শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ২২ জুন, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ২১ জুন, ২০২১ ২৩:২৭

বালু সরাতেই বেরিয়ে আসে লাশ

মির্জা মেহেদী তমাল

বালু সরাতেই বেরিয়ে আসে লাশ
Google News

২৪ বছর বয়েসী ফাতেমা বেগম। নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারের বিশনন্দী ডেংপাড়া এলাকায় মামার বাড়িতে থাকেন। তার বাবার বাড়িও দুই গ্রাম পরে। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই ফাতেমা তার নানির বাড়িতে থাকেন। বিয়ে হয়েছিল। কিন্তু দুই মাস পরই তার ডিভোর্স হয়ে যায়। গত বছর ১০ আগস্ট বিকালে ফাতেমা বাসা থেকে বেরিয়ে যান। মামিকে বলে যান, কিছু সময়ের মধ্যে ফিরে আসছি। একটা ফোনকল আসার পরই ফাতেমা তড়িঘড়ি করে বেরিয়ে যান। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত হয়। ফাতেমা ফেরেন না। রাত পেরিয়ে সকাল। ফাতেমার খোঁজ নেই। ফাতেমার মামা-মামির ধারণা, সে হয়তো তার বাবার বাড়ি গেছে। কারণ কিছুদিন ধরে ফাতেমা তার বাবার বাড়ি মামার বাড়ি ঘুরে-ফিরে থাকত। কিন্তু মামি খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, ফাতেমা সেখানে যায়নি। দুই দিন পর থেকে তাদের টেনশন শুরু হয়। ফাতেমার মামা এ খবর জানতে পেরে বাসার সবার সঙ্গে রাগারাগি করেন। তাকে কেন জানানো হলো না, এ নিয়ে বকাঝকা। তারা পুলিশকেও কিছু জানাননি। নিজেরাই বিভিন্ন স্থানে আত্মীয়-স্বজনদের বাসায় খোঁজখবর নিতে শুরু করেন। কিন্তু খোঁজ পান না ফাতেমার। ফাতেমার সঙ্গে ইউনুস নামে এক যুবকের সম্পর্ক ছিল। এ বিষয়টি ফাতেমার পরিবার জানত। তাদের এটাও ধারণা হয়, হয়তো তারা বিয়ে করে ফেলেছে। কিন্তু এলাকায় ইউনুসকে ঘোরাফেরা করতে দেখে তাদের সে ধারণাও পাল্টে যায়। ফাতেমার পরিবার ইউনুসকে প্রথমে জানায়নি। কারণ, ইউনুস না জেনে  থাকলে, তাকে জানিয়ে বরং ক্ষতি হবে। পরে আর ইউনুসের সঙ্গে বিয়ে নাও হতে পারে। এসব চিন্তা করে ফাতেমার পরিবার গোপনে গোপনে মেয়ের খোঁজ করতে থাকে। গত বছরের ১৫ আগস্ট আড়াইহাজার থানার বিশনন্দী ডেংপাড়া এলাকায় ডালিমের নির্মাণাধীন ঘরের বালুভর্তি ভিটি থেকে অজ্ঞাত মহিলার অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ বিষয়ে এসআই মুক্তার হোসেন বাদী হয়ে আড়াইহাজার থানায় মামলা করেন। পরে মামলাটির তদন্তভার পায় পিবিআই। ঘটনার ৪৩ দিন পর পুলিশ সিলেটের জৈন্তাপুর থেকে গ্রেফতার করে ফাতেমার ঘাতক ইউনুসকে। খুনের ঘটনার সব স্বীকার করেছে ইউনুস।

ইউনুছ আলী অবিবাহিত এবং নয় বছর মালয়েশিয়ায় চাকরি করে গত ফেব্রুয়ারিতে ছুটিতে দেশে আসেন। ইউনুসরা আগে মানিকপুর এলাকায় থাকতেন। ফাতেমার নানা-নানির ভালো লাগত ইউনুসকে। তারাও চাইতেন ফাতেমার সঙ্গে বিয়ে হোক। বিভিন্ন অজুহাতে ইউনুসকে তাদের ঘরে ডাকতেন এবং ইউনুসকে ফাতেমার সঙ্গে বিয়ের প্রস্তাব দিতেন। পাশাপাশি বাড়িতে থাকা অবস্থায় ফাতেমার সঙ্গে ইউনুসের প্রেমের সম্পর্ক হয়।

এরই মধ্যে ইউনুস আলীর পরিবার আড়াইহাজার থানার বিশনন্দী ডেংপাড়ায় নতুন বাড়ি করে সেখানে চলে যায়। বিভিন্ন সময়ে ইউনুস আলী মানিকপুরে অবস্থিত তাদের পুরনো খালি বাড়িতে আসতেন। ওই বাড়িতে ফাতেমার সঙ্গে প্রেম ও ভালোবাসার সম্পর্ক তৈরি করে একপর্যায়ে শারীরিক মেলামেশা শুরু করেন। তাদের প্রেমের বিষয়টি দুই পরিবারের লোকসহ প্রতিবেশীরা জেনে যান।

ইউনুসের পরিবার তাদের সম্পর্কের বিরোধিতা করেই ইউনুসের বিয়ের জন্য কনে দেখা শুরু করে। অন্যদিকে ইউনুসের সঙ্গে মেলামেশার কারণে ফাতেমা গর্ভবতী হয়েছে বলে আশঙ্কা করে। এদিকে ইউনুসের জন্য কনে দেখার বিষয় জানতে পেরে ইউনুসকে বিয়ের জন্য চাপ দেন ফাতেমা। কিন্তু ইউনুস ফাতেমাকে বিয়ে করতে রাজি ছিলেন না। এ অবস্থায় গত ১০ আগস্ট বিকালে ইউনুস মোবাইল ফোনে ফাতেমা আক্তারকে ডেকে নেন। তারা বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে সন্ধ্যার পর তাদের নতুন বাড়ির পেছনের গাছগাছালি বেষ্টিত জায়গায় যান। রাত ১০টায় ফাতেমার কাছে গিয়ে শারীরিক মেলামেশা করেন। মেলামেলার একপর্যায়ে কৌশলে ফাতেমার পেছন দিক থেকে বাহু দিয়ে গলা চেপে ধরে হত্যা করেন। পাশেই স্থানীয় ডালিমদের বাড়ি। সেই বাড়ির নির্মাণকাজ চলছিল। ফাতেমার লাশ ডালিমের নির্মাণাধীন ঘরের বালুভর্তি ভিটির সামনে নিয়ে যান ইউনুস। সেখানে গর্ত করে লাশ ফেলে বালুচাপা দেন। পরদিন ইউনুস সেই বাড়িতে আবারও যান। সেখানে ডালিমের মাকে বসে থাকতে দেখেন। ডালিমের মায়ের কাছে ইউনুস জানতে চান, মেঝে কবে ঢালাই দেওয়া হবে। তখন ডালিমের মা বলেন, টিনের কাজ শেষে ভিটি পাকা করা হবে, তখন ইউনুছ বলেন, দ্রুত ভিটি পাকা করে ফেলেন, যদি টাকা লাগে আমার কাছ থেকে নেবেন। ডালিম ঘরের কাজ করা অবস্থায় ১৫ আগস্ট ভিটি থেকে দুর্গন্ধ পান। সেখানে কোদাল দিয়ে বালু সরালেই বেরিয়ে আসে লাশ। অর্ধপচা লাশের খবর ছড়িয়ে পড়ে। পরে পুলিশ এসে লাশ মর্গে পাঠায়। অজ্ঞাত আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা বেকর্ড করে তদন্ত শুরু হয়। পরে মামলার তদন্তভার পেয়ে পিবিআই নারায়ণগঞ্জ মামলার তদন্ত শুরু করে। তারা উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে জানতে পারে ইউনুস আছে সিলেটের জৈন্তাপুরে। ওই বছরের ৮ ডিসেম্বর সিলেটের জৈন্তাপুর থানার বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকায় ঘণ্টাব্যাপী দুঃসাহসিক অভিযান চালিয়ে গ্রেফতার করা হয় ইউনুসকে। পরে তাকে নিয়ে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার এলাকায় অভিযান চালিয়ে কোদাল উদ্ধার কর হয়। ১০ ডিসেম্বর আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন ঘাতক ইউনুস। পরে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।

এই বিভাগের আরও খবর