শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ৫ মে, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ৪ মে, ২০২০ ২৩:৩৯

বনানীতে শ্রমিক বিক্ষোভ

ঢাকার রাস্তায় যানজট কাঁঠালবাড়ী-শিমুলিয়ায় উপচে পড়া ভিড়

নিজস্ব প্রতিবেদক

ঢাকার রাস্তায় যানজট কাঁঠালবাড়ী-শিমুলিয়ায় উপচে পড়া ভিড়
রাজধানীর বনানীতে গতকাল ট্রাফিক জ্যামের সৃষ্টি হয় -রোহেত রাজীব

করোনাভাইরাস উপেক্ষা করে ঢাকার বনানী ও সাভারের আশুলিয়ায় বেতন-ভাতার দাবিতে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন পোশাকশ্রমিকরা। এ ছাড়া ঢাকার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রাস্তায় অধিক গাড়ির ফলে যানজটের সৃষ্টি হয়। বিপাকে পড়েন বিভিন্ন কাজে বের হওয়া লোকজন। পুলিশের হস্তক্ষেপে যানজট স্বাভাবিক হয়। লকডাউনের মধ্যেও এত গাড়ি দেখে অনেকে হতবাক হয়েছেন। এদিকে কাঁঠালবাড়ী ও শিমুলিয়া ঘাটে ঢাকামুখী মানুষের উপচে পড়া ভিড় ছিল লক্ষণীয়। তবে ঢাকামুখী যাত্রীর চাপ কমেছে দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে। ঢাকার বনানীর চেয়ারম্যানবাড়ী এলাকায় প্রধান সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন আফকো আবেদীন নামে একটি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা। গতকাল দুপুরে তারা বেতন-ভাতা পরিশোধ ও কারখানা খুলে দেওয়ার দাবিতে এ বিক্ষোভ করেন। শ্রমিকরা বলেন, ‘এপ্রিলের বেতন এখনো আমাদের দেওয়া হয়নি। কিন্তু টাকা পরিশোধ না করে মালিকপক্ষ নোটিস ছাড়া কারখানা বন্ধ করে দিয়েছে।’

বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নুরে আযম মিয়া জানান, করোনায় সাধারণ ছুটি ঘোষণার পর অন্যান্য কারখানার মতো এই প্রতিষ্ঠানটিও বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু অন্য কারখানা খুলতে শুরু করলেও আফকো আবেদীন এখনো খোলেনি। এই কারখানার দেড় শতাধিক শ্রমিক বেতন-ভাতার দাবিতে আন্দোলন করেন। একই সঙ্গে কারখানা খুলে দেওয়ার দাবি জানান তারা।

আশুলিয়ায় লে-অফের প্রতিবাদে এবং বকেয়া বেতনের দাবিতে বাইপাইল-আবদুল্লাহপুর সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন পোশাকশ্রমিকরা। গতকাল দুপুরে জামগড়ায় ফ্যান্টাসি কিংডমের সামনে সড়কে অবস্থান নিয়ে এ বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন স্থানীয় পোশাক নিট ওয়্যার লিমিটেড কারখানার প্রায় ৩০০ শ্রমিক।

বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা বলেন, ‘এপ্রিল মাস চলে গেলেও এখনো কারখানা কর্তৃপক্ষ আমাদের মার্চ মাসের পুরো বেতন পরিশোধ করেনি। এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে একাধিকবার কথা বলার পরও তারা বেতন পরিশোধ না করে নানা ধরনের টালবাহানা শুরু করেছে। তাই কারখানার সব শ্রমিক একযোগে বিক্ষোভ শুরু করেন এবং দাবি আদায়ে সড়কে অবস্থান নেন।’

বিক্ষুব্ধ শ্রমিক শাকিল জানান, কারখানাটি লে-অফ করার কারণে চাকরির বয়স এক বছরের নিচে এমন শ্রমিকরা এমনিতেই কোনো বেতন পাবেন না। আবার যতটুকু কাজ করেছেন সেই বেতনও বকেয়া পড়েছে। কর্তৃপক্ষ কিছু শ্রমিককে মার্চ মাসের বেতন পরিশোধ করেছেন, আরও কিছু বাকি রয়েছে। যারা বেতন পাননি তাদের আর বেতন দেওয়া হবে না জানালে শ্রমিকরা আন্দোলনের ডাক দেন।’

এ ব্যাপারে আশুলিয়া শিল্পপুলিশ-১-এর সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার জানে আলম খান বলেন, ‘পোশাক নিটওয়্যার লিমিটেড কারখানার কিছু শ্রমিক লে-অফের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে সড়কে অবস্থান নেন। এ সময় আমরা কারখানা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে বিষয়টি সমাধানের আশ্বাস দিয়ে তাদের বুঝিয়ে সড়ক থেকে সরিয়ে দিই।’

এদিকে গতকাল সকালে ঢাকা রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকার (ডিইপিজেড) এ ওয়ান নামের একটি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা বিক্ষোভ করেছেন। তারা ডিইপিজেডের মহাব্যবস্থাপকের কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নিয়ে চলতি মাসসহ তাদের চার মাসের বকেয়া বেতন ও ভাতা পরিশোধের দাবি জানান।

বেপজার জেনারেল ম্যানেজার আবদুস সোবাহান বলেন, ‘শ্রমিকরা তাদের দাবি নিয়ে আমার কাছে এসেছিলেন। আমি তাদের দাবি শুনে কারখানার মালিকের সঙ্গে আলোচনা করে শ্রমিকদের বকেয়া বেতন পরিশোধ করার কথা বলেছি।’

গতকাল রাজধানীর বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সড়কে গাড়ির চাপ ছিল। অনেক স্থানে যানজট লেগে যায়। মহাখালী থেকে বনানীর রাস্তায় দীর্ঘ যানজট লেগে ছিল। বিজয় সরণি, মগবাজার, রামপুরা, বিমানবন্দরে গাড়ির চাপ থাকায় ধীরগতিতে গাড়ি চলায় যানজটের সৃষ্টি হয়। লকডাউনের মধ্যেও রাস্তায় এত গাড়ি দেখে থমকে যান পথচারী, হতবাক হন অনেকে। গণপরিবহন ছাড়া সব ধরনের গাড়ি দেখা গেছে। এসব গাড়ির মধ্যে বেশির ভাগই ছিল প্রাইভেটকার।

কাঁঠালবাড়ী-শিমুলিয়া নৌরুটে যাত্রীর চাপ : করোনাঝুঁকির মধ্যেই কাঁঠালবাড়ী-শিমুলিয়া নৌরুটে ঢাকামুখী মানুষের ঢল নামে। গতকাল সকাল থেকেই ঢাকামুখী মানুষের চাপ ছিল। এ ছাড়া ঢাকা থেকে মানুষকে বাড়ির উদ্দেশেও আসতে দেখা গেছে। কাঁঠালবাড়ী ফেরিঘাটে পোশাকশ্রমিকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষজনের ব্যাপক ভিড় ছিল। লঞ্চ-স্পিডবোট বন্ধ থাকায় ফেরিতে ছিল বাড়তি চাপ। করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়া বন্ধে সারা দেশে গণপরিবহন বন্ধ ও সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হলেও আজও দক্ষিণবঙ্গের ২১টি জেলার প্রবেশদ্বার খ্যাত কাঁঠালবাড়ী-শিমুলিয়া ঘাটে ব্যাপক ভিড় ছিল। পাশাপাশি কিছুসংখ্যক যানবাহন নিয়েও ফেরি পারাপার হয়েছে।

সরেজমিন কাঁঠালবাড়ী ঘাটে গিয়ে দেখা যায়, সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী লঞ্চ ও স্পিডবোট বন্ধ থাকলেও ফেরিযোগে পাড়ি দিচ্ছেন হাজার হাজার মানুষ। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় পারাপারের প্রতিযোগিতা। সকাল থেকে রাজধানীমুখী যাত্রীদের ভিড়ে যেন উৎসবে পরিণত হয় কাঁঠালবাড়ী ঘাট। দেশব্যাপী করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে সরকার সতর্ক থাকলেও পদ্মা নদীর কাঁঠালবাড়ী-শিমুলিয়া নৌরুটে যেন পারাপারের প্রতিযোগিতায় নামেন হাজার হাজার মানুষ।

বিআইডব্লিউটিসির কাঁঠালবাড়ী ঘাট সূত্রে জানা যায়, কয়েকদিন ধরেই চার-পাঁচটি ফেরিতে সীমিত আকারে যানবাহন পার করা হচ্ছে। এদিকে ঢাকার পোশাক কারখানাগুলো খোলার কারণে বিভিন্ন জেলা থেকে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে বিকল্পভাবে ভেঙে ভেঙে ঘাটে আসছেন মানুষ। লঞ্চ ও স্পিডবোট বন্ধ থাকায় ফেরিতে করে ঢাকামুখী যাত্রীরা পার হন। তবে যাত্রীদের সঙ্গে প্রাইভেটকার, অ্যাম্বুলেন্সসহ জরুরি সেবাদানকারী যানবাহনও পার হতে দেখা যায়।

বিআইডব্লিউটিসির কাঁঠালবাড়ী ঘাটের সহকারী  ব্যবস্থাপক সামসুল আরেফিন বলেন, কাঁঠালবাড়ী-শিমুলিয়া নৌরুটে চলমান ১৭টি ফেরির মধ্যে ২টি রোরো, ২টি ডাম্ব, ২টি কে আকৃতির ও ১টি মধ্যম ফেরির মাধ্যমে যাত্রী ও যানবাহন পার করা হচ্ছে। সকাল থেকেই রাজধানীমুখী যাত্রীর অতিরিক্ত চাপ রয়েছে। আজ (গতকাল) সাতটি ফেরি দিয়ে যাত্রী ও যানবাহন পার করা হচ্ছে।

ঢাকামুখী যাত্রীর চাপ কমেছে দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে : ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সীমিত আকারে পোশাক কারখানা চালুর পর থেকে গত কয়েক দিন রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে যাত্রীর চাপ থাকলেও গতকাল সকাল থেকে সে চাপ কমে এসেছে। গতকাল দৌলতদিয়া ফেরিঘাট দিয়ে ঢাকামুখী একাধিক যাত্রীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রোজার মাস এবং দুপুরে প্রচ- দাবদাহ থাকার কারণে মানুষ ভোরের দিকে সাধারণত ঘাট পার হতে থাকেন। বেলা ১১টা পর্যন্ত দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে যাত্রীর চাপ থাকে। তারপর চাপ কমতে থাকে। একাধিক যাত্রী জানান, তারা পোশাক কারখানায় যোগ দেওয়ার জন্যই ঢাকার দিকে যাচ্ছেন। গণপরিবহন না থাকার কারণে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে দৌলতদিয়া পর্যন্ত আসতে হয়েছে তাদের।

দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা বলেন, গতকাল ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত প্রায় এক হাজার যাত্রী দৌলতদিয়া ফেরি পার হয়েছেন। গত কয়েক দিন এই সময় পর্যন্ত যে সংখ্যাটি ছিল প্রায় তিন হাজার।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) দৌলতদিয়া ফেরিঘাটের ব্যবস্থাপক মো. আবু আবদুল্লাহ রনি জানান, দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটে করোনাভাইরাসের প্রভাবে ফেরি চলাচল সীমিত রয়েছে। শুধু জরুরি পণ্য ও সেবা পারাপারের জন্য পাঁচটি ফেরি চালু রয়েছে। গত কয়েক দিন দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে ঢাকামুখী যাত্রীর চাপ লক্ষ করা গেলেও গতকাল তেমন চাপ ছিল না।

গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রুবায়েত হায়াত শিপলু বলেন, কয়েক দিন ধরে ঢাকায় বিপুলসংখ্যক পোশাকশ্রমিক গিয়েছেন। তাদের চাকরি বাঁচানোর জন্য মানবিক দিক বিবেচনা করে দৌলতদিয়া ফেরিতে তাদের পারাপারের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। আজ (গতকাল) সকাল থেকে সেটি কম লক্ষ করা যাচ্ছে। বাস্তবিক অর্থে সবকিছু স্বাভাবিক পর্যায়ের দিকে যাচ্ছে।

 


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর