শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ৩১ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ৩১ জুলাই, ২০২০ ০০:০৭

ঢাকায় গরুর দাম কম বাইরে বেশি

নেই কোনো স্বাস্থ্যবিধি

আলী আজম

ঢাকায় গরুর দাম কম বাইরে বেশি
ঠাকুরগাঁওয়ে গতকাল একটি গরুর হাটে উপচে পড়া ভিড় -বাংলাদেশ প্রতিদিন

রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে জমে উঠেছে পশুর হাট। ঢাকায় এবার গরুর দাম কম হলেও বাইরে বেশি। কোরবানির পশুর সব হাটেই ছোট, মাঝারি ও বড় গরু উঠেছে। পর্যাপ্ত রয়েছে ছাগলও। অন্যদিনের তুলনায় ক্রেতাদের ভিড় বেড়েছে। বিক্রেতারাও দাম হাঁকছেন। গতকাল সবকটি হাটে কোরবানির পশু বিক্রি বেশি হয়েছে। ক্রেতারা বলছেন, অন্যদিনের তুলনায় দাম বেশি। বিক্রেতারা বলছেন, লোকসান না করার চেয়ে কম লাভে তারা বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। হাট-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সময় যত কমছে বিক্রি তত বাড়ছে। শেষ দিনে গরু বিক্রি আরও কয়েক গুণ বৃদ্ধি পাবে বলে তাদের আশা। তবে হাটগুলোতে সরকারি নির্দেশনায় স্বাস্থ্যবিধি মানতে ক্রেতা-বিক্রেতাদের মধ্যে অনীহা লক্ষ করা গেছে। মহামারী করোনার কারণে বড় আকারের বেশি দামের পশুর প্রতি আগ্রহ নেই ক্রেতাদের। ছাগল ও মাঝারি আকারের গরুর চাহিদা বেশি। গত বছরের চেয়ে কম দামে পশু কিনতে পেরে সন্তুষ্ট ক্রেতারা। তবে প্রত্যাশার চেয়ে কম দাম পাওয়ায় হতাশ বিক্রেতারা। তবে গরু বেশি বিক্রি হওয়ায় খুশি ইজারাদাররা। প্রতিবছরই কোরবানির পশুর হাটে চমক হিসেবে থাকে বিশেষ কিছু গরু। ওজন, সাইজ ও দামের কারণে আলোচনায় থাকে হাটে আসা এসব পশু। এবারও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। এবারের আলোচিত বড় গরু ছিল ঢাকার গাবতলী পশুর হাটে। ‘বাংলার বস’ ও ‘বাংলার সম্রাট’ নামক দুটি গরুর দাম হাঁকা হয়েছিল ৮০ লাখ টাকা। গতকাল ‘বাংলার বস’ বিক্রি হয়েছে ১০ লাখ টাকায়। সরেজমিন ঢাকার দিয়াবাড়ীর হাটে গিয়ে দেখা গেছে, হাটে প্রচুর গরু। রয়েছে ছাগল ও ভেড়া। ক্রেতাও বেশি। দামও বেশি। ক্রেতারা দরদাম করে কাক্সিক্ষত পশু কিনছেন। অনেক পুরুষ ক্রেতার সঙ্গে নারী ও শিশুরা হাটে এসেছে। ছোট ও মাঝারি সাইজের গরু বেশি বিক্রি হতে দেখা গেছে। শেষ মুহূর্তে আশানুরূপ দামে গরু বিক্রি করতে পেরে খুশি ব্যবসায়ীরা। ৫ থেকে ৩০ হাজার টাকার মধ্যে খাসি ও ভেড়া এবং  ৪৫ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকার মধ্যে গরু বিক্রি করতে দেখা গেছে। তবে যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলছেন না ক্রেতা-বিক্রেতারা। অনেকের মুখে মাস্ক নেই। সামাজিক দূরত্ব মানছেন না। হাটে আসা আশরাফ উদ্দিন চৌধুরী নামে দক্ষিণখানের এক বাসিন্দা জানান, তিনি ৯৩ হাজার টাকায় গরু কিনেছেন। তবে তার বাজেট ছিল ৮০ হাজার টাকা। আগের তুলনায় গরুর দাম বেশি হওয়ায় বাজেট বাড়াতে হয়েছে। কুষ্টিয়ার এক ব্যবসায়ী এই গরুটি দেড় লাখ টাকা দাম হেঁকেছিলেন। দরদাম করতে করতে ৯৩ হাজার টাকায় সমঝোতা হয়। হাসিল দিয়েছেন ৪ হাজার টাকা। তিনি কাক্সিক্ষত গরু কিনতে পেরে খুশি। টঙ্গীর বাসিন্দা এস এম মিন্টু জানান, তিনি ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা দিয়ে গরু কিনেছেন। তার বাজেট ছিল দেড় লাখ টাকা। গতবারের তুলনায় এবার কম দামে গরু পেয়ে তিনি খুশি। মানিকগঞ্জের এক ব্যবসায়ী এই গরুটি ২ লাখ ২০ হাজার টাকা চেয়েছিলেন। মিন্টু দরকষাকষি করে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকায় কিনে নেন গরুটি। হাসিল দিয়েছেন ৬ হাজার ২৫০ টাকা। তিনি পিকআপ ভাড়া করে টঙ্গীতে গরু নিয়ে যান। সরেজমিনে ঢাকার মেরাদিয়া পশুর হাটে গিয়ে দেখা গেছে, বনশ্রীর এইচ ব্লকের প্রধান সড়কের দুই পাশে প্রায় দেড় কিলোমিটারজুড়ে ত্রিপল আর বাঁশ দিয়ে হাট বসানো হয়েছে। হাটে রাখা হয়নি কোনো স্বাস্থ্য সুরক্ষা ব্যবস্থা। মানা হচ্ছে না সামাজিক দূরত্বও। মাস্ক ব্যবহার করছেন না বেপারীসহ অনেক ক্রেতা। হাটে ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড়। প্রচুর গরু। বিক্রিও বেশি। ছোট ও মাঝারি সাইজের গরুর ক্রেতা সবচেয়ে বেশি।

কিন্তু বেপারীরা শেষ দিকে যে ধরনের ভিড় আশা করেছিলেন এখনো সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। ফলে সব মিলিয়ে লোকসানের আশঙ্কা করছেন তারা। ক্রেতারা বলছেন, মাঝারি সাইজের গরুর বেশি চাহিদা থাকায় বেপারীরা গরুপ্রতি ১০-১৫ হাজার টাকা বাড়িয়ে দিয়েছেন। হাট যাচাই করে তারা গরু কিনবেন। তবে গত কয়েক দিনের তুলনায় ভিড় বেড়েছে কয়েক গুণ। বেড়েছে গরু বিক্রিও। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ থেকে আসা গরু ব্যবসায়ী মো. রবিউল জানান, মঙ্গলবার ২০টি গরু নিয়ে হাটে এসেছেন। বিক্রি হয়েছে মাত্র একটি। বাকি গরু বিক্রি না হওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘চার মাস আগে গরুগুলো কিনে লালনপালন করেছি। এখন চার মাস আগের কেনা দামও বলছে না। লস দিয়ে তো আর বিক্রি করব না। প্রয়োজনে কসাইদের কাছে কেজি দরে বিক্রি করে দেব।’

রূপগঞ্জ থেকে আসা আরেক ব্যবসায়ী মো. মান্নান মিয়া জানান, ২ লাখ ১০ হাজার টাকা দিয়ে একটি গরু কিনেছিলেন। গরুর খাবারসহ আরও ২ লাখ টাকা খরচ করেছেন। কিন্তু হাটে তোলার পর সর্বোচ্চ দাম উঠেছে সাড়ে ৩ লাখ টাকা। অথচ শুধু মাংসের দাম ধরলেই সাড়ে ৪ লাখ টাকার ওপরে দাম আসে। শেষ পর্যন্ত গরু বিক্রি করতে পারবেন কি না সে বিষয়ে চিন্তায় পড়েছেন তিনি। অধিকাংশ বেপারীই জানালেন, এবার ৫০ থেকে ৭০ হাজার টাকা দামের গরুর ক্রেতা বেশি। তুলনামূলক বড় সাইজের গরু তেমন বিক্রিই হচ্ছে না। হাটে গরু কিনতে আসা মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘মাঝারি সাইজের একটি গরু কিনতে এসেছি। কিন্তু মনে হচ্ছে মাঝারি সাইজের গরুর চাহিদা বেশি থাকায় বেপারীরা দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। অথচ বড় গরুর দাম চাওয়া হচ্ছে কম।’ জানা গেছে, সিটি করপোরেশনের নির্দেশনা অনুযায়ী ২৮ জুলাই থেকে ঈদের দিন পর্যন্ত অস্থায়ী পশুর হাট কার্যকর থাকবে। কিন্তু ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে ১৭টি পশুর হাট ২০ জুলাই বসানো শুরু হয়েছে।

দেশের উত্তরাঞ্চলসহ বিভিন্ন স্থানে বন্যার কারণে অনেক বেপারী আগেভাগেই পশু নিয়ে ঢাকায় চলে এসেছেন। তাই ঢাকার পার্শ্ববর্তী জেলার অনেক  বেপারী দেরিতে আসায় মূল হাটে জায়গা না পেয়ে আশপাশের সড়কে অবস্থান নিয়েছেন। সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে সড়ক, রেল, বাসাবাড়ি, অলিগলিতে পশুর হাট বসেছে। এতে যেমন চলাচলে দুর্ভোগ, তেমনি করোনার সংক্রমণ বৃদ্ধির শঙ্কা রয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি বা সামাজিক দূরত্ব মেনে চলতে মাইকিং করা হলেও ব্যবসায়ী, ইজারাদার প্রতিনিধি বা ক্রেতাদের কমই তা মানতে দেখা গেছে। মহামারী করোনাভাইরাসের কারণে স্বাস্থ্যবিধি মেনে এ বছর ঢাকা শহরের বাইরে পশুর হাট বসানোর নির্দেশনা দিয়েছিল ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের মেয়র।

১০ লাখে বিক্রি ‘বাংলার বস’ : গতকাল বিকালে গাবতলী পশুর হাটসহ সারা দেশে আলোড়ন সৃষ্টিকারী যশোরের ‘বাংলার বস’ ১০ লাখ ১০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে। মালিক মো. আসমত আলী গাইন গরুটির দাম ৩০ লাখ টাকা হেঁকেছিলেন। জানা গেছে, যশোরের মনিরামপুর উপজেলার হুরগাতী গ্রামের খামারি আসমত আলী গাইন গাবতলী পশুর হাটে ‘বাংলার বস’ ও ‘বাংলার সম্রাট’ নামক দুটি গরু আনেন। বাংলার বসের ওজন ১ হাজার ২৯৫ কেজি এবং বাংলার সম্রাট ৯৭৭ কেজি (লাইফ ওয়েট)।

২০ লাখ টাকা দাম চাওয়া বাংলার সম্রাট ১২ লাখ টাকা হলে বিক্রি করে দেবেন বলে জানিয়েছেন গরুর মালিক আসমত। তিনি বলেন, গত বছর কোরবানির ঈদের কয়েক দিন আগে যশোরের নিউমার্কেট এলাকার হাই কোর্ট মোড়ের খামারি মুকুলের কাছ থেকে তিনি ‘বাংলার বস’ কেনেন ১৭ লাখ টাকায়। আর ‘বাংলার সম্রাট’ কেনা হয় ৮ লাখ টাকা দিয়ে। প্রথম অবস্থায় দুটি গরুর দাম হেঁকেছেন ৮০ লাখ টাকা। এর মধ্যে বাংলার বসের দাম নির্ধারণ করেছিলেন ৫০ লাখ টাকা।

হাট পরিদর্শনে আতিকের স্বস্তি : ডুমনী এলাকার কোরবানির পশুর হাট পরিদর্শন করে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র আতিকুল ইসলাম। গতকাল হাটে ক্রেতা ও পশু ব্যবসায়ীদের মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার প্রবণতা দেখে এই স্বস্তি প্রকাশ করেন তিনি। সবাইকে করোনা থেকে সুরক্ষিত থাকার জন্য স্বাস্থ্যবিধি আরও কঠোরভাবে মেনে চলার পরামর্শ দেন মেয়র। পরিদর্শন শেষে মেয়র আতিক বলেন, ‘এ বছর করোনা মহামারীর মধ্যেই পশু কোরবানি দিতে হচ্ছে। মহামারী মোকাবিলা করেই পশু কোরবানি দিতে হবে। এটি অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং ব্যাপার। আমরা দেখতে পাচ্ছি, বারবার বলা সত্ত্বেও কেউ কেউ শিশুদের নিয়ে এসেছেন। তারা যদি নিজেদের সুরক্ষার বিষয়টি না বোঝেন, বোঝানো দুরূহ ব্যাপার। আপনারা নিজেদের সুরক্ষা নিজেরা মেইনটেন করবেন। আমাদের হাট মনিটরিং কমিটি বিভিন্ন হাট নিয়মিত পরিদর্শন করছে। প্রতিটি হাটে ম্যাজিস্ট্রেট রয়েছেন।’ মেয়র বলেন, ‘ডিএনসিসির ডিজিটাল গরুর হাট রয়েছে। সেখান থেকেও আপনারা পশু কিনতে পারেন। আমি অনুরোধ করব, ডিজিটাল হাট থেকে পশু কোরবানি দিন। অনলাইনে পশু কোরবানির ব্যবস্থা করা হয়েছে। বসিলায় পশু স্বাস্থ্যসম্মতভাবে হালাল উপায়ে কোরবানি দিয়ে মাংস প্রস্তুত করে বাসায় পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা নিয়েছে ডিএনসিসি। এ ছাড়া ২৫৬টি স্থানে কোরবানি দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। পশু কোরবানির পর বর্জ্য নির্দিষ্ট ব্যাগে রেখে দিন। পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা তা সংগ্রহ করে নেবেন।’

আমাদের নোয়াখালী প্রতিনিধি জানান, জেলায় কোরবানির পশুর হাটগুলোতে ব্যাপক লোক সমাগম হলেও বেচাকেনা জমে ওঠেনি। বিভিন্ন বাজারে চাহিদামতো গরু ওঠায় এবং গতবারের তুলনায় দাম কম হওয়ায় ক্রেতারা খুশি হলেও বিক্রেতাদের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে। বিক্রেতারা জানান, করোনা পরিস্থিতিতে এবার অনেকে কোরবানি দিতে পারবেন না বলে গরুর দাম উঠছে না। এদিকে হাটগুলোতে ক্রেতা-বিক্রেতাদের মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দূরত্ব না মানার প্রবণতার কারণে জেলায় করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ছে। জেলা প্রশাসক খোরশেদ আলম খান জানান, এবার নোয়াখালীতে ২৬৫টি স্থায়ী এবং ১২১টি অস্থায়ী হাটের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি জানান, ঈদের আর মাত্র এক দিন বাকি। তাই কোরবানি ঈদ ঘিরে ঠাকুরগাঁওয়ে জমে উঠেছে পশুর হাট। স্বাস্থ্যবিধি না মেনে ঠাকুরগাঁওয়ের সব পশুর হাটে হাজার হাজার মানুষ ভিড় জমাচ্ছেন। করোনাভাইরাসের ভয়াবহ সংক্রমণের মধ্যে জেলার সর্ববৃহৎ পশুর হাট সদর উপজেলার খচাবাড়ী, মাদারগঞ্জ, লাহিড়ী হাটে দেখা যায়, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা তো দূরের কথা, ক্রেতা-বিক্রেতাদের কারও মুখে মাস্ক পর্যন্ত নেই।


আপনার মন্তব্য