শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ২৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ২১:৩৩

অনুপ্রেরণীয়

ফেরিওয়ালা পেয়েরা বেগম

বিভিন্ন স্থানে ভ্যানগাড়ি ঠেলে ঠেলে ফেরি করে জিনিস বিক্রি করে জীবন যুদ্ধে বেঁচে আছেন ফেরিওয়ালা নামে খ্যাত পেয়েরা বেগম

বাবুল আখতার রানা, নওগাঁ

ফেরিওয়ালা পেয়েরা বেগম

“লাগবে না কি প্লাস্টিকের জগ, মগ, টিফিন বক্স, চিরুনি, বালতিসহ হরেক রকমের প্লাস্টিকের জিনিস। রয়েছে সিলভারের হাঁড়ি, পাতিল। এ ছাড়াও রয়েছে স্টিলের চামচ, বাটিসহ হরেক রকমের জিনিস। লাগবে না কি আপা। আসুন কম দামে পছন্দের জিনিস বেছে বেছে নেন।” এভাবেই গ্রামের বিভিন্ন মহল্লায়, শহরের বিভিন্ন জনমুখর মোড়ে গলা ছেড়ে ভ্যানগাড়িতে বিভিন্ন রকমের প্লাস্টিক, সিলভার, স্টিলসহ নানা রকমের নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস ফেরি করে বিক্রি করেন পেয়েরা বেগম।

সান্তাহার শহর ও তার আশপাশের বিভিন্ন স্থানে ভ্যানগাড়ি ঠেলে ঠেলে ফেরি করে জিনিস বিক্রি করে জীবনযুদ্ধে বেঁচে আছেন ফেরিওয়ালা নামে খ্যাত পেয়েরা বেগম। এসব এলাকায় মাঝে মধ্যেই ভ্যান গাড়ি ঠেলে ফেরি করে বিভিন্ন জিনিস বিক্রি করতে দেখা যায় পেয়েরা বেগমকে। অনেক ক্রেতা তার  ভ্যানগাড়িতে থাকা বিভিন্ন রকমের জিনিস দেখছেন। দেখছেন আর জিনিস কিনছেন। পেয়েরা বেগমের আসল বাড়ি গাইবান্ধা জেলার মহিমাগঞ্জের গড়গড়িয়া নামক গ্রামে। ওই গ্রামেই পেয়েরার দিনমজুর পরিবার বিয়ে দিয়েছিল এক মাদকাসক্ত পুরুষের সঙ্গে। বিয়ের পর পরই প্রতিদিনই অর্থের জন্য স্বামীর নির্যাতন চলত পেয়েরা বেগমের ওপর। এরই এক পর্যায়ে পেয়েরা ওই মাদকাসক্ত স্বামীর সংসার ছেড়ে চলে আসে বাবা-মার কাছে। পরবর্তীতে পরিচয় হয় বগুড়ার দুপচাঁচিয়া উপজেলার তালোড়া গ্রামের ফজল উদ্দিনের সঙ্গে। ফজল উদ্দিন পেয়েরা বেগমের গ্রামসহ গাইবান্ধা জেলার বিভিন্ন উপজেলার গ্রামে গ্রামে ফেরি করে বিভিন্ন জিনিস বিক্রি করত। মহিমাগঞ্জের গড়গড়িয়া গ্রামে ফেরি করে জিনিস বিক্রির সময় পেয়েরা বেগমের সঙ্গে পরিচয় হলে দুজনের মাঝে গড়ে ওঠে প্রেমের সম্পর্ক। সম্পর্কের কিছুদিন পর ফজল উদ্দিন ও পেয়েরা বেগম বিয়ে করেন। পেয়েরা বেগমের ঘরে আসে এক ছেলে ও এক মেয়ে। বিয়ে করার পর তারা বসবাস শুরু করেন বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলার সান্তাহার রেলওয়ে জংশন স্টেশন শহরের রেলওয়ে কলোনির সাহেবপাড়ায় ভাড়া করা টিনের ঘরে। বিয়ের পর থেকে স্বামীর ফেরি করা আয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছিল পেয়েরা বেগমকে।

তখন পেয়েরা বেগমও সিদ্ধান্ত নেন যে তিনিও তার স্বামীর মতো করে ফেরি করে জিনিস বিক্রি করবেন। তখন তিনি ঋণ নিয়ে একটি পায়ে ঠেলা ভ্যানগাড়ি কিনেন। তার সঙ্গে কিছু জিনিস কিনে ভ্যানগাড়িতে সাজিয়ে শুরু করেন ফেরিওয়ালার ব্যবসা। ছোট পুঁজির ব্যবসা করে পরবর্তীতে পেয়েরা বেগম বৃদ্ধি করতে থাকেন তার ভ্যানগাড়িতে জিনিসের পরিধি। এতে করে দিন দিন পেয়েরার ব্যবসায় লাভের পরিমাণ বৃদ্ধি পেতে থাকে। তারপর থেকে পেয়েরাকে আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি। এখন পেয়েরার সংসারে নেই কোনো অভাব। দূর হয়েছে পেয়েরা বেগমের সংসারের অভাব-অনটনের গল্প। আর নিজে কর্ম করতে পেরে খুশি পেয়েরা বেগম।

ফেরিওয়ালা পেয়েরা বেগম বলেন, তিনি প্রায় ৩ বছর ধরে এই ফেরিওয়ালার ব্যবসা করে আসছেন। এই ব্যবসা করতে পেয়েরা বেগমের ভালো লাগে। যখন তিনি গ্রামের মধ্যে যান তখন বিভিন্ন বয়সের নারীরা তার দোকানের আশপাশে ভিড় করে। বেছে বেছে তাদের পছন্দের নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস কিনেন। কারণ গ্রামের অনেক মহিলার ইচ্ছে থাকলেও বাজারে গিয়ে তাদের নিজের পছন্দমতো জিনিস কিনতে পারেন না। সেই সব মানুষ আমার দোকান থেকে নিজেদের পছন্দমতো জিনিস কিনতে পারেন। এতে করে প্রতিদিনই আমার নতুন নতুন গ্রাম বেড়ানো হয়, অনেক রকমের মানুষের সঙ্গে জানাশোনা হয়। প্রতিদিনই জীবন গল্পের ঝুড়িতে যোগ হয় নতুন নতুন অভিজ্ঞতা। আমার চেয়েও অসহায় নারীদের সঙ্গে পরিচয় হয়। গ্রামের মধ্যে গেলে আমার ফেরির দোকান থেকে বিভিন্ন বয়সের নারী ও ছেলে- মেয়েরা আর শহুরে এলাকা ও বিভিন্ন রাস্তাঘাটে পুরুষরাও তাদের পছন্দের জিনিস কিনেন। তিনি আরও বলেন, কোনো কোনো দিন জিনিস বিক্রি ভালো হয়। কোনো দিন ২ হাজার, কোনো দিন ৩ হাজার আবার কোনো দিন ১ হাজার আবার কোনো দিন কম টাকারও জিনিস বিক্রি হয়। এতে করে খরচ বাদ দিয়ে কোনো দিন ১ হাজার কোনো দিন ৫০০ টাকা আবার কোনো দিন ২ হাজার টাকাও লাভ হয়। এতে করে তার সংসারের অভাব দূর হয়েছে। স্বামী ও ছেলে-মেয়ে নিয়ে এখন তিনি অনেক সুখে আছেন। সংসারের সব খরচ বাদ দিয়ে কিছু টাকা সঞ্চয়ও করছেন পেয়েরা বেগম। কিন্তু এই ব্যবসা তো আর সারা বছর একইভাবে হয় না। বর্ষা মৌসুমে সব সময় গ্রামে যাওয়া হয় না। অসুস্থ হলে বের হওয়া যায় না। তবুও তিনি অনেক ভালো আছেন। মানুষের কাছে হাত পেতে খেতে হচ্ছে না। মন্দ কোনো কাজ করতে হচ্ছে না। শুধু ভ্যানগাড়ি ঠেলে বিভিন্ন গ্রামে যেতে হয়। যতদিন বেঁচে আছি ও সুস্থ আছি ততদিন আমি এই ব্যবসাকে ধরে রাখার চেষ্টা করব। সৎভাবে ব্যবসা করে সৎ উপায়ে অর্জিত অর্থ দিয়েই জীবনযাপন করতে চাই। কর্মকে ছোট করে না দেখে সমাজের অনেক নির্যাতিত ও স্বামী কর্তৃক অবহেলিত নারীরা ইচ্ছা করলেই সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারেন। সমাজের মানুষের বাঁকা কথাকে কানে না ধরে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার দৃঢ়প্রত্যয় গ্রহণ করতে হবে। তবেই এই পুরুষশাসিত সমাজে কোনো নির্যাতিত ও অবহেলিত নারীকে আর পেছনে পড়ে থাকতে হবে না।


আপনার মন্তব্য