শিরোনাম
প্রকাশ : ৬ জুন, ২০২০ ১৬:০৮

সাম্য চিন্তক সোমেন চন্দ ও গল্পের নামকরণ

প্রণব মজুমদার

সাম্য চিন্তক সোমেন চন্দ ও গল্পের নামকরণ

উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছি সবে। ফলাফলের জন্য অপেক্ষা। তিন মাস প্রতীক্ষা। এ সময়ে বরিশাল থেকে চাঁদপুরে এলেন অবিভক্ত বাংলার প্রখ্যাত প্রগতিশীল নেত্রী মনোরমা বসু মাসিমা। উঠেছেন আলীম পাড়ায় আমাদের নিকট প্রতিবেশি রেনু কণা রায় চৌধুরীর বাড়ীতে। সাম্যবাদের মন্ত্রে দীক্ষিত মাসিমার বোনের মেয়ে রেনু কনা। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সম্মেলেনে প্রধান অতিথি হয়ে আসা মাসিমা সে যাত্রায় ছিলেন বেশ কিছুদিন। প্রগতিশীল সংগঠনগুলোর নানা অনুষ্ঠানে অতিথি বক্তা তিনি। খেলাঘর করি। আলীম পাড়া ঐক্যতান খেলাঘর আসরের কার্যালয়ে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে মাসিমার সঙ্গে পরিচয়। তা করিয়ে দেন মাসিমার নাতনী বিশিষ্ট সংগীত শিল্পী বিউটি রায় চৌধুরী। বিউটিদি মাসিমাকে বলেছিলেন, দিদিমা প্রণব ভালো গল্প লেখে। ওর লেখা ছাপা হয় জাতীয় পত্রিকায়! মাসিমা আমাকে আদরে মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। বললেন ভালো গল্প লিখতে চাইলে সোমেন চন্দের গল্প পড়বে। মাসিমার কাছেই সোমেন চন্দ নামটা প্রথম শুনি। পড়াশুনার দ্বিতীয় ধাপ পেরিয়ে উচ্চতর শিক্ষার জন্য ঢাকায় চলে আসি আশির দশকের শুরুতে। উইলস লিটলস ফ্লাওয়ার স্কুলের শিক্ষিকা ও প্রাবন্ধিক নিবেদিতা দাশ পুরকায়স্থ এবং বিশিষ্ট সাংবাদিক অভিনয় কুমার দাশের মেয়ে উপমাকে পড়াই। আরামবাগে তাঁদের বাসায় গল্প ও উপন্যাস পাঠে অতি মনোযোগী এই শিক্ষিকা। গল্প লেখার আমার অভ্যাস আছে জেনে বাংলা কথাশিল্পের রচনাগুলো নিয়ে ওনার সঙ্গে সে সময় প্রায়ই আলোচনা হতো। নিবেদিতা বৌদির কাছে সোমেন চন্দের গল্পের বেশ প্রশংসা শুনতে পাই। প্রগতিশীল চেতনায় বিশ্বাসী আমি! ধীরে ধীরে সাম্যবাদের দর্শন আনন্দে ঝুঁকে পড়ি! গদ্য লেখায় আমার আগ্রহ বাড়ে। শ্রমজীবী, গরীব, নিঃস্ব, বঞ্চিত এবং নিপীড়িত মানুষের কষ্ট ও বেদনা আমার লেখার উপজীব্য! বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার পাশাপাশি নাটক, প্রবন্ধ এবং গল্প লেখাও আমার জীবনের সঙ্গে যুক্ত হয় প্রবলভাবে। বৌদির প্রেরণায় পাঠ্যভাসের মাধ্যমে সোমেন চন্দকে আবিস্কার করি একজন সাম্য চিন্তনের গল্পকার হিসেবে।

আমার প্রথম পাঠ বনস্পতি ও সিগারেট। সোমেন চন্দের গল্প দু’টি পড়ে বেশ প্রাণিত হই। উচ্ছ্বাস ও আবেগের মাত্রা এতটাই তীব্র ছিলো যে হল জীবনে লিখে ফেলি তাঁকে ঘিরে অনুভতির একটি ছোট গল্প, যার নাম দিয়েছিলাম সোমেন চন্দ্র । গল্পের নায়ক সুকু শিক্ষিত একজন কারখানা শ্রমিক। ন্যায্য দাবী আদায়ে কারখানার মধ্যে শ্রমিকদের নিয়ে মিছিল সভা করে। সংঘবদ্ধ শ্রমিকের নেতৃত্বে সুকু। শিল্পাঞ্চলে মালিকদের সঙ্গে কর্মজীবীদের উপযুক্ত পারিশ্রমিক নিয়ে দফায় দফায় সুকুর দেন দরবার ! কখনও সুকু জয়ী হয়! বেশিরভাগ সময় সে ব্যর্থ!  যে কারখানায় সুকু কাজ করে সেখানে তাঁর ন্যায্য মজুরি থেকে সে বঞ্চিত ! অথচ সহকর্মীদের মজুরি আদায়ের ব্যাপারে সে বেশ সোচ্চার। শিল্প মালিক আমজাদ চৌধুরীর সুন্দরী শিক্ষিতা তরুণী কন্যা কেয়া চৌধুরী। নিজের স্বার্থকে প্রাধান্য না দিয়ে সহকর্মীদের প্রতি গভীর ভালোবাসার বিষয়টি কেয়াকে অবাক করে দেয়! শ্রমিকদের উপযুক্ত মজুরির জন্য শ্রমিক নেতা সুকুর আন্দোলনকে মৌন সমর্থন দেয় কেয়া। কারখানার কাজে আমজাদ চৌধুরীর বাসায় আসা যাওয়া সুকুর! এ সময় ড্রয়িং রুমে মাঝে মাঝে সুকুর সঙ্গে কেয়ার সাক্ষাৎ হয়! আস্তে আস্তে তা ভালোলাগার দিকে গড়ায়। কেয়া দুর্বল হয়ে পড়ে সুকুর প্রতি। সোমেন চন্দ গল্পের কাহিনী গড়ায় অবশেষে প্রেমের দিকে! কিন্তু সে ভালোবাসা পরিণতির দিকে এগোয় না! গল্পটি লিখেছিলাম সাদা একটি কাগজে। হিসাব বিজ্ঞান বিষয়ের পড়াশুনা! স্নাতক সম্মান তৃতীয় বর্ষের পরীক্ষার ধারাবাহিক চাপ ছিলো আমার। পুনরায় লিখে ডাকে বিচিত্রা পত্রিকায় গল্পটি পাঠাবো ভেবেছিলাম। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নামাঙ্কিত খাতার লিখিত গল্পের সেই ছেঁড়া কাগজটি খুঁজে পাইনি। হয়তো পুরানো দৈনিক পত্রিকার স্তুপের ভেতর আমার সোমেন চন্দ হারিয়ে গিয়েছিলো সেদিন! খুব আফসোস হয় তখন লিখিত গল্পটি না পাবার কষ্টে।

বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র জীবন শেষ করে যুক্ত হই ঢাকায় মূলধারার অর্থনীতি প্রতিবেদন সাংবাদিকতায়। আমার সাহিত্য চর্চা অনেকটা কমে আসলো। কিন্তু পাঠাভ্যাস বেড়ে গেলো পেশার কারণে। সাহিত্য নিয়ে তেমন লেখালেখি এ সময় না হলেও বিশেষ করে গল্প উপন্যাস পড়া থেকে বিচ্যুত হইনি। পরিণত বেলায় সন্ধান করে বেড়াই সোমেন চন্দের গল্পসমগ্র। বইমেলায় ১৯৯৬ সালে পেয়ে যাই ১৭টি গল্পের দুর্লভ সংকলন সোমেন চন্দের গল্পগুচ্ছ। পড়ে ফেলি মাত্র ৫ বছর আয়ুষ্কালে লেখা বাস্তববাদী ও বক্তব্যধর্মী ২৮ গল্প, ২টি উপন্যাস, ২টি নাটক এবং কিছু কবিতার মননশীল লেখক সোমেন চন্দের কিছু গল্প। যা অবিভক্ত বাংলার সেরা সৃষ্টি হিসেবে অভিহিত। সোমেনের গল্পগুলোর কাহিনী ও দর্শন যেন মর্তলোকে আমাদের সমাজ ব্যবস্থার যাপিত জীবনের চিরসত্য দৃশ্যমান বাস্তবতা। তাঁর গল্প বলার ভঙ্গি সহজ সরল এবং প্রতীকী। গল্পে কোনো ঘোরপ্যাঁচ যেমন নেই, তেমনি নেই ভাষাগত বা আঙ্গিকাশ্রয়ী কোনো জটিলতা। সংসার, সমাজ এবং রাষ্ট্রকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেন তিনি গভীর অর্থবোধক বর্ণনা এবং সংলাপে। ইঁদুর, দাঙ্গা ও প্রত্যাবর্তন গল্প শ্রবণ আমাকেও ভাবিয়ে তোলে।

'দাঙ্গা' গল্পে দাঙ্গার বেশ ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে সাবলীলভাবে। পুরোপুরি অন্য রকম গল্প। দুটো ছেলে। একজন কোমর থেকে ছোরা বের করে একটা লোকের পেছনে বসিয়ে দেয়, তারপর বোঝা গেল দাঙ্গার সূত্রপাত। অজ্ঞাত এক ব্যক্তির মৃত্যুর মধ্য দিয়ে গল্প এগোয়। দাঙ্গা শুধু ক্ষয়ক্ষতিই করে না, সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে বিভেদ সৃষ্টি হয় না, গভীর একটা ক্ষত তৈরি করে, যা শুধুই অশান্তি! যে ক্ষত হয়তো জীবনে আর পূরণ হয় না। দাঙ্গার অভিজ্ঞতা নিয়ে বাংলা সাহিত্যে খ্যাতিমানদের অনেক গল্প রয়েছে। কিন্তু সোমেনের দাঙ্গা গল্পের বিষয়টি ভিন্ন, অভিনব ও বৈচিত্র্য। গল্পে অজু যখন কর্কশ কণ্ঠে বলে- তোমরা তো বলবেই ... তারপর মৃদুস্বরে..., আমরা হিন্দুও নও, মুসলমানও নও ..., আমরা ইহুদির বাচ্চা না রে? অশোক হা-হা করে হেসে বলে, সার্চ হোক বা না হোক, তাতে উল্লাস করারই বা কী আছে, দুঃখিত হবারই বা কী আছে, আসল ব্যাপার হলো অন্য রকম, দেখতে হবে এতে কার কতখানি স্বার্থ সম্পৃক্ত। দাঙ্গায় যে কার লাভ হয় তা তো কেউ বুঝতে পারে না কিন্তু ক্ষতি যাদের হয় তারা আর উঠে দাঁড়াতে পারে না। অশোকের বাবা আর ফিরে আসেনি, মায়ের মলিন মুখটা আরো করুণ হয়ে ওঠে, ফিসফিসিয়ে মা বলে, ‘তাছাড়া আজ আবার মাইনে পাবার দিন’। গল্পে দাঙ্গার পাশাপাশি অর্থনৈতিক সংকট এবং তা থেকে উদ্বেগের একটা চিত্র উঠে এসেছে। অশোকের মতে, বিশ্বে যত দেশে দাঙ্গা হচ্ছে, তা সবই ফ্যাসিস্টদের কাজ, বড়লোকদের দালাল সবাই, শুধু বলি হয় সাধারণ মানুষ এবং তারা তাদের হাতের পুতুল হয়। মানুষ শুধু অন্যের প্ররোচণায় দাঙ্গায় জড়ায়, কিন্তু ফলাফল শূন্য, মাঝখানে মুনাফা লুটে নেয় মহাজন।

প্রত্যাবর্তন গল্পে দুই বন্ধুর দীর্ঘকাল পরে প্রত্যক্ষ সাক্ষাৎ দিয়ে গল্পটির সূচনা। ২৫ বছর পরে নিজ গ্রামে ফিরে আসে প্রশান্ত। অনেক পরিবর্তন চোখে পড়ে যায় তার, তাদের বাড়ির ভগ্নদশা দেখে মন তার খারাপ হলেও কালু মিয়ার সঙ্গে এক রাতে দেখা হলে সবই যেন ভুলে যায় সে। বাল্যকালের বন্ধু, অনেক স্মৃতি লেপ্টে আছে ওর সঙ্গে, পুরনো হলে বন্ধু সে তো বন্ধু, কালু মিয়া দরিদ্র কিন্তু এতটাই গরীব যা প্রশান্ত তা ভাবতে পারেনি কখনো, ওর ছেলে পুষ্টিহীনতায় ভুগছে, কালুও তো একটা দুর্ভিক্ষের কঙ্কালসার অস্থি নিয়ে দাঁড়িয়ে। গল্পে যে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি, তা উপমার মধ্য দিয়েই স্পষ্ট। মানুষের খাদ্য হরণ করছে পুঁজিপতিরা, ওরা কেড়ে খাচ্ছে দরিদ্রের খাদ্য। এভাবে বুর্জোয়া সমাজ প্রতিনিয়ত সাধারণ মানুষের রক্ত-মাংস খেয়ে ফুলে ফেঁপে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে, আর নিম্নবিত্ত বা বিত্তহীন মানুষ হচ্ছে নিঃস্ব। মানুষে মানুষে বিরাজমান এ বৈষম্য সদ্য যুবক সোমেন চন্দের চিন্তনে গভীর ছায়া ফেলে। তাই তিনি তাঁর গল্পগুলোতে শ্রেণি প্রভেদের সে বক্তব্য গদ্যের কারুকাজে স্পষ্ট করেছেন পাঠকের কাছে।

প্রত্যাবর্তন গল্পের মতো 'ইঁদুর' গল্পটিও প্রতীকধর্মী। এখানেও দরিদ্র মানুষের কথাটি বেশ উচ্চঃস্বরেই উঠে এসেছে, বুর্জোয়া শ্রেণী দিন দিন কীভাবে ইঁদুরের মতো কুরে কুরে আমাদের সমাজ-সংস্কার আর সভ্যতাকে নিঃশেষ করছে, তারই ইঙ্গিত সোমেন প্রতীকের মতো গল্পে তুলে ধরেছেন। অভাব-অভিযোগ মানুষের লালিত স্বপ্নকে বিবর্ণ করে ফেলে, নিম্নমধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্ত অথবা বিত্তহীনকে বুর্জোয়া বা পুঁজিবাদ দমিয়ে রাখে, তার রোষানলে দলিত-মথিত হতে হতে একদিন সে ইঁদুরের খাবারে পরিণত হয়। গল্পে সুকুমার এমন একটি চরিত্র, যার মা-বাবা, ভাইবোন সবই আছে, আছে অভাব, স্বপ্ন হারানো এক হতাশা! তাকে প্রতিনিয়ত তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়, দিন দিন সংকুচিত করে, সে বাঁচার মতো বাঁচতে চায়। কিন্তু নিয়মিত এই পরিবারের মানুষদের ওই একটা বুর্জোয়া ইঁদুর তাড়া করে বেড়ায়, সুকুমার আড়ষ্ট থাকে, মা ভয়ে তটস্থ সবসময়, একটা শঙ্কা একটা অপরাধবোধ তাদের তাড়িয়ে বেড়ায়, অভাবী পরিবারটি বাড়তি খরচা হিসেবে একটা ইঁদুর ধরার কল কেনার কল্পনাও করতে পারে না। তারপরও তারা ইঁদুরের সঙ্গে যুদ্ধ করে, সাম্রাজ্যবাদের পতন না হওয়া পর্যন্ত ইঁদুরের যে উৎপাত, তা হয়তো কখনো নিবৃত্ত হবে না। অভাবে মানুষ পুষ্টিহীন হচ্ছে, অনাহারে দিন দিন তার শরীরের মাংস ঝরে যাচ্ছে, জীবন থেকে স্বপ্ন-বাসনা একটু-একটু দূরে সরে যাচ্ছে, ইঁদুর গল্পে এই বোধ সোমেনের ভাবনাকে সুদূর প্রসারিত করেছে। ইঁদুর যখন লেখা হয় তখন ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসন চলছে, সে সময় নানা পর্বে দেশজুড়ে স্বাধীনতার জন্য চলছিল সক্রিয় আন্দোলন। গল্পে সংসারে অভাব-অনটনের চিত্র শিল্পরূপ পেয়েছে শ্রেণি চরিত্রহীন মধ্যবিত্তদের সার্বিক অবস্থা লেখক তুলে ধরেছেন এভাবে- ‘এরা কে জানো? এরা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সন্তান বটে, কিন্তু এরা না খেয়ে মরে! যে ফুল অনাদরে শুকিয়ে ঝরে পড়ে মাটিতে এরা তাই। এরা তৈরী করেছে বাগান, অথচ তারা ফুলের শোভা দেখে না। পেটের ভিতরে সুঁচ বিঁধেছে প্রচুর, কিন্তু এদের ভিক্ষাপাত্রও নেই। পরিহাস! পরিহাস!...।’

ইঁদুর গল্পে আমাদের সমাজ ব্যবস্থার বৈষম্যমূলক এবং নিম্ন মধ্যবিত্ত সংসারের অনটনের দিকগুলো এসেছে সরাসরি বেশ সাবলীলভাবে চরিত্রের প্রয়োজনে। আমাদের এই স্বপ্নহীন বন্ধ্যা সময়ে সোমেন চন্দের গল্পের নায়ক সুকুমার দৃপ্ত প্রত্যয়ে আলোর পথ দেখায়। হতাশার বদলে সে শোনাতে পারে আলোর গান। সুকুমার বলে- ‘ইতিহাস যেমন আমাদের দিকে মোড় নেয়, আমিও ইতিহাসের দিকে মোড় নিলুম। আমি হাত প্রসারিত করে দিলুম জনতার দিকে, তাদের উষ্ণ অভিবাদনে ধন্য হলুম। তাদেরও ধন্যবাদ যারা আমাকে আমার এই অসহায়তার বন্ধন থেকে মুক্তি দিয়ে গেছে। ধন্যবাদ, ধন্যবাদ! গল্পের শেষের দিকে সুকুমারের ক’জন বন্ধুর পরিচয় ঘটে পাঠকের সঙ্গে। যারা শ্রেণি সংগ্রামি। মানুষের মুক্তির সংগ্রামে যারা আত্মোৎসর্গ করছে। কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে তারা বলতে চায় ‘একদিন এ সংগ্রাম সফল হবেই, মানুষে-মানুষে বৈষম্য থাকবে না। গল্পের পরিণতিতে- ‘ব্যাপার আর কিছুই নয়, কয়েকটা ইঁদুর ধরা পড়েছে।’ বাক্যটি দিয়ে সঞ্চিত ক্ষোভের অভিব্যক্তি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এই ধরনের হাজারো ক্ষোভ বর্তমান বিশ্বে ৯৯ শতাংশ মানুষের। বন্ধুদের মতে, সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সফল হতে পারে শোষিতের সংগ্রাম।

সাহিত্য বোদ্ধারা বলেন, ইঁদুর বাংলা সাহিত্য তথা বিশ্বসাহিত্যে একটি সার্থক ছোট গল্প। জনপ্রিয় কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদ বলেছিলেন, সোমেন চন্দের ইঁদুর গল্প তাঁকে বেশ উদ্বুদ্ধ করেছিলো সাহিত্য অঙ্গনে আসতে। গল্প ইঁদুর পাঠের ব্যাপক প্রভাব পড়ে তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস নন্দিত নরকে এবং শঙ্খনীল কারাগার সৃষ্টিতে।

১৯৩৭-১৯৪২ মোট পাঁচ বছর ছিলো সোমেন চন্দেরর সৃষ্টির ব্যপ্তিকাল। প্রথম দু’বছর তিনি রোমান্টিক ধারায় লিখলেও পরের বছরেই তিনি নিজেকে অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছিলেন। রোমান্টিক ভাবধারার বদলে তাঁর সাহিত্যকে তিনি করেছিলেন জীবনমুখী। রচনা, চরিত্র এবং উপমার দিক থেকেও প্রতিনিয়তই তিনি নিজেকে অতিক্রম করে যাচ্ছিলেন। সোমেন সাহিত্যের সবচেয়ে বড়ো বৈশিষ্ট্য হলো নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা।

ছোটকাল থেকেই বইয়ের প্রতি প্রচণ্ড আগ্রহ সোমেনের। পাঠাগারমুখী ছিলেন তিনি। প্রগতি ও মার্কসবাদী লেখক সোমেন চন্দ শ্রেণি শোষণের বিরুদ্ধে বেশ সোচ্চার ছিলেন। মুক্তির আকাঙ্খায় তিনি অসাম্প্রদায়িক চেতনায় সবাইকে উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করেছেন যেমন রাজনৈতিকভাবে, তেমনি লেখনিতে।

কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য ২১ এবং কথাশিল্পী সোমেন চন্দ ২২ বছর আয়ু পেয়েছিলেন। প্রগতিমনা দু’জনেরই অকাল প্রয়াণ! সুকান্তের মৃত্যু প্রথমে ম্যালেরিয়া পরে দুরারোগ্য ক্ষয়রোগে। কিন্তু সোমেনের মৃত্যুটা ছিলো অপ্রত্যাশিত নিরোগে, দাঙ্গায় ঢাকার রাজপথে। তাঁর কালজয়ী সৃষ্টি গল্প দাঙ্গার কাহিনীর মতোই তিনি বলিদান হন স্বদেশী রেভুলেশনরী সোশ্যালিস্ট পার্টি (আরএসপি) নামের উগ্রবাদী দলের সন্ত্রাসীদের হাতে। মাত্র ২২ বছর বয়সে পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে হয় তাঁকে। মৃত্যু ১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দের ৮ মার্চ। জন্ম তাঁর ঢাকা জেলার নরসিংদীতে ১৯২০ সালের ২৪ মে। কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন বাঙ্গালী এ দুই সাহিত্যিক। পরিণত বয়সে তাঁদের মৃত্যু হলে বিশ্ব সাহিত্য পরিমণ্ডলে তাঁরা শক্ত অবস্থানে স্থান পেতেন তা নিশ্চিত করেই বলা যায়। আরও অনেক কিছু জমা করতে পারতেন বিশ্বসাহিত্য ভাণ্ডারে। বাংলা সাহিত্যে আজ তাঁরা অমর ও কালজয়ী মানুষ।

বাংলা সাহিত্যে ক্ষণজন্মা কথাশিল্পী সোমেন চন্দের সমৃদ্ধ লেখনি নিয়ে অনেক লেখা যায়। আমাদের সমৃদ্ধ সাহিত্য ভূবন তাতে আরও উন্নত হবে। লেখালেখি চর্চার সূচনা পর্বে যাঁর গল্প আমাকে করেছিলো বিমোহিত ও অনুপ্রাণিত সেই মহান ব্যক্তি সোমেন চন্দের ওপর গল্পটি পুনরায় লিখবো ভাবছি। স্বপ্নপুরুষ শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিকে নিয়ে লেখার গল্পটির কাহিনী একই রাখবো। সোমেন চন্দের শততম জন্মবার্ষিকীর এই মাহেন্দ্রক্ষণে পরম ভালোবাসায় আমার গল্পের নামকরণ থাকবে সেই সোমেন চন্দই। 

লেখক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক

বিডি প্রতিদিন/ফারজানা


আপনার মন্তব্য