Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শনিবার, ৩ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : বুধবার, ৮ জুন, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ৭ জুন, ২০১৬ ২৩:৪৪
প্রস্তাবিত বাজেট ও কিছু ভাবনা
গোলাম মোহাম্মদ কাদের এমপি
প্রস্তাবিত বাজেট ও কিছু ভাবনা

২০১৬-২০১৭ অর্থবছরের ৩ লাখ ৪০ হাজার ৬০৫ কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেটটি উচ্চাভিলাষী ও অস্বচ্ছ। বাস্তবায়নযোগ্য নয় বলে অতীত অভিজ্ঞতা ও বিশেষজ্ঞদের মত। রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা গত বছরের চেয়ে শতকরা ৩৫ শতাংশ বেশি ধরা হয়েছে। অতীতে কখনো এত বেশি বৃদ্ধি আদায় সম্ভব হয়নি। এ বছর সম্ভব করার লক্ষ্যে যে উদ্যোগ গ্রহণ করার কথা বাজেটে উল্লেখ করা হয়েছে, তা বাস্তবসম্মত নয়। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা, ড. মীর্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যমে বাস্তবে অতীতে সবচেয়ে বেশি রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি হয়েছে শতকরা ২২%। সাম্প্রতিককালে বাৎসরিক বৃদ্ধি ৮ থেকে ১২ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ আছে। তার মতে রাজস্ব বোর্ডবহির্ভূত আয়ের বৃদ্ধির পরিমাণ একই ধরনের। তার সুস্পষ্ট অভিমত, বাজেটে প্রাক্কলিত রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব নয়।

নির্ধারিত বাজেট বাস্তবায়নযোগ্য না হলে পরবর্তীতে অনুমোদিত বাজেটের বাইরে অনেক কিছু অন্তর্ভুক্ত করতে বা বাদ দিতে হয়। আমাদের সংবিধান/আইনে এ ধরনের কার্যক্রমের সুযোগ আছে। যেহেতু পরবর্তীতে অনেক কিছুই পরিবর্তিত হতে পারে, সে কারণে এ ধরনের বাজেটের খাতওয়ারি বরাদ্দ নিয়ে বা কর প্রস্তাবসমূহ নিয়ে আলোচনা, যুক্তিতর্ক উপস্থাপন, দর কষাকষি বা সমঝোতা অর্থহীন হয়ে পড়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকে। সে অর্থে অবাস্তবায়নযোগ্য বাজেট সুন্দর কথার ফুলঝুরি হলেও তা প্রায়শ হয় অস্বচ্ছ ও ভিতরে শুভঙ্করের ফাঁকি থেকে যায়।

প্রায় ১ কোটি লাখ টাকার ঘাটতি বাজেট তার মধ্যে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা ব্যাংক ঋণ নিয়ে মেটানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। রাজস্ব আদায় ঘাটতি হলে আরও বেশি পরিমাণ ব্যাংক ঋণ নিয়ে ঘাটতি মেটানোর প্রয়োজন হতে পারে। বিনিয়োগকারী এবং ব্যবসায়ীদের অভিযোগ এতে করে ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকট দেখা দিতে পারে, যা ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাধা হিসেবে দেখা দিতে পারে।

রাজস্ব আদায় ঘাটতির কারণে উন্নয়ন ও অনুন্নয়ন ব্যয় হ্রাস করতে হতে পারে। অবশ্য উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দক্ষতার অভাবসহ অন্যান্য নানান কারণে বাস্তবায়ন লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ক্ষেত্রেই আশানুরূপ অর্জন হয় না। উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়ন না হওয়া বাজেট বাস্তবায়নের ঘাটতি। বাজেটের অন্য লক্ষ্যমাত্রাসমূহ অর্জনের এ ঘাটতি একটি বাধাস্বরূপ কাজ করে।

অনুন্নয়ন বাজেটের সিংহভাগজুড়ে থাকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ভাতাদি ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার খরচ। যা এক কথায় সরকার পরিচালনার ব্যয়ভার। বাস্তবতা হলো অনুন্নয়ন ব্যয়ের এ অংশ থেকে খরচ কমানো যায় না। ফলে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হলে অনুন্নয়ন বাজেটের অংশবিশেষ যা বিভিন্ন খাতে জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যবহার হবে এমন বরাদ্দ থাকে সে অংশসমূহ কাটছাঁট করা হতে পারে।

রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হলে সরকারের পক্ষ থেকে পরবর্তীতে বাজেট অনুমোদন হওয়ার পর পরোক্ষ কর ধার্য (এসআরও জারির মাধ্যমে) বা অন্য কোনো উপায়ে সাধারণ জনগণের ওপর অতিরিক্ত করের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হতে পারে। সে ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও জীবনমানের অবনতি হয়।

উচ্চহারে বিনিয়োগ, প্রবৃদ্ধি অর্জনে সহায়ক হয়। তাছাড়া কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতেও এ বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। বাজেট-উত্তর প্রতিক্রিয়ায় গবেষণা সংস্থা সিপিডি প্রদত্ত তথ্য মোতাবেক জানা যায়, প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে বেসরকারি খাতে ৮০ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। জিডিপির শতকরা হার হিসাবে বিনিয়োগ এখন যে পর্যায়ে আছে তা থেকে শতকরা ১.৫ ভাগ বৃদ্ধি করে ২৩.৩% করতে হবে। সিপিডির তথ্য অনুযায়ী কোনো উৎস থেকে এ অতিরিক্ত অর্থ জোগাড় হবে সে বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা বাজেট প্রস্তাবে চোখে পড়ছে না।

ক্রমবর্ধমান বেকার সমস্যা দেশের জন্য বর্তমানে সবচেয়ে ভয়াবহ সংকট। বিশ্বব্যাংকের শীর্ষ পর্যায়ের অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেছেন, রাষ্ট্রায়াত্ত খাতে সরাসরি কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য ব্যবস্থা গ্রহণের রূপরেখা বাজেট প্রস্তাবে নেই। বাজেটে গৃহীত কোন ধরনের পদক্ষেপের কারণে পরোক্ষভাবে বেসরকারি খাতে কর্মস্থানের সৃষ্টি করবে সে রকম কিছু প্রস্তাবিত বাজেটে দেখা যাচ্ছে না।

পেট্রোলিয়াম জাতীয় পদার্থের বড় ধরনের মূল্য পতনের কারণে প্রবাসী, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত প্রবাসীদের আয় থেকে আসা অর্থের পরিমাণ ক্রমান্বয়ে নিম্নমুখী। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এরও নেতিবাচক প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এ সমস্যা সমাধানে বিদেশে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির বিষয়ে বাজেট প্রস্তাবে যে কর্মসূচি গ্রহণের কথা বলা হয়েছে তা বাস্তবে কতটুকু ফলপ্রসূ হবে তাতে সংশয় আছে। এক কথায় বলা যায়, বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জনের তেমন কোনো নিশ্চিত পথ বাজেট প্রস্তাবে দেখা যাচ্ছে না। বিদেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য বাস্তবসম্মত কোনো পদক্ষেপ লক্ষ করা যাচ্ছে না।

রাষ্ট্রায়াত্ত ব্যাংকসমূহে দলীয়/দল অনুগত ব্যক্তিবর্গকে গুরুত্বপূর্ণ পদসমূহে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সেসব ব্যাংকে ঋণ বিতরণে ব্যাপক অনিয়ম ও ফলশ্রুতিতে অনাদায়কৃত ঋণের অঙ্ক হয়েছে বিশাল পরিমাণ। জনগণের অর্থ থেকে এ ঘাটতির পূরণের জন্য ভর্তুকির প্রস্তাব করা হয়েছে। ২০০০ কোটি টাকা এ ধরনের ভর্তুকির জন্য বরাদ্দের প্রস্তাব, দুর্নীতি ও অনিয়মকে প্রশ্রয় দেবে বলে সাধারণ মানুষের ধারণা। ড. আহসান এইচ মনসুর, আইএমএফের সাবেক অর্থনীতিবিদ ও বর্তমানে গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিআরআই প্রধান, এ ভর্তুকির বিপক্ষে। তার মতে এতে করে, ‘দেশ ভালো টাকা খারাপ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করছে।’

বাজেটে প্রস্তাবিত বড় বা মেগা প্রকল্পসমূহ দেশের অগ্রগতিতে প্রয়োজন সন্দেহ নেই। তবে যে প্রক্রিয়ায় অর্থায়ন ও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে তাতে প্রকল্প ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে, আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা। এসব প্রকল্প সময়মতো বাস্তবায়ন হবে না সে আশঙ্কাও আছে। এ বিষয়ে যথেষ্ট স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা ও দুর্নীতি রোধ করে সার্বিক সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য কী করা হবে তা বাজেটে উল্লেখ করা হয়নি।

বাজেট শুধু বাৎসরিক আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়, সরকারের রাজনৈতিক দর্শন ও সে অনুযায়ী গৃহীত কার্যক্রম বাজেটে প্রতিফলন হবে এটা আশা করা হয়। সে কারণে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের (বাংলাদেশ ব্যাংক) অর্থ চুরির মতো ঘটনার বিষয়ে সরকারের বক্তব্য, কীভাবে ঘটল, কী ব্যবস্থা নেওয়া হলো বাজেটে উল্লেখ করা প্রয়োজন ছিল।

একইভাবে পানামা পেপারস নামে অভিহিত ফাঁসকৃত তথ্য থেকে প্রাপ্ত তথ্যাদি এবং সে বিষয় সরকারের করণীয় সম্পর্কেও বাজেট বক্তৃতায় উল্লেখ এবং গৃহীত ব্যবস্থাদির বর্ণনা থাকলে ভালো হতো।

খাতওয়ারি বরাদ্দ সম্পর্কে আমাদের বক্তব্য জনকল্যাণমূলক খাত হতে যাতে পরবর্তীতে কাটছাঁট করা না হয় সে বিষয়ে সরকারকে নিশ্চয়তা দিতে হবে। অর্থ ব্যবহারে অস্বচ্ছতা বা দুর্নীতি রোধ করে প্রকৃত পরিমাণ যাতে সঠিক কাজে ব্যবহার করা হয় সে বিষয়ে সরকার কী ব্যবস্থা নেবে তা জানিয়ে জনগণকে আশ্বস্ত করা বাঞ্ছনীয়। 

সার্বিক বিবেচনায় প্রস্তাবিত বাজেট যথেষ্ট স্বচ্ছ নয়। বাজেটকে এ মুহূর্তে গণমুখী বলা যায় না। ভবিষ্যতে এ বাজেট জনগণের অজান্তে বড় ধরনের বোঝা হিসেবে তাদের কাঁধে চেপে বসার আশঙ্কা আছে। সে কারণে বাজেট প্রস্তাব সংশোধন করে বাস্তবায়নযোগ্য লক্ষ্যমাত্রাসহ, স্বচ্ছ ও বোধগম্যভাবে জনকল্যাণমুখী বাজেট করার প্রস্তাব করছি।  

লেখক : কো-চেয়ারম্যান, জাতীয় পার্টি ও সাবেক মন্ত্রী

এই পাতার আরো খবর
up-arrow