Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : শুক্রবার, ১৯ মে, ২০১৭ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ১৮ মে, ২০১৭ ২২:০৬
সুর সংগীত সম্রাজ্ঞী
সুর সংগীত সম্রাজ্ঞী

উপমহাদেশের খ্যাতিমান সংগীতশিল্পী, সংগীত পরিচালক ফেরদৌসী রহমান (জন্ম ২৮ জুন ১৯৪১)। তার সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে তৎকালীন পাকিস্তান টেলিভিশনের (বর্তমান বিটিভি) উদ্বোধন হয়। এ দেশের চলচ্চিত্রে তিনি প্রথম নারী সংগীত পরিচালক। সংগীতে অবদানের জন্য তিনি রাষ্ট্রীয় সম্মান স্বাধীনতা পদক, একুশে পদক, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ একাধিক সম্মাননা লাভ করেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন—শেখ মেহেদী হাসান

 

আপনার জন্ম কোচবিহারে। খুব ছোটবেলায় আপনি গান শিখতে শুরু করেছিলেন।

আমার জন্ম ২৮ জুন ১৯৪১ কোচবিহারে। আমার আব্বা শিল্পী আব্বাস উদ্দিন আহমদ। সংগীত-পরিবারের সদস্য হিসেবে আমি ছোটবেলায় আব্বার কাছে গানের তালিম নিতে শুরু করি। কথা বলার আগে থেকে গান গাওয়া শুরু করেছি। মা সারাক্ষণ গুন গুন করতেন, বাড়িতে গ্রামোফোন বাজত। শুনে শুনে মাথার মধ্যে সুর ঢুকে গিয়েছিল। তবে শিল্পী হওয়ার কোনো স্বপ্ন আমার ছিল না। আব্বা কলকাতা থাকতেন, আমরা কোচবিহারে। বাড়ি এলে আব্বার কাছে শিখতাম। বেশির ভাগই আব্বার নামকরা গান শেখা এবং গাওয়া হতো—‘তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে’, ‘ত্রিভুবনের প্রিয় মুহাম্মদ’ ইত্যাদি। কলকাতায় যাওয়ার পর ওস্তাদ কাদের জামেরি, ওস্তাদ ইউসুফ খান কোরাইশীর কাছে গান শিখি। তারও আগে হাতেখড়ি হয় শ্রদ্ধেয় শিল্পী সোহরাব হোসেনের কাছে।

 

ঢাকায় চলে আসলেন কখন?

১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর আমরা সপরিবারে ঢাকায় চলে আসি। তখন আমার বয়স ছয় বছর। আব্বা নারিন্দায় একটি বাসা ভাড়া করেছিলেন। তারপর ভিক্টোরিয়া পার্কের পাতলা খান গলিতে থাকতাম।

 

আপনার পড়াশোনা তো ঢাকায়?

ঢাকায় এসে পুরান ঢাকার কনভেন্ট স্কুলে ভর্তি হলাম। ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা দেওয়ার পাঁচ মাস আগে বাংলাবাজার স্কুলে ভর্তি হই। ঢাকা বোর্ডে সপ্তম স্ট্যান্ড করলাম। ইন্টারমিডিয়েটেও ১২তম স্ট্যান্ড করলাম ইডেন গার্লস কলেজ থেকে। এগুলো সবই আব্বার কৃতিত্ব। কারণ আব্বা পড়াশোনাটা খুব ভালোবাসতেন, তেমনি গানকেও। সব সময় বলতেন, ‘পড়াশোনা করো মা গো, গান করো মা গো।’ আব্বার কাছে কখনো বকুনি শুনিনি। আব্বা ওয়াজ মাই বেস্ট ফ্রেন্ড। সাংঘাতিক ভালো বন্ধু ছিলেন।

তার কাছ থেকে উৎসাহ, অনুপ্রেরণা, ভালোবাসা, আদর, বন্ধুত্ব পেয়েছি। পরবর্তীকালে মায়ের কাছে পেয়েছি। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজ বিজ্ঞানে যথাক্রমে ১৯৬১ ও ’৬২ সালে স্নাতক সম্মান ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করি। ১৯৬৩ সালে ইউনেস্কো থেকে সংগীত নিয়ে একটি ফেলোশিপ পেয়েছিলাম ছয় মাসের, তখন ট্রিনিটি কলেজ অব মিউজিক লন্ডনে পড়তে যাই।

 

আপনি তো খুব অল্প বয়সে রেডিওতে গান করতেন?

সাত বছর বয়সে রেডিওতে ‘খেলাঘর’ নামের একটা অনুষ্ঠানে গান পরিবেশন করি। সম্ভবত ১৯৪৮ সাল। রেডিওতে তখন রবীন্দ্রসংগীতই হতো। তখন আমি রবীন্দ্রসংগীত গাইতাম পরে তো আধুনিক, নজরুল ও রাগপ্রধান গান গাওয়া শুরু করি।  তারপর তো আস্তে আস্তে বড় হলাম। বড়দের অনুষ্ঠানে গাওয়া শুরু করলাম। বেশির ভাগ উচ্চাঙ্গসংগীতই গাইতাম। আস্তে আস্তে আধুনিক গান শুরু করলাম আবদুল আহাদ, সমর দাসের সুরে। নজরুলগীতি, ভাওয়াইয়া, ভাটিয়ালিও গাইতে শুরু করলাম। যেগুলো তখন আমি বেশি ভালো করে শিখিনি। কারণ আব্বা সেগুলোর ওপর অত জোর দিতেন না। জোর দিতেন উচ্চাঙ্গের ওপর। উচ্চাঙ্গসংগীত হচ্ছে সব গানের ভিত্তি। ১৯৫৬ সালে প্রথমবারের মতো বড়দের অনুষ্ঠানে গান করি। এইচএমভি করাচি থেকে আমার প্রথম রেকর্ড বের হয় ১৯৫৭ সালে।

 

আপনি তো চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক করেছিলেন?

প্রথমে আমার আগ্রহ ছিল না। তারপর সবার চাপাচাপিতে সিনেমায় প্লেব্যাক করি, তখন আমার বয়স মাত্র আঠার। চলচ্চিত্র ছিল ‘আসিয়া’, পরিচালক ছিল ফতেহ লোহানী। চলচ্চিত্রটি ১৯৬০ সালে মুক্তি পায়। এই ছবির আগে ‘এ দেশ তোমার আমার’ ছবিতে প্লেব্যাক করেছিলাম। বাংলা এবং উর্দু অনেক জনপ্রিয় সিনেমায় আমি গান গেয়েছি। ‘যে জন প্রেমের ভাব জানে না’, ‘যার ছায়া পড়েছে মনের আয়নাতে’, ‘প্রাণ সখিরে, ঐ শোন কদম্ব্বতলে বংশী বাজায় কে’, ‘পদ্মার ঢেউরে মোর শূন্য হৃদয় পদ্মা নিয়ে যা যারে’ এসব গান বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল।

 

বাংলা চলচ্চিত্রের আপনিই প্রথম নারী, যিনি সংগীত পরিচালনা করেছিলেন?

১৯৬০ সালে রবীন ঘোষের সঙ্গে সংগীত পরিচালনা করেছিলাম ‘রাজধানীর বুকে’ চলচ্চিত্রে। আমিই প্রথম নারী হিসেবে বাংলা চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালনা করি। তখন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি মাত্র। আজিজুর রহমান সাহেব গানগুলো লিখেছিলেন। আমি আর রবীন বাড়িতে বসে বসে সুর করতাম। গানগুলো ভালো হয়েছিল। একটা গান তো আমার এখনো খুব ভালো লাগে—‘এই সুন্দর পৃথিবীতে আমি এসেছিনু কিছু নিতে।’ দেখলাম গানগুলো খুব জনপ্রিয় হলো। তখন মোটে এফডিসি হয়েছে। স্টুডিওর কোনো কিছু ঠিক নেই। তারপরও সেই গানের সঙ্গে পিয়ানো বাজালেন তখনকার দিনের খুব নামকরা সংগীত পরিচালক মোসলেহ উদ্দীন। একক কাজ করতে হলো ‘মেঘের অনেক রঙ’—এর জন্য, স্বাধীনতার ঠিক পরপরই। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র ছিল। খুব মজার ছিল—কোনো গান ছিল না, শুধু মিউজিক ছিল, মিউজিকই প্রধান। একা একা ছবি দেখতাম আর চিন্তা করতাম, এখানে এই মিউজিকটা লাগাব, এখানে এটা লাগাব। কিন্তু এটা ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড পেয়ে যাবে ভাবনার বাইরে ছিল। হ্যাঁ, সংগীত পরিচালনার জন্য। এর পরেও ছবিতে কাজ করেছি। ‘নোলক’ নামে একটি ছবি করেছি। ওখানে ভাওয়াইয়া গান ছিল। আরেকটা ছবিতে কাজ করেছিলাম ‘গাড়িয়াল ভাই’। ছবিটা পরে রিলিজ হয়নি।

 

আপনি প্রচুর স্টেজ শোতে গান করেছেন?

রেডিওতে গান করতে করতে স্টেজে গাওয়া। প্রথম স্টেজ শোর কথাই মনে আছে। ছয় বছর বয়সে আব্বার সঙ্গে মুসলিম ইনস্টিটিউট হলে গিয়ে করেছিলাম। এত ছোট ছিলাম, মাইক্রোফোন ধরতে পারছিলাম না। আব্বা পাশে হারমোনিয়াম বাজাচ্ছিলেন। উইংসের পাশ থেকে কে যেন একটি টেবিল এনে টেবিলের ওপর দাঁড় করিয়ে দিল। মাইক্রোফোন ধরতে পারলাম। গেয়েছিলাম ‘শুধু কাঙালের মতো চেয়েছিনু তার মালাখানি’। বড়দের গান। গানের শেষে এত তালি পড়েছিল, তখন ছোট্ট আমি বুঝতে পারলাম গানটা খুব ভালো হয়েছিল। কেবল ঢাকায় নয়, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, রাজশাহী যেতাম। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গানের অনুষ্ঠান হতো। জামালপুর, নেত্রকোনা বহু জায়গায় গান করেছি। কমপিটিশনগুলোতে পার্টিসিপেট করেছি। পশ্চিম পাকিস্তানে গাইলাম। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে গিয়ে গান করেছি, বিভিন্ন ভাষায় গান করেছি।

টেলিভিশনের প্রথম অনুষ্ঠান প্রচার হয়েছিল আপনার গাওয়া গান দিয়ে।

টেলিভিশনের প্রথম শিল্পী ছিলাম। সেটাও বলতে গেলে প্ল্যান করে কিছু ছিল না। হঠাৎ করেই হয়েছে। আমাকে হঠাৎ করেই গাইতে বলা হলো। কিছু না ভেবেই বললাম, হ্যাঁ, গাইব। গাইলাম এবং দেখা গেল, সেটা ঐতিহাসিক ব্যাপার হয়ে গেল। গেয়েছিলাম ‘ওই যে আকাশ নীল হলো আজ’। এর রচয়িতা ছিলেন, আবু হেনা মোস্তফা কামাল, সুরকার আনোয়ার উদ্দীন খান। পরে গেয়েছি বিবিসি টেলিভিশনে। আমার আসলে কখনো গান গাইতে ভয় লাগত না। নার্ভাস শিল্পী কখনো ছিলাম না। একটা ব্যাপার হচ্ছে, স্টেজে যখন গাইতাম, তখন বেশি ইন্সপায়ার্ড হতাম। অল্প, হাতেগোনা কয়েকটি দর্শক থাকলে গান গাইতে বিরক্ত লাগত। যত লোক বেশি হতো, আমার তত ভালো লাগত গাইতে।

 

পুরানা পল্টনের আপনাদের বিখ্যাত বাড়ি ‘হীরামন মঞ্জিল’-এর গল্প শুনতে চাই।

পুরানা পল্টনে হীরামন মঞ্জিল ছিল বিখ্যাত। আমাদের বাড়ির পাশে থাকতেন কবি বুদ্ধদেব বসু। এই পুরানা পল্টন গত শতকের পঞ্চাশ বা ষাট দশকে সংস্কৃতির কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছিল। আব্বাকে কেন্দ্র করে আমাদের বাড়িতে বিরাট আড্ডা বসত। নিয়মিত সংগীতের আসর বসত। কবি জসীম উদ্দীন, কবি গোলাম মোস্তফা, মুহম্মদ মুনসুর উদ্দিন, কবি আজিজুর রহমান, কবি সাঈদ সিদ্দিকী, কবি আশরাফ সিদ্দিকী, কবি সুফিয়া কামালসহ বহু খ্যাতিমান মানুষ আমাদের বাড়িতে আসতেন। গানের আসরে সোহরাব হোসেন, আবদুল লতিফ, আবদুল আলিমসহ অনেকেই গান করতেন। কেউ একজন এলে আব্বা মহাখুশি হয়ে হতেন আর আমার মা ছিলেন অতিথি আপ্যায়নে পটু, তিনি অতিথিদের জন্য নানা পদের রান্না করতেন। এটা শুধু পুরানা পল্টন নয়, ভিক্টোরিয়া পার্কের পাশে আমরা যখন থাকতাম, বলা চলে প্রায় প্রতি সন্ধ্যায়ই গানের আসর বসত আমাদের বাসায়।

 

আপনার আব্বার নামে ‘আব্বাস উদ্দিন একাডেমি’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। একাডেমির বর্তমান অবস্থা কী?

আব্বাস উদ্দিন একাডেমিটা শুরু করি ১৯৯২ সালে। এটা নিয়ে আমি ব্যস্ত। মাঝখানে অনেক ছাত্রছাত্রী হয়ে গিয়েছিল। আমার সুখ ওটা যে করতে পেরেছি জীবদ্দশায়, দুঃখের ব্যাপারটি হলো এটার জন্য আলাদা কোনো জায়গা করতে পারিনি। নিজের যদি একটা জায়গা হতো, তাহলে আব্বাস উদ্দিন সংগীত একাডেমির কলেবরটা বাড়ানো যেত।

 

আব্বাস উদ্দিনের সব গানের রেকর্ড কী সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়েছে।

শিল্পী আব্বাস উদ্দিনের গানের রেকর্ড প্রিজার্ব করার দায়িত্ব তো আমার একার নয়। এটা সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে হতে পারে। তার গাওয়া সব গানের সংকলন প্রকাশ হওয়া জরুরি। আসলে সংগীত আমাদের সাধনার সম্পদ।

 

টেলিভিশনে ‘এসো গান শিখি’ অনুষ্ঠানটি কীভাবে শুরু করেন?

শিল্পী কলিম শরাফী ছিল টেলিভিশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। তিনি আমাকে অনুরোধ করলেন শিশুদের গান শেখানোর একটি অনুষ্ঠান করতে হবে। তার অনুরোধ না করতে পারিনি। আমি নিজেও তখন শিখি, তারপরও শুরু করলাম ‘এসো গান শিখি’ অনুষ্ঠান। এটি আজও চলছে।

 

আপনার পরিবারের কথা জানতে চাই।

আমার পরিবার বাবা, মা, দুই ভাই; বড় ভাই বিচারপতি মোস্তফা কামাল, ছোট ভাই কণ্ঠশিল্পী ও গবেষক মুস্তাফা জামান আব্বাসী। আমার বিয়ে হয় ১৯৬৬ সালে, স্বামী রেজাউর রহমান মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। আমাদের দুই ছেলে রুবাইয়াত ও রাজিন। আর তিন নাতি বিয়াশা রহমান, রাহিল রহমান এবং রাফান রহমান। এবং ছোট ছেলের ঘরে দুই নাতনি তাসমিয়া ও নাবিবা। আমার দুটি ছেলে বাইরে। বড়টা ডালাসে, আর ছোটটা লন্ডনে। ওরা ওস্তাদের কাছে শিখেছে। কিন্তু তেমন করে আর গান করেনি। বিদেশে চাকরি, ফ্যামিলি নিয়ে ব্যস্ত।

 

আপনাকে ধন্যবাদ।

তোমাকেও ধন্যবাদ।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow