Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : সোমবার, ৭ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ৬ মার্চ, ২০১৬ ২৩:৩৭
দেশে সোয়া দুই কোটির বেশি মানসিক রোগী
অনুপাতে চিকিৎসক নেই - সামনের দশকে ভয়াবহ হবে পরিস্থিতি
জিন্নাতুন নূর

দেশে প্রায় সোয়া দুই কোটিরও বেশি মানুষ মানসিক রোগে আক্রান্ত। খোদ জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট দিয়েছে এই তথ্য। মানসিক রোগীর এই সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। দেশের মনোরোগের চিকিৎসকরা বলছেন, আগের চেয়ে তাদের কাছে এখন মানসিক রোগে আক্রান্তরা বেশি আসছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানসিক রোগ বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে এখন পারিবারিক হত্যাকাণ্ড ও পৈশাচিকভাবে শিশু হত্যার ঘটনাগুলোও বেশি ঘটছে। কিন্তু সরকার বরাবরই এই রোগে আক্রান্তদের অবহেলা করে আসছে। এ কারণে সারা দেশে মানসিক রোগের চিকিৎসক আছেন মাত্র ২৫০ থেকে ৩১০ জন। আর মনোবিজ্ঞানীর সংখ্যা আরও কম। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, মানসিক রোগের বিস্তার যাতে না হয় এ জন্য সরকারকে শিগগিরই মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ১৮ বছরের নিচে এবং ১৮ বছরের উপরের মানুষদের ওপর দুটি গবেষণা করে। গবেষণায় দেখা যায়, ১৮ বছরের উপর ১৬% মানুষ মানসিক রোগে আক্রান্ত। অর্থাৎ ১০০ জনের মধ্যে ১৬ জনেরই মানসিক রোগ আছে। আরেকটি গবেষণার তথ্য, ১৮ বছরের কম বয়সীদের মধ্যে মানসিক রোগীর সংখ্যা ১৮%। বিশেষজ্ঞরা জানান, এই রোগীদের জন্য সরকারি ও বেসরকারি খাতে দেশে প্রশিক্ষিত জনবলের যথেষ্ট অভাব। আর যথাযথ চিকিত্সাও নেই। ফলে অতিমাত্রায় বিষণ্ন রোগীরা আত্মহত্যার দিকে ঝুঁকছেন। তারা বলছেন, সামাজিক অস্থিরতা, প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ক্ষেত্রে অসম প্রতিযোগিতা, অল্প সময়ে ধনী হওয়ার জন্য অনৈতিক পথে অর্থ উপার্জন, বিদেশি ড্রামা-সিরিয়ালের কুপ্রভাব, সামাজিক ও পারিবারিক বন্ধন কমে যাওয়া, যৌথ পরিবারে ভাঙন এবং মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কারণে বাংলাদেশে মানসিক রোগীর সংখ্যা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাদের মতে, পাশ্চাত্য বিশ্বের দেশগুলোতে সাধারণত মা-বাবা কর্তৃক সন্তানের হত্যা বা সন্তান কর্তৃক অভিভাবকদের হত্যার বিষয়টি বেশি ঘটতে দেখা যায়। কিন্তু আশঙ্কাজনক হলেও বিগত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের একদিকে যেমন অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি হচ্ছে অন্যদিকে মানুষের মানসিক অবস্থার অবনতি ঘটছে। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, সাধারণত তরুণ প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের অতিরিক্ত মোবাইলে কথপোকথন, সম্পর্কে অবিশ্বাস, মাদকাসক্তি, একাধিক সম্পর্ক স্থাপন, পারিবারিক সহিংসতা,পরকীয়ার ফলে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মনোমালিন্য এবং সম্পর্কে প্রতারিত হওয়ার ফলেও মানসিক রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বৃদ্ধি পাচ্ছে। মনোরোগ চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. এম. এ মোহিত কামাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, তিনি দৈনিক গড়ে ৩০ জন রোগীর মধ্যে পাঁচজনই অতিরিক্ত বিষণ্নতায় আক্রান্ত রোগী পান। একজন ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে বিষণ্নতায় ভুগে তারপর পরিকল্পনা করে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। বিষণ্নতা বিষয়ে দেশে কোনো সচেতনতা নেই। বর্তমানে উচ্চতর জীবনের হাতছানির অসম প্রতিযোগিতায় মানুষের মধ্যে হতাশা ও বিষণ্নতা দানা বাঁধছে। ফলে তারা সামাজিক অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. নজরুল ইসলাম বলেন, সমাজে যারা বর্বর হত্যাকাণ্ডের মতো অপরাধে জড়িত, তারা অধিকাংশই মনোবৈকল্যে ভুগছে। এরা মানসিক বিকারগ্রস্ত রোগী। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ডা. মো. গোলাম রাব্বানী বলেন, আগের তুলনায় দেশে মানসিক রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। দিন দিন এ অবস্থা আরও খারাপ হচ্ছে। সাধারণত দুইভাবে রোগীরা মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়। বায়োলজিক্যালভাবে মা-বাবার কাছ থেকে এবং সামাজিকভাবে মা-বাবার সম্পর্কের অবনতি ঘটলে শিশুরা এই রোগে আক্রান্ত হয়। শিশুদের পৈশাচিকভাবে হত্যার কারণে তাদের মধ্যে ‘চ্যানেলাইজ এগ্রেশন’ তৈরি হচ্ছে। এজন্য তাদের মধ্যে বিষণ্নতা ও নানা রকম মানসিক সমস্যা তৈরি হচ্ছে। আগের চেয়ে মানুষের চাহিদা বেড়ে গেছে। মানুষ এখন দ্রুত প্রতিষ্ঠার পেছনে ছুটছে। পিতা-মাতার মধ্যে সম্পর্কের অবনতি ঘটছে। এজন্য মানসিক সমস্যাও বেড়ে যাচ্ছে। যৌথ পরিবার ভেঙে এখন একক পরিবার হওয়ায় মানুষ আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে। এছাড়া সোশ্যাল মিডিয়ার কুপ্রভাব এবং সিনেমায় গঠনমূলক কিছু না থাকায়, গল্প-উপন্যাসে কাল্পনিক বিষয় পাঠ করায় মানুষ অস্বাভাবিক আচরণ করছে। মনোবিজ্ঞানী অধ্যাপক মেহতাব খানম বলেন, তরুণ প্রজন্ম বর্তমানে একটি অস্থির সমাজ ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে সময় পার করছে। যুবকরা এখন সহজেই সহিংসতামূলক আচরণে প্রলুব্ধ হচ্ছে। মোবাইল-ইন্টারনেট প্রযুক্তির অপব্যবহারের মাধ্যমে যুবকরা শিশু হত্যার মতো নেতিবাচক আচরণে প্রলুব্ধ হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, পরিস্থিতি সামাল দিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজন। একই সঙ্গে ক্যাবল টিভিতে বিভিন্ন বিদেশি চ্যানেলে প্রচারিত অনুষ্ঠানমালা থেকে মানুষ নেতিবাচক কিছু শিখছে কিনা তা লক্ষ্য রাখতে হবে। বাধ্যতামূলকভাবে প্রতি সিটি, পৌরসভা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডের কাউন্সিলরদের পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধে কাউন্সিলিংয়ের উদ্যোগ নেওয়া উচিত। আর এ ব্যাপারে কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে স্থানীয় সরকার ও মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এ এ এম আমানউল্লাহ বলেন, বিষণ্নতা থেকে রেহাই পেতে জীবন দক্ষতামূলক বিষয়গুলোর ওপর জোর দিতে হবে। সমাজসেবা অধিদফতরসহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর চলমান প্রকল্পে অসহায় নারীদের নৈরাজ্যজনক অবস্থা থেকে ফিরিয়ে আনতে সেবাদানকারী কেন্দ্র চালু করতে হবে। সমাজে বর্তমানে যে পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে তার সঙ্গে পরিবারগুলো তাল মেলাতে পারছে না। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বিরাজ করছে অসম প্রতিযোগিতা। ধনী হওয়ার স্বপ্নে বিভোর একটি শ্রেণি তাদের মূল্যবোধ হারাচ্ছে। আর এ অবস্থার জন্য রাষ্ট্রের উদাসীনতা দায়ী। সব মিলিয়ে সামাজিক, রাজনৈতিক, মিডিয়া, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসা ও সাংস্কৃতিক অস্থিরতায় মানুষ ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ছে। এতে সামাজিক সম্পর্কে ভাঙন দেখা দিচ্ছে। তার মতে, দেশে সামাজিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা বা উন্নতিতে কোনো পূর্ব-পরিকল্পনা নেই। শুধু রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিষয়ে আলোচনা না করে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও সুশীল সমাজকে জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে নিজ নিজ জায়গা থেকে সামাজিক অপরাধ প্রতিরোধে এগিয়ে আসতে হবে। এখনই যদি এ বিষয়ে ঐকমত্য তৈরি করা না যায় তবে আগামী ১০ বছরে দেশে মানসিক ব্যাধি ভয়াবহ রূপ নেবে।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow