Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : ২৬ এপ্রিল, ২০১৯ ১১:১৭

সন্ত্রাসী হামলা প্রতিরোধে কেন ব্যর্থ শ্রীলঙ্কা পুলিশ?

এনআরবি নিউজ, নিউইয়র্ক থেকে

সন্ত্রাসী হামলা প্রতিরোধে কেন ব্যর্থ শ্রীলঙ্কা পুলিশ?
সেরা পুলিশ অফিসারের পদক হাতে রাজুব ভৌমিক। ছবি: এনআরবি নিউজ

পূর্বাভাস সত্ত্বেও কেন প্রতিরোধ করা যায়নি শ্রীলঙ্কার সন্ত্রাসী হামলা, এ ব্যাপারে নিজের অভিজ্ঞতা আলোকপাত করেছেন নিউইয়র্ক পুলিশ ডিপার্টমেন্টের কাউন্টার টেররিজম ব্যুরোর ক্রিটিক্যাল রেসপন্ড কমান্ডের চৌকষ অফিসার বাংলাদেশি-আমেরিকান রাজুব ভৌমিক।

তিনি ২৫ এপ্রিল বৃহস্পতিবার শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বোতে সাম্প্রতিক সন্ত্রাসী হামলা প্রসঙ্গে এক সাক্ষাৎকার দেন । 

রাজুব ভৌমিক এই চাকরিতে যোগদানের আগে এমএ করেন আমেরিকান পাবলিক ইউনিভার্সিটি থেকে ন্যাশনাল সিকিউরিটি এবং হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিষয়ে। এরপর ওয়াল্ডন ইউনিভার্সিটি থেকে ফরেনসিক সাইকোলজিতে এম এ করেন। ডক্টরেট করেন ক্যালিফোর্নিয়া সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি থেকে ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিতে। 

এছাড়া রাজুব ভৌমিক বর্তমানে কর্মরত অবস্থায়ই জার্নালিজমে পিএইচডি করছেন বিশ্বখ্যাত হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটিতে।

সম্প্রতি পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে বেশকিছু মানুষের প্রাণ বাঁচিয়ে আমেরিকায় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন তিনি। মার্কিন মিডিয়ায় ব্যাপক প্রচার পেয়েছে নোয়াখালীর সন্তান রাজুব (৩১) এর অসম সাহসিকতার ঘটনাবলি। বেশ কিছু এওয়ার্ডও জুটেছে বিভিন্ন অঙ্গন থেকে। 

গত রবিবারে তিনটি গির্জা এবং তিনটি বিলাসবহুল হোটেলে পরিকল্পিত সন্ত্রাসী হামলায় সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী ২৫৩ জন নিহত এবং ৫০০ জনের বেশি আহত হয়েছে। 

হামলার স্থানগুলো হচ্ছে সেইন্ট অ্যান্থনি গির্জা, দ্য কিংসব্যুরি, শাংর-লা হোটেল, সিনামন গ্র্যান্ড হোটেল, রেসিডেন্সিয়াল ডিস্ট্রিক্ট ডেমাতাগোদা, এবং দেডিওয়ালা জ্যু।

নিহতদের মধ্যে বেশ কিচু বিদেশিও রয়েছে। শ্রীলঙ্কার সরকার এই সন্ত্রাসী হামলার সঙ্গে উগ্রবাদী সন্ত্রাসী গ্রুপ ন্যাশনাল তাওহিদ জামাতের সংযুক্ততা স্বীকার করেছে।

সরকারি কর্মকর্তারা আরও জানান, ন্যাশনাল তাওহিদ জামাত সন্ত্রাসী হামলার জন্য বিদেশের সহায়তা পেয়েছে।

অন্যদিকে তিনদিন পর আইএস এই হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করেছে। এ প্রসঙ্গে রাজুব উল্লেখ করেন, ‘কিন্তু আইএস আদৌ জড়িত কিনা তা সন্দেহের। কারণ, এই মুহূর্তে জঙ্গি সংগঠন হিসেবে আইএসের অবস্থা খুবই করুণ। যুক্তরাষ্টের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর থেকে আইএসের উপর উপর্যুপুরি হামলা করে তাদেরকে ছত্রভঙ্গ করেছে। অর্থের দিক থেকেও আইএস অনেকটাই দুর্বল। এ অবস্থায় প্রশ্ন জাগতে পারে, আইএস কিভাবে হামলার দায় স্বীকার করে।’

রাজুবের মতে, কলম্বোতে পরিকল্পিত এই সন্ত্রাসী হামলা সফল করতে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন হয়েছে, যা এখন আইএসের নেই। যেহেতু সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে আইএস এখন অনেক দুর্বল তাই লোকবল দিয়ে সাহায্য করার মত ক্ষমতাও তাদের নেই। এমন হতে পারে উগ্রবাদী সন্ত্রাসীগ্রুপ ‘ন্যাশনাল তাওহিদ জামাত’ ঘটনার আগে আইএসের কিছু সদস্যের সঙ্গে যোগাযোগ করে আত্মঘাতী হামলা সম্পর্কে অবহিত হয়। তবে আইএস এতে সাহায্য করতে রাজী নাও হতে পারে। কারণ তাদের উপর এখন অনেক বিপদ।

তিনি আরও বলেন, যদি আইএস সরাসরি জড়িত থাকত তাহলে যুক্তরাষ্ট খুব সহজেই তাদেরকে খুঁজে বের করে হত্যা করত। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর পণ করেছেন যে তিনি আইএস নির্মূল করে দেবেন এবং কয়েকবার বলেছেনও ‘আইএস এখন পুরোপুরি ধ্বংস।

রাজুব বলেন, যদিও আইএস প্রথমে এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত হতে নারাজ ছিল এবং ন্যাশনাল তাওহিদ জামাতের সদস্যরা ছবিসহ কিছু তথ্য তাদের সঙ্গে শেয়ার করে। এমন হতে পারে আইএস প্রথমেই বিশ্বাস করতে পারেনি যে ন্যাশনাল তাওহীদ জামাত এরকম হত্যাকাণ্ড করার ক্ষমতা রাখে। সেজন্য সুযোগ বুঝে আইএস সদস্যরা আত্মগোপন করার তিনদিন পরে এত বড় একটি সন্ত্রাসী হামলার দায় স্বীকার করে। না হলে কেন তারা তিনদিন সময় নিয়েছে? এখন পাঠকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, তাহলে ন্যাশনাল তাওহিদ জামাত কিভাবে এত বড় আত্মঘাতী হামলা করতে পেরেছে? সোজা উত্তর হতে পারে শ্রীলঙ্কা প্রশাসনের ব্যর্থতা। 

নিউইর্য়ক টাইমসের সংবাদ অনুযায়ী গত ১১ এপ্রিল শ্রীলঙ্কান পুলিশ কর্মকর্তারা সম্ভাব্য আত্মঘাতী হামলার খবর পেয়ে সারাদেশে সতর্কতা জারি করে। এতে ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল প্রিয়ালাল দেশানায়েকে বলেন, উগ্রবাদী সন্ত্রাসীগ্রুপ ‘ন্যাশনাল তাওহিদ জামাত’ সারাদেশে হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। 

রাজুব বলেন, ‘সন্ত্রাসী হামলার পূর্বে পুলিশের কাছে তথ্য থাকলেও তারা সেই অনুযায়ী হামলা ঠেকানোর পদক্ষেপ নিতে পারেনি। কেন শ্রীলঙ্কান পুলিশ হামলা ঠেকাতে ব্যর্থ হলো? সম্ভাব্য আত্মঘাতী হামলার খবর পেয়ে সারাদেশে সতর্কতা জারি ছাড়া পুলিশ আর কি কি করেছে তা খতিয়ে দেখা দরকার। শ্রীলঙ্কান পুলিশের কাছে যে আত্মঘাতী হামলার তথ্য ছিল এর চেয়ে ভাল তথ্য আশা করা যায় না। পুলিশের নিরাপত্তা মেমোতে সন্ত্রাসীদের নাম, ঠিকানা, ফোন নম্বর, এমনকি সন্ত্রাসীদের একজন গভীর রাতে কখন এবং কোথায় দেখা করবে সে তথ্য পর্যন্ত ছিল।’ 

রাজুব উল্লেখ করেন, ‘উপরন্তু ভারত শ্রীলঙ্কা সরকারকে গত জানুয়ারিতে বিভিন্ন গির্জায় সন্ত্রাসী হামলার তথ্যও শেয়ার করে। এতে বলা আছে যে উগ্রবাদী সন্ত্রাসীগ্রুপ ন্যাশনাল তাওহিদ জামাত শ্রীলঙ্কার বিভিন্ন গির্জাতে বড় ধরনের হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং তারা হামলার জন্য অস্ত্র-সরঞ্জামাদি সংগ্রহ করেছে। এ অবস্থায়ও কেন শ্রীলংকান পুলিশ হামলা ঠেকাতে ব্যর্থ হলো?’ 

সন্ত্রাসী হামলার পর প্রেস কনফারেন্সে শ্রীলঙ্কান প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহেও জানান যে, তাদের কাছে আত্মঘাতী হামলার আগাম খবর ছিল।

তিনি আরও বলেন, কেন পর্যাপ্ত পুলিশি পদক্ষেপ নেয়া হয়নি তা খতিয়ে দেখা হবে।

জঘন্য এ পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড জনমনে প্রশ্নের সৃষ্টি করছে। পুলিশ এখন পর্যন্ত হামলায় জড়িত সন্দেহে বেশ ক’জনকে গ্রেফতার করেছে। তার মানে হচ্ছে পুলিশ ঠিকই সন্ত্রাসীদের অবস্থান জানত। যদি পুলিশ সন্ত্রাসীদের অবস্থান সম্পর্কে জেনেই থাকে তাহলে হামলা ঠেকাতে তারা কেন কোন পদক্ষেপ নেয়নি। তাহলে তো এই সন্ত্রাসী হামলার দায়ভার শ্রীলঙ্কার পুলিশকেই নিতে হবে, মন্তব্য রাজুবের। 

রাজুব বলেন, ‘শ্রীলঙ্কার প্রশাসন কি তাহলে বাংলাদেশের চেয়েও দুর্বল? এই প্রশ্ন একেবারে অযৌক্তিক নয়। বাংলাদেশের পুলিশের কাছে এরকম তথ্য থাকলে কোনমতেই সন্ত্রাসীরা হামলা করতে পারত না।’

এখন জেনে নেয়া যাক সন্ত্রাসী হামলার আভাস পাওয়ার পর পুলিশের কি কি করণীয় থাকা উচিত... 

বিশ্বের সেরা পুলিশ বাহিনীর কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের অফিসার রাজুব উল্লেখ করেন, ‘প্রথমত, পুলিশ কর্মকর্তারা সম্ভাব্য আত্মঘাতী হামলার তথ্য পাওয়ার পর পরই কোনও বিলম্ব না করে সে তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে হবে। সে দায়িত্ব পুলিশের চৌকষ কর্মকর্তাদেরকে দিতে হবে। তথ্যের সত্যতা পাওয়া গেলে সে অনুযায়ী দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে, কেননা সন্ত্রাসী হামলার সময়সূচি সন্ত্রাসীরাই নির্ধারণ করে। যদি সন্ত্রাসীরাই কোনওভাবে টের পায় যে, পুলিশ তাদের কার্যক্রম সম্পর্কে অবহিত তখন সাধারণত তারা সন্ত্রাসী হামলার সময়সূচি পরিবর্তন করে ওই সময়েই হামলা করে।

দ্বিতীয়ত, যদি পুলিশ কর্মকর্তারা সম্ভাব্য আত্মঘাতী হামলার তথ্য পেয়ে তদন্তের মাধ্যমে তথ্যের সত্যতা পায়। এ সময় সন্ত্রাসীদের না পেলে, সারাদেশে পুলিশি উপস্থিতি বৃদ্ধি করতে হবে এবং সম্ভাব্য সন্ত্রাসীদের আস্তানায় অভিযান চালাতে হবে। সন্ত্রাসীদের নো ফ্লাই লিস্টে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যেন তারা দেশ থেকে না পালাতে পারে। দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পুলিশি চেকপোস্টে তল্লাশি করতে হবে। পুলিশের গোপন তথ্যদাতাদের সঙ্গে মিটিং করে তথ্য আদায় করতে হবে। সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করেও অনেক সন্ত্রাসীর অবস্থান সম্পর্কে জানা যায়। প্রয়োজনে জেলখানার কয়েদির সাহায্যও নেয়া যেতে পারে। 

রাজুবের মতে, তৃতীয়ত, যদি পুলিশ কর্মকর্তারা সম্ভাব্য আত্মঘাতী হামলার তথ্য পেয়ে তদন্তের মাধ্যমে তথ্যের সত্যতা পান এবং সন্ত্রাসীদের কোন হদিস না পায়, তাহলে অন্য পদক্ষেপ নিতে হবে। বর্তমান যুগের প্রযুক্তির সদ্ব্যবহার করতে হবে। সারাদেশে ট্রাফিক ক্যামেরা থেকে তথ্য নিতে হবে। রেডিয়েশন ডিটেক্টর স্থাপন করতে হবে দেশের গুরূত্বপূর্ণ স্থাপনার কাছে যাতে করে বোমা থেকে নির্গত রেডিয়েশন নির্ণয় করে সন্ত্রাসী হামলা প্রতিরোধ করা যায়। হাইরেঞ্জ রেডিয়েশন ডিটেক্টর স্থাপন করতে হবে দেশে গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে যাতে করে কারো কাছে বোমা থাকলে সহজেই বোমা থেকে নির্গত রেডিয়েশন নির্ণয় করে সন্ত্রাসী হামলা প্রতিরোধ করা যায়।

হাইরেঞ্জ রেডিয়েশন ডিটেক্টর অনেক সময় দুই মাইলের মধ্যে যত প্রকার রেডিয়েশন আছে তা নির্ণয় করে পুলিশকে জানাতে পারে। বর্তমান যুগে বোমা হামলা প্রতিরোধে হাইরেঞ্জ রেডিয়েশন ডিটেক্টরের কোনও বিকল্প নেই। দুই একটি রেডিয়েশন ডিটেক্টর পুলিশের হেলিকপ্টারে স্থাপন করে সর্বদা টহল দিতে হবে। এসব রেডিয়েশন ডিটেক্টর পুলিশের ছোট জাহাজে স্থাপন করেও টহল দিতে হবে। পুলিশের প্রশিক্ষিত কুকুরের সহায়তা নিতে হবে। প্রশিক্ষিত কুকুরের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাতে টহল দিতে হবে।’ 
এওয়াইপডির এই অফিসার বলেন, ‘চতুর্থত, দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার সামনে বিশেষ অস্ত্রে সজ্জিত পুলিশ সদস্যের ৭২ ঘণ্টার পুলিশি উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। যেমন ধরুন পুলিশের কাছে তথ্য আছে যে, একটি গির্জাতে রবিবার সকাল ১০টায় সন্ত্রাসী হামলা হতে পারে। বিশেষ অস্ত্রে সজ্জিত পুলিশ সদস্যের সে স্থানে এর আগের দিন বা শনিবার সকাল ১০টায় পৌঁছে বিশেষ পুলিশি উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে এবং মঙ্গলবার সকাল ১০টা পর্যন্ত থাকতে হবে।

পঞ্চমত, পুলিশের সন্ত্রাসবিরোধী তথ্য ফোন নম্বর জনগণকে দিতে হবে। পুলিশি অভিযানে এবং জনগণের সুষ্ঠু নিরাপত্তা দিতে সাধারণ মানুষের সাহায্যের বিকল্প নেই। সাধারণ মানুষের সাহায্য ছাড়া পুলিশ সন্ত্রাস দমনে কখনো সফল হবে না। সাধারণ মানুষ যখন পুলিশের সন্ত্রাসবিরোধী তথ কেন্দ্রে কল করে তথ্য দেয় তখন সব তথ্যের সতত্য যাচাই করার জন্য পুলিশকে তদন্ত করতে হবে- যোগ করেন রাজুব। 

এসব পদক্ষেপ নিলে সন্ত্রাসী আক্রমণ সহজেই প্রতিরোধ করা যায় বলে দাবি করেছেন রাজুব। সর্বোপরি পুলিশ সদস্যদের সবসময় যেকোনও হামলার ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। কোনোভাবেই দায়িত্বে অবহেলা করা যাবে না। না হলে গত রবিবারের মত ঘটনার পুনর্জন্ম হবে।  

বিডি প্রতিদিন/কালাম


আপনার মন্তব্য