শিরোনাম
প্রকাশ : বুধবার, ১৮ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৭ মার্চ, ২০২০ ২১:৪৪

বাংলাদেশের সংবাদপত্রে সংবাদ পরিবেশনের ঝোঁক ও প্রবণতা

রোবায়েত ফেরদৌস, অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

বাংলাদেশের সংবাদপত্রে সংবাদ পরিবেশনের ঝোঁক ও প্রবণতা

If there’s anything that’s important to a reporter, it is integrity. It is credibility.
-Mike Wallace
If I had my choice I would kill every reporter in the world, but I am sure we would be getting reports from Hell before breakfast.
-William Tecumseh Sherman

 

জাতীয় ও আঞ্চলিক মিলিয়ে বাংলাদেশে এখন কয়েক হাজার সংবাদপত্র। কয়েকটি চলছে এবং বেশির ভাগ খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে। খুবই সন্দেহ হয় সাংবাদিকতার পেশাদারি মনোভাব নিয়ে এসব সংবাদপত্রের দীর্ঘমেয়াদি কোনো চিন্তা রয়েছে কিনা। বিশদ আলোচনার সুযোগ, এ পরিসরে যেহেতু নেই, সে কোশেশ না করে আমি বরং মোটা দাগে আমাদের এখনকার সংবাদপত্রে সংবাদ পরিবেশনের প্রধান কিছু ঝোঁক ও প্রবণতা শনাক্ত করার চেষ্টা করব।  

 

ইতিবাচক দিক বিষয়বৈচিত্র্য : সংবাদ পরিবেশনে বিষয়বৈচিত্র্য নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে। সংবাদপত্রগুলো আগের যে কোনো সময়ের চাইতে এখন বহুমুখী, বহুমাত্রিক ও বিচিত্র সব বিষয়ে সংবাদ পরিবেশিত হচ্ছে। শেয়ারবাজার থেকে সেলিব্রিটি-জনআগ্রহের প্রতিটি বিষয়ই এখন সংবাদের উপাদান; জননিরাপত্তা থেকে জনদুর্ভোগ নিউজ ভলিউমে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে সবই; কৃষি থেকে কৃষ্টি- নিউজ কভারেজ থেকে বাদ যাচ্ছে না কোনো কিছুই; সংবাদের ভলিউমও অনেক বেড়েছে; সংখ্যা বেড়েছে কয়েকগুণ, মানুষের অ্যাকসেস, অপশনস ও চয়েসেস বেড়েছে। মিডিয়ার ‘ওয়াচডগ’ বা ‘সারভেইলেন্স’ ফাংশন জোরদার হয়েছে। মিডিয়া সত্যিকার অর্থেই ‘আই অন গভর্নমেন্ট’ হয়ে ওঠার চেষ্টা করছে; কোনো বিষয়ই এখন গোপন থাকছে না; সরকারের পাশাপাশি জনসম্পৃক্ত আছে এমন প্রতিষ্ঠানের ওপর সংবাদপত্রের নজরদারি কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর মধ্য দিয়ে কাজের ‘স্বচ্ছতা’ ও ‘জবাবদিহিতার কাঠামো’ তৈরির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বলা হয় সময় এখন স্পেশালাইজেশনের; এর সঙ্গে তাল রেখে সংবাদেরও প্রচুর বিষয়ভিত্তিক স্পেশালাইজেশন ঘটেছে; এর সমান্তরালে পাঠকও ‘সেগমেন্টেড’ হয়ে গেছে; কেউ কেবলই স্পোর্টস কেউ-বা শুধুই শেয়ার মার্কেট বা ফ্যাশন সংবাদে আগ্রহী ও আসক্ত হয়ে উঠছে। সংবাদ পরিবেশনে কৃষি, অর্থনীতি, ব্যবসায়, আইটি ও শিক্ষামূলক বিষয়াদি যৌক্তিকভাবেই বাড়তি গুরুত্ব পাচ্ছে। জিডিপিতে বিরাট অবদান রাখছে কৃষি, প্রায় ২০%, এবং প্রত্যক্ষভাবে কৃষির সঙ্গে দেশের ৪৫-৪৮ ভাগ মানুষের জীবন-জীবিকা জড়িত, তবু বাংলাদেশের মূলধারার সাংবাদিকতায় কৃষি ছিল অবহেলিত। গেল এক দশকে তা পরিবর্তিত হয়েছে, কৃষি এখন সাংবাদিকতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিট হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

 

উপস্থাপনা ও শৈলী : সংবাদ উপস্থাপনা ও শৈলীতে গুণগত পরিবর্তন এসেছে; গ্রাফিক্স, কিউআর, সংবাদপত্রের ভিতরে ক্লু বা অনলাইন ভার্সনে ভিডিও ফুটেজ, কার্টুন, ইন্টারেক্টিভিটি ও নানাবিধ প্রযুক্তির ব্যবহারে নতুনত্ব এসেছে। ঘটনা ঘটা মাত্র অকুস্থল থেকে রিয়েল টাইমে সংবাদের লাইভ সম্প্রচার যেমন টিভিতে চলছে, সংবাদপত্রের অনলাইনও তা থেকে পিছিয়ে নেই। সংবাদ পরিবেশন এখন আর ইউনিলিনিয়ার বা একমুখী কোনো বিষয় নয়; আগের যে কোনো সময়ের চাইতে এখন তা অনেক বেশি ইন্টারেক্টিভ। কেবল দ্বিমুখী নয়, পাঠক আর গণমাধ্যমের সম্পর্ক এখন বিচিত্র ও বহুমুখী; সংবাদের সঙ্গে নিয়ত পাঠকের মিথস্ক্রিয়া চলছে।

উন্নয়ন সংবাদ : উন্নয়ন সংবাদ আগের চাইতে বেশি পরিবেশিত হচ্ছে; তবে উন্নয়ন রিপোর্টের সত্যিকার যে দর্শন-গরিব, প্রান্তিক, সাধারণ মানুষের জীবন ও দারিদ্র্য নিয়ে সরেজমিন রিপোর্ট- সেখানে এখনো ঘাটতি আছে। সংবাদ পরিবেশনে তথ্যের ওপর বিত্তহীন-বঞ্চিত মানুষের অভিগম্যতা ও স্বত্বাধিকার এখনো প্রান্তিক পর্যায়ে রয়েছে।

তরুণ প্রতিভা : সংবাদ সংগ্রহ, লিখন, তৈরি ও পরিবেশনের সঙ্গে অনেক তরুণ যুক্ত হচ্ছেন, তাদের প্রতিভা ও সৃজনশীলতার স্বাক্ষর রাখছেন; সংবাদভিত্তিক নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে; আরও ইতিবাচক যে, অনেক নারী তাদের পেশার প্রধান উপজীব্য হিসেবে সংবাদকে বেছে নিচ্ছেন এবং কৃতিত্বের পরিচয় দিচ্ছেন।

 

দুর্বলতার দিকসমূহ ইভেন্ট বনাম প্রসেস রিপোর্ট : এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের সংবাদের মূল ঝোঁক ‘ইভেন্ট রিপোর্টিং’-এর দিকে; দিনের ঘটনা দিনেই বা পরের দিন প্রচার করতে হবে, এর কোনো বিকল্প নেই, কিন্তু অন্য সংবাদপত্র থেকে সংবাদ পরিবেশনে স্বাতন্ত্র্য ও ভিন্নতা তৈরির জন্য ‘প্রসেস’ রিপোর্টিং’-এর কোনো বিকল্প নেই। নওগাঁয় চারজন সাঁওতালকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে এটা একটা ইভেন্ট রিপোর্ট, যা ওই দিনই কভার করতে হবে, কিন্তু গেল ১০ বছরে নওগাঁয় কতজন সাঁওতালকে হত্যা করা হয়েছে, কতটি সাঁওতাল পরিবারের কত হেক্টর জমি বেদখল হয়ে গেছে, কারা এর জন্য দায়ী- এসব বিস্তারিত তথ্য নিয়ে যে রিপোর্ট তা হলো প্রসেস রিপোর্ট। এই প্রসেস রিপোর্টের মধ্য দিয়েই আদিবাসীদের ভূমি দখল, তাদের দারিদ্র্য ও প্রান্তিকতার প্রক্রিয়াটি পাঠকের কাছে স্পষ্ট হবে। প্রসেস বা অনুসন্ধানী বা ডেপথ রিপোর্ট যেমন সময়সাপেক্ষ তেমনি তা ব্যয়বহুলও বটে। কিন্তু অন্য সংবাদপত্রের তুলনায় নিজের একটি আলাদা ইমেজ তৈরিতে এ ধরনের রিপোর্ট সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে; অধিকন্তু পাঠকের কাছে তা ওই সংবাদপত্রের গ্রহণযোগ্যতা, বিশ্বাসযোগ্যতা ও গুরুত্বও বাড়িয়ে দেয়; কিন্তু আমাদের প্রিন্ট সাংবাদিকতায় অনুসন্ধানী প্রতিদিন রিপোর্ট এখনো তার যথার্থ গুরুত্বের জায়গাটি খুঁজে পায়নি।

জাত সাপ বনাম ঢোঁড়া সাপ : প্রতিদিন দেখি সংবাদপত্র আর টিভির রিপোর্টাররা কর্তৃপক্ষকে প্রশ্ন করে, চ্যালেঞ্জ করে, কেমন সাপের মতো তার-প্যাঁচানো-বুম নিয়ে হিসহিস করতে থাকে কিন্তু কই, তুলে আনা তথ্যে জাত সাপের মতো বিষ কই তাদের? সবই কেমন বিষহীন পানিবাসী নিরীহ ঢোঁড়া সাপ। তাদের কোনো দংশন নেই, কামড় দেওয়ার শক্তি নেই; বিষ নেই, জ্বালাও নেই; কিন্তু বেশ বড়াই আছে, আছে নিরপেক্ষতার ভং; ভালোমানুষীর আবরণ, আবডাল। এজন্যই কি কামড়ে ভয়? কাউকে দংশন করলে পাছে যদি কোনো পক্ষ হয়ে যাই; কিংবা নিদেনপক্ষে ভয় থাকে, কেউ যদি কোনো পক্ষে মার্জিন এঁকে দেয়। নিত্যদিন এত সব মুখোশে সংবাদের মুখ মোড়া থাকা যে মুখোশ চিরে মুখ চেনাই মুশকিল হয়ে ওঠে! মুশকিল হয় তখন। কখন? সংবাদপত্র চালু হওয়ার আগেই এর মালিকের সঙ্গে সাংবাদিকদের যখন দেন-দরবার চলে, মহা আপস রফাটি তখনই সম্পাদিত হয়ে যায়। পরে আর কিচ্ছুটি করার থাকে না, বেতনভোগী সাংবাদিকরা তাদের পেশাদারিত্ব দেখাবেন কোথায়? ক্ষমতাবানদের চ্যালেঞ্জ করার সাহস ও শক্তি কয়টি কাগজ দেখাচ্ছে? অথচ সাংবাদিকতা মানেই সাপের গর্তে হাত দিয়ে সাপকে টেনে বাইরে আনা, হাটে হাঁড়ি ভেঙে দেওয়া, থলের বেড়াল কালো-সাদা যাই হোক বের করে দেওয়া। কোনো কাগজ কি পারবে তার মালিকের দুর্নীতি, ঋণখেলাপ, ভূমিদস্যুতা, হত্যা-অন্যায়ের বিরুদ্ধে কলম ধরতে? একশো ভাগ সংশয়-ভরা মন নিয়ে ‘দেখিবার অপেক্ষায় আছি’।

অসুস্থ প্রতিযোগিতায় যথার্থতা বলি : সবার আগে নিউজ প্রচারের চাপে যাচাই-বাছাই না করে অনেক সময় ভুল তথ্য পরিবেশন করা হয়, যা কোনো অবস্থাতেই গ্রহণযোগ্য নয়। সাংবাদিকতায় ‘সময়’-এর গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি কিন্তু ‘যথার্থতা’র গুরুত্ব তার চাইতেও বেশি। সংবাদ পরিবেশনে প্রতিযোগিতা সব সময়ই ইতিবাচক কিন্তু আন্তসংবাদপত্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা মাঝে মাঝে এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে তা সংবাদ পরিবেশনে-সততা, যথার্থতা, বস্তুনিষ্ঠতা ও পক্ষপাতহীনতা- এই চার মৌলনীতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে; টিভি চ্যানেলের ক্ষেত্রে এই প্রতিযোগিতা ভয়ঙ্কর পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। অসুস্থ প্রতিযোগিতার বিষয়টি অনেক সময় এমন ন্যক্কারজনকভাবে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে তা খোদ কোনো কোনো কাগজের রুচি ও বিশ্বাসযোগ্যতাকেও নাড়িয়ে দেয়।

দায়িত্বশীলতা ও নৈতিকতা : সংবাদ পরিবেশনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক দায়িত্বশীলতা ও নৈতিকতা; এর ওপর ভিত্তি করেই সাংবাদিকতার ‘প্রফেশনাল ডিগনিটি’ তৈরি হয়; কিন্তু আমাদের সাংবাদিকতায় ‘ফেয়ারনেস’ ও ‘এথিকস’-এর সিরিয়াস ঘাটতি রয়েছে; যেমন, কারও বিরুদ্ধে যত বড় অপরাধের অভিযোগ হোক না কেন, রিপোর্টে অভিযুক্তের বক্তব্য থাকতেই হবে; ধর্ষণের শিকার কোনো নারী বা তার নিকটাত্মীয়দের ছবি ছাপা যাবে না, কোনো অপরাধে শিশু জড়িত থাকলে তার নাম-ছবি প্রকাশ করা যাবে না, রিপোর্টে প্রতিবেদকের নিজস্ব মতামত দেওয়া চলবে না, বেদনাদায়ক ঘটনা যা সে মনে করতে চায় না কিংবা সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন হতে পারে এমন ঘটনায় শিশুর নাম-ছবি-কথা প্রকাশ করা যাবে না, বীভৎস ছবি, বিকৃত ছবি, লাশের ক্লোজ ছবি দেখানো যাবে না; সংবাদ ও ছবি পরিবেশনে কারও প্রাইভেসির সীমা অতিক্রম করা যাবে না, কাউকে হুমকি-ধমকি বা ভয় দেখিয়ে তথ্য বের করার চেষ্টা করা যাবে না; সংবাদে সবসময়ই একাধিক সোর্স থেকে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করতে হবে ইত্যাদি। সাংবাদিকের স্বাধীনতা মানে যা-খুশি তা বলা-দেখানো-প্রচার করা নয়; ভুলে গেলে ভুল হবে যে, ‘ফ্রিডম ইজ নাথিং উইদাউট রেসপনসিবিলিটি’।

 

টাচ অ্যান্ড গো : একেকটি সংবাদপত্রে সংখ্যার হিসাবে অনেক বেশি সংখ্যক ‘নিউজ ইভেন্ট’ কভার করা হচ্ছে; ফলে কোনো সংবাদেরই গভীরে যাওয়ার সুযোগ থাকছে না; এক ধরনের ‘টাচ অ্যান্ড গো’ ধরনের সংবাদ পরিবেশন করেই সংবাদপত্রগুলো দায়সারাভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করছে। কিছু সেমিনার, কতক কনফারেন্স, কিছু সড়ক দুর্ঘটনা, মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর দৌড়ঝাঁপ, দু-তিনটি মানববন্ধন, আওয়ামী লীগ-বিএনপির পাল্টাপাল্টি কথার বস্ত্রহরণ- এসব নিয়েই সংবাদের দিনরাত্রী। রাষ্ট্রকে নাড়িয়ে দেওয়ার মতো, ক্ষমতাবান রাজনীতিবিদ-ব্যবসায়ী-করপোরেটদের চ্যালেঞ্জ করে চমকে ওঠার মতো কোনো রিপোর্ট নেই; যা জানি তাকেই হেভি মেকআপ দিয়ে পরিবেশন করা হচ্ছে। ফি-দিন সংবাদপত্রগুলোয় হিমশৈলীর ওপর দৃশ্যমান বারো ভাগের এক ভাগই কেবল আমাদের দেখানো হচ্ছে, কিন্তু আমরা যারা আইসবার্গের নিচের বারো ভাগের এগারো ভাগ অর্থাৎ নিচে লুকানো বড় অংশটা দেখতে চাই তাদের তথ্যক্ষুধা কিন্তু পূরণ হচ্ছে না একেবারেই। কোনো কাগজে কোনো ‘ক্রসফায়ার’ বা ‘এনকাউন্টার’ নিয়ে একটিও অনুসন্ধানী প্রতিবেদন এলো না? কেন মিডিয়া র‌্যাবের একপেশে বক্তব্যই দিনের দিন প্রকাশ করছে? সাগর-রুনির ঘটনা নিয়ে কেন ইন-ডেপথ রিপোর্ট হচ্ছে না? ইলিয়াসের গুম হয়ে যাওয়ার তথ্য কোথায়? তমা হত্যার কূলকিরানা তো জানা হলো না? কানাডার বেগমপাড়ায় কার কার নামে বাড়ি আছে? আমাদের অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা যে কত দুর্বল এসব উদাহরণ তারই প্রমাণ!

 

জটিল ইস্যুর সহজ ব্যাখ্যা : বিভিন্ন জটিল ইস্যুর ভালো ব্যাখ্যা সাধারণ পাঠক পাচ্ছে না; ভুলে গেলে ভুল হবে যে, শিক্ষাবঞ্চিত বা স্বল্পশিক্ষিত বিপুলসংখ্যক মানুষ, যাদের পক্ষে সংবাদপত্রের কঠিন ভাষা বোঝা সম্ভব না; তাদের জন্য অর্থনীতি, পাটের জিনোম গবেষণা বা ক্লাইমেট চেঞ্জের মতো জটিল আর টেকনিক্যাল বিষয়গুলো সহজ করে উপস্থাপনের দরকার আছে বৈকি।

বড় ঘটনা কাভারে অপ্রস্তুত সংবাদপত্র : বড় কোনো ঘটনা বা দুর্ঘটনা কাভারে আমাদের মিডিয়া এখনো ঠিক প্রস্তুত না; ঘটনার আকস্মিকতায় সাংবাদিকরা নিজেরাই বিহ্বল হয়ে পড়েন, খেই হারিয়ে ফেলেন এবং দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে ব্যর্থ হন। এর বড় উদাহরণ বিডিআরের ঘটনা। শুরু থেকেই একপেশে খবর পরিবেশন করায় খবরের বস্তুনিষ্ঠতা ক্ষুণœ হয়েছে, পরে অন্য পক্ষের তথ্য জানার পরে আগে প্রকাশিত খবরের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছে। কিছু সংবাদ ছিল ‘উসকানিমূলক’ যা ঘটনাকে বরং আরও বাজে ও করুণ দিকে নিয়ে গেছে। এক ধরনের হুজুগে সাংবাদিকতার নমুনা সে সময় আমরা খেয়াল করেছি। অধিকন্তু বিডিআরের ঘটনায় বীভৎস ও বিকৃত লাশের ক্লোজ ছবি যেভাবে প্রকাশ করা হয়েছে তাও সাংবাদিকতার নৈতিকতার মানদন্ডে উত্তীর্ণ নয়। সাগর-রুনির ঘটনাতেও কিছু কাগজ সূত্র উল্লেখ না করে বিভিন্ন বানোয়াট ও মিথ্যা তথ্য পরিবেশন করে বাড়তি সেনসেশন তৈরি করতে চেয়েছে, শিশু মেঘকে যেভাবে সংবাদপত্রে তুলে ধরা হয়েছে তাতে সাংবাদিকতার নীতিমালায় ‘সিরিয়াস এথিক্যাল ব্রিচ’ হয়েছে।

উপেক্ষিত গ্রাম আধেয় ও প্রযুক্তি দুভাবেই : কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে সংবাদপত্রে গ্রাম, গ্রামীণ জীবন, গ্রামীণ খেটে খাওয়া মানুষের সংগ্রাম, তাদের উদ্ভাবনী ক্ষমতা কিংবা তাদের প্রতিভা ও সৃজনশীলতা অনুপস্থিত। সাধারণ, প্রান্তিক, গ্রামীণ মানুষ সংবাদের কেন্দ্রে আসতে পারছেন না; ঢাকার বাইরের জেলাগুলো বা গ্রামসমূহের সংবাদ পরিবেশনে প্রযুক্তিগত দুর্বলতাও লক্ষণীয়। আধেয়ের বিচারে তারা যেমন অবহেলিত, ছবির কোয়ালিটিতেও একই কথা প্রযোজ্য।

লোগো ছাড়া পত্রিকা চেনা মুশকিল : সংবাদ পরিবেশনে বিষয়বৈচিত্র্য এসেছে ঠিকই কিন্তু দু-একটি ব্যতিক্রম বাদ দিলে সব কাগজ বিষয় বা পরিবেশন শৈলী মোটামুটি একইরকম। এক কাগজ থেকে আরেকটিকে ঠিক আলাদা করা যায় না। কেউ কেউ বলেন পত্রিকার নামফলক আর লোগো ফেলে দিলে কোনটি কোন কাগজ পাঠকের পক্ষে তা শনাক্ত করাও শক্ত।

পৌনঃপুনিকতা আর পুনরাবৃত্তিতে ভরা : পৌনঃপুনিকতা আর পুনরাবৃত্তিতে ভরা থাকে সংবাদগুলো; অথচ একটু সৃজনশীল পথে হাঁটলে, একই সংবাদের বিভিন্ন অ্যাঙ্গেল বা ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিশেষজ্ঞের মতামত ও ব্যাখ্যা জুড়ে দিয়ে একই সংবাদে নতুনত্ব ও বাড়তি তাৎপর্য যোগ করা সম্ভব।

মুখচেনা কতিপয় কর্তৃপক্ষ : মোটা দাগে আমাদের সংবাদপত্র এলিট অভিমুখীন, ধনিক অভিমুখীন, শহর ও পুরুষ অভিমুখীন; দিনের পর দিন ঢাকা শহরের দেড় থেকে দুশো মানুষই ঘুরেফিরে সব সংবাদের নির্মাতা, সোর্স বা অথরিটি হিসেবে উঠে আসছেন। নাটকের মুখচেনা অভিনেতা-অভিনেত্রীর মতো সংবাদেও কিছু রাজনীতিবিদ, কিছু আমলা আর সিভিল সোসাইটির কিছু মুখচেনা সদস্যই সংবাদের মুখ্য চরিত্র হয়ে উঠেছেন। মুখচেনা গবেষক, অর্থনীতিবিদ, এনজিও প্রতিনিধি কিংবা পরিবেশকর্মীর বাইরেও যে আরও অথরিটি আছেন সংবাদগুলো দেখলে তা বোঝার উপায় নেই; জেন্ডারের বিবেচনায় সংবাদে এক্সপার্ট অপিনিয়ন নেওয়ার বিষয়টিও যারপরনাই অসংবেদনশীল-যেখানে অথরিটি হিসেবে প্রায় সবক্ষেত্রেই পুরুষকে বেছে নেওয়া হচ্ছে। দেশে যে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ, আইটি বিশেষজ্ঞ বা জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ হিসেবে অনেক নারী আছেন সংবাদ, মতামত বা কলাম দেখলে তা বোঝার উপায় নেই।

 

ফলোআপ উধাও : সংবাদের আরেকটি বড় দুর্বলতা সংবাদের ফলোআপ না থাকা। একটি বড় ঘটনা অন্য ঘটনাকে ‘আউটসাইন’ করে দেবে এটাই স্বাভাবিক; কিন্তু সেসব ঘটনার ফলোআপ পাঠককে জানাতে হবে। ঘটনাকে দু-একবার তুলে এনে পরে ছেড়ে দিলে চলবে না; ঘটনার শেষ পর্যন্ত ঘটনার পেছনে লেগে থাকতে হবে। ‘বনখেকো ওসমান গনী’ নিয়ে একসময় এত তোলপাড় হয়েছে, এখন তার কী অবস্থা, মামলার অগ্রগতি কী হলো? কোনো ফলোআপ নেই। বলা হলো মাগুরছড়ায় পাঁচ হাজার কোটি টাকার পরিবেশগত ক্ষতি হয়েছে; এত হাজার কোটি টাকার যে ক্ষতি সেখানকার পরিবেশ এখন কেমন? জীববৈচিত্র্য বা বৃক্ষরাজির কী অবস্থা? জনস্বাস্থ্যের ওপর কোনো প্রভাব এখনো আছে কিনা? এত বছর হয়ে গেল, আমাদের সাংবাদিকতা এ বিষয়ে একেবারে নিশ্চুপ।

বেতন কম বাইলাইন বেশি : সাধারণত এক্সক্লুসিভ সংবাদে বাইলাইন ট্রিটমেন্ট দেওয়ার নিয়ম-যেখানে রিপোর্টারের নাম থাকে; সংবাদপত্রের বাইলাইন স্টোরি তৈরিতে রিপোর্টারের মেধা, শ্রম, নতুনত্বের স্বীকৃতি হিসেবে রিপোর্টে তার নাম দেওয়া হয়; কিন্তু অনেক কাগজের অপব্যবহার করে থাকে; সাদামাটা বা কম গুরুত্বপূর্ণ সংবাদের ক্ষেত্রেও বাইলাইন ব্যবহার করে থাকে। কিছু সংবাদপত্রে যেমন বেতন-ভাতা ঠিকমতো না দিয়ে বলে ‘কার্ড তো দিয়েই দিয়েছি, এবার করে খাওয়ার দায়িত্ব তোমার’, জানতে ইচ্ছে করে কিছু কাগজ বাইলাইনকেও এই অর্থে ব্যবহার করছে কিনা? পর্যবেক্ষণ বলে, যেসব কাগজ বেতন-ভাতা কম সেখানে বাইলাইন বেশি; অনেক কাগজ বাইলাইন দেওয়ার ক্ষেত্রে পেশাগত উৎকর্ষের চাইতে ব্যক্তিগত সম্পর্কও ভূমিকা রাখে বলে প্রতীতি জন্মে। কেউ কেউ একে ‘মেন্টাল সাবসিডি’ বা ‘খ্যাতি-ভর্তুকি’ হিসেবেও চিহ্নিত করে থাকেন।

ভাষা ও ব্যাকরণ : ভাষা ও শব্দ-বাক্যের ব্যবহারে দুর্বলতা লক্ষণীয়। সংবাদপত্রে এর প্রয়োজন অনপনেয়। একটি ভালো রিপোর্ট ভুল বানান ও দুর্বল শব্দগাঁথুনির কারণে তার বিশ্বাসযোগ্যতা হারাতে পারে। পাশাপাশি জেন্ডার অসংবেদনশীল শব্দ ব্যবহারে সংবাদপত্রকে সতর্ক থাকতে হবে।

 

সৌজন্য সংবাদ : পাঠকের দিক থেকে সংবাদে বিজ্ঞাপনের আধিক্য আরেকটি পুরনো অভিযোগ; শিরোনাম, বিভিন্ন সেগমেন্ট, বিভিন্ন সংবাদও এখন বিক্রি হয়ে যাচ্ছে পণ্যের বিজ্ঞাপনের কাছে। পণ্যায়নের এই যুগে সব সংবাদই হয়ে যাচ্ছে সৌজন্য সংবাদ; এখন খবরের ফাঁকে ফাঁকে সংবাদ নয় বরং বিজ্ঞাপনের মাঝে মাঝে কিছু সংবাদ যেন ঝুলে থাকে স্পাইডারম্যানের মতো। বিজ্ঞাপনই সংবাদপত্রের পৃষ্ঠাসজ্জাকে বদলে দিচ্ছে।

সংবাদপত্রের মালিকানা-কাঠামো : সংবাদ পরিবেশনের বিষয়টি কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়; এর সঙ্গে গণমাধ্যমের মালিকানা-কাঠামো, মালিকের ব্যবসায়িক, রাজনৈতিক ও করপোরেট স্বার্থ, রাজনৈতিক বিবেচনায় কাগজের লাইসেন্স প্রাপ্তি, মিডিয়ার পলিটিক্যাল ইকোনমি, বিজ্ঞাপনদাতাদের চাপ ও স্বার্থরক্ষা, সোর্সের সঙ্গে অপেশাদারি সম্পর্কে জড়িয়ে যাওয়া, ক্ষমতাবানদের হুমকি-ধমকি-চাপ, সাংবাদিকদের জীবন-জীবিকার নিরাপত্তা, হামলা-মামলা, দ্রুত এক কাগজ থেকে অন্য কাগজ বা চ্যানেলে ‘হিজরতজনিত অস্থিরতা’, আন্তমিডিয়া কাদা ছোড়াছুড়ি, সেল্ফ-সেন্সরশিপ, সাংবাদিকদের নিজস্ব রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বিশ্বাসের বিষয়টিও যুক্ত; কখনো পরোক্ষ কখনো বা প্রত্যক্ষভাবে এসব বিষয় একটি কাগজের সংবাদ পরিবেশনের ঝোঁক, প্রবণতা ও গুণগত মানকে প্রভাবিত করে।

গবেষণা ও মূল্যায়ন নেই : সংবাদ পরিবেশনের দুর্বলতার একটি বড় কারণ বেশির ভাগ সংবাদপত্রে সংবাদভিত্তিক রিসার্চ বা ইভালুয়েশন বিভাগ নেই। গণমাধ্যম রাষ্ট্র ও সমাজের বিবিধ ঘটনা ‘পর্যবেক্ষণ’ করে। পর্যবেক্ষণ করে রাষ্ট্রের রাজনীতি, অর্থনীতি আর সাহিত্য-সংস্কৃতির গতিপ্রকৃতি। তাদের পর্যবেক্ষণলব্ধ লেখা আর পরিবেশিত শব্দ/ইমেজ থেকেই নির্মিত হয় নিত্যদিনের ইতিহাস; মিডিয়া সবাইকে চোখে চোখে রাখে ঠিক, কিন্তু মিডিয়াকে পর্যবেক্ষণ করবে কে? প্রতিদিন সময়ের সঙ্গে সাংবাদিকদের যুদ্ধ করতে হয়। ফলে যে সাত তাড়াতাড়ির মধ্যে তারা কাজ করেন, সেখানে থেকে যায় ভুলচুক-বিভ্রান্তি আর একপেশে পর্যবেক্ষণ। এ ধারণা থেকেই সাংবাদিকতায় ‘ওয়াচারদের ওয়াচ’ করার বিষয়টি আজ প্রতিষ্ঠিত যেখানে সাংবাদিকদের প্রতিদিনকার দেখার বাইরে গিয়ে আরেকটি দল তাদের দেখা-লেখা-পরিবেশন কৌশলের যৌক্তিকতা নিয়ে নিয়মিত গবেষণা করেন। বলা যায় মিডিয়ায় এরা ‘থার্ড আই’ হিসেবে কাজ করেন, কাজ করেন ‘প্রফেশনাল পর্যবেক্ষক’ হিসেবে। গুণগত মান, সাংস্কৃতিক রুচি আর দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা চর্চার জন্য মিডিয়ায় অন্যান্য বিভাগের মতো স্থায়ী গবেষণা সেল বা বিভাগ থাকা তাই জরুরি; প্রতিদিনের প্রচারিত সংবাদ সম্পর্কে মূল্যায়ন প্রতিবেদন তৈরি করা এ বিভাগের মূল লক্ষ্য। নিজের কাগজের ভালো, বিশেষত্ব, ভুল, দেশ-বিদেশের অন্য কাগজ বা টিভির সঙ্গে নিজের মিডিয়ার নিয়মিত মূল্যায়ন পেশাগত উৎকর্ষের জন্য খুবই জরুরি। কিন্তু বাংলাদেশের কয়টি কাগজে এরকম গবেষণা বা মূল্যায়ন সেল আছে প্রশ্ন রইল?

প্রশিক্ষণ সেল : সংবাদ পরিবেশনে আরও পেশাদারিত্ব অর্জনের আরেকটি সমস্যা বেশির ভাগ কাগজে সংবাদভিত্তিক প্রশিক্ষণ সেল নেই। নবীন সাংবাদিকদের উপযোগী করে তোলা, অভিজ্ঞদের জ্ঞান নতুনদের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে নিরন্তর কাজ করার জন্য প্রত্যেক কাগজেই ছোট বা বড় হোক নিজস্ব প্রশিক্ষণ সেল থাকা জরুরি। কেন্দ্র কিংবা স্থানীয় পর্যায়ের প্রতিনিধিদের সাংবাদিকতার কলাকৌশল, নৈতিকতা, অনুসন্ধান কৌশল, আইনি বিষয়ে সচেতন করা এর উদ্দেশ্য। ইন-হাউস সাংবাদিকদের জন্য সাংবাদিকতার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ/বিতর্কিত/চলতি বিষয়ে আলোচনার আয়োজন করা ও তাদের সামনে বিশ্ব সাংবাদিকতার হালনাগাদ ডিসকোর্স তুলে ধরার লক্ষ্যে নিত্যনতুন পরিকল্পনা তৈরি করা ও তার বাস্তবায়নে উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। বিভিন্ন টেকনিক্যাল ইস্যু যেমন ক্লাইমেট চেঞ্জ বা পাটের জিনোম গবেষণার মতো বিষয়কে কীভাবে আরও সহজে পাঠকের কাছে হৃদয়ঙ্গম করানো যায় সে লক্ষ্যে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা জরুরি। প্রশিক্ষণের কাজে সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আরও প্রো-অ্যাকটিভ ভূমিকা রাখা দরকার।

কোড অব এথিকস : সংবাদপত্রের জন্য প্রেস কাউন্সিল একটি কোড অব এথিকস তৈরি করেছে; প্রতিটি সংবাদপত্রের নিজেদের সাংবাদিকদের জন্য কোড এথিকস বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশিক্ষিত করতে পারে। নৈতিকতা, দায়িত্বশীলতা ও স্বাস্থ্যকর কর্মপরিবেশ নির্মাণের জন্য পৃথিবীর অনেক দেশেই মিডিয়াগুলো অমবুডসপারসন বা ন্যায়পাল নিয়োগ করে থাকে। বাংলাদশেও এর চর্চা শুরু করা জরুরি।

শেষে বলব বাংলাদেশের সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতা দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে বর্তমান পর্যায়টি অতিক্রম করছে এবং জনগণের কাছে বিশ্বস্ত ও গ্রহণযোগ্য মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হয়ে উঠেছে। তবে নৈতিকতা, বস্তনিষ্ঠতা, গুণগত মান অর্জন ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার পথে এ দেশের সাংবাদিকতাকে আরও অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে; এটি করতে হবে উন্নয়নের জন্য, মানুষের জীবনমান পাল্টে দেওয়ার জন্য, করতে হবে গণতন্ত্রকে সতেজ, টাটকা আর ফুরফুরে রাখার জন্য।

 


আপনার মন্তব্য