৃশংস অপরাধ, চাঁদাবাজি মামলার অভিযুক্ত বন্দীরা এই সুযোগের বাইরে থাকবেন। বন্দীদের কথোপকথনের সময় ডেপুটি জেলার/প্রধান কারারক্ষী/সহকারী প্রধান কারারক্ষীর সার্বক্ষণিক উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। কোনো অবোধগম্য/সাংকেতিক ভাষায় কথা বলা যাবে না। ধর্মীয়, রাজনৈতিক বিষয়ে কোনো আপত্তিকর, রাষ্ট্রবিরোধী, কারা নিরাপত্তা, জননিরাপত্তা বিঘিœত হতে পারে এমন আলোচনা করার চেষ্টা করলে ওই বন্দীকে তাৎক্ষণিক নিবৃত্ত করে এ বিষয়ে রিপোর্ট করতে হবে। জরুরি ফোন সেবায় কোনো অনিয়ম/অপব্যবহার রোধে জেল সুপার, জেলারসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে দায়িত্বশীল ও সতর্ক থাকতে হবে।

১৯. করোনা প্রতিরোধে সচেতনতা সৃষ্টি এবং আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হওয়ার পরবর্তী পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়/স্বাস্থ্য অধিদফতরের মতামত/পরামর্শ গ্রহণ করতে হবে। ২০. করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে বন্দীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি, কারা নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয়পূর্বক কারাগারে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে কারাগারে নিরবচ্ছিন্ন প্রেষণ প্রদান করতে হবে।

হবিগঞ্জ জেলা কারাগারের জেলার জয়নাল আবেদীন ভূইয়া বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, কারা অধিদফতরের নির্দেশনা পুরোপুরিভাবে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। আমার কারাগারে ১৪টি ছোট ছোট কক্ষ আলাদা করে রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে সম্প্রতি এই কারাগারে একজন চিকিৎসক পেয়েছি, যা রোগী ব্যবস্থাপনায় অনেক সুবিধা হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত এই কারাগারের সব বন্দী নিরাপদে আছে।


আপনার মন্তব্য