রবিবার, ২৬ জুন, ২০২২ ০০:০০ টা

বন্যায় মৃত বেড়ে ৮২

সিলেট সুনামগঞ্জে আশ্রয়হীন অনেকে, কুড়িগ্রামে ত্রাণ না পেয়ে দুর্ভোগ

প্রতিদিন ডেস্ক

বন্যায় মৃত বেড়ে ৮২

বন্যায় এখনো তলিয়ে আছে অনেক বাড়িঘর। নৌকাই বাসিন্দাদের ভরসা। কুড়িগ্রামের বাবুরচর থেকে গতকাল তোলা ছবি -বাংলাদেশ প্রতিদিন

সারা দেশে বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৮২ জনে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে ৫১ জনই সিলেট বিভাগে। এ ছাড়া ময়মনসিংহ বিভাগে ২৭ ও রংপুর বিভাগে চারজন। গত ২৪ ঘণ্টায় মারা গেছেন নয়জন।

জেলাভিত্তিক মৃত্যুর সংখ্যায় শীর্ষে সুনামগঞ্জ। ১৭ মে থেকে ২৫ জুনের মধ্যে এ জেলায় ২৬ জনের মৃত্যু হয়। সিলেট জেলায় মারা গেছেন ১৮ জন। নেত্রকোনা ও জামালপুরে ৯, ময়মনসিংহে ৫, শেরপুরে ৪, কুড়িগ্রামে ৩ ও লালমনিরহাটে একজন প্রাণ হারিয়েছেন। গতকাল বিকালে সারা দেশে বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমারজেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

এতে বলা হয়, শুক্রবার পর্যন্ত বন্যাজনিত বিভিন্ন রোগে ৪ হাজার ৬১৬ জন আক্রান্ত থাকলেও শনিবার তা বেড়ে ৫ হাজার ২০২ জনে দাঁড়িয়েছে। ১৭ মে থেকে ২৫ জুন দুপুর পর্যন্ত দেশে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন ৩ হাজার ৬৬৪ জন। মৃত্যু হয়েছে একজনের। চোখের রোগে আক্রান্ত হয়েছেন ১৬৬ জন।

বন্যার শুরু থেকে এ পর্যন্ত বজ্রপাতে আক্রান্ত হয়েছেন ১৫ জন। মৃত্যু হয়েছে ১৪ জনের। সাপের দংশনের শিকার হয়েছেন ছয়জন। মৃত্যু হয়েছে দুজনের। পানিতে ডুবে প্রাণ হারিয়েছেন ৫৬ জন।

সিলেটে আশ্রয় কেন্দ্র থেকে ফিরেও যেন আশ্রয়হীন : কমছে পানি। লোকালয়ে দেখা মিলছে মাটির। অনেকেই ফিরছেন আশ্রয় কেন্দ্র থেকে। আশ্রয় কেন্দ্র থেকে ফিরেও তারা যেন আশ্রয়হীন। বানের পানিতে ভেসে গেছে অনেকের বাড়িঘর। কারও কাঁচাঘর বিধ্বস্ত হয়ে পড়ে আছে মাটির সঙ্গে। বেঁচে থাকার লড়াইয়ের চেয়ে যেন শক্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে টিকে থাকাটাই। বাড়ি ফিরে বিধ্বস্ত ঘর দেখে দিশাহারা অসহায় লোকজন। অনেকে আবারও ফিরে যাচ্ছেন আশ্রয় কেন্দ্রে, কেউবা ঠাঁই নিচ্ছেন পাকা সড়কে।

পানি নামার খবর পেয়ে গতকাল আশ্রয় কেন্দ্র থেকে বাড়ি ফিরে যান সিলেট সদর উপজেলার কান্দিগাঁও ইউনিয়নের জইনকারকান্দি গ্রামের আক্কাস আলী। বাড়ি গিয়ে দেখেন শূন্য পড়ে আছে ভিটা। আক্কাস আলী জানান, ‘আশ্রয় কেন্দ্রে ছিলাম, মানুষ খাবার দিত। বাড়িতে এসে দেখছি আমার সব শেষ হয়ে গেছে।

কানাইঘাট উপজেলার নিচচাউড়া দক্ষিণ গ্রামের আইয়ুব আলী। বানের পানিতে ভেসে গেছে ঘর। উপায়ন্তর না পেয়ে পরিবারের লোকজন নিয়ে রাস্তার পাশে একটি গরুর খামারে আশ্রয় নিয়েছেন।

গোয়াইনঘাটের নলজুরি এলাকার পাথর শ্রমিক আবদুস ছবুর জানান, বানের পানি নামলেও ঘরের ভিতর হাঁটুসমান কাদা জমেছে। পুরো ঘর নড়বড়ে হয়ে গেছে। এখন ঘর মেরামত করে বাসযোগ্য করা তার পক্ষে অসম্ভব। হাতে কাজকর্ম না থাকায় এখন খেয়ে বাঁচাই দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জেলা প্রশাসক মো. মজিবর রহমান জানান, ‘এখনো জেলার বেশির ভাগ জায়গায় পানি রয়ে গেছে। এখনো আমরা ত্রাণ কার্যক্রম চালাচ্ছি। পানি পুরো নেমে যাওয়ার পর ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি মেরামত ও ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।’

সুনামগঞ্জে বাড়ি ফেরা মানুষ চরম অর্থনৈতিক সংকটে : বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও ধীরে কমছে হাওরের পানি। উঁচু এলাকায় স্বাভাবিক হতে শুরু করছে, কিন্তু নিম্নাঞ্চলে এখনো বন্যা পরিস্থিতি বিদ্যমান। সেখানকার মানুষ এখনো অবস্থান করছেন আশ্রয় কেন্দ্রে। বন্যায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হওয়ায় ইতোমধ্যে যারা বাড়ি ফিরেছেন তারা পড়েছেন চরম অর্থনৈতিক সংকটে। পরিবার-পরিজন নিয়ে নতুন করে সবকিছু শুরু করতে হচ্ছে তাদের।

প্রশাসনের তথ্যমতে, এখনো লক্ষাধিক মানুষ রয়েছেন আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে। তাদের মাঝে ত্রাণ ও রান্না করা খাবার বিতরণ করা হচ্ছে। এদিকে, সরকারি সহায়তার পাশাপাশি দেশের নানা প্রান্ত থেকে ত্রাণ, ওষুধ ও মানবিক সহায়তা নিয়ে আসছেন অনেকে।

কুড়িগ্রামে বানভাসিদের দুর্ভোগ চরমে : কুড়িগ্রামে ব্রহ্মপুত্র, ধরলা ও দুধকুমার নদীসহ সব নদ-নদীর পানি দ্রুত কমতে শুরু করেছে। ফলে জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। কিন্তু দুর্ভোগ চরমে। চর ও ও দ্বীপচরের  নদ-নদীর নিম্নাঞ্চলের মানুষ এখনো পানিবন্দি। প্রায় ২ লক্ষাধিক মানুষের কষ্টের সীমা নেই। তিস্তা নদীসহ সবকটির পানি কমায় দেখা দিয়েছে তীব্র ভাঙন। তিস্তার অববাহিকায় প্রায় ১২টি পয়েন্টে নদীভাঙন চলছে। গ্রামীণ ও চরের রাস্তাঘাট ভেঙে যাওয়ায় যাতায়াতে ভোগান্তি বেড়েছে। ব্রহ্মপুত্র নদের হকেরচর এলাকার রফিকুল মিস্ত্রি জানান, বৃহস্পতিবার হঠাৎ করে ব্রহ্মপুত্র নদে পাক দিয়ে ভাঙন শুরু হয়। দুই দিনে আমার দুই ছেলের বাড়িসহ ৯ জনের বাড়িভিটা বিলীন হয়ে যায়। হকেরচরের ভিটামাটি হারিয়ে নিঃস্ব মাইদুল, মোহাম্মদ আলী, সৈয়দ দফাদার, আম্বর আলী, আনোয়ার আলী ও মুকুল। উলিপুরের সাহেবের আলগা ইউনিয়নের দুর্গম চর বাগুয়ায় নদীভাঙন প্রকট। সেখানকার অনেকেই নিঃস্ব। ওই এলাকার আক্কাস আলী জানান, নদীভাঙনে চলতি বন্যা মৌসুমে আনন্দবাজার সংলগ্ন চর বাগুয়ায় ৩৪টি পরিবার গৃহহীন হয়েছে। সাহেবের আলগা ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার আবু সায়েম দাবি করেন, গুজিমারী চরে ৫টি গ্রামের ৩ হাজার মানুষ এখন পর্যন্ত কোনো ত্রাণ সহায়তা পাননি। ওই চরের সাইফুল জানান, বন্যা শুরুর পর থেকে চেয়ারম্যান মেম্বার কেউ খোঁজ নেননি। দেননি কোনো রিলিফ। বৃহস্পতিবার কিছু ছাত্র ১ কেজি চিঁড়া এবং এক পোয়া গুড় দিছে। তা খেয়ে কতক্ষণ চলবে। হাতিয়া ইউনিয়নের সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আবুল হোসেন জানান, ত্রাণ সহায়তা অপ্রতুল হওয়ায় আমাদের এ ইউনিয়নে বন্যার্তদের দুর্ভোগ বেড়েছে। আর দুর্গম চরাঞ্চলে যেতে না পারায় আরও খারাপ অবস্থা।

সিরাজগঞ্জে বাড়িঘর থেকে এখনো নামেনি বন্যার পানি   -বাংলাদেশ প্রতিদিন

সিরাজগঞ্জ : যমুনা নদীর পানি কমে বিপৎসীমার ২০ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি কমায় বন্যার ক্ষয়ক্ষতি স্পষ্ট হচ্ছে। ঢেউয়ের আঘাতে এবং বন্যার পানিতে বসতভিটা নষ্ট হয়ে গেছে। ফসলগুলো খেতে নুইয়ে পড়ে আছে।

 

 

এই রকম আরও টপিক

সর্বশেষ খবর