Bangladesh Pratidin

ঢাকা, সোমবার, ২১ আগস্ট, ২০১৭

ঢাকা, সোমবার, ২১ আগস্ট, ২০১৭
প্রকাশ : শুক্রবার, ১০ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০ টা আপলোড : ৯ মার্চ, ২০১৭ ২৩:৩৫
প্রাইভেট সেক্টরের উন্নয়নে আন্তরিকতার ঘাটতি আছে
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রাইভেট সেক্টরের উন্নয়নে আন্তরিকতার ঘাটতি আছে
ড. জামালউদ্দিন আহমেদ

বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক ড. জামালউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, প্রাইভেট সেক্টরের উন্নয়নে সরকারের আন্তরিকতার ঘাটতি রয়েছে। সরকারের উচ্চপর্যায়ে যে সিদ্ধান্ত হয়, বাস্তবায়ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা সেটি ঠিকভাবে করেন না।

তাদের জ্ঞানের অভাব আছে, এমনকি আন্তরিকতারও ঘাটতি আছে। গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন।

ড. জামাল উদ্দিন বলেন, প্রাইভেট সেক্টরের আমূল পরিবর্তন ছাড়া প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা বা মধ্যম আয়ের দেশ গড়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না। দেশের আর্থিক প্রবৃদ্ধিতে প্রধান ভূমিকা প্রাইভেট সেক্টরের। সরকার মধ্যম আয়ের দেশ গড়ার যে পরিকল্পনার কথা বলছে, সেটা করতে হলে বিনিয়োগ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করতে হবে। শুধু মুখের কথায় এটা করা যাবে না। ব্যাংকিং সিস্টেমে যেভাবে দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা রয়েছে, এটা পুরো আর্থিক কাঠামোতে সমস্যা সৃষ্টি করছে। তিনি বলেন, যে কোনো প্রকল্প বাস্তবায়নে একটি স্ট্যাডি করতে হয়। বাংলাদেশে কোনো স্ট্যাডি ছাড়াই প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। ফলে প্রকল্প শেষ হতে বা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে দেখা যায় ভুল পদ্ধতিতে কাজ করা হচ্ছে। তিনি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক প্রকল্প ও মগবাজার ফ্লাইওভার প্রকল্পের উদাহরণ দিয়ে প্রশ্ন রেখে বলেন, কারা এই কাজ করল? কিংবা কারা স্ট্যাডি করল? ফ্লাইওভার করার পর এখন বলা হচ্ছে, ভুল হয়েছে। এটা কীভাবে সম্ভব?  কারণ কোনো ধরনের স্ট্যাডি ছিল না। যে স্ট্যাডি করা হয়েছিল, সেটা যারা করেছে তারা কিছু না বুঝে দুর্নীতি করে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জামাল উদ্দিন বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক নির্মাণের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সমস্যা তৈরি হয়েছে। এই সড়কটি করতে ১৬ বছর লেগেছে। অথচ এটা দুই-তিন বছরের বেশি লাগার কথা নয়। এত বেশি সময় ধরে রাষ্ট্রের যে লোকসান হলো, সেটা কে বহন করবে? প্রতিদিন কোটি কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। তিনি বলেন, প্রকল্প স্ট্যাডির ক্ষেত্রে দেখা যায় খুব দ্রুত করে ফেলে। জাপান, কোরিয়ার মতো দেশগুলো স্ট্যাডির ক্ষেত্রে কমপক্ষে দুই বছর লাগে। আমাদের এখানে সেটা কয়েক মাসে করা হয়। এতেই বোঝা যায় এরা আন্তরিক নয়। ফলে অনেক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। অর্থনীতি সমিতির সাধারণ সম্পাদক বলেন, আমাদের উচ্চপর্যায়ের আন্তরিকতা আছে। তাদের সিদ্ধান্ত সঠিকভাবেই হয়। কিন্তু বাস্তবায়ন পর্যায়ে যারা কাজটি করেন সেটা খুবই দুর্বলভাবে করেন। তাদের মধ্যে জ্ঞানের অভাব রয়েছে, আন্তরিকতার ঘাটতি রয়েছে। এ ছাড়া প্রযুক্তি যত পুরনো হবে, সেটা দুর্বল হয়ে যায়। নতুন প্রযুক্তি চলে আসে। বাস্তবায়ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা সেটা না বুঝেই কাজ করেন। ফলে খরচ ও সময় অনেক বেশি লাগে। জামাল উদ্দিন বলেন, এখন বলা হচ্ছে, এনএলজি টার্মিনাল করা হবে। কোনো স্ট্যাডি, গবেষণা ছাড়াই সেটা করার তোড়জোড় শুরু হয়েছে। বলা হচ্ছে, ২০২০ সালের মধ্যে চাহিদার ১০০ ভাগ বিদ্যুত্ উৎপাদন করা সম্ভব হবে। কীভাবে সম্ভব? এর পরিবেশ ঝুঁকি, প্রযুক্তি সক্ষমতা, ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা কি আছে? সেটা নিয়ে কোনো গবেষণা নেই। যা করা হচ্ছে, সেটা আন্তর্জাতিক মানের যে গবেষণা তার সঙ্গে কোনো মিল নেই। এমন সিদ্ধান্ত যখন বাস্তবায়ন করবে তখন দেশের উপকার না হয়ে ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়ে যায়। তিনি বলেন, ২০০৪-০৫ সালের দিকে চট্টগ্রামে একটি শিল্প সম্ভাবনার ওপর জাইকার নেতৃত্বে স্ট্যাডি হয়েছিল। তাদের দুই বছরের বেশি সময় লেগেছে। জাপানের মতো দেশের যদি দুই বছরের বেশি সময় লাগে আর আমাদের এখানে কোনো গবেষণা ছাড়াই করা হয়।   তিনি আরও বলেন, প্রাইভেট খাতে উন্নয়নের জন্য অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ রাষ্ট্রকে করতে হবে। রাষ্ট্র যদি সুবিধা তৈরি করে দিতে না পারে প্রাইভেট খাত এগুবে না। এই খাতের উন্নয়নের জন্য যে মহাপরিকল্পনা প্রয়োজন, সেটা কোথাও নেই। শুধু কথাই বলা হচ্ছে। দেশের বর্তমান যে কর্মসংস্থান তার প্রায় পুরোটাই প্রাইভেট সেক্টরের অবদান। এই প্রাইভেট সেক্টরের ব্যাপারে আরও বেশি আন্তরিকতার সঙ্গে পদক্ষেপ নিতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এই পরিচালক বলেন, দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা ভঙ্গুর হয়ে আছে। এটা যে অব্যবস্থাপনার ওপর দাঁড়িয়ে আছে, তাই কোনোভাবেই বিনিয়োগ সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। পুরো খাত দাঁড়িয়ে আছে দুর্নীতি, অনিয়ম ও জালিয়াতির ওপর। কথা হচ্ছে, কারা চালায় এই ব্যাংক। তিনি বলেন, দুটি ভাগ রয়েছে ব্যাংকে। সরকারি খাত ও বেসরকারি খাত। সরকারি খাতের ব্যাংকগুলোতে ব্যবস্থাপনা নিয়োগ দেয় সরকার। যারা ব্যবস্থাপনায় নিয়োগ পান, তাদের যোগ্যতা নিয়ে অনেক প্রশ্ন রয়েছে। আত্মীয়করণ, অদক্ষ ব্যক্তিদের নিয়োগ দিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো ধ্বংস করে দেওয়া হচ্ছে। প্রত্যেকটি ব্যাংক যে খাতে বিনিয়োগ করে সেগুলোর কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই। তিনি বলেন, ব্যাংকগুলোর যারা পরিচালক তারা সরকারি আমলা। রিটায়ার্ড আমলারা ব্যাংকিং সিস্টেমের কী বোঝেন? ব্যাংকগুলোতে হাজার হাজার কোটি টাকা আমানত রয়েছে। এর অর্ধেকেরও কম ঋণ দেওয়া হয়। এখন এই ঋণ দিয়ে কীভাবে মুনাফা করবে? আমানতকারীদের মুনাফা দিতে হলে ব্যাংকের কী থাকবে? তিনি বলেন, ব্যাংক খাতে এখন চরম অব্যবস্থাপনা চলছে। এখান থেকে বের হতে না পারলে যে লক্ষ্যের কথা বলা হচ্ছে তা কাগজে কলমে থাকবে। বাস্তবায়ন হবে না।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow