শিরোনাম
প্রকাশ : বুধবার, ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ২৩:৪৫

বন্যপ্রাণী পাচারের ট্রানজিট রুট বাংলাদেশ

আন্তর্জাতিকভাবে পাচারের ঝুঁকিতে বাঘ, বনরুই ও তক্ষক

জিন্নাতুন নূর

আন্তর্জাতিকভাবে বন্যপ্রাণী পাচারের ক্ষেত্রে ‘ট্রানজিট রুট’ বাংলাদেশ। বাংলাদেশ থেকে সড়ক, নৌ ও আকাশ পথে বিভিন্ন প্রজাতির বন্যপ্রাণী পাচার করা হচ্ছে। বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিট কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পাচারের জন্য দেশের তিনটি প্রাণী এখন ঝুঁকিতে আছে। এগুলো হলো রয়েল বেঙ্গল টাইগার, বনরুই ও তক্ষক। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ধরন ও কৌশল বদলালেও আন্তর্জাতিক বন্যপ্রাণী পাচারকারীরা রুট হিসেবে বাংলাদেশকে ব্যবহার করছে। তবে বিভিন্ন সময় বন্যপ্রাণী বহনকারীরা আটক হলেও মূল হোতারা অধরাই থেকে যাচ্ছে।

বিগত বছরগুলোয় মাদক ও অবৈধ অস্ত্রের ব্যবসার সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশীয় বন্যপ্রাণী পাচারের ঘটনাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। রাজধানী ঢাকা ও আশপাশ ছাড়াও কিশোরগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, চলনবিল ও পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে স্থানীয়ভাবে বাণিজ্যিক এবং বিদেশে পাচারের উদ্দেশ্যে বন্যপ্রাণী শিকার করা হচ্ছে।

বন বিভাগের সংশ্লিষ্টরা জানান, আন্তর্জাতিক পাচারকারী চক্র বিভিন্ন দেশ থেকে আকাশপথে বন্যপ্রাণী নিয়ে বাংলাদেশে আসে। সড়কপথে এসব প্রাণী চলে যায় বিভিন্ন সীমান্তবর্তী এলাকায়। এরপর ভারত হয়ে থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম, চীন, সিঙ্গাপুরসহ অন্যান্য দেশে তা পাচার করা হয়। জানা যায়, বন্যপ্রাণী চোরাচালানে একটি আন্তর্জাতিক চক্র সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। কখনো এ চক্র দেশের ভিতর থেকে বিভিন্নভাবে প্রাণী পাচার করছে, আবার কখনো বাংলাদেশকে বন্যপ্রাণী পাচারের রুট হিসেবে ব্যবহার করছে। বিভিন্ন সময় পাচারে জড়িত বন্যপ্রাণী বহনকারীদের আটক করা হলে দেশি-বিদেশি মূল হোতারা রয়ে যায় অধরা। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, বেনাপোল,           হিলি ও বাংলাবান্ধা পোর্ট দিয়েই জীবন্ত বন্যপ্রাণী বেশি পাচার হয়। বন্যপ্রাণী পাচারসংক্রান্ত অভিজ্ঞ আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘ট্রাফিক’-এর প্রতিবেদন বলছে, কালো ছোপবিশিষ্ট কচ্ছপ বাংলাদেশে পাওয়া যায়। এগুলো হংকং ও চীনে পাচারের উদ্দেশ্যে পাঠানো হয়। সাধারণত কচ্ছপের খোলস ম্যানিব্যাগ ও জুয়েলারি বাক্স তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। আর এর মাংস বিক্রি হয় থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরের রেস্টুরেন্টগুলোয়। ট্রাফিকের প্রতিবেদন আরও বলছে, বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর ৫০০ কোটি টাকার বন্যপ্রাণী ও উদ্ভিদ পাচার হয়। ২০০০ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন দেশে ৫১টি বাঘের চামড়া এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পাচর হয়। সংস্থাটির প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক বন্যপ্রাণী পাচার চক্রের বাংলাদেশকে ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহারের বিষয়টি উঠে এসেছে।

বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের তথ্যমতে পাচারের জন্য বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন সময় উদ্ধার বন্যপ্রাণীগুলো হচ্ছে- বিভিন্ন ধরনের পাখি, শুশুক, মায়াহরিণ, বিভিন্ন ধরনের সাপ, বনবিড়াল, মেছোবিড়াল, হনুমান, গন্ধগোকুল, বেজি, বানর, তক্ষক, কচ্ছপ, রামগুঁই, ভোঁদড়, রাজকাঁকড়া, ঘড়িয়াল, বাগাড়, শিয়াল, চিতাবিড়াল ও লজ্জাবতী বানর। বিশেষ করে রয়েল বেঙ্গল টাইগার পাচারের জন্য আন্তর্জাতিক পাচারকারী চক্র বিভিন্নভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বাঘ ছাড়াও সুন্দরবনের চোরা শিকারি চক্রের প্রধান টার্গেট মায়াবী হরিণ। করোনাকালে এ চক্রের তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। জানুয়ারিতে মাত্র ২০ দিনের ব্যবধানে একটি বাঘ ও ১৯টি হরিণের চামড়া এবং ৩ মন হরিণের মাংসসহ ১১ জন চোরা শিকারি ও পাচারকারীকে গ্রেফতার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন জেলায় চোরা শিকারিদের রোষানলে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে পরিবেশবান্ধব বন্যপ্রাণী তক্ষক। মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে চোরা শিকারিরা প্রাণীটি শিকার করে বেড়াচ্ছে। তক্ষকের বিষে ক্যান্সার ও এইডসের মতো প্রাণঘাতী রোগের অস্তিত্ব আছে। এটি জানার পর থেকেই তক্ষক চোরাই অভিযান শুরু হয়। চীন ও ভিয়েতনামে তক্ষকের ব্যাপক চাহিদা থাকায় চোরা শিকারিরা সীমান্ত দিয়ে এর পাচার অব্যাহত রেখেছে। আবার বনরুই পার্বত্য চট্টগ্রাম ও মৌলভীবাজার এলাকায় দেখা গেলেও এ প্রাণীটিও অস্তিত্ব সংকটে পড়তে যাচ্ছে।

বন্যপ্রাণী পাচার রোধে ২০১২ সালে সরকার বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিট গঠন করে। এ ইউনিটের পরিচালক এ এস এম জহির উদ্দিন আকন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘এ কথা ঠিক যে আন্তর্জাতিকভাবে বন্যপ্রাণী পাচারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ট্রানজিট রুটগুলোর একটি। বিশ্বে পাচারের জন্য যে প্রাণীগুলোর চাহিদা রয়েছে এর মধ্যে বাংলাদেশের সুন্দরবনের বাঘ, তক্ষক ও বনরুই অন্যতম। তাই এ তিনটি প্রাণী ঝুঁকিতে রয়েছে। পাচার রোধে কাস্টমস ও বিজিবি কর্তৃপক্ষকে সহযোগিতা করার জন্য চিঠি দিয়েছি। আমাদের ইউনিটটি এখনো রাজস্বে না যাওয়ায় বর্তমানে মাত্র ১১ জন জনবল নিয়েই কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।’ তিনি জানান, বন্যপ্রাণী পাচারকারীদের সাজার মেয়াদ, আসামিকে সহজে আইনের আওতায় আনাসহ অনেক বিষয় অন্তর্ভুক্ত করে বন্যপ্রাণী আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বন বিভাগ থেকে জানানো হয়, দেশীয় বন্যপ্রাণীর বাজারমূল্য নির্ধারণের জন্য কাজ চলছে। তবে ধারণা করা হচ্ছে, দেশে প্রতি বছর ১০ কোটি টাকার ওপরে বন্যপ্রাণীর বেচাকেনা হয়। পাচারকারী চক্র মূলত বাংলাদেশে ঘুরতে আসা বিদেশি পর্যটক এবং দেশের ধনী-শৌখিন ক্রেতার কাছে এসব বন্যপ্রাণী বিক্রি করে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ থেকে চীন, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও মিয়ানমারে বন্যপ্রাণী পাচার করা হয়। বিভিন্ন বন্যপ্রাণী পাচারের জন্য পাচারকারীরা নদীপথ ও আকাশপথ ব্যবহার করে। মূলত বাংলাদেশের তিন দিকেই স্থলভাগ। আর দেশের স্থলভাগ সে অর্থে বন্যপ্রাণীর জন্য নিরাপদ নয়। এ জন্য বাংলাদেশকে পাচারকারীরা সহজেই ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর