শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১৯ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৮ মার্চ, ২০১৯ ২৩:৪২

রাজধানীর লেভেলক্রসিংয়ে মৃত্যুঝুঁকি

জয়শ্রী ভাদুড়ী

রাজধানীর লেভেলক্রসিংয়ে মৃত্যুঝুঁকি
অরক্ষিত লেভেলক্রসিংয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পারাপার হচ্ছে মানুষ। রাজধানীর মগবাজার থেকে তোলা ছবি -রোহেত রাজীব

অসুস্থ স্ত্রীকে চিকিৎসার জন্য কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করেছিলেন লুৎফর রহমান। গত ১৪ ফেব্রুয়ারি রাতে হাসপাতাল থেকে জোয়ার সাহারা বাজার এলাকায় ভাইয়ের বাসায় যাচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু অসচেতনভাবে রেললাইন পার হতে গিয়ে ট্রেনে কাটা পড়ে মারা যান তিনি। প্রায়ই এমন দুর্ঘটনায় প্রাণ দিচ্ছেন সাধারণ পথচারী। যাতায়াতের জন্য নিরাপদ হলেও সাধারণ পথচারীর কাছে রেলপথের লেভেলক্রসিং ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। বিশেষ করে রাজধানীতে রেলকেন্দ্রিক মৃত্যুর হার বেড়েই চলেছে। রেলওয়ে পুলিশের তথ্য মতে, গত পাঁচ বছরে রাজধানীতে ট্রেনের নিচে কাটা পড়ে ও ট্রেন দুর্ঘটনায় পাঁচ শতাধিক মৃত্যু হয়েছে। চলতি বছর সারা দেশে প্রথম ছয় মাসেই ট্রেনে কাটা পড়ে ও দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ৪৬৬ জন, যার মধ্যে রাজধানীতে মারা গেছেন ৭৩ জন। ২০১৭ সালে সারা দেশে ট্রেনে কাটা পড়ে এক হাজার ১০০ লোকের মৃত্যু হয়েছে। জানা যায়, ট্রেনে কাটা পড়ার জন্য কমলাপুর স্টেশন থেকে টঙ্গী পর্যন্ত ঢাকা অংশকে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটছে কানে হেডফোন লাগিয়ে এবং অসতর্ক অবস্থায় দ্রুত ক্রসিং পার হতে গিয়ে। সরেজমিন বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, গেন্ডারিয়ার ঘুমটিঘর থেকে শুরু করে জুরাইন রেলক্রসিং পর্যন্ত রেল সড়কের দুই পাশে প্রতিদিনই বসছে নানা পণ্যের দোকান। সকাল-বিকাল বসছে কাঁচাবাজার। ট্রেনের হুইসেল শুনলেই তড়িঘড়ি করে মালামাল সরিয়ে ফেলছে দোকানিরা। ট্রেন চলে গেলে আবারও আগের অবস্থা। একেবারে লাইন ঘেঁষে সারিবদ্ধ দোকান। কাঁচামালের টুকরি থরে থরে সাজানো। রেললাইনের পাশ ধরে পথচারীরা হেঁটে যাবেন সে স্থানটুকুও নেই। কখন হঠাৎ ট্রেন এলে বিপদে পড়তে হয় পথচারীদের। কোন দিকে যাবেন, কোন দিক দিয়ে গেলে নিরাপদ থাকবেন তা ঠিক করতে হুড়োহুড়ি শুরু হয়ে যায়। এতে কখনো কখনো ঘটে যায় দুর্ঘটনা। রাজধানীর বুক চিরে এগিয়ে চলা রেললাইনের পাশে অনেক স্থানেই এ অবস্থা। খিলগাঁও রেলগেট বাজারটি দিনভর জমজমাট থাকে। এখানে মাছ-মাংসসহ সব পণ্যই মিলছে। স্থানীয়রা বলেন, রেলগেট বাজারটিতে মালামালের দাম কিছুটা কম। সে কারণে দূর-দূরান্ত থেকেও মানুষ এ বাজারে আসে। টঙ্গী, উত্তরখান, কসাইবাড়ি, বিমানবন্দর, খিলক্ষেত, কুড়িল বিশ্বরোড, মহাখালী, নাখালপাড়া, তেজকুনিপাড়া, তেজগাঁও, কারওয়ান বাজার, মগবাজার, গোপীবাগ, টিটিপাড়া, জুরাইনসহ বেশ কিছু এলাকায় রেললাইনের পাশে গড়ে ওঠা অর্ধশতাধিক বাজার বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। এসব বাজারের কারণে ট্রেন চালককে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। ট্রেন চালক মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, কমলাপুর থেকে টঙ্গী পর্যন্ত অংশে আমরা ট্রেনের গতি বাড়াতে পারি না। অনেক দূর থেকে হুইসেল দিলেও পথচারীরা সরে দাঁড়ান না। ট্রেন কাছাকাছি চলে আসলে কিছুক্ষণ অপেক্ষা না করে দৌড় দেয়। জনগণের অসচেতনতায় আমাদের চোখের সামনে ঘটে যায় দুর্ঘটনা। বাংলাদেশ রেলওয়ের ট্রাফিক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানী ঢাকার গেন্ডারিয়া এলাকা থেকে টঙ্গী রেলস্টেশন পর্যন্ত মোট ৩১টি বৈধ লেভেলক্রসিং রয়েছে। প্রতিদিন আন্তঃনগরের বিভিন্ন রুটের ৫১টি ট্রেন ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশনে আসে। ট্রেন চলাচলের কারণে সারা দিন ১০২ বার প্রতিটি লেভেলক্রসিংয়ের প্রতিবন্ধকগুলো ফেলা হয়। প্রতিবার গড়ে তিন মিনিট করে লেভেলক্রসিং বন্ধ রাখা হয়। সেই হিসাবে একটি লেভেলক্রসিংয়ের ওপর দিয়ে প্রতিদিন ৩০৬ মিনিট বা পাঁচ ঘণ্টা ছয় মিনিট যান চলাচল বন্ধ থাকে। কোনো দিন সাত থেকে আট ঘণ্টা পর্যন্ত প্রতিটি লেভেলক্রসিংয়ের বার ফেলে রাখা হয়। এতে একদিকে বাড়ছে তীব্র যানজট, অন্যদিকে পথচারীরা ক্রসিং না মেনেই চলছে পথ। ফলে দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে পথচারীরা। দুর্ঘটনার বিষয়ে নগর বিশ্লেষক মোবাশ্বের হোসেন বলেন, ‘ক্রসিংয়ে দুর্ঘটনার কয়েকটি কারণের মধ্যে রয়েছে রেললাইন ধরে অসতর্কভাবে হাঁটা, কানে হেডফোন লাগিয়ে রেললাইনের পাশ দিয়ে যাতায়াত করা, তাড়াহুড়ো করে লেভেলক্রসিং পার হওয়া এবং চলন্ত ট্রেনের সঙ্গে সেলফি তোলা। দুর্ঘটনা বন্ধ করতে জনগণের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোকে সচেতন হতে হবে।


আপনার মন্তব্য