Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শুক্রবার, ১৮ আগস্ট, ২০১৭

ঢাকা, শুক্রবার, ১৮ আগস্ট, ২০১৭
প্রকাশ : রবিবার, ১২ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০ টা আপলোড : ১১ মার্চ, ২০১৭ ২৩:০৩
বিএনপি কি ‘নোটিস পার্টির’ অপবাদ ঘুচাতে পারবে?
কাজী সিরাজ
বিএনপি কি ‘নোটিস পার্টির’ অপবাদ ঘুচাতে পারবে?

আমাদের দেশে যে কোনো নির্বাচনকে ঘিরেই এক ধরনের প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। জাতীয় নির্বাচনে রীতিমতো উন্মাদনা লক্ষ্য করা যায়।

তবে স্থানীয় সরকার বা আঞ্চলিক সরকার নির্বাচন ও জাতীয় নির্বাচনের বৈশিষ্ট্য একরকম নয়। স্থানীয় সরকার নির্বাচন আগে ছিল সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক। আত্মীয়তা, পাড়া-মহল্লা তথা আঞ্চলিকতা এবং ক্ষেত্রবিশেষে প্রার্থীর শিক্ষা-দীক্ষা, সততা, যোগ্যতাও প্রাধান্য পেত। এখন ওয়ার্ড কাউন্সিলর ছাড়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান, পৌরসভা, সিটি করপোরেশনের মেয়র এবং উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নির্বাচন দলীয় ভিত্তিতে, দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। কিন্তু তারপরও চেয়ারম্যান, মেয়র ছাড়া অন্যান্য পদে দলীয় প্রভাব খুব একটা কার্যকর হয় না। দেখা যায় যিনি কোনো দলীয় চেয়ারম্যানের জন্য কাজ করছেন, তিনি কাউন্সিলর পদে ওই দলের সমর্থিত (প্রতীকবিহীন) প্রার্থীর পক্ষে কাজ না করে অন্য কোনো বিবেচনায় অন্য প্রার্থীর পক্ষে কাজ করছেন— যিনি তার দলের ঘোর বিরোধী। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের সরকার অদল-বদল হয় না। তাই জাতীয় নির্বাচনে রাজনীতিটা প্রধান না হলেও দলটা প্রধান। কমিউনিস্ট সমর্থক এবং ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের সমর্থকরাও ভোটের সময় আদর্শিক দৃঢ়তা না দেখিয়ে নানা বিবেচনায়, নানা সমীকরণে নৌকা অথবা ধানের শীষের দিকে ঝুঁকে পড়ে। নির্বাচনের সময় যত ঘনিয়ে আসে মেরুকরণ প্রক্রিয়া তত গতি পায়। এই প্রক্রিয়ায় ভোটারদের যার যার পক্ষভুক্ত করার জন্য দলসমূহ মাঠ গরম করার নানা কৌশল অবলম্বন করে। রাজনৈতিক আক্রমণ-প্রতিআক্রমণে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে মাঠ-ময়দান।

দেশে প্রাক-নির্বাচনী বাগ্যুদ্ধ শুরুই হয়ে গেছে বলা চলে। প্রধান দুই দল আওয়ামী লীগ-বিএনপি কেউ কাউকে ছেড়ে কথা বলছে না। ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ ও ড. খোন্দকার মোশাররফ হোসেনের মতো সিনিয়র নেতারা দীর্ঘদিন পর মুখ খুলেছেন, কথা বলছেন— অর্থাৎ সরব-সক্রিয় হয়েছেন। নির্বাচন কমিশন নিয়ে বাকবিতণ্ডা এখনো শেষ না হলেও নির্বাচনের জন্য যদি লেভেল-প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত হয়, তাহলে এই কমিশনের অধীনে নির্বাচনে যেতে প্রধান বিরোধী দল বিএনপির আপত্তি থাকবে বলে মনে হয় না। আমাদের মতো দেশে একটি সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন শুধু নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতার ওপরই নির্ভর করে না। নির্বাচনকালে যে সরকারটি ক্ষমতায় থাকে সেই সরকার যদি নিরপেক্ষ আচরণ না করে, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশনকে সর্বতো সহযোগিতা না করে তাহলে ভালো নির্বাচন আশা করা যায় না। সে জন্যই নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা নিয়ে তুমুল বিতর্ক হচ্ছে। সরকারপক্ষ থেকে জোর দিয়ে বলা হচ্ছে যে, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের অধীনেই হবে আগামী নির্বাচন, বিএনপিকে তা মেনে নিয়েই নির্বাচনে আসতে হবে। তারা দোহাই দিচ্ছেন সংবিধানের। পৃথিবীর সব সংসদীয় গণতন্ত্রের দেশেই ক্ষমতাসীন সরকার নির্বাচনকালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হিসেবে কাজ করে। তবে সেই সরকার রাষ্ট্রীয় নীতিগত কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে না, দান-অনুদানের ভাণ্ডার খুলে দেয় না। তারা স্রেফ ‘রুটিন ওয়ার্ক’গুলো সম্পাদন করে। সংসদ বহাল রেখে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় না। আমাদের দেশেও এমন ব্যবস্থাই ছিল। কিন্তু ক্ষমতাসীন সরকারের অধীনে নির্বাচনে সীমাহীন কারচুপি, অনিয়ম, সন্ত্রাস, নৈরাজ্যের কারণে নির্বাচনকালীন নির্দলীয়, নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি ওঠে।

 

 

১৯৯৪ সালে পঞ্চম সংসদে মাগুরা-২ আসনের উপনির্বাচনে নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গ করে শাসক দল বিএনপির প্রার্থী কাজী সলিমুল হক কামালের পক্ষে ভোট ডাকাতির পর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে জাতীয় পার্টি, জামায়াতে ইসলামী ও বাম দলসমূহসহ সব বিরোধী দল তুমুল আন্দোলন গড়ে তোলে। তারা নির্বাচনকালীন নির্দলীয়-নিরপেক্ষ, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মানতে শেষ পর্যন্ত ক্ষমতাসীন সরকারকে বাধ্য করে। স্বল্পকালীন-স্থায়ী ষষ্ঠ জাতীয় সংসদে এ সংক্রান্ত বিল পাস হয়। ওই সাংবিধানিক বিধান অনুযায়ী বিচারপতি হাবিবুর রহমান ও বিচারপতি লতিফুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে পরপর দুটি নির্বাচন হয় এবং দেশ-বিদেশে তা গ্রহণযোগ্যতাও পায়। নবম সংসদ নির্বাচন ঘিরে আবার জটিলতা সৃষ্টি হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন প্রক্রিয়া নিয়ে বিএনপি এমন অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ করে যে, তা নিয়ে ফের বিতর্ক সৃষ্টি হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ওপর নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার মতলবে বিচারপতিদের বয়সসীমা আকস্মিক বাড়িয়ে দেওয়া হয়— যা তখনকার বিচারপতিরা দাবি করেননি। উদ্দেশ্য ছিল বিচারপতি কে এম হাসানকে প্রধান উপদেষ্টা করা। বিচারপতি হাসান বিচারক হিসেবে যোগদানের আগে বিএনপির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। বিচারপতি হিসেবে যথেষ্ট সুনামের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ ও তার মিত্ররা দেশে অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। ঢাকায় লগি-বৈঠার আঘাতে প্রকাশ্যে মানুষ হত্যার ঘটনা ঘটে। অনেক পর্যবেক্ষকের মতে দেশে গৃহযুদ্ধাবস্থার মতো পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। বিচারপতি হাসান নিজেই প্রধান উপদেষ্টা হতে অস্বীকৃতি জানানোর পর সংবিধান নির্দেশিত প্রক্রিয়া পুরোপুরি অনুসরণ না করে তৎকালীন বিএনপি মনোনীত প্রেসিডেন্ট ইয়াজ উদ্দিন আহম্মদ নিজেই প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি একাধারে প্রেসিডেন্ট ও প্রধান উপদেষ্টা। আওয়ামী লীগ ও তার মিত্ররা তা মানেনি। সহিংসতা অব্যাহত থাকে। ড. আকবর আলি খান, অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল, শফি শামি— এই উপদেষ্টারা পদত্যাগ করলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। ওই প্রেক্ষাপটে ওয়ান-ইলেভেনের পরিবর্তন অনেকটা অনিবার্য হয়ে ওঠে। প্রেক্ষাপটটি এই কারণেই সামনে আনা দরকার যে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার কনসেপ্টটিকে প্রশ্নবিদ্ধ ও বিবর্ণ করে দেওয়া হয়েছিল। মইনউদ্দিন-ফখরুদ্দীনের সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নবম সংসদ নির্বাচনে ছিন্ন-ভিন্ন, ক্ষত-বিক্ষত ও কোণঠাসা বিএনপি ২৯-৩০টি সিট নিয়েই সন্তুষ্ট থেকেছে। ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাই বাতিল করে দেয়। এমন নয় যে, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে ভালো কোনো ব্যবস্থা অনুসরণের জন্য তারা কাজটি করেছে। প্রতিপক্ষের অভিযোগ, তারা ব্যবস্থাটি বাতিলের জন্য সংবিধান সংশোধন করেছে নির্বাচনে হস্তক্ষেপ ও প্রভাব বিস্তার করে জয়লাভের বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্য। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি কোনো নির্বাচনই হয়নি। তা ছিল কেলেঙ্কারিপূর্ণ। পাঁচটি সিটি নির্বাচন এবং উপজেলা নির্বাচনের প্রথম দুই ধাপ ছাড়া অন্য সব স্থানীয় সংসদ নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের উপরোক্ত ধারণাকে সত্য বলেই স্পষ্ট করে। বিএনপিসহ অন্যান্য সরকারবিরোধী দল এটা ভাবতেই পারে যে, আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ হবে না। তাই তারা নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নে বেশ সরব। সরকার সংবিধানের যে দোহাই দিচ্ছে তার সমালোচনায় বিএনপি বলছে, সংবিধানে এমন বিধান আগে ছিল না। এমন কি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ব্যবস্থা যখন ছিল না তখনো সংসদ বহাল রেখে, এমপিরা স্বপদে থেকে নির্বাচন করার বিধান ছিল না। আওয়ামী লীগ নবম সংসদে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে তাদের সুবিধার জন্য বিধানটি পাস করিয়ে নিয়েছে। এই বিধান অনুযায়ী নির্বাচনে ‘লেভেল-প্লেয়িং’ ফিল্ড থাকছে না। কেউ নির্বাচন করবেন এমপি পদের বাড়তি সুবিধা নিয়ে, আর বাকিরা করবেন সাধারণ প্রার্থী হিসেবে। অর্থাৎ ভিআইপি-নন-ভিআইপি, অসম প্রতিদ্বন্দ্বিতা। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক-বিশ্লেষকরাও বিএনপির এই অবস্থান যৌক্তিক বলে মনে করেন।

তবে পরিস্থিতি এই জায়গায় আটকে থাকবে বলে অনেকে মনে করেন না। সরকার ও সরকারি দল তাদের বর্তমান অবস্থানে অটল না থাকার সম্ভাবনাই বেশি। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম সংসদ নির্বাচনের আগেও লীগ সরকার ও শাসক লীগের অবস্থান এমনই ছিল। তখনো তাদের বক্তব্য ছিল যে, তাদের দলীয় সরকারের অধীনেই নির্বাচন হবে। কিন্তু পরে তারা অবস্থান পরিবর্তন করে বিরোধী দলের কাছে সর্বদলীয় সরকারের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, সরকারপক্ষ এবারও মত বদলাতে পারে। এবারের বাস্তবতা গেলবারের চেয়ে আরও ভিন্ন ও জটিল। গণতান্ত্রিক বিশ্বে গত জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পর্কে খারাপ যে ধারণার সৃষ্টি হয়েছিল এবং প্রায় সবাই প্রকাশ্যে সেই নির্বাচন সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছিল তাদের সে অবস্থান পরিবর্তন হয়নি বরং বাংলাদেশে একটি অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দেখতে সবাই উদগ্রীব। অনেকে তাদের এই মনোভাব সময়ে সময়ে ব্যক্তও করে চলেছে। সরকার উন্নয়নের যে কথা বলছে— (হ্যাঁ, দৃশ্যমান কিছু উন্নয়ন তো হচ্ছেই—) সে সম্পর্কে বলা হচ্ছে উন্নয়ন আর গণতন্ত্র সমান্তরাল রেখায় না থাকলে জবাবদিহিতাহীন ব্যবস্থায় মেগা-উন্নয়নে মেগা-দুর্নীতি হয়, সেই উন্নয়নের সুফল জনগণ ভোগ করতে পারে না। সরকারসংশ্লিষ্ট একটি বিশেষ শ্রেণি ও গোষ্ঠীই তা ভোগ করে। জনগণের কাছে জবাবদিহিতাহীন উন্নয়নের নামে ব্যাপক দুর্নীতি ও লুটপাটে সংশ্লিষ্টদের রক্ষার জন্য সরকার দৃষ্টিকটুভাবে আইনি ব্যবস্থাও গ্রহণ করে। দেশে শক্তিশালী গণতন্ত্র থাকলে আইনের শাসন নিশ্চিত হয় এবং তখনই উন্নয়নের সুফল ভোগ করতে পারে জনগণ। কেননা, গণতন্ত্রে সরকারকে পদে পদে জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হয়, সংসদে বিরোধী দলের ‘চাবুকের’ ভয় থাকে সরকারি দলের। ভারতের বিশ্বনন্দিত নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন সম্প্রতি বলেছেন, উন্নয়ন ও গণতন্ত্র হাত ধরাধরি করে চলতে হয়। দেশে গণতন্ত্র, সুশাসন ও জনগণের কাছে সরকারের নিয়মিত জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সংসদ। নির্বাচনটাই গণতন্ত্রের সবকিছু নয় সত্য, কিন্তু একটি অবিতর্কিত, প্রশ্নহীন নির্বাচন গণতন্ত্রের বাদবাকি উপাদানসমূহ নিশ্চিত করার ব্যাপারে অতীব গুরুত্বপূর্ণ। তাই গণতান্ত্রিক বিশ্বে নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর তীক্ষ নজর রাখা হয়।

আওয়ামী লীগের জাতীয় কাউন্সিলে এবং তার পরবর্তীকালেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘আগামী নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হোক তা আমি চাই না। ’ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনও যদি দশম সংসদ নির্বাচনের মতো বিতর্কিত, একতরফা ও প্রশ্নবিদ্ধ হয় তা হলে প্রধানমন্ত্রীর মাথা হেঁট হবে, বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হবে এবং উন্নয়ন সহযোগিতার প্রশ্নে বাংলাদেশ রাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্ত হবে— এই বিবেচনা বোধ থেকেই প্রধানমন্ত্রী তার গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্যটি করেছেন আগামী নির্বাচন সম্পর্কে— এমন একটা ধারণা করাই যেতে পারে। তাই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপিসহ সব দলের অংশগ্রহণে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করতে হলে সরকার ও সরকারি দলকে অবস্থান পাল্টাতে হবে। একইভাবে বিএনপি থেকেও যেসব কথাবার্তা বলা হচ্ছে তাদেরও হুঁশে আসতে হবে। আশার কথা হচ্ছে, দুই দলের তরফ থেকে নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নে যে সব বক্তব্য পাওয়া গেছে তা কোনো দলেরই নীতিগত অবস্থান নয়। আওয়ামী লীগ এমন কোনো সিদ্ধান্ত দলীয়ভাবে নেয়নি যে, পরিস্থিতি যাই হোক তাদের দলের সরকারের অধীনেই নির্বাচন হবে। আবার বিএনপিরও এমন কোনো সিদ্ধান্তের কথা জানা যায়নি যে, শেখ হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রী রেখে তারা নির্বাচনে যাবেই না। দুই দলের কিছু নেতা দলের সিদ্ধান্তের বাইরে নানা কথা বললেও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ও বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর উচ্চ রাজনৈতিক মানের কথাও বলছেন। যেমন ওবায়দুল কাদের বারবার বলছেন, বিএনপির জনসমর্থনকে ছোট করে দেখা যাবে না। তারা নির্বাচনে আসবে এবং তাদের মোকাবিলার জন্য দলের ও অঙ্গ দলের নেতা-কর্মীদের প্রস্তুতি নিতে হবে। তিনি অবশ্যই সাংগঠনিক ও রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলার কথা বলেছেন। অন্যদের মতো তুচ্ছতাচ্ছিল্য ভাব দেখাননি। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলামও নির্বাচনকালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে একটি সহায়ক সরকার গঠনের কথা বলেছেন। যিনি বা যারা বলছেন কেয়ামতের আগ পর্যন্ত শেখ হাসিনার অধীনে বিএনপি নির্বাচনে যাবে না বা তেমন নির্বাচন প্রতিহত করা হবে, এসব বক্তব্য তাদের মহাসচিবের বক্তব্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। দলের সিনিয়র নেতা ড. খোন্দকার মোশাররফ হোসেনও যুক্তিগ্রাহ্য কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, ‘নিরপেক্ষ সরকার প্রতিষ্ঠা করেই তারা নির্বাচনে যাবেন। হ্যাঁ, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সব দলের (মূল স্টেকহোল্ডার) প্রতিনিধি নিয়ে অথবা তাদের প্রস্তাবিত প্রতিনিধি নিয়ে একটি নিরপেক্ষ সর্বদলীয় সরকার বা নিরপেক্ষ সহায়ক সরকার হতেই পারে। সরকারপক্ষ থেকে ‘গিঁট লাগানো’ ব্যক্তিরা সংবিধানের প্রসঙ্গ টেনে বলতে পারেন, বিএনপি তো সংসদে নেই, তাদের নিয়ে কীভাবে সর্বদলীয় সরকার হবে বা প্রস্তাবিত অনির্বাচিত ব্যক্তিদের কীভাবে সহায়ক সরকারে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে! সদিচ্ছা থাকলে সংবিধানের প্রতি সম্মান রেখে জাতীয় জরুরি প্রয়োজনে সবার সম্মতিতে বাইরেও যাওয়া যেতে পারে। স্বৈরাচারের পতনের পর বিচারপতি সাহাবউদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়েছিল তার জন্য সংবিধানের বাইরে যেতে হয়েছিল। প্রধান বিচারপতি হিসেবে সাহাবউদ্দিন আবার স্বপদে ফেরত গিয়েছিলেন পঞ্চম সংসদ নির্বাচনের পর সংসদের প্রথম অধিবেশনে এই সংক্রান্ত একটি বিল পাসের মাধ্যমে। ওই ব্যবস্থার কোনো বিকল্প ছিল না। এখনো বিষয়টি সেভাবে দেখা যেতে পারে।

২০১৪ সালের নির্বাচনটি আদর্শ নির্বাচন ছিল না এ ব্যাপারে শাসকমহল ছাড়া আর কারও দ্বিমত নেই। কিন্তু তারপরও আলোচনা হয়, সেই নির্বাচনেও যদি বিএনপি অংশগ্রহণ করত শত কারচুপি ও প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের পরও তারা ১০০ প্লাস-মাইনাস আসন নিয়ে শক্তিশালী একটি বিরোধী দলের জায়গা করে নিতে পারত সংসদে। আসন সংখ্যা যদি আরও কমিয়েও দেওয়া হতো তারাই থাকত সংসদে বিরোধী দল। বিএনপি নির্বাচনে এলে জাতীয় পার্টির সঙ্গে সরকারের সমঝোতা হতো ক্ষমতা ভাগাভাগি করা নিয়ে, খয়রাতি মন্ত্রিত্ব আর গৃহপালিত বিরোধী দল বানানোর জন্য নয়। অর্থাৎ সংসদে মুখোমুখি থাকত আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। বিএনপি যদি সেই অবস্থানে থাকত বিভিন্ন মামলা-মোকদ্দমার নামে বেগম জিয়াকে এভাবে হয়রানি করা যেত? মাসে পাঁচ-সাতবার বা আরও বেশি তাকে আদালতে টানাহিঁচড়া করা সম্ভব হতো? দলের নেতা-কর্মীদের গুম, হত্যা, জেল-জুলুম, লক্ষাধিক মামলার জাঁতাকলে পিষ্ট হতে হতো? বিএনপি কি আগামী নির্বাচন প্রশ্নে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে দলের নেতা-কর্মীদের রাজনৈতিক দলন-পীড়ন থেকে রক্ষা করে ঘরে ফেরার সুযোগ সৃষ্টি করবে; সরকারের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যভাবের জবাব দেবে, ঘুরে দাঁড়াবে, নাকি কারও প্ররোচনায় আবারও ভুল করে দলের জন্য আরও বেশি বিপর্যয়কর পরিস্থিতি সৃষ্টি করবে? সম্ভাবনার দরজা খুলতে বিএনপিকে ঘুরে দাঁড়াতে হবে সাহস করে। নতুবা কি দলটি ওবায়দুল কাদেরের ভাষায় ‘নোটিস পার্টি’ হয়ে যাবে? রাজপথ ছেড়ে বিবৃতি আর সেমিনারে বক্তৃতাবাজিতে ধমক-ধমকিকেই তিনি ‘নোটিস’ বলে মন্তব্য করেছেন।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট

ই-মেইল : kazi.shiraz@yahoo.com

এই পাতার আরো খবর
up-arrow