শনিবার, ৭ আগস্ট, ২০২১ ০০:০০ টা

ঐতিহ্য

চাঁপাইনবাবগঞ্জের ঐতিহ্য ছোট সোনামসজিদ

মো. রফিকুল আলম, চাঁপাইনবাবগঞ্জ

চাঁপাইনবাবগঞ্জের ঐতিহ্য ছোট সোনামসজিদ

প্রাচীন বাংলার গৌড়ের রাজধানী চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলায় বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপনা ও দর্শনীয় নিদর্শনগুলো আজও বিদ্যমান। সেন বংশের শেষ রাজাদের স্মৃতিচিহ্ন ও সুলতানি আমলে সুলতানদের নির্মিত মসজিদই এই এলাকার প্রধান ঐতিহাসিক স্থাপনা। স্থাপনাগুলোর মধ্যে সুলতানি স্থাপত্যের রত্ন বলে খ্যাত ছোট সোনামসজিদ অন্যতম। জানা যায়, ভারতের মালদহ জেলার মোহদীপুরে  অনুরূপ একটি মসজিদ থাকায় সেটিকে বড় সোনামসজিদ এবং এটিকে ছোট সোনামসজিদ বলা হয়। এই ছোট সোনামসজিদ প্রাচীন বাংলার রাজধানী গৌড়-লখনৌতির ফিরোজপুর কোয়াটার্সের তোহাখানা কমপ্লেক্স থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে বিশাল এক দিঘির পাশে অবস্থিত। মসজিদের প্রধান প্রবেশপথের উপরিভাগে স্থাপিত একটি শিলালিপি অনুযায়ী মসজিদটি মজলিস-ই-মাজালিস মজলিস মনসুর ওয়ালী মুহাম্মদ বিন আলী কর্তৃক নির্মিত হয় বলে জানা যায়। শিলালিপিতে নির্মাণের সঠিক তারিখ সংবলিত অক্ষরগুলো মুছে গেলেও এতে সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহর নাম উল্লেখ থাকায় ধারণা করা হয় তার রাজত্বকালের (১৪৯৪-১৫১৯) কোনো এক সময় সোনামসজিদটি নির্মিত হয়।

মসজিদের স্থাপত্যশৈলী সভাইকে মুগ্ধ করে। মসজিদের দরজাগুলো শোভাবর্ধক রেখা দিয়ে ঘেরা থাকলেও এর খুব কাছে না গেলে এর খোদাই কাজ চোখে পড়ে না। মসজিদের মধ্য দ্বারের উপরস্থ লিপিটির অনুবাদ এ রকম : ‘দয়াময় ও করুণাময় আল্লাহর নামে। সর্বশক্তিমান আল্লাহ বলেন যে, আল্লাহ ও বিচার দিনের ওপর আর কাউকে ভয় করো না। যারা আল্লাহর মসজিদ তৈরি করেন তারা শীঘ্রই পথ প্রদর্শিতদের অন্তর্ভুক্ত হবে এবং নবী (সা.) বলেন যে, আল্লাহর জন্য যে একটি মসজিদ নির্মাণ করে, তার জন্য অনুরূপ একটি গৃহ বেহেশতে তৈরি করা হবে। এই মসজিদের নির্মাণকার্য সুলতানগণের সুলতান, সৈয়দগণের সৈয়দ, পবিত্রতার উৎস, যিনি মুসলমান নর-নারীর ওপর দয়া করেন, যিনি সত্য কথা ও সৎ কাজের প্রশংসা করেন, যিনি ইসলাম ও মুসলমানদের রক্ষক, সেই আলাউদ্দুনীয়া ওয়াদ্দীন আবুল মুজাফ্ফর হোসেন শাহ সুলতান আল হোসাইনী’র (আল্লাহ তার রাজ্য ও শাসন চিরস্থায়ী করেন) রাজত্বকালে সংঘটিত হয়। খালেস ও আন্তরিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে এবং আল্লাহর ওপর বিশ্বাস রেখে ওয়ালী মনসুর কর্তৃক জামে মসজিদ নির্মিত হয়। সর্বশক্তিমান আল্লাহ ইহকাল ও পরকাল উভয় স্থানে তাকে সাহায্য করেন। এর শুভ তারিখ হচ্ছে রহমতের মাস রজবের ১৪ তারিখ। এর মূল্য ও মর্যাদা বর্ধিত হোক’।

এই লিপিটির মধ্যের লাইনে তিনটি শোভাবর্ধক বৃত্ত রয়েছে। মসজিদটি অলঙ্করণের ক্ষেত্রে সোনালি গিল্টির (রঙের) ব্যবহার থেকে এর নামকরণ সোনামসজিদ হয়েছে ধারণা করা হলেও সেই গিল্টি এখন আর নেই। মসজিদের চারদিকে একটি পুরু দেয়াল ছিল। পূর্ব-পশ্চিমে ৪২ মিটার এবং উত্তর-দক্ষিণে ৪৩ মিটার লম্বা এই বহির্দেয়ালের পূর্বদিকের মধ্যবর্তী স্থানে একটি প্রধান ফটক ছিল। মসজিদের বাইরের দেয়ালে এবং ভিতরে গ্রানাইট পাথর খন্ডের আস্তরণ রয়েছে।

জানা যায়, ১৮৯৭ সালে প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্পে ধ্বংসলীলার পর সংস্কার কাজের সময় পশ্চিম দেয়ালের দক্ষিণ অংশে পাথরের আস্তরণ অপসারিত হয়েছে। মসজিদের বাইরের দিকে চার কোণে চারটি বহুভুজাকৃতির বুরুজের সাহায্যে কোণগুলোকে মজবুত করা হয়েছে। মসজিদের সামনের দিকে পাঁচটি এবং উত্তর ও দক্ষিণ দিকে ৩টি করে প্রবেশদ্বার রয়েছে। মসজিদের উত্তর-পশ্চিম কোণে উপরিভাগে দোতলার আদলে নির্মিত একটি রাজকীয় গ্যালারি রয়েছে যা ধ্বংসপ্রায় অবস্থায় আজও বিদ্যমান। এখানে কয়েকটি বাঁধানো কবর রয়েছে। কিন্তু কারা সমাহিত আছেন তা সঠিকভাবে জানা যায়নি। ইতিহাসবিদ ক্যানিংহ্যামের মতে, সমাধি দুটো হচ্ছে মসজিদের নির্মাতা ওয়ালী মুহাম্মদ ও তার পিতা আলীর।