শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ২৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ২১:৩৫

অনন্য

দুলালের মানবিক সিএনজি

প্রায় বিশ বছর ধরে অসহায় রোগীদের নিয়ে ছুটছেন

জামশেদ আলম রনি

দুলালের মানবিক সিএনজি

পেশায় সিএনজি অটোরিকশা চালক দুলাল চন্দ্র দাস একজন ব্যতিক্রমী মানুষ। মানবিক গুণের কারণে তিনি আজ অনেকের কাছে পরিচিত। তার সিএনজির গায়ে লেখা মানবিক কিছু শব্দ দেখে যে কারও দৃষ্টি আটকে যাবে। আর ভিতরের দিকে নজর দিলে তো চমকে ওঠারই কথা। একটি সিএনজিতে এতগুলো প্রয়োজনীয় জিনিস থাকতে পারে সেটা কেউ কল্পনাও করতে পারবে না। অটোরিকশার পেছনে দুলাল চন্দ্রের নাম ও  ফোন নম্বর দিয়ে লেখা আছে, ‘গরিব ও অসহায়  রোগীদের জন্য ফ্রি যাতায়াত’। মাঝখানে  লেখা, জনপ্রিয় উপস্থাপক হানিফ সংকেতের অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি ও কেয়া কসমেটিকসের পক্ষ থেকে পুরস্কারপ্রাপ্ত’। আর অটোরিকশার ভিতরে আছে ছোট্ট একটি ফ্যান, আয়না-চিরুনি, পাউডার, টিস্যু বক্স, এয়ার ফ্রেশনার, ছোট্ট প্যাড, মোবাইলের চার্জার, সাউন্ড বক্স, নেলপলিশ, মোবাইল ট্যাব ও ডায়েরি। সম্প্রতি দুলাল চন্দ্র দাস বাংলাদেশ প্রতিদিন অফিসে এসেছেন। এই প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে উঠে আসে তার মহৎ উদ্যোগের পেছনের গল্প। জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদিতে’ যাওয়ার গল্প বললেন তিনি। অটোরিকশার ভিতরে রাখা নিত্য ব্যবহার্য জিনিসপত্র রাখার বিষয়েও জানালেন। তিন সন্তানের জনক দুলাল চন্দ্রের বাড়ি সাভারে। বৃদ্ধ বাবা-মা, স্ত্রী আর সন্তানদের নিয়ে থাকেন রাজধানীর গাবতলীর ঋষিপাড়ায়। বড় মেয়ে নবম শ্রেণিতে ও এক ছেলে সপ্তম  শ্রেণিতে পড়ে। আরেক ছেলে স্কুলে যাওয়া শুরু করেছে মাত্র। দুলাল চন্দ্র দাস জানিয়েছেন, ১৯৯৭ সাল থেকে তিনি এই পেশার সঙ্গে জড়িত। আগে বেবিটেক্সি চালালেও ২০০০ সাল থেকে তিনি সিএনজি অটোরিকশা চালাচ্ছেন। শুরুতে দশ বছর ভাড়া চালালেও ২০১১ সাল থেকে নিজের অটোরিকশা চালান তিনি। পরে নিজের মনের মতো করে সাজিয়েছেন তিন চাকার এই বাহনটি। অনেক সময় সিএনজির ছাদ আর পেছনের পর্দা কেটে চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনাও ঘটে। তাই নিরাপত্তার জন্য অটোরিকশার ছাদে লাগিয়েছেন লোহার নেট। রাস্তায় জ্যামে বসে থাকলে রোদের তাপে কষ্ট লাগবে, এর জন্য ছাদে সিলভার পেপার লাগিয়েছেন। কয়েক হাজার টাকা খরচ করে নিজের আয়ের উৎস অটোরিকশাটিকে সাজিয়েছেন দুলাল। গত বছর দুলাল চন্দ্রের এমন সেবার কথা জানতে পেরে এগিয়ে আসে জনপ্রিয় টিভি অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’। সেখানে তাকে পুরস্কার হিসেবে কেয়া কসমেটিকসের পক্ষ থেকে দেওয়া হয় এক লাখ টাকা। পুরস্কারের টাকার সঙ্গে আরও টাকা যুক্ত করে ক্রয় করেন একটি অটোরিকশা। অন্য সিএনজির চালকরা যেখানে নানা অজুহাতে যাত্রীদের কাছে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করেন সেখানে গরিব রোগীদের ফ্রি সেবা দেওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি জানান, ‘২০০০ সাল থেকেই আমি এই চেষ্টা করে যাচ্ছি। তবে যখন মালিকানা গাড়ি চালাতাম তখন খুব বেশি সেবা দেওয়া যেত না। যখন নিজের গাড়ি হলো তখন থেকে নিজের মতো করে কাজ করতে পারছি।’

অতীতের গল্প তুলে ধরে এই জীবন সংগ্রামী বলেন, ‘একসময় আমি অনেক গরিব ছিলাম। আমার মেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ে। গাবতলীর বাসা  থেকে শ্যামলী শিশু হাসপাতালে কাঁধে করে নিয়ে আসি।

কোনো গাড়িচালক আসতে রাজি হননি। ওই সময় থেকে সিদ্ধান্ত নিই সুযোগ পেলে যারা আমার মতো গরিব আছে তাদের সাহায্য করব। অনেক কষ্টে সিএনজিটা কিনেছি আমি। এখন সাধ্যমতো গরিব, অসুস্থ মানুষের সেবা করছি।’

দুলাল বলেন, ‘আমি চাই, যারা অসুস্থ অথচ অসহায় তারা যেন ফোন দেয়। তারা ফ্রি সেবা পাবে। আমি চাই, অসহায় মানুষগুলো যাতে আমাকে  বেশি করে পায়। আমি তাদের সেবা দিতে চাই।’

প্রতি মাসে গড়ে ১০ থেকে ১৫ জন তার কাছ থেকে এই সেবা নেন জানিয়ে তিনি বলেন, এতে আমার পরিবারের সদস্যদের কোনো অভিযোগ  নেই। বরং তারা সবাই খুশি। অন্যদের সুখের কথা চিন্তা করে তারা একটু কষ্ট স্বীকার করতেও রাজি আছেন।

সবশেষে তিনি জানান, আশপাশে কোনো অসহায় রোগী কল দিয়ে সেবা চাইলে তিনি এসে তাকে পৌঁছে দেবেন গন্তব্যে। এই কাজ করতে পারার মাঝে আনন্দ পান বলেও জানান তিনি।


আপনার মন্তব্য