Bangladesh Pratidin

ঢাকা, রবিবার, ১১ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : শুক্রবার, ৭ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ৬ অক্টোবর, ২০১৬ ২৩:০১
নানা সংকটে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
সুখে-দুঃখে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়
জয়শ্রী ভাদুড়ী, রাবি
নানা সংকটে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

মতিহারের সবুজ গালিচায় মোড়ানো বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিদ্যাপীঠ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯৫৬ সালে প্রতিষ্ঠার পর উচ্চশিক্ষা বিস্তারে অসামান্য অবদান রেখে চলেছে এই বিশ্ববিদ্যালয়।

শহীদ ড. শামসুজ্জোহার স্মৃতিবিজড়িত এই বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তিযুদ্ধে রয়েছে বীরত্বগাথা আর আত্মত্যাগের ইতিহাস।

প্রাকৃতিক পরিবেশে ভরপুর এ ক্যাম্পাসে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের মহান ব্রত নিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ছুটে আসেন হাজার হাজার শিক্ষার্থী। প্রতি বছর নবীন স্বপ্নচারীদের পদভারে মুখরিত হয়ে ওঠে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। কিন্তু দেশের দূরদূরান্ত থেকে আসা নবীন স্বপ্নবাজদের শুরুতেই পড়তে হয় আবাসন সংকটে। এরপর একে একে তাদের মুখোমুখি হতে হয় নানা সমস্যার।

আবাসন সংকট : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এখনো শিক্ষার্থীদের জন্য নিশ্চিত করতে পারেনি প্রয়োজনীয় আবাসন ব্যবস্থা। ফলে এখনো প্রায় ৭৫ শতাংশ শিক্ষার্থীকে থাকতে হচ্ছে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ক্যাম্পাসের বাইরে, যা তাদের শিক্ষা ও ব্যক্তিজীবনের নিরাপত্তার জন্য অনেকটা হুমকি। অন্যদিকে এ সুযোগে রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনগুলো শিক্ষার্থীদের জিম্মি করে পরিচালনা করছে তাদের রাজনৈতিক কার্যক্রম। রাবি প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে এ ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৩৫ হাজার। ছাত্র ২২ হাজার। কিন্তু ছাত্রদের জন্য আবাসিক হল রয়েছে মোট ১১টি। এসব হলে মাত্র ৫ হাজার ৩০৪ জনের আবাসন ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে বাকি ১৭ হাজার ছাত্রকেই থাকতে হয় বাইরে। আর ১৪ হাজার ছাত্রীর জন্য রয়েছে সাতটি হল। এসব হলে ৩ হাজার ১০১ জন ছাত্রীর আবাসন ব্যবস্থা রয়েছে। এখানে পড়াশোনার জন্য নেই উপযুক্ত পরিবেশ। তাই শিক্ষার্থীদের রেজাল্টেও রয়েছে এর বিরূপ প্রভাব। হলগুলোতে আবাসন সংকুলন না হওয়ায় প্রায় ৭৫ ভাগ শিক্ষার্থীই অনাবাসিক। এ প্রসঙ্গে রাবি উপ-উপাচার্য চৌধুরী সারওয়ার জাহান বলেন, ‘অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের কথা চিন্তা করে ইতিমধ্যে আমরা একটি ছাত্রী হল নির্মাণ করেছি। ভোগান্তি কমাতে আরও একটি করে ছাত্র হল ও ছাত্রী হলের আবেদন করা হয়েছে। ’

সান্ধ্য আইনে বন্দী ছাত্রীরা : সান্ধ্য আইনের নামে সন্ধ্যা ৭টার পর হলে ফেরা ছাত্রীদের আইডি কার্ড কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে অভিভাবকদের ফোন দিয়ে দেরিতে ফেরার কথা জানানোর মতো ঘটনা ঘটছে বিশ্ববিদ্যালয়ে। এভাবেই ঘড়ির কাঁটায় বন্দী দেশের বৃহৎ বিদ্যাপীঠ রাবির হলের ছাত্রীরা। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৭৩-এর বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ অনুযায়ী মেয়েদের হলে প্রবেশের ক্ষেত্রে এ ধরনের কোনো বিধিনিষেধ নেই। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডি আরোপিত এই সান্ধ্য আইন রাবিসহ আরও কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে চালু আছে। সান্ধ্য আইনের কারণে সন্ধ্যা ৭টার মধ্যেই মেয়েদের হলের প্রধান ফটকটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। এতে হয়রানির শিকার হতে হয় হলের ছাত্রীদের। এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর মজিবুল হক আজাদ বলেন, আবাসিক ছাত্রীদের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনা করেই সান্ধ্য আইন জারি করা হয়েছে।

বাড়েনি শ্রেণিকক্ষ : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় প্রতি বছরই খোলা হচ্ছে নতুন নতুন বিভাগ। এতে বেড়েছে শিক্ষার্থী। কিন্তু সে হারে বাড়েনি শ্রেণিকক্ষ। ফলে প্রতিনিয়তই সমস্যার মধ্যে দিন পার করছেন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত হাজারো শিক্ষার্থী। বিভাগ সূত্রে জানা যায়, এ বছর চারুকলা অনুষদের অধীনে তিনটি নতুন বিষয়ে ১২০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি নেওয়া হয়। এ অনুষদের তিনটি বিভাগের একটিমাত্র অফিস কক্ষ। বিভাগের সভাপতির কোনো নিজস্ব অফিস নেই।

শুরু হয়নি স্মার্টকার্ড ব্যবহার : দেশের প্রথম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে স্মার্ট আইডেনটিটি কার্ডের ব্যবহার শুরু হওয়ার কথা। এপ্রিলে নির্দিষ্ট সময় পার হয়ে গেলেও এখনো রাবি প্রশাসন স্মার্ট আইডি কার্ডের ব্যবহার শুরু করতে পারেনি। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০১১ সালে স্মার্ট আইডি কার্ড বিতরণ শুরু হয়। কিন্তু ২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীসহ অনেকেই এখন পর্যন্ত কার্ড পাননি। এ কার্ডের জন্য শিক্ষার্থীপ্রতি ৪০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

পরিবহন সংকট চরমে : বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৩ হাজার শিক্ষার্থীর বিপরীতে বাসের সংখ্যা মাত্র ৩৯টি। এর মধ্যে বিভিন্ন রুটে চলছে ২৭টি বাস, যার আটটি শুধু শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের পরিবহনে ব্যবহূত হয়। শুধু ছাত্রীদের জন্য রয়েছে মাত্র তিনটি বাস। চালক আছেন ৩২ জন। কিন্তু দুই শিফটে বাস চালানোর জন্য চালকের প্রয়োজন ৫৪ জন। অন্যদিকে বাকি বাসগুলো নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। এগুলো সংরক্ষণে নেই কোনো ব্যবস্থা। তবে ৩৩ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য ৩৯টি বাসকে যথেষ্ট বলে দাবি করেন জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন দফতরের প্রশাসক অধ্যাপক মাইনুল হক। তিনি বলেন, ‘আমাদের পর্যাপ্ত বাস আছে। এখন কিছু চালক প্রয়োজন। কিছু চালক নিয়োগ দেওয়া হলে সব সমস্যা অতি দ্রুত সমাধান হবে। ’ বাসস্ট্যান্ডের বেহাল অবস্থার কারণেও সমস্যায় পড়তে হয় শিক্ষার্থীদের। সামান্য বৃষ্টি হলেই হাঁটুপানি জমে যায়। দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে এ সমস্যা থাকলেও এখনো তা মেরামত করা হয়নি।

নতুন বইয়ের অপর্যাপ্ততা : পুরনো বই দিয়েই চলছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি। শিক্ষকদের রেফারেন্স অনুযায়ী বই না পাওয়া, আর পেলেও বেশির ভাগ বই পুরনো ও সেকেলে হওয়ায় ভোগান্তিতে পড়ছেন লাইব্রেরিতে আসা শিক্ষার্থীরা। ফলে বাধ্য হয়ে শিক্ষার্থীদের বেশি টাকা দিয়ে বাইরে থেকে বই কিনে পড়ালেখা করতে হচ্ছে।

বিদ্যুৎ বিভ্রাট নিত্যদিনের : বিদ্যুৎ বিভ্রাটে চরম ভোগান্তির শিকার হন শিক্ষার্থীরা। গ্রীষ্মের গরম শুরু হতেই বিদ্যুতের লুকোচুরিতে প্রচণ্ড গরমে শিক্ষার্থীদের সমস্যা হয় লেখাপড়ায়। আর বিদ্যুতের এই যাওয়া-আসায় শিক্ষার্থীদের ল্যাপটপ, ডেস্কটপসহ মূল্যবান ইলেকট্রনিক সামগ্রী নষ্ট হয়ে যায়। অন্যদিকে রাতে লোডশেডিংয়ের সময় অন্ধকারে ছেয়ে যায় পুরো ক্যাম্পাস। এ সময় ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে।

ট্রেন সুবিধা থেকে বঞ্চিত : প্রতিনিয়তই বিশ্ববিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের এলাকা থেকে প্রায় ৫০০ যাত্রী ট্রেনে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যাতায়াত করেন। বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন স্টেশন থেকে এত লোক যাতায়াত করা সত্ত্বেও এখানে রাখা হয়নি কোনো ট্রেন স্টপেজ। এজন্য বাড়তি দুর্ভোগে মেয়েদেরই বেশি পড়তে হচ্ছে।

বাড়ছে না খাবারের মান : রাবির ১৭টি আবাসিক হলেই নিম্নমানের ও বাসি খাবার পরিবেশন করা হচ্ছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির দোহাই দিয়ে এসব হল ডাইনিংয়ে বাসি, পচা, অস্বাস্থ্যকর খাবার পরিবেশন করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। হলের ডাইনিংগুলোতে যে খাবার পরিবেশন করা হয়, তা খাওয়ার অনুপযোগী। বাজারের সর্বনিম্ন মানের চাল আর সবচেয়ে কম দামি সবজি কিনে এনে শিক্ষার্থীদের জন্য খাবার তৈরি করা হয়। সরেজমিনে দেখা যায়, হলগুলোর ক্যান্টিনের রন্ধনশালার অভ্যন্তর অন্ধকার, নোংরা, স্যাঁতসেতে আবর্জনাময়, দুর্গন্ধযুক্ত। দুপুরে একবার তরকারি রান্না করে সেই তরকারি রাতে খাওয়ানো হয়। ছোট সিলভার কার্প ছাড়া অন্য কোনো মাছের দেখা মেলে না।

দিনে নাপা রাতে ইনজেকশন : বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা কেন্দ্রে দুপুরের পর জরুরি সেবা নিতে গেলে বেশির ভাগ সময় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। এমনকি জ্বর-সর্দির মতো রোগ গুরুতর না হলেও রামেকে পাঠিয়ে দায় এড়ানোর চেষ্টা করা হয়। বিনা মূল্যে ওষুধ সরবরাহ করার কথা থাকলেও শুধু পাওয়া যায় ‘নাপা’। আর রাতে যদি কোনো শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়েন, তা জ্বর হোক আর পেট খারাপ, তাকে দেওয়া হয় ইনজেকশন। রাতে জরুরি চিকিৎসার জন্য কোনো ডাক্তার না থাকায় নার্সরা নিজেরাই এ ইনজেকশন দিয়ে থাকেন। এ ছাড়া যে অ্যাম্বুলেন্সগুলো রয়েছে, সেগুলো দলীয় ও ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করা হয় বলে শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন। সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক চৌধুরী সারওয়ার জাহান বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক উন্নয়নকল্পে আমরা একটি মাস্টারপ্ল্যান হাতে নিয়েছি। এর মধ্যে প্রথমে ছেলেদের জন্য ১০ তলাবিশিষ্ট একটি ও মেয়েদের জন্য একটি হল তৈরির পরিকল্পনা করেছি। এ ছাড়া অন্য হলগুলো সম্প্রসারণ করার বিষয়ে অর্থায়নের চেষ্টা চলছে। বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে মেডিকেল সেন্টার এক্সটেনশন করার কাজ চলছে। সেখানে জনবলও বাড়ানো হবে। পরিবহন সমস্যা মেটাতে বেশ কিছু নতুন বাস এবং ছাত্রী হলের জন্য নতুন অ্যাম্বুলেন্স কেনা হয়েছে। পুরনো বিআরটিসি বাসগুলোকে মেরামত করে সক্রিয় করা হয়েছে। ডিজিটালাইজেশনের ধারা অব্যাহত রাখতে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ইন্টারনেট প্রোভাইডার কেনা হয়েছে। এতে বিটিসিএলের ওপর আমাদের আর নির্ভর করে থাকতে হবে না। ঝুঁকি থেকে বাঁচতে ই-টেন্ডার চালু করা হয়েছে। আমরা শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পরিবেশ তৈরি করতে সব ধরনের আধুনিক সুযোগ-সুবিধা চালুর চেষ্টা করছি। ’

এই পাতার আরো খবর
up-arrow