Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শুক্রবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : রবিবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ২৩:৪৮
শিশুপল্লীতে অন্য রকম ঈদ
শেখ সফিউদ্দিন জিন্নাহ্, শ্রীপুর
শিশুপল্লীতে অন্য রকম ঈদ

শ্রীপুরের তেলিহাটির টেংরা এলাকায় শিশুপল্লী প্লাস। ৫১ বিঘা জমির ওপর সবুজে ঘেরা এ পল্লীতে ঈদের আগের দিন থেকে শুরু হয় উৎসব।

আশ্রিতদের জন্য নানা বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। তাই এবারও এখানকার শিশুদের মুখে ছিল হাসি, ছিল অন্য রকম ঈদের আনন্দ।

শুরুটায় ছিল এক কাহিনী। ব্রিটিশ নাগরিক পেট্রিসিয়া কার, ব্রিটিশ এয়ারওজের ক্রু। ১৯৮১ সালের শুরুর  দিকে একদিন ফ্লাইট বিরতিতে ঢাকায় কাটান। তিনি ফার্মগেট ইন্দিরা রোডে অবস্থিত ফ্যামিলি ফর চিলড্রেন নামের আশ্রয় কেন্দ্রে যান। সেখানে অবলোকন করেন অন্য রকম দৃশ্য। ওই প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলার সময় দেখতে পান এক মা তার বুক খালি করে শিশু সন্তানকে ওই কেন্দ্রে ভর্তি করে রেখে যাচ্ছেন। ওই সময় মা কান্নায় ভেঙে পড়েন। সন্তানকে ছেড়ে যেতে খুব কষ্ট হচ্ছিল তার। তখন ব্রিটিশ এই নাগরিক পেট্রিসিয়া একটি শিশু আশ্রয় কেন্দ্র গড়ে তোলার ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ হন। তিনি এ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কিছু দিন কাজ করে শ্রীপুরের তেলিহাটির টেংরা এলাকায় শিশুপল্লী প্লাস গড়ে তোলেন। গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার টেংরা এলাকার সেই শিশুপল্লীতে প্রতিবছরের মতো এবারও অন্যরকম ঈদ উদযাপন করেছেন আশ্রিত অসহায় মা ও শিশুরা। ঈদের দিন সকালে সমাজের অবহেলিত সুবিধাবঞ্চিত শিশু ও তাদের মায়েদের এ আশ্রয় কেন্দ্রে গিয়ে দেখা গেছে, বিশেষভাবে তৈরি ফিরনি খেয়ে শিশুরা ঈদের নামাজ পড়তে যাচ্ছে ভিতরে থাকা মসজিদে। আশ্রয় কেন্দ্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অংশগ্রহণে সকাল সোয়া ৮টার দিকে ঈদের নামাজ হয়। এরপর আশ্রিত শিশুদের নিয়ে শিশুপল্লীর সদস্যরা একটি গরু ও খাসি কোরবানি দেন। পবিত্র ঈদ উপলক্ষে আশ্রিত শিশু ও শিশুদের মাকে সাধারণত ঈদুল ফিতরের সময় নতুন জামা দেওয়া হয়। তিন দিনব্যাপী আয়োজনের মধ্যে ঈদের আগের দিন সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত আশ্রিত শিশু ও মায়েদের জন্য বিভিন্ন ইভেন্টের খেলা ও মিউজিক্যাল বিষয়ক নানা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। পরে ওইদিন সন্ধ্যায় শুরু হয় মেহেদী উৎসব। যে যেভাবে খুশি মেহেদী দিয়ে হাত রাঙানো— এখানে নেই কোনো বাধা। ঈদের দিন রাতে শিশুপল্লীর প্রতিষ্ঠাতা পেট্রিসিয়া কার নিজে সরাসরি উপস্থিত থেকে আশ্রিত শিশু ও মায়েদের সঙ্গে রাতের খাবার গ্রহণ করেন। এ সময় তিনি নিজে সব বিষয়ে তদারকিও করেন। ঈদের দিন রাতে আশ্রিত শিশুদের বিশেষ খাবার দেওয়া হয়। গরু, খাসি ও মুরগির পাশাপাশি সবজি, ডাল, নানা ধরনের পিঠা, পায়েসও ছিল রাতের খাবারে। ঈদের পরের দিন বিভিন্ন কালচারার অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এর মধ্যে শিশুদের জন্য নাচ, গান, ছড়া উৎসব ও মায়েদের জন্য নাচ, গানের আয়োজন করা হয়। সন্ধ্যায় তিন দিনের নানান অনুষ্ঠানে বিজয়ী ও সব অংশগ্রহণকারীদের পুরস্কৃত করা হয় এবং ওইদিন সন্ধ্যায় সিনেমা দেখানো হয়। এ বছর ‘দ্য জাঙ্গল বুক’ নামের একটি সিনেমা দেখানো হয়েছে। কর্মকর্তারা জানান, শিশুপল্লীতে বর্তমানে ২৪৯ জন শিশু ও ১১৪ জন মা রয়েছেন। শিশুর মধ্যে ১২২ জন মেয়ে ও ১২৭ জন ছেলে রয়েছে। শুরু থেকে এ পর্যন্ত ৩ হাজার ৫২ জন শিশু এবং ৯০০ মাকে আশ্রয় দিয়ে পুনর্বাসন করা হয়েছে। আর এসব শিশু ও মাকে দেখাশুনার জন্য ১৪৪ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন শিশুপল্লীতে। দেখা গেছে, ৫১ বিঘার এই শিশুপল্লী প্লাসের চারপাশ সবুজে ঘেরা শত শত বৃক্ষাদি দিয়ে আচ্ছাদিত। ভিতরে শিশু ও তাদের মায়েদের থাকার জন্য বয়স অনুযায়ী আলাদা ব্যবস্থা রয়েছে। এক তলার ৬টি আবাসন ভবন রয়েছে। প্রতি কক্ষে দুপাশ সারি সারি করে থাকেন আশ্রিত এসব শিশু ও মা-রা। এখানে একটি প্রাথমিক ও প্রি-প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। বিদ্যালয়টি সরকারি নিয়ম অনুযায়ী পরিচালিত হয়। এখানে আশ্রিত শিশু ও মাকে বিভিন্ন নিয়ম-শৃঙ্খলা শিক্ষা দেওয়া হয়। রুটিন অনুযায়ী খাবার প্রদান করা হয়। চিকিৎসার জন্য রয়েছে একটি ক্লিনিক।

যেখানে একজন মেডিকেল অ্যাসিসটেন্ট, দুজন প্যারামেডিকেল চিকিৎসক, দুজন সেবিকা রয়েছেন। জরুরি প্রয়োজনে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স অথবা জেলা সদরে নেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। বিনোদনের জন্য রয়েছে টিভি রুম, কমনরুম এবং পত্রপত্রিকা ও বই-পুস্তক পড়ার সুবিধাও রয়েছে। আশ্রিত শিশু ও মায়েদের বিভিন্ন প্রয়োজনে ১৪৪ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন। রয়েছে মেয়েদের একটি ক্রিকেট দলও।

এখানে আশ্রিত অনেক শিশুই বর্তমানে সমাজে বিভিন্ন কর্ম করছে। যেসব শিশুর মা ও বাবা কেউই নেই— তাদের এখানে বড় করে প্রতিষ্ঠানের খরচে বিয়ের ব্যবস্থা করা হয়। শিশুপল্লী প্লাসে প্রবেশের পরই হাতের ডানপাশে একটি খেলার বড় মাঠ রয়েছে। এ ছাড়া এখানে নিজস্ব ব্যবস্থায় কাগজ তৈরি করা হয়। কাগজগুলো বেশির ভাগই বোর্ড, যা দিয়ে ভিজিটিং কার্ড, দাওয়াত কার্ড, ঈদ কার্ড বানিয়ে বাজারে বিক্রিও করা হয়। ভিতরে একটি প্রিন্টিং প্রেসও রয়েছে। আর ওই কাগজ তৈরির কাজে আশ্রয় কেন্দ্রের বাইরে থেকে ৫০ জন মহিলা এসে কাজ করছেন।

একই সঙ্গে শিশুপল্লীর ভিতরে রয়েছে একটি ক্লিনিক, মা ও শিশুদের আলাদা আবাসন ব্যবস্থা, শিক্ষা সুবিধার জন্য স্কুল, পুনর্বাসন ও বিভিন্ন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা। যার মধ্যে আছে গার্মেন্ট, টেইলারিং, বিউটি পারলার, হাউসকিপিং। শিশুদের নাচ, গান, আর্ট শিক্ষারও ব্যবস্থা রয়েছে। রয়েছে একটি মিনি ট্রেনিং সেন্টার। একটি তাঁতও আছে। রয়েছে একটি সুইমিং পুল, যেখানে শিশুদের সাঁতার শেখানো হয়। একটি গরুর খামার ও মাছ চাষের ব্যবস্থা রয়েছে। রয়েছে একটি মসজিদ, খাবারের জন্য আলাদা ডাইনিং রুম ও একটি হ্যান্ড মেড পেপার কক্ষ। ভিতরে শ্রীপুর ভিলেজ ট্রেড নামের একটি কক্ষ রয়েছে। একটি প্রশাসনিক ভবন, মিনি শিশুপার্ক, বেবি হাউস রয়েছে। মাঝখানে রয়েছে ওয়াটার টাওয়ার। এ ছাড়া রয়েছে একটি বাস্কেট বল খেলার মাঠ।

সূত্র জানায়, সকালের নাস্তার পর ১০টার দিকে টিফিন দেওয়া হয়। দুপুরে খাবার ও ৫টায় টিফিন এবং রাতে রয়েছে খাবারের ব্যবস্থা। এখানে আশ্রিত সব শিশুর ২৫ ডিসেম্বর জন্মদিন পালন করা হয়। বিশেষ করে দুই ঈদ, বড়দিন, বুদ্ধপূর্ণিমা, দুর্গাপূজাসহ বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব নানা আয়োজনের মাধ্যমে উদযাপন করা হয়। শিশুপল্লী প্লাসের চেয়ারম্যান সৈয়দ শামসুল আলম চৌধুরী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমি প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই এখানে আছি। এই সময়ের ভিতর অনেক শিশু ও তাদের মাকে এখানে আশ্রয় দিয়ে আত্মোন্নয়নের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এখানে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানদের আলাদা ধর্মীয় উৎসব পালনের ব্যবস্থা রয়েছে। ’

এই পাতার আরো খবর
up-arrow