Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শনিবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : শুক্রবার, ২১ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ২০ অক্টোবর, ২০১৬ ২৩:৫৬
ধর্মতত্ত্ব
আল্লাহর রজ্জুকে আঁকড়ে ধর
মুফতি আমজাদ হোসাইন
আল্লাহর রজ্জুকে আঁকড়ে ধর

পবিত্র কোরআনের প্রসিদ্ধ আয়াত, ‘হে ইমানদারগণ আল্লাহকে যেমন ভয় করা উচিত ঠিক তেমনিভাবে ভয় করতে থাক এবং অবশ্যই মুসলমান না হয়ে মৃত্যবরণ কর না। আর তোমরা আল্লাহর রজ্জুকে সুদৃঢ় হস্তে ধারণ কর; পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না।

’ (সূরা আলে ইমরান : ১০২, ১০৩)। আলোচ্য আয়াতে মহান রাব্বুল আলামিন দুটি মূলনীতির আলোকপাত করেছেন। এক. আল্লাহকে ভয় করা। দুই. আল্লাহর রজ্জুকে মজবুত হস্তে আঁকড়ে ধরা। মৌলিকভাবে মুসলমানদের পূর্ণ শক্তি ও কামিয়াবির ভিত্তি এ দুটি জিনিসের ওপর নির্ভরশীল। যার ভিতরে এ দুটি মূলনীতির মজবুতি থাকবে সে তত তাড়াতাড়ি আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করতে পারবে। তাফসিরে ইবনে কাসিরের মধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহর রজ্জু বলতে পবিত্র কোরআনকে বুঝানো হয়েছে। আবার আল্লামা সুয়ূতী (রহ.) বলেন, আল্লাহর রজ্জু দ্বারা দীন-ইসলামকে বুঝানো হয়েছে। মোটকথা হাবলুন তথা আল্লাহর রজ্জু দ্বারা কোরআন বা দীন-ইসলাম যাই বুঝানো হোক। উভয়টি শুধু একতা, শৃঙ্খলা, মৈত্রী এবং দলবদ্ধভাবে থাকার শিক্ষাই দেয় না বরং তা অর্জন করতে হয় কীভাবে, তার ওপর অটল থাকতে হয় কীভাবে? তারও পদ্ধতি বাতলে দেয়। পবিত্র কোরআনের অন্যত্র আল্লাহ বলেন, ‘হে ইমানদারগণ! তোমরা পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ কর। শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ কর না। নিশ্চিতরূপে সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু। (সূরা বাকারা : ২০৮)। এ আয়াতে ‘সিলমুন’ এবং ‘কাফ্ফাহ’ শব্দ দুটি উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লামা হাফেজ ইবনে কাছীর (র.) ‘সিলমুন’-এর অর্থ করেছেন ইসলাম ও শান্তি। আর ‘কাফ্ফাহ’-এর অর্থ করেছেন পরিপূর্ণরূপে ও সাধারণভাবে। জমহুরে সাহাবায়ে কেরামদের থেকেও এ অর্থের সাপোর্ট পাওয়া যায়। এখন আয়াতের অর্থ দাঁড়ালো— হে ইমানদারগণ! তোমরা ইসলামে তথা শান্তির ধর্মে পরিপূর্ণভাবে প্রবেশ কর। পরিপূর্ণভাবে প্রবেশ করা বলতে আমরা কি বুঝি? কোনো ব্যক্তি যদি আপন গৃহে প্রবেশ করে তখন সে পুরো বডি নিয়েই প্রবেশ করে। যদি সে শুধু পদযুগল প্রবেশ করায়, কিন্তু বাকি বডি প্রবেশ করাল না, তাহলে তাকে পূর্ণ প্রবেশকারী বলা হবে না। আলোচ্য আয়াতে আল্লাহতায়ালা মুমিন ও মুসলমানদের উদ্দেশ করে বলছেন, তোমরা যখন শান্তির ধর্ম ইসলামে প্রবেশ করেছ, তখন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলামের বিধিবিধান মেনে চল। এমন যাতে না হয় নিজের সুবিধা মতো ইসলামের বিধি-বিধান মানলে, আর মন চায় না তো মানলে না। তা হবে না। ইসলামে পরিপূর্ণভাবে প্রবেশ করতে হলে, ইসলাম কি? ইসলাম কী শিক্ষা দেয়? ইসলামের মানশা কী? কোরআন ও হাদিস চর্চা করে সঠিক জ্ঞান অর্জন করতে হবে। তখন দেখা যাবে ইসলাম সম্পর্কে যেসব ভ্রান্ত ধারণা সমাজে প্রচলিত আছে তা সমূলে দূর হয়ে যাবে। মুমিনরা এক আল্লাহর ওপর বিশ্বাস করে। তার রেজামন্দি হাসিলের জন্য দিবানিশি ইবাদতে মগ্ন থাকে। পারস্পরিক লেনদেন, আচার-আচরণ এবং স্বভাব-চরিত্র প্রকাশ করার মাধ্যমেও আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করে। হজরত রসুলে আরাবি (সা.) তার প্রিয় সাহাবি হজরত আনাস বিন মালেক (রা.)-কে বললেন, হে আনাস! তোমার পক্ষে যদি সম্ভব হয়, তুমি সকাল-সন্ধ্যা এমনভাবে অতিবাহিত করবে যে, তোমার অন্তরে কারও প্রতি কোনোরূপ বিদ্বেষ থাকবে না। তাহলে তুমি তাই কর (এটাই তোমার জন্য কল্যাণকর)। কারণ এমন ধারণা পোষণ করা আমার সুন্নত। যে আমার সুন্নতকে জিন্দা করে সে যেন আমাকেই ভালোবাসে। আর যে আমাকে ভালোবাসে সে পরকালে আমার সঙ্গে জান্নাতে থাকবে। (তিরমিজি : ২৬৭৮)। আমরা তো কেবল নামাজ ও রোজার সুন্নতকে ইবাদত মনে করি। এ ছাড়াও যে জীবন চলার প্রতিটি অঙ্গনে রসুল (সা.)-এর সুন্নত রয়ে গেছে সেদিকে একেবারেই খেয়াল নেই। আমাদের আকাবিরে উলামায়ে কেরামগণ ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে সামাজিক ও পারিবারিক তথা সর্ব অবস্থাতেই সুন্নতের পাবন্দ ছিলেন। খাওয়ার সুন্নত, চলার সুন্নত এবং বলার সুন্নত কোনোটাই ছাড়তেন না। বিশেষ করে ‘মানুষের জন্য মানুষ’— এ স্লোগানের ওপর পুরোপুরিভাবে আমল করতেন। কেননা ইসলামের বিধান হলো মানুষের জন্য মানুষ সব কাজে সহযোগিতা করবে। কাউকে কষ্ট দেবে না। কষ্টদায়ক বস্তু পথ থেকে সরিয়ে দেবে। আজকাল অনেক অনুষ্ঠানে কিংবা মসজিদে দেখা যায়, সামনে আসার জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়ে। অন্য সাধারণ মানুষকে কষ্ট দিয়ে সামনের স্থান দখল করে। মসজিদে তার জুতার পানি টপ টপ করে মানুষের ওপর ও মসজিদে পড়তে থাকে। এদিকে তার কোনো খেয়াল নেই। তার খেয়াল তো শুধু একটাই কীভাবে সামনে যেতে হবে। মসজিদে সামনের কাতারের ফজিলত পেতে হবে। তার এমন আচরণ দ্বারা সাধারণ মানুষের কষ্ট হয়। কেউ কষ্ট প্রকাশ করে আর কেউ তার দাপটের ভয়ে প্রকাশ করে না। প্রিয় পাঠক! এ ধরনের নির্বোধ লোকেরা বুঝে না। একটু সামনে যাওয়া বা তার ব্যক্তিত্ব মানুষের সামনে প্রকাশ করার জন্য হারাম কাজে লিপ্ত হয়ে যাচ্ছে। কারণ ইজায়ে মুসলিম তথা মুসলমানকে কষ্ট দেওয়া হারাম। কবিরা গুনাহে লিপ্ত হওয়া যেমন হারাম। মানুষকে কষ্ট দেওয়া অনুরূপ হারাম। শরীয়তের বিধান হলো জনমানুষের সমাগমস্থলে বা মসজিদে যেখানে জায়গা পাবে সেখানেই বসে পড়বে। চাই সে সমাজের যত উচ্চস্তরের লোক হোক না কেন। আমি অন্যের সঙ্গে এমন আচরণ কেন করতে যাব যে আচরণ আমি পেলে কষ্ট পাব? বিশ্ববরেণ্য কবি আল্লামা শেখ সাদী (র.) কত সুন্দর বলেছেন— ‘তোমার পদতলে পতিত পিঁপড়ার অবস্থা যদি তুমি জানতে চাও তাহলে তুমি তোমার অবস্থাকে হাতির পদতলে অনুভব কর’ তখনেই বুঝতে পারবে অপরের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করার পরিণাম কী? আল্লাহপাক আমাদের সবাইকে আল্লাহর রজ্জু তথা দীন-ইসলামকে মজবুতির সঙ্গে আঁকড়ে ধরার তৌফিক দান করুন।   আমিন।  

লেখক : মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও খতিব, বারিধারা ঢাকা।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow