Bangladesh Pratidin

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৪ আগস্ট, ২০১৭

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৪ আগস্ট, ২০১৭
প্রকাশ : শনিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ২৩:৫৮
শিক্ষকের কথা
শুধু সার্টিফিকেট নয়, মন-মানসিকতায় আলোকিত মানুষ হতে হবে
শুধু সার্টিফিকেট নয়, মন-মানসিকতায় আলোকিত মানুষ হতে হবে

এইচএসসি ছাড়াও অনার্স ও মাস্টার্স প্রোগ্রাম রয়েছে দেশের এমন ৬৮৫টি কলেজের ওপর সম্প্রতি জাতীয়  বিশ্ববিদ্যালয় একটি র্যাংকিংস প্রকাশ করেছে। কলেজগুলোর সার্বিক শিক্ষার মান মূল্যায়নের লক্ষ্যে এটাই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম কোনো উদ্যোগ।

র্যাংকিংয়ে রংপুর বিভাগের সেরা দশটি কলেজের একটি রংপুর কারমাইকেল কলেজ। প্রতিষ্ঠানটির এ সফলতার পেছনে রহস্য কী, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সামগ্রিক মান উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট সবার করণীয় কী, শিক্ষকদের মান কীভাবে বাড়ানো যায়, সহশিক্ষা কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের সার্বিক বিকাশে কীভাবে ভূমিকা রাখে এবং একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তাদের কীভাবে প্রস্তুত হওয়া উচিতসহ শিক্ষা সংশ্লিষ্ট নানা বিষয় নিয়ে আমাদের ধারাবাহিক আয়োজনে আজ কথা বলেছেন কলেজটির অধ্যক্ষ অধ্যাপক বিনতে হুসাইন নাসরিন বানু। সাক্ষাৎকার নিয়ে নিজস্ব প্রতিবেদক, রংপুর— শাহজাদা মিয়া আজাদ।  

 

প্রশ্ন : জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথমবারের মতো দেশের সব কলেজের র্যাংকিংস প্রকাশ করেছে। বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখেন?

অধ্যক্ষ : এটি অবশ্যই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ভালো উদ্যোগ। কারণ এতে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সবদিক ভালো করার একটি সুস্থ প্রতিযোগিতা শুরু হবে। এতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের মান উন্নয়নের লক্ষ্যে সচেষ্ট হবে। এ লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষক, শিক্ষার্থীসহ সংশ্লিষ্ট সবকিছুর মান বাড়াতে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করবে। এতে করে প্রতিষ্ঠানগুলোর মান নিশ্চিতভাবে বাড়বে বলে আমি মনে করি। এরই অংশ হিসেবে আমরাও ভবিষ্যতে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণে আগ্রহী হব।

প্রশ্ন : কলেজ র্যাংকিংয়ে বিভাগীয় পর্যায়ে আপনার প্রতিষ্ঠান সেরা দশটির একটি। আপনার প্রতিষ্ঠানের এই সফলতার পেছনে রহস্য কী?

অধ্যক্ষ : কারমাইকেল কলেজ দেশের একটি ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। বর্তমান সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে এ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ সংশ্লিষ্ট সবাই নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। ফলে প্রশাসনের সঠিক দিকনির্দেশনা, শিক্ষক এবং সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতার কারণেই হয়তো এটি সম্ভব হয়েছে।

 

প্রশ্ন : বিগত বছরগুলোয় বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষার ফলাফলে আপনার প্রতিষ্ঠানের সফলতার কারণ কী?

অধ্যক্ষ: প্রতিটি বিভাগে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন এবং বিভাগের শিক্ষকদের ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি করে শিক্ষার্থীদের ক্লাসে উপস্থাপনের ফলে শিক্ষার্থীরা খুব সহজেই অনুধাবন করতে পারে। তাছাড়া নিয়মিত ইনকোর্স পরীক্ষা, সমন্বিতভাবে প্রস্তুতিমূলক পরীক্ষা গ্রহণ— সবকিছুই হয়তো শিক্ষার্থীদের ভালো ফলাফলে সহায়তা করেছে। সেইসঙ্গে নিয়মিত শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সংশ্লিষ্ট সবার কার্যক্রম নিয়মিত মনিটর করা হয়। শিক্ষা সহায়ক বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণের ফলেই আমাদের এ সফলতা এসেছে।

প্রশ্ন : শিক্ষার গুণগতমান কীভাবে নিশ্চিত করা যায় বলে আপনি মনে করেন?

অধ্যক্ষ : শিক্ষার গুণগতমান নিশ্চিত করতে প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট সবাইকে আন্তরিক হতে হবে। শিক্ষার্থীদের সমস্যাগুলো ধৈর্য সহকারে শুনে সমাধানের পথগুলোর সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে হবে। শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকের মধ্যে বন্ধুসুলভ আচরণের পরিবেশ তৈরি করতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে কলেজ প্রশাসনের মনিটরিং বৃদ্ধি করতে হবে। শিক্ষা উপকরণের যথাযথ ব্যবহার এবং শিক্ষা ব্যবস্থাপনার সঠিক মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গুণগত মান বৃদ্ধি করা যায়।

প্রশ্ন : দেশের শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন আছে। মান বাড়াতে হলে সংশ্লিষ্ট সবার করণীয় কী বলে আপনি মনে করেন?

অধ্যক্ষ : দেশের শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি করতে হলে শিক্ষা সংশ্লিষ্ট সবারই সহযোগিতা প্রয়োজন। শিক্ষার্থীদের জন্য যুগোপযোগী সিলেবাস প্রণয়ন, শিক্ষকদের জন্য যথাযথ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা এবং শিক্ষা উপকরণ ব্যবহারের মাধ্যমে গুণগতমান বৃদ্ধি করা সম্ভব।

প্রশ্ন : শিক্ষার মান বাড়ানোর ক্ষেত্রে শিক্ষকরা কি ভূমিকা রাখতে পারে বলে আপনি মনে করেন?

অধ্যক্ষ : শিক্ষার মান বাড়ানোর ক্ষেত্রে শিক্ষকদের ভূমিকাই অগ্রগণ্য। আমার নিজের শিক্ষকতা জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, একজন ভালো শিক্ষককেই শিক্ষার্থীরা মডেল হিসেবে গ্রহণ করে। তাই শিক্ষকরা যদি আন্তরিক এবং সহনশীল হয়ে শিক্ষার্থীদের কাছে জটিল বিষয়গুলো উপস্থাপন করেন তবে শিক্ষার্থীরা অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে তা গ্রহণ করবে। শিক্ষার্থীদের জ্ঞানের পরিধি বৃদ্ধি পেলেই তাদের নৈতিক মনোবল বৃদ্ধি পাবে। এজন্য আমি মনে করি শিক্ষার মান বৃদ্ধির জন্য শিক্ষকদেরই অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।

প্রশ্ন : শিক্ষকদের মান নিয়েও প্রশ্ন আছে। এ থেকে উত্তরণে করণীয় কী?

অধ্যক্ষ : শিক্ষকদের মান নিয়ে প্রশ্ন থাকতেই পারে। তবে আমাদের মতো সরকারি কলেজসমূহের প্রায় সব শিক্ষকই বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে শিক্ষকতার পেশায় যোগদান করেন। বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে যারা শিক্ষকতা পেশায় যোগদান করেন তাদের মান নিয়ে প্রশ্ন করা আমার কাছে বাহুল্য মনে হয়। তবে হ্যাঁ, এসব শিক্ষকের যথাযথ প্রশিক্ষণ এবং আধুনিক শিক্ষা উপকরণ সরবরাহ করতে পারলে তাদের দক্ষতা অনেকাংশে বৃদ্ধি পাবে। তবে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যে পদ্ধতিতে শিক্ষক নিয়োগ করা হয় সেক্ষেত্রে মানের বিষয়ে প্রশ্ন আসতেই পারে। আমার কথা এই যে, বর্তমান সরকার শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রাচীন পদ্ধতিতে থেকে বের হয়ে আসার পথ খুঁজে পেয়েছে। এনটিআরসিএ কর্তৃক বাছাইকৃত শিক্ষকদের মেধা এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগদানের মাধ্যমেই শুধু এ সমস্যা থেকে উত্তরণ হতে পারে।

প্রশ্ন : মূল্যবোধের অবক্ষয় এখন সমাজের সর্বস্তরে প্রতীয়মান হচ্ছে। এর উন্নয়নে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কী ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন?

অধ্যক্ষ : সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় বর্তমান সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই অবস্থা থেকে বের হতে না পারলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ভয়াবহ অবস্থার মধ্যে পড়বে। এর উন্নয়নে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করা উচিত। আমি আমার শিক্ষকদের এ বিষয়ে শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে সচেতনতা সৃষ্টি করার জন্য নির্দেশনা দিয়েছি। বিশেষ করে উঠতি বয়সের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সুযোগ পেলেই আমরা কলেজ প্রশাসন থেকে বিভিন্ন সেমিনার, সিম্পোজিয়াম এবং কর্মশালার আয়োজন করে থাকি। সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে আলোচনা করে শিক্ষার্থীদের সামাজিক সচেতনতা আরও কীভাবে বৃদ্ধি করা যায় সে বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়।  

প্রশ্ন : সহশিক্ষা কার্যক্রম শিক্ষার মান উন্নয়ন ও শিক্ষার্থীদের মাঝে মানবিক মূল্যবোধ বিকাশের ক্ষেত্রে কীভাবে ভূমিকা রাখে?

অধ্যক্ষ : সহশিক্ষা কার্যক্রম একজন শিক্ষার্থীর মানবিক মূল্যবোধ বিকাশ ঘটাতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একজন শিক্ষার্থীকে পাঠ্যপুস্তকের শিক্ষার পাশাপাশি সহশিক্ষা হিসেবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বিতর্ক, সেমিনার, ক্রীড়া ইত্যাদি বিষয়ের চর্চা করতে হবে। এগুলোর যত বেশি চর্চা হবে ততই শিক্ষার্থীরা উপকৃত হবে।

প্রশ্ন : আপনার শিক্ষা জীবনের কোনো মধুর স্মৃতি থাকলে বলুন।

অধ্যক্ষ : শিক্ষা জীবনের অনেক মধুর স্মৃতি আছে। স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের অনেক স্মৃতি। তবে একটি স্মৃতির কথা আমার সবসময় বিশেষ করে বান্ধবীদের সঙ্গে কথা বললেই সে স্মৃতিটাই আগে আসে। আর সেটি হলো- রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের সময় রোকেয়া হলে ছিলাম। পিকনিকে যাব। সব ঠিকঠাক। বান্ধবীরা মিলে স্টেশনে গিয়ে দেখি নির্ধারিত ট্রেন চলে গেছে। পরে অবশ্য অনেক কষ্ট করে পিকনিকে উপস্থিত হয়েছিলাম।

প্রশ্ন : স্কুল-কলেজে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে আপনার উপদেশ কী?

অধ্যক্ষ : শুধু সার্টিফিকেট নয়, মন-মানসিকতায় আলোকিত মানুষ হতে হবে। তোমাদের আলোতে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র এবং বিশ্ব সমাজ যেন আলোকিত হয়। সেজন্য শুধু পাঠ্যবই নয়, তোমাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি, মুক্তিযুদ্ধ, বিখ্যাত মনীষীদের জীবনীসহ শিক্ষা সহায়ক অন্যান্য বই পড়ার অভ্যাস গড়তে হবে। নিয়মিত স্কুল-কলেজের লাইব্রেরিতে গিয়ে   শিক্ষা সহায়ক বিভিন্ন বই পড়ার চেষ্টা করতে পার। এতে তোমাদের সার্বিক বিকাশ ঘটবে। ফলে তোমরা সমাজ ও জাতির উন্নয়নে অংশীদার হওয়ার অনুপ্রেরণা পাবে। মনে রাখবে, ছাত্রজীবনে নিয়মিত সর্বোচ্চ পড়াশোনার বিকল্প নেই। এমনটি হলেই কেবল ভবিষ্যতে তোমরা উজ্জ্বল জীবন গড়তে সক্ষম হবে। নিয়মিত অধ্যবসায়সহ পড়াশোনা চালিয়ে যাও, সফলতা তোমাদের জীবনে আসবেই।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow