Bangladesh Pratidin

ঢাকা, রবিবার, ১১ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : রবিবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:২০
শিক্ষকের কথা
শিক্ষকতা শুধু পেশা নয়, নেশাও হতে হবে
শিক্ষকতা শুধু পেশা নয়, নেশাও হতে হবে

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় সম্প্রতি প্রথমবারের মতো অনার্স ও মাস্টার্স প্রোগ্রাম রয়েছে দেশের এমন ৬৮৫টি কলেজের ওপর একটি র্যাংকিংস প্রকাশ করেছে। এতে খুলনা বিভাগের সেরা দশটি কলেজের একটি হচ্ছে যশোর সরকারি মহিলা কলেজ।

প্রতিষ্ঠানটির এ সাফল্যের পেছনে রহস্য কী, দেশের শিক্ষার সামগ্রিক মান বাড়াতে করণীয় কী, এক্ষেত্রে শিক্ষকদের ভূমিকা কী এবং একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শিক্ষার্থীদের কীভাবে প্রস্তুত  হওয়া উচিত এসব নিয়ে কথা বলেছেন কলেজটির অধ্যক্ষ প্রফেসর সেলিনা ইয়াসমিন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন যশোর প্রতিনিধি—সাইফুল ইসলাম সজল।

প্রশ্ন : জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথমবারের মতো দেশের সব কলেজের র্যাংকিংস প্রকাশ করেছে। বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখেন?

অধ্যক্ষ : বিষয়টিকে আমি ইতিবাচকভাবেই দেখছি। দেশের সব কলেজের র্যাংকিং করা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। এ কারণে কলেজগুলো তাদের নিজেদের অবস্থার উন্নতির জন্য সচেষ্ট হবে। যারা র্যাংকিংয়ে স্থান পেয়েছে তারা তালিকায় নিচের দিক থেকে উপরে উঠতে চেষ্টা করবে। যারা স্থান পায়নি তারা স্থান পেতে চেষ্টা চালাবে। এক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অন্য প্রতিষ্ঠানের প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হবে। ফলে শিক্ষার মান উন্নত হবে।

প্রশ্ন : কলেজ র্যাংকিংয়ে বিভাগীয় পর্যায়ে আপনার প্রতিষ্ঠান সেরা দশটির একটি। এই সফলতার পেছনে কোন কোন বিষয় ভূমিকা রেখেছে বলে আপনি মনে করেন?

অধ্যক্ষ : আমি মনে করি কলেজের সার্বিক কর্মকাণ্ড একটি টিম ওয়ার্কের মতো। ভালো ফলাফলের জন্য টিমের সবাইকে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে হয়। প্রশাসনের দক্ষ ব্যবস্থাপনা, শিক্ষকদের আন্তরিকতা, মেধা, শ্রম, ছাত্রীদের মেধা, মননশীলতা, শিক্ষার প্রতি অনুরাগ, কর্মচারীদের সহায়তা, অভিভাবকদের সচেতনতা, মাল্টিমিডিয়ার ব্যবহার, সহশিক্ষা কার্যক্রম তথা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও খেলাধুলার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের দেহ-মনের সুস্থ বিকাশ ঘটানো, সর্বোপরি শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষাবান্ধব একটি পরিবেশ এই সফলতার পেছনে ভূমিকা রেখেছে।

প্রশ্ন : বিগত বছরগুলোয় বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষার ফলাফলে আপনার প্রতিষ্ঠানের সাফল্য কেমন?

অধ্যক্ষ : বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষায় আমাদের ফলাফল যথেষ্ট ভালো। ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষে মাস্টার্স শ্রেণিতে মোট ৩৭ জন ছাত্রী প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়েছে।

প্রশ্ন : শিক্ষার গুণগত মান কীভাবে নিশ্চিত করা যায় বলে আপনি মনে করেন?

অধ্যক্ষ : শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করার জন্য প্রথমত শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। সে লক্ষ্যে দেশে বিদেশে প্রশিক্ষণ এবং প্রতিষ্ঠানে ইন-হাউস প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকা দরকার। বিদ্যমান প্রশিক্ষণের যে ব্যবস্থা আছে তা যথেষ্ট নয়। তাছাড়া প্রযুক্তির এই অগ্রগতির যুগে শিক্ষাকে আরও বেশি প্রযুক্তিনির্ভর তথা ডিজিটালাইজড করতে হবে। এক্ষেত্রে ইকুইপমেন্টসের স্বল্পতা আছে। সেজন্য কার্যকরি সরকারি পদক্ষেপ দরকার।

প্রশ্ন : দেশের শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন আছে। মান বাড়াতে হলে সংশ্লিষ্ট সবার করণীয় কী বলে আপনি মনে করেন?

অধ্যক্ষ : হ্যাঁ, সব ক্ষেত্রে শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত হচ্ছে না, এটা ঠিক। এজন্য মেধাবী শিক্ষকের স্বল্পতা, পেশাগত দায়িত্ব পালনে কিছু শিক্ষকের আন্তরিকতার অভাব এবং শিক্ষার্থীদের শিখনের প্রতি অমনোযোগ ও উদাসীনতা দায়ী বলে আমি মনে করি। এসব সমস্যা দূর হলে শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি পাবে।

প্রশ্ন : শিক্ষার মান বাড়ানোর ক্ষেত্রে শিক্ষকদের ভূমিকা কী?

অধ্যক্ষ : শিক্ষার মান বাড়ানোর জন্য শিক্ষকদের পেশাগত দায়িত্বের প্রতি আন্তরিক হতে হবে। শিক্ষকতা শুধু শিক্ষকের পেশা না, নেশাও হতে হবে। দক্ষ শিক্ষক হিসেবে নিজেদের প্রস্তুত করতে ব্যাপক পড়াশোনা ও প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে হবে।

প্রশ্ন : শিক্ষকদের মান নিয়েও প্রশ্ন আছে। এ থেকে উত্তরণে করণীয় কী?

অধ্যক্ষ : হ্যাঁ, শিক্ষা বিভাগে মেধাবী শিক্ষকের অভাব আছে। কারণ মেধাবী ছাত্ররা বর্তমানে শিক্ষা বিভাগে আসতে আগ্রহী হচ্ছে না। তার কারণ শিক্ষকদের মর্যাদার কথা মুখে মুখে বলা হলেও বাস্তবে শিক্ষকতা পেশা নানা কারণে আকর্ষণহীন হয়ে পড়েছে। শিক্ষকতা পেশাকে লাভজনক ও আকর্ষণীয় করতে হবে। তাছাড়া বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে অযোগ্য, অদক্ষ, মেধাহীন ব্যক্তিদের অসৎ পন্থায় নিয়োগ বন্ধ করতে হবে।

প্রশ্ন : মূল্যবোধের অবক্ষয় এখন সমাজের সর্বস্তরে প্রতীয়মান হচ্ছে। এর উন্নয়নে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কী ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন?

অধ্যক্ষ : মূল্যবোধের অবক্ষয় এখন একটা বৈশ্বিক সমস্যা। এই অবক্ষয়ের হাত থেকে বাঁচতে হলে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকার সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। আমাদের প্রতিষ্ঠানে আমরা ছাত্রীদের নীতি-নৈতিকতা সম্পর্কে জ্ঞানদান করি, আদর্শ ব্যক্তিদের জীবনী থেকে উদ্ধৃতি দেই, তাদের আদর্শ অনুসরণ করতে উদ্বুদ্ধ করি। ধর্মের সঠিক অনুশাসন জানাতে ও বোঝাতে চেষ্টা করি।

প্রশ্ন : সহশিক্ষা কার্যক্রম শিক্ষার মান উন্নয়ন ও শিক্ষার্থীদের মাঝে মানবিক মূল্যবোধের বিকাশের ক্ষেত্রে কীভাবে ভূমিকা রাখে?

অধ্যক্ষ : লেখাপড়ার পাশাপাশি সহশিক্ষা কার্যক্রম একটি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের সুস্থ দেহ-মনের বিকাশে সাহায্য করে। পাশ্চাত্য সংস্কৃতি যখন তার বিষদাঁত আমাদের সংস্কৃতির বুকে বসিয়ে দিয়েছে, তখন আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির ঐশ্বর্যের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের ঘনিষ্ঠ পরিচয়, পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রভাবমুক্ত হয়ে আমাদের শিক্ষার্থীদের মানবিক মূল্যবোধের বিকাশে ভূমিকা রাখবে।

প্রশ্ন : স্কুল-কলেজে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে আপনার উপদেশ কী?

অধ্যক্ষ : স্কুল-কলেজে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে আমার উপদেশ,  বর্তমান যুগে তোমাদের জন্য অপার সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত। তোমরা আজ মোবাইল, ফেসবুক, ইন্টারনেট ব্যবহার করছ। বিশ্ব তোমাদের হাতের মুঠোয়। তবে এগুলো যেন তোমাদের জীবনে আশীর্বাদ নিয়ে আসে, অভিশাপ না হয়। চারিত্রিক দৃঢ়তা, সততা, নিষ্ঠা, স্বাতন্ত্র্যবোধ বজায় রাখবে। লেখাপড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানবিক গুণাবলির বিকাশ ঘটিয়ে দেশাত্মবোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে নিজেকে তৈরি করবে। দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি জানবে, কারণ তোমরাই এদেশের আগামী দিনের কর্ণধার।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow