Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ১২ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১২ জুলাই, ২০১৯ ০০:২৩

কাফকা ও তার মেটামরফোসিস

ড. নেয়ামত উল্যা ভূঁইয়া

কাফকা ও তার মেটামরফোসিস

শেকসপিয়রের পর যে লেখককে নিয়ে সবচেয়ে বেশি গবেষণা ও বই লেখা হয়েছে তিনি ফ্রানৎস কাফকা (১৮৮৩-১৯২৪)। গত শতকের নব্বইয়ের দশকের মধ্যভাগের আগেই তাকে নিয়ে লেখা হয়ে গেছে ১০ হাজার বই। আর ১৯৯৬ থেকে ২০১০ পর্যন্ত সময়ে প্রতি ১০ দিনে তার ওপর বের হয়েছে একটি করে নতুন বই। বিংশ শতাব্দীর বিশ্বসাহিত্যের সবচেয়ে প্রভাবশালী রূপকাশ্রয়ী জার্মান ভাষার এ রূপকাশ্রয়ী লেখক। এ যাবৎ সাহিত্যে নোবেলজয়ী ১০৯ জন লেখকের মধ্যে ৩২ জনই নিজেদের ওপরে কাফকার প্রভাবের কথা স্বীকার করেছেন। তাছাড়া, বিংশ ও একবিংশ শতকের সেরা লেখক আলবেয়ার কাম্যু, গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস, জে এম কোয়েৎজি ও জ্যঁ পল সাত্রে নির্দ্বিধায় স্বীকার করেছেন, তারা কাফকা দ্বারা প্রভাবিত।

১৯১২ সালে কাফকার প্রথম গল্পের বই প্রকাশ করেন তিনি। বইটির আটশ কপি ছাপা হয়েছিল। কিন্তু সেগুলো ভালো বিক্রি হয়নি। বই প্রকাশের কয়েক সপ্তাহ পর কাফকা লিখেছিলেন, ‘এগার কপি বিক্রি হয়েছে। এর মধ্যে দশ কপি আমি নিজেই কিনেছি। এগারোতম কপিটি কে কিনেছে সেটা জানতে মন চাইছে।’ মাত্র নয়টি পূর্ণাঙ্গ গল্প, তিনটি অসমাপ্ত উপন্যাস, সামান্য কয়টি অসমাপ্ত বড় গল্প, কিছু গদ্য-স্কেচ, ডায়েরি ও চিঠি রেখে যাওয়া এই লেখকের বন্ধুকে তিনি অনুরোধ করে গিয়েছিলেন তাঁর সব লেখা পুড়িয়ে ফেলতে। কিন্তু ১৯২৪ সালের ৩ জুন কাফকার মৃত্যুর পর বন্ধু ম্যাক্স ব্রড তাঁর লেখাগুলো প্রকাশের উদ্যোগ নেন। অখ্যাত কাফকা হয়ে উঠেন শতাব্দীর সেরা কথাশিল্পী। উল্লেখ্য, তাঁর ক্ষুদ্রায়তন পান্ডুলিপির মূল্য ধরা হয়েছিল ১০ কোটি পাউন্ড, কিন্তু অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় তা বিক্রি করেনি। কাফকা সাহিত্যে ‘নিয়তি বা সম্ভবত এই লেখাগুলোর মহত্ত্ব এটাই যে, সবকিছু আছে এতে, কিন্তু কোনো কিছুই নিশ্চিত করা হয়নি।’

আধুনিক বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম এ ব্যতিক্রমী শিল্পী ফ্রান্্ৎস কাফকা জন্মগ্রহণ করেন ১৮৮৩ সালে, প্রাগে, এক সচ্ছল মধ্যবিত্ত ইহুদি ব্যবসায়ী পরিবারে। অস্তিত্ববাদ ও অভিব্যক্তিবাদ তত্ত্ব প্রভাবিত জার্মানভাষী এ লেখকের কম শিক্ষিত বাবা হ্যারমান কাফকা (১৮৫২-১৯৩১) পেশায় ছিলেন একজন মাংস বিক্রেতা। প্রাগের জার্মান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনের পাঠ সমাপ্ত করে ১৯০৬ সালের পরবর্তী কয়েক বছর একটি বীমা কোম্পানিতে চাকরি করেন ফ্রান্্ৎস কাফকা। অংশ নেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধে। হারমেইন এবং জুলির ছয়টি সন্তানের মধ্যে ফ্রান্ৎস কাফকা ছিলেন জ্যেষ্ঠ। ফ্রান্ৎস এর বয়স যখন মাত্র সাত বছর তখন তার ছোট দুই ভাই জর্জ এবং হাইনরিখ শিশুকালেই মৃত্যুবরণ করে। তার তিন বোন এলি (১৮৮৯-১৯৪৪), ভেলি (১৮৯০-১৯৪২) এবং ওতলা (১৮৯২-১৯৪৩)। প্রত্যেকেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হত্যাকান্ডের শিকার হন।

কাফকার সময়ে প্রাগ ছিল ইউরোপের একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। এটি ছিল হাবসবুর্গ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত এক গুরুত্বপূর্ণ শহর এবং উনিশ শতকের শেষে এটি জার্মান ও চেক সাহিত্যের কেন্দ্রে পরিণত হয়। কাফকার মতো অনেক লেখক উভয় ভাষাতেই পারদর্শী ছিলেন। মানসিক এবং বুদ্ধিবৃত্তির দৃষ্টিকোণ থেকে এই শহর ও শহরের মানুষ কাফকার ওপর প্রভাব ফেলেছিলেন। একই সালে কাফকা প্রাগ শহরের জার্মান চার্লস-ফার্দিন্যান্দ বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন শাস্ত্রে ভর্তি হন। তবে মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে তিনি রসায়ন ছেড়ে আইন শাস্ত্রে ভর্তি হন। আইন শাস্ত্রে কাফকার বিন্দুমাত্র আগ্রহ ছিল না। কিন্তু তার পরও দুটি কারণে তিনি এই বিষয়ে অধ্যয়ন করার জন্য মনস্থির করেন। প্রথম কারণ হলো আইন পেশায় যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকায় তার বাবা খুশি থাকবেন। অপর দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন অনেক দীর্ঘ কোর্স হওয়ায় তিনি দীর্ঘকাল ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থান করতে পারবেন এবং তার প্রিয় বিষয় যেমন ইতিহাস, কলা ও জার্মান শিক্ষায় ছোট ছোট কোর্স করতে পারবেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকার সময় কাফকার কয়েকজন বন্ধু ছিলেন যারা পরবর্তী জীবনে সাহিত্য ও কলার বিভিন্ন বিভাগে জনপ্রিয় হয়েছিলেন।

জীবনের অনিশ্চয়তা, অর্থহীন বিষাদমাখা অযৌক্তিক কা-কারখানা, ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও নিঃসঙ্গতা তাঁকে পীড়িত করে। তাঁর স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ে। মানসিক দিক থেকেও তিনি বিধ্বস্ত বোধ করলেন। তাঁর মনে হলো এই জীবনের জন্য তিনি যথেষ্ট উপযুক্ত ও সক্ষম নন। ততদিনে তাঁর স্বাস্থ্য আরও খারাপ হয়েছে। দুরারোগ্য যক্ষা শেষ পর্যন্ত কাফকার জীবনীশক্তি নিঃশেষ করে দেয়। অনেক কষ্ট ও যন্ত্রণা ভোগের পর ১৯২৪ সালের মাঝামাঝি মাত্র একচল্লিশ বছর বয়সে ফ্রান্ৎস কাফকা মৃত্যুবরণ করলেন। কিন্তু তার পূর্বেই তিনি রচনা করে ফেলেছেন অসাধারণ কয়েকটি উপন্যাস ও ছোটগল্প। কাফকার শ্রেষ্ঠ রচনাবলীর মধ্যে রয়েছে তিনটি উপন্যাস-দি টায়াল (১৯২৫), দি ক্যাসল (১৯২৬) এবং আমেরিকা (১৯২৭)। উপন্যাস ছাড়াও কাফকা বেশ কয়েকটি অত্যন্ত উন্নতমানের, শিল্পগুণসম্পন্ন, গভীর মনস্ততাত্ত্বিক বিশ্লেষণসমৃদ্ধ, আবেদনময় ছোটগল্প রচনা করেছেন। এগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ‘মেটামরফোসিস’ বা রূপান্তর, ‘এ হাঙ্গার আর্টিস্ট’, ‘অ্যান ওল্ড পেজ’, ‘দ্য মিসিং ম্যান’, ‘দ্য জাজমেন্ট’।

অন্তর্মুখী স্বভাবের এ জার্মানভাষী ইহুদি লেখকটি ধার্মিক হওয়ার চেষ্টারত ছিলেন, প্রেম ও নারী বিষয়ে আজন্ম তিনি সুস্থির কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারেননি, পিতার সঙ্গে দ্বন্দ্বটা চিরকালই তাকে ভুগিয়েছে অথচ স্পষ্টবাদিতা তো তার মাঝে তেমন ছিল না; সুতরাং নিজস্ব চিন্তাধারা বয়ান করার জন্য বাধ্য হয়েই তাকে বেছে নিতে হয়েছিল রূপক, প্রতীক, গল্প বলবার জটিল ও জান্তব এক কৌশল, যেখানে প্রতিটি গল্পের পরিণতি তাকে ছেড়ে দিতে হয়েছে নিয়তির নিষ্ঠুর হাতুড়ির নিচে। তার সময়কালে প্রাগের অধিকাংশ মানুষ চেক ভাষায় কথা বলত। চেক আর জার্মান ভাষাভাষী মানুষের মধ্যে বিভাজন ছিল একটি স্পর্শকাতর বাস্তবতা, যেহেতু উভয় পক্ষই একই জাতীয় পরিচয়ের দাবিদার ছিল। ইহুদি সম্প্রদায় প্রায়ই দুই অনুভূতির মধ্যে নিজেদের খুঁজে ফিরত, যেহেতু এই জায়গাটা কোনো রাজ্যের সেই প্রশ্নটি স্বাভাবিকভাবেই উঠত। কাফকা উভয় ভাষাতেই পারদর্শী হলেও জার্মান ভাষাকে নিজের মাতৃভাষা হিসেবে মেনে নিয়েছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমবর্ষের অধ্যয়নের শেষের দিকে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যাক্স বোর্ড নামে একজন ছাত্রের সঙ্গে পরিচিত হন, যার সঙ্গে কাফকার আজীবন বন্ধুত্ব ছিল। ম্যাক্স বোর্ড লক্ষ্য করেছিলেন যে, কাফকা অত্যন্ত লাজুক প্রকৃতির এবং মিতভাষী হওয়া সত্ত্বেও তার কথার মধ্যে নিগূঢ় উপলব্ধি থাকত। এ ছাড়াও কাফকা ছিলেন আজীবন একজন ক্ষুধিত পাঠক।

ফ্রানৎস কাফকার ‘ডি ভারওয়াল্ডলুং’ (দ্য মেটামরফোসিস) বা রূপান্তর একটি  অস্তিত্ববাদী উপন্যাস হিসেবে সারা পৃথিবীতে খ্যাত। প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯১৫ সালে। এই উপন্যাসে যে দর্শন ও নির্মাণশৈলী ব্যবহার করা হয়েছে তাতে উপন্যাসটির মধ্য থেকে ম্যাজিক রিয়ালিজম বা জাদুবাস্তবতার যথেষ্ট উপাদান পাওয়া যায়। গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস বা সালমান রুশদি যেভাবে সচেতনভাবে জাদুবাস্তবতাবাদকে তাদের রচনায় ব্যবহার করেছেন, কাফকা ঠিক সেভাবে ব্যবহার করেননি। ফ্যান্টাসি ও জাদুবাস্তববাদী রচনাশৈলীর যুগল মিশ্রণ ‘রূপান্তর’ উপন্যাসে প্রয়োগ করেছেন কাফকা। ফ্যান্টাসি আসলে কল্পনার জগত। প্রকৃত বিশ্বের সমস্যাকে অতিক্রম করে ফ্যান্টাসি অপ্রাকৃত জগতের দিকে নিয়ে যায়। সেই জগতটা যতই কাল্পনিক বা অপ্রাকৃত হোক না কেন লেখকের নিপুণ রচনাশৈলী সেটাকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে।

জাদুবাস্তবতাবাদ ও ফ্যান্টাসির মিশ্রণে রচিত ‘রূপান্তর’ রূপক, দর্শনাত্মক অথবা প্রতীকাশ্রয়ী আখ্যান হিসেবে বিবেচিত। উপন্যাসে গ্রেগর সামসা নামে একজন ভ্রাম্যমাণ সেলসম্যান বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকে। একদিন ঘুম থেকে উঠে দেখতে পায় সে একটি বড় আকারের পোকায় রূপান্তরিত হয়েছে। এই রূপান্তর ঘটনায় তার পরিবারের সদস্যরা তার সঙ্গে কী ধরনের আচরণ করে যার জন্য শেষ পর্যন্ত সে মারা যায়। এটাই এই উপন্যাসের মূল উপজীব্য। জাদুর বিষয় বা ঘটনা এমন- যার প্রত্যক্ষ বা পরীক্ষণলব্ধ প্রমাণ নেই। ইন্দ্রিয় দিয়ে তাকে বোঝা যায় না। তাই একে অতীন্দ্রিয় বা অতিপ্রাকৃতিক বলা হয়। অপ্রাকৃতিক বলা হলেও আসলে এসব ঘটনা দীর্ঘদিন ধরে কোনো স্থান বা সম্প্রদায়ের বিশ্বাস, চর্চা বা জীবনাচরণের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আছে সংস্কৃতিরই অংশ হিসেবে।

এ উপন্যাসে গ্রেগরের রূপান্তরটাই হলো সত্যিকারের একটিমাত্র ফ্যান্টাস্টিক উপাদান। পরে যখন তার পরিবারের সদস্যরা জানতে পারল তার পোকায় রূপান্তরের ঘটনাটি, তখন তাদের আচরণের মধ্যে যে বিরাট পরিবর্তন ঘটে সেটাই এ গল্পের আসল রূপান্তর। তা কিন্তু ফ্যান্টাসি নয়। মানুষ গ্রেগরের পোকায় রূপান্তরিত হওয়াটা বাস্তবে ঘটে না। এটা অতি মাত্রায় কাল্পনিক গল্পমাত্র। এ কারণে এটা সাহিত্যের অভিধায় ফ্যান্টাসি। আবার গ্রেগরের পোকায় রূপান্তরের কারণে তার বাবা, মা, বোনদের স্বভাবে যে আমূল পরিবর্তন ঘটল, তা কিন্তু অতি কল্পনা নয়। এটা বাস্তবসম্মত। যতই গ্রেগর এই পরিবারের কারও ছেলে বা কারও ভাই হোক না কেন, সে তো আর মানুষ নয়- পোকা মাত্র। কে পারে পোকাকে সহ্য করতে?

বিশ্বজুড়ে সাধারণ পাঠকের মনে ফ্রানৎস কাফকার নামের সঙ্গে উপন্যাসিকা বা বড় গল্প মেটামরফোসিস (রূপান্তর) অবিচ্ছেদ্যভাবে সম্পৃক্ত হয়ে আছে। কেউ কেউ এর প্রারম্ভিক বাক্যটি সম্পর্কে বলেছেন যে, এটা হলো আধুনিক বিশ্বসাহিত্যের সব চাইতে চমক জাগানিয়া অবিস্মরণীয় বাক্য। আলোচ্য গল্পটির মূল চরিত্র গ্রেগর সামসা ভ্রাম্যমাণ সেলসম্যান- যাকে নিত্যদিন ভোর ৪টার ট্রেন ধরতে হয় অফিসের জন্য, এক সকালে ঘুম ভেঙে দেখলো চার পেরিয়ে সাত বেজে যাচ্ছে, রোজকার সময়ে তার ঘুম ভাঙেনি বরং সে বিছানায় চিৎ হয়ে শুয়ে আছে স্বাভাবিকের চেয়ে বড় আকারের এক পোকা হয়ে। অনুমান করি কাফকা তার গল্পের নামকরণে ওভিদ থেকেই উৎসাহ পেয়ে থাকবেন। মেটামরফোসিস নামে রোমান কবি ওভিদেও লাতিন ভাষায় যে মহাকাব্য আছে ওতে দুর্দান্ত সব রূপান্তরের কাহিনী রয়েছে- যেখানে নার্সিসাস হয়ে যায় গাছ কিংবা জিউস যৌনকাতর হয়ে ষাঁড়ে রূপান্তরিত হন, ষাড়ের বেশেই মিলিত হন কাক্সিক্ষত নারীর সঙ্গে। অনুমান করি কাফকা তার গল্পের নামকরণে ওভিদ থেকেই উৎসাহ পেয়ে থাকবেন। আবার এপুলিয়াসের গোল্ডেন অ্যাস (যার লাতিন অর্থও রূপান্তর)-ও কাফকাকে মুগ্ধ করে থাকবে হয়তো। সে রূপান্তর আরও বিচিত্র। এপুলিয়াসের নায়ক জাদু ব্যবহার করে পাখি হতে চায়। কিন্তু ভ্রান্তিজনিত কারণে সে মানুষ থেকে বদলে যায় গাধায়।

কাফকা মেটামরফোসিস লেখেন; জীবন আর এর উপাদান কিংবা চরিত্রদের দগ্ধ করেন, বিদ্ধ করেন নির্মমতায়-এর সঙ্গে যোগ হয় সূক্ষ্ম কৌতুকবোধ, যা তিনি করেছেন আদতে ওই নির্মমতার বিরুদ্ধেই, যেমন-দেয়ালের একটি চিরচেনা পোর্ট্রেট সরিয়ে নিতে চায় গ্রেট, পোকারূপী গ্রেগর লাফিয়ে ছবিটার ওপর বসে, ছবিটা ওখান থেকে সরাতে দেবে না এই তার পণ, এমন কি ভেবে নেয় বেশি বাড়াবাড়ি করলে বরং সে গিয়ে বসে পড়বে বোনের মুখের ওপর, চলতে থাকে তার কষ্টক্লিষ্ট অথচ হাস্যকর নড়াচড়া। পুরো গল্পের এমনি মোহ, জীবন্ত এর পরিবেশ; ফারাক মেলে না প্রাগের একটা নিম্ন মধ্যবিত্ত জার্মান পরিবারের সঙ্গে এমন কী ফারাক মেলে না এদেশের এমন অজস্র পরিবারের সঙ্গেও।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ তখনো শুরু হয়নি। কিন্তু ইউরোপজুড়ে ফুঁসে উঠছে গাঢ় ইহুদি বিদ্বেষ; তা সত্ত্বেও তার লেখায় সরাসরি এসবের কোনো বর্ণনা আমরা পাব না। প্রচ- অন্তর্মুখী এ লোকটি তখন প্রাগের পথে-ঘাটে হেঁটে বেড়াচ্ছেন, বিয়ারের পেয়ালায় চুমুক দিচ্ছেন, নারী সঙ্গে স্বস্তি খোঁজার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। কিন্তু কিছুই তাকে শান্তি দিতে পারছেন না। কেবল লেখার টেবিলে বসেই তিনি ঢুকতে পারছেন আপন জগতে, যেখানে তিনি নিজেকে ভেবে নিচ্ছেন স্বাধীন। আসলে কী ওখানেও কাফকা স্বাধীনতা পেয়েছেন? মেটামরফোসিসের শব্দগুলো থেকে ভেসে ওঠে-নাহ, স্বাধীনতা তিনি পাননি, পিতার সঙ্গে ব্যক্তি জীবনের দ্বন্দ্ব ফুটে উঠেছে গ্রেগর সামসা আর তার বাবার মাঝে দৃশ্যমান নিষ্ঠুর বৈরিতার মধ্যে। চেনা জীবনের প্রাত্যহিক জীবিকা নির্বাহের চাপ থেকে মুক্তি পাওয়ার পথ খুঁজতে গিয়ে যে গ্রেগর সামসাকে আঁকতে চাইলেন তিনি, সে অনাকাক্সিক্ষত কিন্তু অনিবার্য দায়িত্ব থেকে মুক্তি পেল কেবল একটা পোকায় রূপান্তরিত হওয়ার পর, যার ফলাফল- মুক্তি নয়; বরং আরও নিগুঢ় বন্দীদশা।

কাফকার প্রায় সবগুলো বিখ্যাত সাহিত্য কর্ম তাঁর ব্যক্তিগত জীবনেরই প্রতিফলন। নারীর প্রতি তাঁর যে দৃষ্টিভঙ্গি- তাও তাঁর রচনায় সুস্পষ্ট। কাফকা তাঁর জীবনে শত শত চিঠি লিখেছেন বাবা, বোন, বন্ধুবান্ধব ও প্রেমিকাদের। কেবল মাত্র ফেলিসকেই লিখেছেন অর্ধশতাধিক চিঠি। সাহিত্যকর্মের পাশাপাশি তাঁর লিখা চিঠিতেও নারীর প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ ঘটেছে। যেমন, ‘বিস্ময়করভাবে নারীর সূক্ষ্ম বিচারবুদ্ধি নিতান্তই সামান্য; তারা শুধু লক্ষ্য করে আপনাকে আকর্ষণ করাতে পেরেছে কিনা অথবা তাদের প্রতি আপনার দরদ উথলে উঠেছে কিনা, এবং শেষতক তাদের প্রতি আপনার মমতা সৃষ্টি হয়েছে কি-না। এখানেই শেষ; যদিও সাধারণত এটুকুই যথেষ্ট।’

কাফকা নিয়েছেন অনেক নারীর উষ্ণ সঙ্গ, কিন্তু ঘর বাঁধেননি কারাও সঙ্গেই। ফেলিস বাউয়ার-এর সঙ্গে সম্পর্ক হয় যখন কাফকার বয়েস ২৩ বছর। ১৯১৭ সালে যক্ষ্মায় আক্রান্ত হওয়ার পর ছেদ পড়ে এ সম্পর্কে। প্রথম প্রেমের পরিসমাপ্তিতে ১৯২০-এর গোড়ার দিকে গভীর সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন মাদকাসক্ত এক বিবাহিত-চেক লেখিকার সঙ্গে। তার নাম মেরিনা জেসেনকা। ১৯২৩ সালে বার্লিনে পালিয়ে এসে এ সম্পর্ক থেকে মুক্তি পান কাফকা। সেখানে ২৫ বছর বয়স্কা শিক্ষিকা ডোরা ডায়ামান্টের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন গভীর প্রণয়-সম্পর্কে। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত কাফকার সঙ্গ ত্যাগ করেনি ডোরা। ভিয়েনার চিকিৎসা-আশ্রমে তারই কোলে মাথা রেখে মারা যান কাফকা।

কাফকার লেখাগুলোয় আমরা আবিষ্কার করেছি নিজ সময়ের পরে ঘটবে এমন অজস্র ঘটনা। আসলে তিনি তাঁর সাহিত্য জীবন পার করেছেন প্রফেসির মাঝে। তাঁর সময়ে পৃথিবী বদলে যাচ্ছিল, পৃথিবীর মানচিত্রে আসছিল বড় কোনো পরিবর্তন, আসছিল যুদ্ধ ও মৃত্যু। সে বদলের আগমনী সংকেত বাজছিল কাফকার লেখায়। পরিবর্তন তো বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আমাদের জীবনকে এলোমেলো করে দিয়ে যায়। কাফকার গহন জীবনবোধ এ পরিবর্তনের আঁচে হয়তো ঘূর্ণিবায়ুর মতো নিয়ত বিধ্বস্ত হতো, ক্লান্ত কিংবা উদ্দীপ্ত হত-না হওয়াটাই ছিল অস্বাভাবিকতা।

কাফকা নিজেই বলেছেন, তাঁর রচনার মূল্য ব্যক্তিগতভাবে তাঁর নিজের কাছেই। তবুও এসব রচনা আমাদের শতকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রচনা সমূহেরই অন্তর্ভুক্ত। কেননা এ কালের মানুষের গুরুতর সমস্যাকে উপজীব্য করে এগুলো লেখা। অবাস্তবতাকে রূপ দেয়ার একটা নূতন ও মৌলিক পদ্ধতি তাঁর রচনায় প্রবর্তিত আছে। তাঁর এসব প্রতীকী রচনার ব্যাখ্যা দেওয়া কঠিন হলেও এসব রচনা নিশ্চিতরূপেই অর্থহীন নয়। কাফকার জীবনের রহস্য, উদ্বেগ, হাহাকার ও একের পর এক বিফলতাই তাঁর রচনায় দার্শনিক ও জীবন ধারণের সমস্যা নূতন রূপ নিয়েছে। মানুষের চৈতন্যের একটা সংকট আছেই, এতেই মানুষ নিজেকে অনেক সময় অপরাধী বলে জ্ঞান করে, এ চেতনাই তাকে জ্ঞান অর্জনের স্পৃহা জাগায় এবং সামাজিক পরিবেশে ক্ষমতার অধিকারী করতে চায়। কাফকা’র লেখায় এ সবই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে নান্দনিক রূপকাশ্রয়ে।


আপনার মন্তব্য