Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শনিবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : বুধবার, ১২ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ১১ অক্টোবর, ২০১৬ ২৩:২৬
মহাচীনের মহান অতিথিকে সুস্বাগতম
লে. জেনারেল মাহবুবুর রহমান
মহাচীনের মহান অতিথিকে সুস্বাগতম

গণচীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং আগামীকাল দুই দিনের বাংলাদেশ সফরে আসছেন। বন্ধুপ্রতিম, ভ্রাতৃপ্রতিম বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষ চীনের মহান এ প্রাণপ্রিয় অতিথিকে স্বাগত জানায়।

জানায় সুস্বাগতম। ইতিপূর্বেও শি জিনপিং বাংলাদেশ সফরে এসেছেন। ২০১০ সালে চীনের উপ-রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে তিনি বাংলাদেশে আসেন। সেটা ছিল আমাদের দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৩৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে। স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে চীনা রাষ্ট্রীয় নেতার আগমন ঘটে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে। তদানীন্তন উপ-প্রধানমন্ত্রী (Vice Premier) লি শিয়েননিয়েন (Li Xiennien) বাংলাদেশ সফরে আসেন ১৯৭৮ সালে। পরবর্তীতে তিনি চীনের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে জেনারেল এরশাদের আমলে আবার বাংলাদেশ সফর করেন। রাষ্ট্রপতি পর্যায়ে লি শিয়েননিয়েনের সফরই স্বাধীন বাংলাদেশে চীনের প্রথম রাষ্ট্রপতির সফর। স্বাধীনতাপূর্ব (পূর্ব পাকিস্তান) ঢাকায় সফরে এসেছিলেন রাষ্ট্রপতি লি শাওছি।  

বিগত শতাব্দীতেই চীন তাক লাগানো এক বিশাল উত্থান ঘটিয়ে মহা পরাক্রান্ত শক্তিরূপে বিশ্বে আবির্ভূত হয়। একবিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্ন হতেই বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি পরবর্তীতে দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশে পরিণত হয়। অদম্য চীন বিরামহীন গতিতে তার অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা অব্যাহত রেখেছে। বিশ্ব অর্থনীতির মহা বিশারদ ও পণ্ডিতেরা ভবিষ্যদ্বাণী করে চলেছেন চীন ২০২০ সালের মধ্যেই বিশ্বের সর্ববৃহৎ অর্থনীতিতে পরিণত হবে।

শি জিনপিংয়ের এ সফর দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ও বহুল প্রত্যাশিত। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের চার দশক পূর্তি উপলক্ষে এ সফর গত বছরেই হওয়ার কথা ছিল। এ বছর কিছু দেরিতে হলেও সর্বোচ্চ পর্যায়ে চীনা রাষ্ট্রীয় নেতার এ সফর বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। ২০১০ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চীন সফরের প্রাক্কালে আমি কালেরকণ্ঠে ‘প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন চীন সফর’ শিরোনামে একটি নিবন্ধ লিখি (কালেরকণ্ঠ ১১ মার্চ ২০১০) আমি প্রধানমন্ত্রীর সফরকে বাংলাদেশ ও চীনের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সিংহদ্বার উন্মোচনের বার্তা বহন করে বলে উল্লেখ করি। ২০১০ হতে ৬ বছরে চীন বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় উন্নীত হয়েছে। যোগাযোগ (connectivity) জলে স্থলে অন্তরীক্ষে উন্নয়ন ও বিস্তারের বিশাল সম্ভাবনা ইতিমধ্যে উন্মোচিত হয়েছে। BCIM-EC (বাংলাদেশ চীন ভারত মিয়ানমার-ইকোনমিক করিডর)-এর বাস্তবায়ন পুরো এ অঞ্চলে অর্থনীতি, যোগাযোগ ও বাণিজ্য ক্ষেত্রে এক অভূতপূর্ব উন্নয়ন ঘটাবে বলে সবাই বিশ্বাস করে। চীনের সঙ্গে হান রাজবংশের মহা পরাক্রমশালী সম্রাট হান উতি খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীতে তার বিশেষ দূত চাং ছিয়েনকে পশ্চিমের রেশম পথ ধরে বেকট্রিয়ায় (বর্তমান আফগানিস্তান ও মধ্যপ্রাচ্য) বিভিন্ন রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করতে প্রেরণ করেন। তিনি সম্রাট হান উতির শুভেচ্ছা বার্তা ও প্রীতি উপহার সবাইকে পৌঁছে দেন। তিনি উপলব্ধি করেন উত্তরাঞ্চলের রেশম পথের অনেক আগে চীনের সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলের রেশম পথ দিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। এর অর্থ আড়াই হাজার বছরেরও অনেক আগে স্থাপিত হয়েছিল চীন ও বাংলাদেশের সম্পর্ক।

শি জিনপিংয়ের এ সফর একটি যুগসন্ধিক্ষণে অনুষ্ঠিত হতে চলেছে। মাত্র কয়দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি ঢাকা সফর করে গেছেন এবং ঢাকা থেকেই তিনি দিল্লি গমন করেন। ভারত ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে লজিস্টিক এক্সচেঞ্জ এগ্রিমেন্ট স্বাক্ষর করেছে। এশিয়া প্যাসিফিকের নৌঘাঁটিগুলোসহ সব লজিস্টিক বেস ও ফ্যাসিলিটিগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর জন্য উন্মুক্ত থাকবে। জোট নিরপেক্ষ ভারতের জন্য সামরিক এ জোটভুক্তি তার পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা নীতিতে এক বড় রকমের পরিবর্তন। চীন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের এ চুক্তিকে ইতিমধ্যে তাকে ঘিরে ফেলার এক আক্রমণাত্মক তত্পরতা বলে মনে করছে। যুক্তরাষ্ট্র ইতিপূর্বে এশিয়া প্যাসিফিক পিভোট স্ট্র্যাটিজির কথা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে। বিশ্বরাজনীতির এ রকম সমীকরণের প্রেক্ষাপটে চীনের রাষ্ট্রপতির বাংলাদেশ সফর বিভিন্ন কারণে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। আগেই উল্লেখ করেছি আড়াই হাজার বছরের গভীর সম্পর্ক চীন ও বাংলাদেশের। শতাব্দীতে শতাব্দীতে যুগে যুগে তা সমৃদ্ধ হয়েছে। ফা হিয়েন, হিউয়েন সাং, অতীশ দিপংকর, এডমিরাল চাং হ আমাদের দুই প্রাচীন সভ্যতার যোগাযোগ স্থাপনে, প্রীতি, সম্প্রীতি ও মৈত্রীর মেলবন্ধনে সমৃদ্ধশীল ইতিহাসের এক গৌরবোজ্জ্বল কালান্তরের সৃষ্টি করেছে।

বন্ধুপ্রতিম, ভ্রাতৃপ্রতিম দেশ চীন। চীন সম্বন্ধে কিছু লিখতে গেলেই চীনের সুপ্রাচীন সভ্যতার ইতিহাস এবং বাংলাদেশের সঙ্গে সভ্যতার ঊষালগ্ন হতে সম্প্রীতি ও মৈত্রী বন্ধনের কথা স্বাভাবিকভাবেই এসে পড়ে যা এক দীর্ঘ ইতিহাস। বাংলাদেশের প্রায় পাশাপাশি চীনের অবস্থান। বাংলাদেশ ও চীন অতি নিকট প্রতিবেশী দেশ। চীন ও বাংলাদেশের মাঝে বিভাজনের যে ভূখণ্ড তা আয়তনে অনেক ছোট, প্রায় ১০০ কিলোমিটারের মতো দূরত্বের। আগেই উল্লেখ করেছি আড়াই হাজার বছরেরও আগে সেই সুপ্রাচীনকালে আমাদের সম্পর্ক স্থাপিত হয়। আমাদের বহুদূরের পূর্ব পুরুষেরা পরস্পর যোগাযোগ করেছিল। সম্পর্ক স্থাপন করেছিল। আদান-প্রদান করেছিল। হিমালয় ডিঙ্গিয়ে বাংলাদেশে এসেছিল ফা হিয়েন, শুয়ান জাং, ই চিং। তেমনি বাংলাদেশ থেকে বৃহৎ ঢাকার সন্তান অতীশ দীপংকর শ্রীজ্ঞান চীন গমন করেন। তিনি তিব্বতে ভগবান বুদ্ধের অমিতবাণী অহিংসা পরমধর্ম, সর্বজীবে দয়া, সমস্ত তিব্বত অঞ্চলজুড়ে পদব্রজে পায়ে হেঁটে হেঁটে প্রচার করেন। ১৬ বছর তিব্বতে ধর্ম ও জ্ঞান প্রচার করে সেখানেই মহাপ্রয়াণ করেন। ১৪০৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৪৩৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত শান্তির দূত মহান সমুদ্র পর্যটক ও বিশ্বশ্রেষ্ঠ নাবিক এডমিরাল চাং হ শত জাহাজের বহর নিয়ে ৩০ হাজার নাবিক সহকারে সাতটি আন্তঃসমুদ্র অভিযান পরিচালনা করেন। এশিয়া ও আফ্রিকার ত্রিশটি দেশ ও অঞ্চল পরিভ্রমণ করেন। এডমিরাল চাং হ-র বিশাল নৌবহর কমপক্ষে দুবার চট্টগ্রাম বন্দরে এসেছিল। সুবা বাংলার শক্তিমান শাসক সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজমশাহ তার রাজধানী সোনারগাঁওয়ের পানাম নগরীতে বিশাল বর্ণাঢ্য অভ্যর্থনা সভার আয়োজন করে তাকে স্বাগত জানান। সুবা বাংলার সুলতানদের সঙ্গে চতুর্দশ ও পঞ্চদশ শতাব্দীতে পরাক্রান্ত মিং সম্রাটদের যোগাযোগ দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক সমৃদ্ধি ও মৈত্রীর মাপকাঠিতে এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। সপ্তদশ শতাব্দীতে চীন বাংলা সম্পর্কের সুতোয় টান পড়ে। ইউরোপীয় উপনিবেশবাদের আধিপত্য বিস্তৃত হয়। একপর্যায়ে তা স্তিমিত হতে হতে ছিন্ন হয়ে যায়। ব্রিটিশরা বাংলাদেশসহ ভারতবর্ষ অধিকার করে বিশাল উপনিবেশ স্থাপন করে। উপনিবেশকারীরা গর্বভরে নাম দেয়  Jewel in the crown। তেমনি চীনেও ইউরোপের উপনিবেশবাদী দেশগুলো আধিপত্য গড়ে তুলে। বাংলা ও চীনের ঐতিহাসিক গভীর সম্পর্কে ছেদ পড়ে। দুই দেশেরই স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব লুণ্ঠিত হয়।

এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, সুপ্রাচীনকাল থেকে চীন নৌশক্তি ও স্থলশক্তিতে অত্যন্ত বলবান দেশ হওয়া সত্ত্বেও সমগ্র ইতিহাসে অন্য কোনো দেশে নিজেদের উপনিবেশ স্থাপন করেনি। অন্য কোনো দেশ দখলে নেয়নি। আধিপত্য বিস্তার করেনি বরং সব দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে এসেছে। প্রাচীন ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় চীন আজ পর্যন্ত অন্য কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কখনো হস্তক্ষেপ করেনি এবং শান্তি ও সম্প্রীতির সঙ্গে সহাবস্থানে দৃঢ় বিশ্বাস করেছে। ‘পঞ্চশীলা রাষ্ট্রনীতির ভিত্তিতে বিশ্ব আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক নির্মিত এবং বিশ্ব শান্তি ও স্থিতিশীলতা সুরক্ষিত। ’ চীন এই মহান নীতিতে দৃঢ় বিশ্বাসী।

সাম্প্রতিক ইতিহাসে আমরা দেখতে পাই বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির পর একাধিকবার চীন সফর করেন এবং মাসাধিককাল ধরে অবস্থান করেন। তিনি চীনের ইতিহাস, সাহিত্য, সংস্কৃতি, শিল্পকলা, দর্শন ও বিজ্ঞানে পরিচিত হয়ে অভিভূত হয়ে পড়েন। আধুনিক ইতিহাসে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকায় চীনের প্রধানমন্ত্রী চৌ এনলাই ১৯৫৬ সালে সফর করেন। প্রেসিডেন্ট লি শাওছি ১৯৬৬ সালে বাংলাদেশ সফরে আসেন। বাংলাদেশের জননেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৫৭ সালে চীন সফর করেন এবং চেয়ারম্যান মাও সেতুং, প্রধানমন্ত্রী চৌ এনলাই এবং মার্শাল চু-তে সহ কমিউনিস্ট পার্টির নেতাদের সঙ্গে বন্ধুত্বের সম্পর্ক স্থাপন করেন। ম্যাডাম সু চিং লিং (ম্যাডাম সান ইয়াতসেন) ১৯৬৭ সালে ঢাকা সফরে আসেন। মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এমনি একটা সময়ে মাও সেতুংয়ের আমন্ত্রণে চীন সফর করেন এবং চৌ এনলাইসহ কমিউনিস্ট পার্টির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে প্রগাঢ় বন্ধুত্ব গড়ে তোলেন। বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কের সূচনা ঘটে ১৯৭৫ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উদ্যোগে। জিয়ার দৃষ্টি ছিল পূর্বমুখী। সেই সময় চীনের শীর্ষ নেতা চেয়ারম্যান মাও সেতুং ও চৌ এনলাই জীবিত ছিলেন। আমাদের কূটনৈতিক সম্পর্ক, শুরু হওয়ার পর থেকেই বরাবরই চমৎকার। দিনে দিনে তা নিবিড় হয়েছে, সমৃদ্ধ হয়েছে। এ সম্পর্ক সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে। সম্পূর্ণ রাজনৈতিক ভিন্ন মতাদর্শের ও সামাজিক সাংকৃতিক ব্যবস্থার ভিন্নতা সত্ত্বেও আমাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক একটি iconic, role model হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। আমাদের জাতীয় জীবনের সব ক্ষেত্রে এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে চমৎকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বিরাজ করছে। আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নে, অবকাঠামো গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এবং ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষি, শিল্প, বিজ্ঞান এবং প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে চীন আমাদের প্রভূত সহযোগিতা করে চলেছে।  

বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক, ভূকৌশলগত ও ভূঅর্থনৈতিক অবস্থান এমন যে তা আঞ্চলিক কৌশলগত ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশে পরিণত হয়েছে। এমনকি বৈশ্বিক কৌশলগত ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের স্থান অতীব গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার একটি দেশ যা দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ দেশগুলোর সঙ্গে সংযোগ সেতু হিসেবে অবস্থান করে। বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে যেমন দক্ষিণ এশিয়ার দেশ আবার তেমনি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ারও দেশ। এশিয়ার দুই বৃহৎ শক্তিধর দেশের মধ্যখানে বাংলাদেশের অবস্থান। একটি বৃহৎ উদীয়মান ভারত। আরেকটি ১০০ কিলোমিটারের দূরত্বে শান্তিকামী শান্তিবাদী বন্ধুত্বপরায়ন মহাচীন যা ইতিমধ্যে বিশ্বে দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ হিসেবে নিজের স্থান করে নিয়েছে।

চীনের সূর্য আজ মধ্য গগনে। চীনে এখন high noon। অর্থনীতি, রাজনীতি, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, ব্যবসা-বাণিজ্যে চীন ইতিমধ্যে বিস্ময়কর অবস্থান নির্মাণ করেছে। চীন এক বেল্ট এক রোড ও সামুদ্রিক নবতর সিল্ক রোড পুনর্নির্মাণ উদ্যোগের বাস্তবায়নে প্রতিবেশী দেশগুলো নিয়ে এগিয়ে যেতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। ইতিমধ্যে চীন এআইআইবি (AIIB-Asian International Investment Bank) প্রতিষ্ঠা করেছে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের ১০০টির মতো বেশি দেশ তার সদস্যভুক্ত হয়েছে। ভারত এ সমৃদ্ধ এআইআইবি সদস্য। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোয় আধুনিক যোগাযোগ ও ভৌতকাঠামো নির্মাণে এআইআইবি আগামীতে বিশাল অর্থের জোগান দেবে। শি জিনপিং বাংলাদেশ সফরে আসছেন। তাঁর এ সফর শুভ হোক, সুন্দর হোক, সফল হোক। আমাদের দুই দেশের নতুন নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত আরও উন্মোচিত হোক, কামনা করি। চীন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সমৃদ্ধিতে অর্থবহ সহযোগিতা করে চলেছে। এ সহযোগিতা আরও বিস্তৃত হোক, আরও মজবুত, ব্যাপক হোক, সুসঙ্গত হোক, দৃঢ় হোক। বাংলাদেশ নিজের শক্ত পায়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াক চীন তা দেখতে চায়। চীন অকৃত্রিম বন্ধু হিসেবে বাংলাদেশকে স্বাধীন সার্বভৌম ও নিরাপত্তায় আরও শক্তিশালী দেখতে চায়। এ অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতায় বাংলাদেশ আরও বড় ভূমিকা রাখুক, কামনা করে।

আমার মনে পড়ে, ১৯৯৬ সালের অক্টোবর মাস। আমি তখন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সেনাপ্রধান। চীনা সামরিক বাহিনীর আমন্ত্রণে চীন সফরে যাই। আমার সৌভাগ্য হয়েছিল চীনের তদানীন্তন রাষ্ট্রপতি ও কমিউনিস্ট পার্টিপ্রধান জিয়াং জেমিনের সঙ্গে এক সৌজন্য সাক্ষাৎকারে মিলিত হওয়ার। প্রেসিডেন্ট জেমিনের সঙ্গে আলাপের একপর্যায়ে তিনি বলেছিলেন ‘আপনি আশির দশকে এক দীর্ঘ সময় ধরে চীনে থেকেছেন। তখনকার চীন আর আজকের চীনের মধ্যে অনেক তফাৎ। এ কয়েক দশকে চীনে অনেক পরিবর্তন এসেছে, চীন আধুনিক হয়েছে। আমাদের নেতৃত্বেও অনেক পরিবর্তন এসেছে। তরুণরা নতুন নেতৃত্বে এগিয়ে এসেছে। এদের অনেককেই আপনি তখন দেখেননি। আমি শুনেছি, বাংলাদেশেও অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। ঢাকার স্কাই লাইন বদলে গেছে। আসলে পৃথিবী সব সময় পরিবর্তনশীল। কিন্তু এতসব পরিবর্তনের মাঝেও আপনি কি বলতে পারেন একটি বিষয়ে কোনো পরিবর্তন ঘটেনি এবং কখনো ঘটবেও না। ’ তিনি বলে চললেন, ‘সেটা চীন ও বাংলাদেশের সম্প্রীতির সম্পর্ক। বাংলাদেশের প্রতি চীনের নীতির সম্পর্ক’। এ নীতির কোনো পরিবর্তন নেই, কখনো পরিবর্তন হবেও না। চীন সব সময়ে সব সংকটে, দুঃসময়ে ও দুর্দিনে বাংলাদেশের পাশে থাকবে, তার সম্প্রীতি ও সহযোগিতার হাত সদা সম্প্রসারিত রাখবে। ’ আমি প্রেসিডেন্ট জিয়াং জেমিনের কথাগুলোর মধ্যে একটা অদ্ভুত দৃঢ়তা ও স্পষ্টতা লক্ষ্য করি। তার আন্তরিকতা ও উষ্ণতা আমার হৃদয় স্পর্শ করে।

চীনের প্রতি পূর্ণ আস্থাবান বাংলাদেশের জনগণ রাষ্ট্রপতি শি জিনপিংয়ের সফরকে অনেক বড় করে মূল্যায়ন করে। আশা করে এ সফরের অনেক সাফল্য, আশা করে অনেক অর্জন। এ অর্জন দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নে নতুন উচ্চতায় আরোহণের। এ সাফল্য বাংলাদেশের অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জনে চীনের সহযোগিতার সিংহদ্বার উন্মোচনের।

চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক উন্নয়ন ও সহযোগিতার ক্ষেত্র অনেক ব্যাপক, অনেক বিস্তৃত, বহুবিধ ও বহুমাত্রিক। চীন আমাদের জাতীয় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সহযোগিতায় এগিয়ে এসেছে আরও এগিয়ে আসার প্রত্যাশায় আমরা গভীর আগ্রহে তাকিয়ে আছি। আমাদের কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য, যোগাযোগ ব্যবস্থা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, শিক্ষা, প্রতিরক্ষা, ক্রীড়া ইত্যাদি সব বিষয়ে চীন অর্থবহ উন্নয়ন ঘটাতে পারে। চীন ইতিমধ্যে বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি বৃহৎ মৈত্রী সেতু নির্মাণ করেছে। পদ্মা সেতু নির্মিত হচ্ছে। যমুনা বক্ষে আরেকটি সেতুসহ নদীমাতৃক বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে চীন প্রয়োজনীয় সব সেতুর নির্মাণকাজ করতে পারে। ঢাকার ভয়াবহ যানজট নিরসনে পাতাল রেল এবং একই সঙ্গে আকাশ রেলপথ নির্মাণ করতে পারে। চট্টগ্রাম-কুনমিং সরাসরি যোগাযোগসহ বাংলাদেশের সড়ক ও রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা BCIM-EC বাস্তবায়নের মাধ্যমে আধুনিক ও যুগোপযোগী করার জন্য চীনকে আরও এগিয়ে আসার অনুরোধ করা যেতে পারে। এখানে উল্লেখ করা যায় যে, চীন সম্প্রতি রেল যোগাযোগ ব্যবস্থায় যুগান্তকারী উন্নয়ন সাধন করেছে। বিশ্বের দ্রুততম ট্রেন (ঘণ্টায় ৪০০ কি.মি.) এর প্রযুক্তির উদ্ভাবন চীনই করেছে। বিশ্বের সর্বোচ্চ রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা (বেইজিং হতে তিব্বত) চীনই নির্মাণ করেছে। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দিনাজপুর ও রংপুর অঞ্চলে অবস্থিত কয়লা খনিগুলো থেকে কয়লা উত্তোলন করে কয়লা জ্বালিত আরও অনেক প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপন করতে পারে। চীন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উৎপাদনে পরমাণু শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারে আমাদের সহযোগিতা করতে পারে। রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রটি রাশিয়ার সহযোগিতায় বাস্তবায়ন হতে চলেছে। এমনি চীনের সহযোগিতায় আরেকটি পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মিত হতে পারে। চীন সরকার বিশেষভাবে আগ্রহী তাদের উদ্যোগে, অর্থায়ন ও কারিগরি সাহায্যে বঙ্গোপসাগরে একটি গভীর সমুদ্রবন্দর প্রতিষ্ঠায় যেমনটি তারা ইতিমধ্যে পাকিস্তান, মিয়ানমার ও শ্রীলঙ্কায় করেছে। চীনের কাছ থেকে আমরা সাগরবক্ষের তেল ও গ্যাস উত্তোলনেও সহযোগিতা নিতে পারি। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি বিদ্যমান। এ সমস্যা নিরসনে আমাদের রপ্তানি বাড়াতে এবং চীনের বিপুল অর্থ বিনিয়োগ ঋউও আনতে আমরা তার উদার সহযোগিতা কামনা করি।   চীনের জন্য স্পেশাল ইকোনমিক জোন ও জয়েন্ট ভেঞ্চার মহাপরিকল্পনা ইতিমধ্যে নেওয়া হয়েছে। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চীন কৃষি ক্ষেত্রে অতি উচ্চ ফলনশীল হাইব্রিড ধান উদ্ভাবনসহ যে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে তার প্রযুক্তি আমাদের হস্তান্তর করতে পারে। সশস্ত্র বাহিনী শক্তিশালী ও যুগোপযোগী আধুনিকায়ন করতে চীনের সহযোগিতা বিশেষভাবে প্রয়োজন। আমাদের সেনাবাহিনীর অস্ত্রশস্ত্র, বিমান বাহিনীর জঙ্গি জাহাজ এবং নৌবাহিনীর যুদ্ধ জাহাজ আরও সমৃদ্ধ করা অপরিহার্য। চীনা মুক্তিফৌজের উদার সহযোগিতা আমরা কামনা করি আমাদের জাতীয় নিরাপত্তাকে আরও শক্তিশালী ও অপ্রতিরোধ্য করতে। বাংলাদেশের নীল অর্থনীতি উন্নয়ন ও সমৃদ্ধিতে চীন বিশাল সহযোগিতায় এগিয়ে আসতে পারে।

আমাদের সমুদ্র সম্পদ সংরক্ষণে এবং তেল, গ্যাস উত্তোলন ও আহরণে চীনের সহযোগিতা আমরা প্রত্যাশা করি। শি জিনপিংয়ের বাংলাদেশ সফর আমাদের জাতীয় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক এক গুরুত্বপূর্ণ সময় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। বাংলাদেশ আজ জটিল যুগসন্ধিক্ষণে কঠিন ক্রান্তিতে দাঁড়িয়ে। অনেক চ্যালেঞ্জ আমাদের সামনে। পথে অনেক বাধা। সাগরে উত্তাল ঢেউ। বিশাল জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত দক্ষিণ এশিয়ার ছোট্ট একটি দেশ বাংলাদেশ। ক্ষুধা ও দারিদ্র্যপীড়িত অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া, বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে চরমভাবে আঘাতপ্রাপ্ত ও অভিশপ্ত। আজ নদীমাতৃক বাংলাদেশের সব নদ নদী স্রোতহারা, পানিশূন্য। সাগরবক্ষে ঝড়। বাংলাদেশে আজ প্রয়োজন চীনের মতো ঐতিহ্যবাহী মহান এক বন্ধুর নিবিড় নৈকট্য ও পারস্পরিক সমঝোতা ও সম্পর্কের গভীর উষ্ণতা। প্রয়োজন বিশ্বস্ত বন্ধুর উদ্দীপক অনুপ্রেরণা ও বিশাল আস্থা। প্রয়োজন সাহসী, উদার, নিরবচ্ছিন্ন ও বহুমাত্রিক সহযোগিতা। সে লক্ষ্যেই বাংলাদেশ ও চীনের জনগণ প্রতীক্ষমাণ। বাংলাদেশ চীন মৈত্রী অমর হোক। অটুট হোক। আমাদের দুই দেশ বাংলাদেশ ও চীনের এক এবং অভিন্ন নদী, ব্রহ্মপুত্র নদ ও ইয়ারলুং জাংপো চিয়াং। আমাদের মৈত্রী ব্রহ্মপুত্র নদের বিশাল স্রোতধারার মতো অনন্তকাল ধরে পূর্ণ কলেবরে কানায় কানায় প্রবহমান থাকুক, উসলে পড়ুক।

লেখক : সাবেক সেনাপ্রধান

এই পাতার আরো খবর
up-arrow