শিরোনাম
প্রকাশ : ২০ মার্চ, ২০২১ ২১:১১
প্রিন্ট করুন printer

নিষিদ্ধ সময়ের বঙ্গবন্ধু বনাম চাটুকারিতার সময়ের বঙ্গবন্ধু

সৈয়দ বোরহান কবীর

নিষিদ্ধ সময়ের বঙ্গবন্ধু বনাম চাটুকারিতার সময়ের বঙ্গবন্ধু

১৯৭৬। ১৭ মার্চ, বুধবার। দেশের প্রধান তিনটি জাতীয় দৈনিকের কোথাও বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনের কোনো খবর নেই। দৈনিক ইত্তেফাকের দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় কোনায় অনাদরে এক কলামের ছোট্ট একটি খবরের শিরোনাম- ‘আজ শেখ মুজিবের জন্মদিন’। ’৭৫-এর ১৫ আগস্টের বিয়োগান্ত ঘটনার পর জাতির পিতা ছিলেন নির্বাসিত। নিষিদ্ধ। জন্মদিন পালন দূরের কথা, তাঁর নাম উচ্চারণ যেন ছিল এক ভয়ংকর অপরাধ!

২০২১। ১৭ মার্চ, বুধবার। দেশের সব জাতীয় দৈনিকের প্রথম পৃষ্ঠাজুড়ে শুধু বঙ্গবন্ধু আর বঙ্গবন্ধু। অর্ধেক লেখা, অর্ধেক বিজ্ঞাপন। নানা রঙে, নানা সাজে বিজ্ঞাপন। প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি, যে যেভাবে পেরেছে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়েছে। কিছু কিছু বিজ্ঞাপন উৎকট, আবেগহীন তেলমর্দন। কিছু বিজ্ঞাপন এত বাহারি যে তা দেখে মনের ভিতর অজান্তেই প্রশ্ন ওঠে, জাতির পিতাকে কি এরা পণ্য বানিয়ে ফেলছে?

Bangladesh Pratidin৪৫ বছরের ব্যবধানে এ বৈপরীত্য যেমন আনন্দের, তেমনি ভয়, আতঙ্কের। আনন্দের এজন্য যে, যারা বঙ্গবন্ধুকে নিষিদ্ধ করেছিল তারা পরাজিত হয়েছে। যারা জাতির পিতাকে নির্বাসিত করার চেষ্টা করেছিল, তারা নিজেরাই আজ নির্বাসিত। আর আতঙ্কের এজন্য যে, বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন নিয়ে যারা লোক দেখানো আবেগের পসার বসিয়েছে, তারাই বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় ঘাতক কিনা। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে রীতিমতো বাণিজ্যে মেতে ওঠা এই অতি উৎসাহীরা জনগণ এবং বঙ্গবন্ধুর মধ্যে দূরত্ব তৈরি করেছে কিনা। বাহারি প্রচারণায় বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বাঙালির আবেগ শুষে নেওয়া হচ্ছে কিনা।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু কখনই তাঁর জন্মদিন ঘটা করে পালন করতেন না। শেখ মুজিব থেকে বঙ্গবন্ধু, বঙ্গবন্ধু থেকে জাতির পিতা হয়ে ওঠার প্রতিটি পর্বে তাঁর জন্মদিন ছিল সহজাত, মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত। হৃদয় দিয়ে বাঙালি তাঁর উৎসব করেছে। ১৯৭১ সালের উত্তাল এবং অনিশ্চয়তায় ভরা সময়ে ১৭ মার্চ পালিত হয়েছে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত ভালোবাসায়। হাজার হাজার মানুষ ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে এসেছে। ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু তাঁর প্রাণের চেয়েও প্রিয় বাঙালিকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। নিজের জন্মদিন নিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমি আমার জন্মদিনের উৎসব পালন করি না। এই দুঃখিনী বাংলায় আমার জন্মদিনই বা কি আর মৃত্যুদিনই বা কি।’ সারা জীবন বাঙালি জাতির মুক্তির জন্য সবকিছু উৎসর্গ করা এই মানুষটি নিজের জন্য কিছুই করেননি। স্বাধীনতার পরও তাঁর জন্মদিন নিয়ে কোনো আদ্যিখেতা করতে দেননি তিনি। ’৭২ থেকে ’৭৫ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন পালিত হয়েছে সাদামাটাভাবে। নেতা-কর্মীরা তাঁকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। স্ত্রী রেণু ভালোমন্দ রান্না করেছেন, ব্যস এটুকুই। ১৯৭৪-এর ১৭ মার্চ, বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন মাথায় রেখেই জাসদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাসভবন ঘেরাওয়ের কর্মসূচি করেছিল। ওই কর্মসূচিতে জাসদ পুলিশের ওপর গুলি চালিয়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করেছিল। ওই অমার্জনীয় অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের কেউ আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী হয়েছেন, কেউ এখন শেখ হাসিনার চেয়েও বড় আওয়ামী লীগার! বঙ্গবন্ধু জীবিতকালে শেষ জন্মদিন কাটিয়েছিলেন দেশ পুনর্গঠনে তাঁর নতুন উদ্যোগ ‘বাকশাল’ নিয়ে। এ সময়টা বঙ্গবন্ধু ভীষণ ব্যস্ত ছিলেন। এর মধ্যেও নেতা-কর্মীরা গণভবনে এবং ৩২ নম্বরে এসে বঙ্গবন্ধুকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। ভালোবাসায় সিক্ত করেছেন। এ সময় চাটুকার এবং অতিভক্তদের উৎসাহ দৃশ্যমান হয়েছিল। খুনি মোশতাক চক্রের কিছু বাড়াবাড়ির ঘটনাও ঘটেছিল। কিন্তু বঙ্গবন্ধু এসবকে প্রশ্রয় দেননি।

১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট শুরু হয় বঙ্গবন্ধুর ‘নিষিদ্ধ কাল’। এ সময় সর্বত্র নিষিদ্ধ হয় শেখ মুজিবুর রহমান নামটি। ’৭৬ থেকে ’৮১ সাল পর্যন্ত পত্রপত্রিকা ঘেঁটে কিছু ‘ইঙ্গিতপূর্ণ’ খবর পাওয়া যায়। ’৭৬-এর ১৯ মার্চ দৈনিক বাংলার মফস্বল পাতায় একটি খবর ছিল এ রকম- ‘১৭ মার্চ গোপালগঞ্জে আপত্তিকর ভাষণ প্রচারের অভিযোগে ১২ জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ১৭ মার্চ তারা ওই ভাষণ প্রচারের চেষ্টা করে।’ বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কোনো কারণ নেই যে, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ প্রচারের চেষ্টা করেছিল কিছু তরুণ। বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে ৭ মার্চের ভাষণ প্রচারের চেষ্টার কথা এর পর থেকে প্রতি বছর ৭ মার্চ, ১৭ মার্চ এবং ১৫ আগস্টের পত্রিকা খুঁজলে পাওয়া যায়। ’৭৭ সালের ১৭ মার্চ দৈনিক ইত্তেফাকের দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন নিয়ে এক কলাম এক ইঞ্চির খবর প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু ওই বছরের ১৯ মার্চ দৈনিক বাংলায় প্রকাশিত খবরে জানা যায়, সরকারবিরোধী ষড়যন্ত্রের অভিযোগে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আওয়ামী লীগের শতাধিক কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়। ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রামে তারা সমবেত হয়ে ‘ষড়যন্ত্র’ করার চেষ্টা করছিল বলে পুলিশ অভিযোগ করে। ধারণা করা যায়, বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন পালনের উদ্দেশ্যে তারা সমবেত হয়েছিল। জিয়া সরকার ‘জাতির পিতা’র ব্যাপারে নিñিদ্র নীরবতা চেয়েছিল। এ ভূখণ্ডের কোনো প্রান্তে তাঁর নাম উচ্চারিত হোক তা জিয়া চাননি। জিয়ার নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করেই গ্রেফতার-নির্যাতনের ঝুঁকি নিয়ে সেই নিষিদ্ধকালে অনেকেই বঙ্গবন্ধুর ভাষণ প্রচার করেছিলেন। তারা এজন্য নির্মম বর্বরতার শিকারও হয়েছিলেন। ’৭৮ সালে চট্টগ্রামে ৭ মার্চের ভাষণ প্রচার করেন প্রয়াত আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু। পুলিশের বাধা সত্ত্বেও নেতা-কর্মীরা ওই ভাষণের পুরোটা প্রচার করতে সক্ষম হন বলে দৈনিক আজাদীর ৮ মার্চের খবরে জানা যায়।

’৭৯ সালের ২ এপ্রিল জাতীয় সংসদের অধিবেশন শুরু হয়। ওই অধিবেশনেই প্রথম শেখ মুজিবুর রহমানের নাম উচ্চারিত হয় শোক প্রস্তাবের আকারে। ওইদিন সংসদে সুধাংশু শেখর হালদার এবং বিরোধীদলীয় নেতা আসাদুজ্জামান খান, সরকার বঙ্গবন্ধুর নাম মুছে ফেলার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করেন। সংসদের প্রথম দিনে অনির্ধারিত বক্তব্যে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য সুধাংশু শেখর হালদার বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর নাম ইতিহাস থেকে যারা মুছে ফেলতে চাইছে, এই সংসদে দাঁড়িয়ে তাদের বলছি, বঙ্গবন্ধু চিরকাল থাকবেন। যারা আজ ইতিহাস বিকৃতির চেষ্টা করছেন, তারাই ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হবেন।’ নিষিদ্ধকালে জাতির পিতার জন্মদিনের খবর সব দৈনিকে প্রথম প্রকাশ পায় ১৯৮২ সালের ১৭ মার্চ। ১৮ মার্চ প্রকাশিত দৈনিক সংবাদের শেষ পৃষ্ঠায় এক খবরের শিরোনাম ছিল- ‘শেখ মুজিবের জন্মদিন উপলক্ষে দোয়া মাহফিল’। এ খবরে বলা হয়, আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিন উপলক্ষে এক দোয়া মাহফিলের আয়োজন করেন। ’৮২ সাল থেকেই দেশের বিভিন্ন স্থানে ৭ মার্চ, ১৭ মার্চ এবং ১৫ আগস্ট পালনের উদ্যোগ দেখা যায়। এ তিন দিনই বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিচার, ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিলের দাবি করে আওয়ামী লীগ পোস্টার প্রকাশ করে। এ সময়ও বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে নিষিদ্ধ ছিলেন। কিন্তু ক্রমে ‘নিষিদ্ধ’ বঙ্গবন্ধু মানুষের আবেগ আর ভালোবাসার কেন্দ্রে জায়গা পেতে শুরু করেন। নিষিদ্ধকালে ৭ মার্চ ছিল বাঙালির জন্য এক অন্যরকম দিন। বিভিন্ন স্থানে মাইকে এ ভাষণ প্রচারিত হওয়া শুরু হয়। এ ভাষণ বাঙালি জাতিকে নতুন করে শিহরিত করে, আপ্লুত করে। রাষ্ট্রীয়ভাবে নিষিদ্ধ বঙ্গবন্ধু জনগণের হৃদয়ের সবটুকু শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় সিক্ত হন। ’৮২ থেকে ’৯০ সাল ১৭ মার্চ, ৭ মার্চ, ১৫ আগস্ট বাঙালির আবেগের দিন হিসেবে ক্রমে জায়গা করে নিতে থাকে। এ সময় বঙ্গবন্ধুর জন্য রোজা রাখা, কাঙালি ভোজ, কান্না, আবেগ-অনুভূতির প্রকাশ ক্রমে জাতীয় গণমাধ্যমে জায়গা করে নিতে থাকে। নিষিদ্ধ শেখ মুজিবই হয়ে ওঠেন বাঙালির সবচেয়ে জনপ্রিয় মানুষ, সবচেয়ে আপনজন। যেমনটি তিনি ছিলেন জীবিতকালে। ১৯৮৬ সালে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রীয় বেতার ও টেলিভিশনে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ প্রচারের দাবিতে রেডিও-টেলিভিশন ঘেরাওয়ের কর্মসূচি দেয়। হাজারো মানুষ ওই কর্মসূচিতে যোগ দেয়। জনগণের ভালোবাসা, শ্রদ্ধায় নিষিদ্ধ বঙ্গবন্ধুই জনগণের জাতির পিতায় পরিণত হন। এ সময় বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে যা হয়েছে সবটুকুই নিখাদ ভালোবাসা থেকে। নিরেট শ্রদ্ধা থেকে। অকৃত্রিম আবেগ থেকে। এর মধ্যে কোনো চাওয়া-পাওয়ার হিসাব ছিল না। কারও দৃষ্টি আকর্ষণের অরুচিকর প্রয়াস ছিল না। কাউকে খুশি করার ভাঁড়ামি ছিল না। এ রকম বহু মানুষ তখন সারা বছর টাকা জমাত ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে কিছু গরিব মানুষকে খাওয়াবে বলে। বহু তরুণ প্রস্তুতি নিত ৭ মার্চের ভাষণ প্রচারের। একটা মাইক ভাড়া করে মহল্লায় ওই ভাষণ প্রচারের জন্য সারা রাত অপেক্ষার নির্ঘুম প্রহর গুনত। খেটে খাওয়া হতদরিদ্র মানুষ তার ভাঙা ঘরে বঙ্গবন্ধুর একটি ছবি টাঙিয়ে রাখত পরম মমতায়। বহু মানুষ ১৭ মার্চে টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর সমাধিস্থলে গিয়ে নীরবে দুই ফোঁটা জল ফেলত। এ সবই ছিল স্বতঃস্ফূর্ত, হৃদয় থেকে উৎসারিত। যে তরুণ পুলিশের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ বাজাত, সে কোনো দিন মন্ত্রী কিংবা এমপি হওয়ার নেশায় বুঁদ হতো না। ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে যে যুবক ৩২ নম্বরের সামনে একটি ফুল নিয়ে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকত, সে কোনো দিন সচিব কিংবা বড় লোভনীয় পদ পাওয়ার আশায় এটা করত না। যে মানুষটি সেদিন মসজিদে বঙ্গবন্ধুর জন্য দোয়া করতে করতে কান্নায় ভেঙে পড়ত, সে মানুষটি কখনো এর বিনিময়ে কিছু প্রত্যাশা করত না। নিষিদ্ধ যুগে জাতির পিতার প্রতি কিশোরের শ্রদ্ধা, তরুণীর ভালোবাসা, যুবকের আবেগ, প্রৌঢ়ের কান্না সবকিছু হৃদয় থেকে উৎসারিত।

কিন্তু আজ যখন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীতে উৎসবের আতিশয্য তখন আমরা কজন বুকে হাত দিয়ে বলতে পারব এ ভালোবাসা নিখাদ, নিঃস্বার্থ, লোক দেখানো নয়। এই সময়ে ১৭ মার্চ সবখানে বঙ্গবন্ধু। পত্রিকার পাতায় পাতায় বঙ্গবন্ধু। টেলিভিশনের ফ্রেমে ফ্রেমে বঙ্গবন্ধু। রাস্তাঘাট ছেয়ে গেছে পোস্টার ব্যানার ফেস্টুুনে। চারপাশে যেদিকে তাকানো যায় শুধু বঙ্গবন্ধু আর বঙ্গবন্ধু। এর মধ্যে আবার সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো যেন এক বীভৎস প্রতিযোগিতায় মেতেছে। কোন প্রতিষ্ঠান কার চেয়ে বড় বিজ্ঞাপন দিল, কোন সংস্থার ব্যানারটা সবচেয়ে বড় হলো। কোন ব্যাংকের ফেস্টুন টেলিভিশনে বেশিটা সময় থাকল। কি দুর্ভাগ্যজনক এ আতিশয্যের খেলা। যারা এ ভয়াবহ প্রতিযোগিতার খেলায় মেতেছে তারা কি আসলে বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা জানাচ্ছে, নাকি প্রাপ্তির আশায় দৃষ্টি আকর্ষণের প্রতিযোগিতায় নেমেছে? ১৭ মার্চ সব দেখে শুনে আমার ইংরেজ কবি স্যামুয়েল টেইলর কোলরিজের ‘দ্য রাইম অব দ্য এসনসিয়েন্ট মেরিনার’ কবিতার দুটো পঙ্ক্তি মনে হলো-

WATER WATER EVERY WHERE

NOR ANY DROP TO DRINK.

সবখানে পানি, তবু পানের জন্য এক ফোঁটা পানি নেই। জন্মশতবার্ষিকীতেও যেন তেমনি, সবখানে সরকারি বঙ্গবন্ধু কিন্তু বাঙালির জাতির পিতা যেন কোথাও নেই। চাটুকার, আমলাতন্ত্রের চতুর সুবিধাবাদী, মতলববাজরা বাঙালির সবচেয়ে বড় অর্জন, বাঙালির শ্রেষ্ঠ মানুষটিকে যেন পণ্য বানিয়ে ফেলেছে। এরা অনেকেই কোনোরকম আবেগ, ভালোবাসা শ্রদ্ধা ছাড়া কেবল নিজেদের আখের গোছাতে জাতির পিতাকে সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করছে। আমি দুঃখিত, কিন্তু সব দেখে শুনে মনে হচ্ছে জন্মশতবার্ষিকীর উৎসবের আড়ালে চলছে চাওয়া-পাওয়ার এক নোংরা হিসাব-নিকাশ। যাদের প্রাপ্তির সুযোগ নেই তাদের আছে ব্যবসা পসারের উদগ্র বাসনা। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যা হচ্ছে তার বড় অংশই মেকি, ভণিতায় ভরা, দৃষ্টি আকর্ষণ এবং তোষামোদীর কসরত। এক অনৈতিক বাণিজ্য।

দুঃসময়ে বঙ্গবন্ধু নিষিদ্ধ ছিলেন। আওয়ামী লীগ সভাপতি মাঝেমধ্যেই বক্তৃতায় ’৭৫-এর ১৫ আগস্টের কথা স্মরণ করে বলেন, ‘এত বড় সংগঠন, এত নেতা তারা কোথায় ছিলেন। জাতির পিতার হত্যার পর তারা কী করেছিল।’ আজ যারা চাটুকারিতার প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হওয়ার জন্য জাতির পিতাকে ব্যবহার করছে, যারা নানা রকম উৎসবের আড়ালে আসলে নিজেকে ‘বঙ্গবন্ধু -প্রেমিক’ হিসেবে উপস্থাপিত করার চেষ্টা করছে এদের প্রধান উদ্দেশ নিজের বর্তমানটাকে আরও নাদুসনুদুস করা। আরও কিছু ব্যবসা আরও পদোন্নতির আশা। কিন্তু দুঃসময়ে এরা থাকবেন তো? এ চাটুকারদের কি খরার সময় খুঁজে পাওয়া যাবে?

বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীতে যখন চারদিকে বঙ্গবন্ধুর নামে জয়ধ্বনি, যখন বঙ্গবন্ধুর ছবিতে ছবিতে ভরে গেছে গোটা বাংলাদেশ তখন আশির দশকে ছাত্রলীগের বহুল জনপ্রিয় একটি স্লোগানের কথা মনে পড়ল। ছাত্রলীগের মিছিলে বিপুল জনপ্রিয় এ স্লোগানটি ছিল এ রকম- ‘এক মুজিব লোকান্তরে/ লক্ষ মুজিব ঘরে ঘরে’। নিষিদ্ধকালে সত্যিই মুজিব ঘরে ঘরে ছিলেন, মানুষের হৃদয়ে ছিলেন, আবেগে ছিলেন। নিষিদ্ধ মুজিব ছিলেন অনেক শক্তিশালী। তাঁর একটি ভাষণ শোনার জন্য মানুষ হাসতে হাসতে জীবন দিয়ে দিত। আর এখনকার এ চাটুকারিতার যুগে বঙ্গবন্ধু যেন আমলা আর ধনাঢ্যদের বিষয়। সর্বসাধারণের মুজিবকে যেন ছিনতাই করেছে কিছু চাটুকার, তোষামোদকারী। জনগণের মুজিবকে যেন বন্দী করা হয়েছে আমলাতন্ত্রের ফাইলে। কৃষক, মজুর, জেলে, তাঁতির শেখকে যেন চুরি করে নিয়ে পণ্য বানিয়েছে হঠাৎ বনে যাওয়া সরকারি আওয়ামী লীগ। আর এখানেই আমার ভয়। তাই মুজিববর্ষে সরকারি কেরানিরা অন্য কোনো দুরভিসন্ধিতে লিপ্ত কিনা তা-ও খতিয়ে দেখা দরকার। অবশ্য তার পরও আমি আশাবাদী। শেখ মুজিব জনগণ একসূত্রে গাঁথা। জিয়া, মোশতাক বঙ্গবন্ধুকে নিষিদ্ধ করেও জনগণ থেকে আলাদা করতে পারেনি। এখন চাটুকাররা বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লোক দেখানো উৎসব করলেও জনগণের কাছ থেকে কেড়ে নিতে পারবে না। বঙ্গবন্ধু আর জনগণ অভিন্ন এক সত্তা।

লেখক : নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত।

[email protected]


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর