Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : বুধবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ২৩:০৫
সাক্ষাৎকারে বেগম মতিয়া চৌধুরী
সাফল্যের রহস্য বিজ্ঞানমনস্কতা
নিজামুল হক বিপুল
সাফল্যের রহস্য বিজ্ঞানমনস্কতা
bd-pratidin

কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী। তিনি আওয়ামী লীগ প্রেসিডিয়াম সদস্য। ১৯৯৬ সালে দল ক্ষমতায় এলে তাকে কৃষি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী নিযুক্ত করা হয়। তখন খাদ্য ঘাটতির দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছিল। এরপর ২০০৯ সালে দ্বিতীয় দফায় আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে আবারও তিনি কৃষিমন্ত্রী হন। সেই থেকে টানা ১০ বছর একই মন্ত্রিত্বে অবস্থান করে কৃষিতে তিনি নীরব বিপ্লব ঘটিয়েছেন। বাংলাদেশ সচিবালয়ে গতকাল তাঁর দফতরে বসে মতিয়া চৌধুরী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে দেশের কৃষি বিষয়ে তাৎপর্যময় অনেক কথা বলেছেন।

প্রশ্ন : আপনি তো ১০ বছর ধরে কৃষিমন্ত্রী। এর আগে ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত একই দায়িত্বে ছিলেন। এ দীর্ঘ সময়ে কৃষিতে অনেক সাফল্য এসেছে। এর রহস্য কী?

বেগম মতিয়া চৌধুরী : রহস্য আমাদের প্রধানমন্ত্রী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার দিকনির্দেশনা। তার বিজ্ঞানমনস্কতা। যে বিজ্ঞানমনস্কতা আমাদের কৃষি মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন অর্থাৎ উচ্চফলনশীল ধান থেকে শুরু করে কৃষির সব ক্ষেত্রে যে অগ্রগতি... বিজ্ঞানের যে প্রযুক্তি তার প্রয়োগ ছাড়া এটা সম্ভব ছিল না। মান্ধাতার বা চিরায়ত যে কৃষি তাতে আমরা একটা জায়গায় আটকে ছিলাম। একদিকে মানুষ বাড়ছে, জমি কমছে, কিন্তু বিজ্ঞানের নতুন নতুন আবিষ্কার এবং উদ্ভাবন— এটা আমরা আমাদের কৃষির ক্ষেত্রে প্রয়োগ করছি। একই সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের প্রতিটি স্তরে কমবেশি আমি বলব না যে সেন্ট পার্সেন্ট, কমবেশি সবাই কাজ করছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর যে উজ্জীবনী প্রেরণা সেই প্রেরণা সারা দেশের মানুষের মধ্যে একটা প্রেরণা আনছে, তারা কর্মচঞ্চল হয়েছে। আজ আমরা সেই নিম্ন আয়ের দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হয়েছি। এটা শুধু কৃষিতে নয়, সব ক্ষেত্রে। কাজেই সবখানে একটা প্রেরণাদায়ী শক্তি লাগে। আমাদের সেই শক্তি হচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সারা দেশের মানুষ তো বটেই কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রতিটি কর্মী তাঁর প্রেরণায় উজ্জীবিত।

আমাদের সমস্ত স্তরে সবাই কাজ করছে এবং আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছে। কারও হয়তো তৎপরতা একটু কম আবার কারও বেশি। আমি বলব, আমাদের কৃষি মন্ত্রণালয়ের কি সম্প্রসারণ, কি গবেষণা বা অন্যান্য জায়গায় সবাই কর্মতৎপর। এ সাফল্য সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার কারণেই এসেছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দীর্ঘ ২৩ বছরের সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আমাদের বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতা দিয়ে গেছেন। তাঁরই কন্যা শেখ হাসিনা পিতার যে স্বপ্ন ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত, সুখী-সুন্দর বাংলাদেশ, উন্নতশীল বাংলাদেশ, শিক্ষায় উন্নত, জ্ঞানে-বিজ্ঞানে উন্নত, সারা পৃথিবীর দৃষ্টি বাংলাদেশের দিকে থাকবে। যে স্বপ্ন বঙ্গবন্ধু দেখিয়ে গেছেন কিন্তু করে যেতে পারেননি। ঘাতকের বুলেটে সেদিন ৩২ নম্বরের ওই বাড়িতে যারা ছিল তাদের সবাইকে হত্যা করা হয়েছে। আল্লাহর অশেষ রহমতে প্রধানমন্ত্রীকে আমরা পেয়েছি বলেই আজ বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। আমি শুধু একটা কথা বলতে চাই, ’৯৬-এ আমরা যখন ক্ষমতায় এলাম দেশে তখন খাদ্য ঘাটতি। তখনো খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছি, নীরব বিপ্লব ঘটিয়েছি। তারপর ২০০৯-এ যখন শুরু করলাম খাদ্য ঘাটতি দিয়ে সেখান থেকে আবারও আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। এই সেক্টরে নীরব বিপ্লব ঘটেছে। এই যে এত রোহিঙ্গা আসছে, বাইরে থেকে খাদ্য সেই অর্থে তুলনামূলক খুবই কম। ১০-১১ লাখ লোককে খাওয়ানো— চাট্টিখানি কথা নয়। এটা করে যাচ্ছেন। পাশাপাশি গত বছর সেই অকাল বর্ষণে, পাহাড়ি ঢলে আমাদের খাদ্যের একটা বড় ক্ষতি হয়েছিল। তা আমরা পুষিয়ে নিয়েছি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী একদিকে যেমন অকৃপণভাবে কৃষি পুনর্বাসনের জন্য উদার হাতে আমাদের বরাদ্দ দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর যে বিরল গুণ— তা হচ্ছে তাঁর কথায় সবাই উদ্বুদ্ধ হয়, কেউ দ্বিধান্বিত হয় না। এটা পৃথিবীর কম নেতারই থাকে। তাঁর কথা সবাই মনে করে আমার কাজ সামনে আগানো, দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।

প্রশ্ন : কৃষিতে প্রবৃদ্ধি গত পাঁচ-সাত বছরে বাড়ছে। আগে এ প্রবৃদ্ধি বাড়ার হার ছিল বেশি। কিন্তু প্রবৃদ্ধি বাড়লেও হার কমেছে। কেন এমনটা হচ্ছে? এ থেকে উত্তরণের উপায় কী?

মতিয়া চৌধুরী : দেখুন দেশে মানুষ বাড়ছে। সে তুলনায় জমি কমছে। শিল্পায়ন হচ্ছে। আমাদের গাজীপুরে এখন কৃষি আছে! বলুন। একমাত্র রিসার্চ সেন্টারগুলো ছাড়া। নরসিংদী পর্যন্ত শিল্পায়ন হয়ে গেছে। এটা হচ্ছে বাস্তবতা, এটা নিয়ে বিলাপ করার কিছু নেই, ঝগড়া করারও কিছু নেই। দুটোই দরকার। আমরা আমাদের প্রসেসড্ ফুড ইন্ডাস্ট্রি যখন তার সক্ষমতার পরিচয় দেবে তখন এই প্রবৃদ্ধি আবারও বাড়ার সম্ভাবনা আছে। যেমন ধরুন সুতা তৈরি করলেই কিন্তু প্রবৃদ্ধি হবে না। যখন আপনি গার্মেন্টে যাবেন তখনই প্রবৃদ্ধি হবে। ঠিক তেমনি যেমন প্রসেস্ড ফুড, রেডি টু কুক ফুড— এসবে যখন আমরা চলে যাব তখন আবার প্রবৃদ্ধি বাড়বে। এই যে দেখুন আমাদের জাতীয় ফল কাঁঠাল, আমরা ভুলেই গেছি। অথচ ভারত কাঁচা কাঁঠাল প্রক্রিয়াজাত করে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে বিক্রি করছে।

প্রশ্ন : বোরোতে পানির ক্রাইসিস প্রকট আকার ধারণ করে। পরিত্রাণের উপায় কী? বোরোর বিকল্প কিছু ভাবছেন?

মতিয়া চৌধুরী : এজন্য আমরা আউশ ও আমনের ওপর জোর দিয়েছি। আমি কিন্তু বলেই থেমে নেই। এই যে আউশের তো কাভারেজ বাড়ছে। যেখানে এক ফসলি জমি সেখানে অবশ্যই বোরো করবে এবং হাই ইয়েল্ডিং করবে। কিন্তু অন্য জায়গায় যেখানে পানির ক্রাইসিস আছে সেখানে আমি পানির লেভেল যাতে নিচে নেমে না যায়, যেমন ধরেন বরেন্দ্র অঞ্চলে জোর করে বোরো ফসল করে... সেখানে ১ কেজি চালের উৎপাদনে ৩২ লিটার পানি লাগে। আমি সেটা না করে সেখানে আউশে যাব। কিছু কিছু বৃষ্টি হয়, আর আউশ তো একটু খরাসহিষ্ণু ফসল। দক্ষিণাঞ্চলের জমিরও সদ্ব্যবহার করার প্রক্রিয়া এগোচ্ছে। নইলে এত মানুষকে খাওয়াবেন কীভাবে?

প্রশ্ন : হাওরাঞ্চলে তো প্রায় প্রতি বছরই আগাম বন্যা হয়, এতে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়, কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশেষ করে নিচু জমিতে বোরো চাষের কারণে ক্ষতিটা বেশি হচ্ছে।

মতিয়া চৌধুরী : আসলে যেটা মাছের জন্য আমরা সেখানে মাছই করব। দরকার হলে সেখানে আরও মডার্নভাবে এটাকে গোছানো হবে। আর যেসব জমি কান্দার সেখানে ফসল করবে। মাছও ফসল, যে জমিতে মাছ হবে সেখানে কৃষক মাছ চাষ করবে, আবার যে জমিতে ধান চাষ হয় সেখানে ধান করবে। তাহলে মাছ বিক্রি করেও সে আয় করতে পারবে।

প্রশ্ন : জিএম ফুডের সর্বশেষ অবস্থা কী?। যদ্দুর জানি বেগুনের জিএম বাজারে চলে এসেছে। ধান, আলু ও পটোল নিয়ে এখনো গবেষণা চলছে। এগুলো কবে নাগাদ রিলিজ হতে পারে?

মতিয়া চৌধুরী : আপনারা যে সয়াবিন তেল খান তা জিএম ফুড নয়? তারপর কটন অয়েল এটাও জিএম ফুড। ভুট্টা জিএম। ধান, আলু, পটোলের গবেষণা চলমান। আমরা একেবারে নিশ্চিত হয়ে...। আসলে আমাদের দেশের কৃষক এত ছোট মানে ল্যান্ড হোল্ডিং মালিক। আমরা তাদের কোনো ক্ষতির সম্মুখীন করতে চাই না।

প্রশ্ন : জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তো আমাদের দেশের দক্ষিণাঞ্চলে লবণাক্ততা বাড়ছে। দক্ষিণাঞ্চলের কৃষি নিয়ে সরকারের কোনো বিশেষ পরিকল্পনা আছে কিনা?

মতিয়া চৌধুরী : জলবায়ু পরিবর্তনের কথা যারা বলেন তারা কিন্তু আমাদের কোনো সাহায্য করেননি। কিন্তু আমাদের প্রধানমন্ত্রী জলবায়ু সম্মেলন থেকে এসেই নিজস্ব ফান্ড তৈরি করেছেন। আজকেও যে শতাব্দীর লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হলো সেখানেও এজন্য একটা ফান্ড রাখার জন্য অর্থমন্ত্রীকে বললেন। আমাদের প্রধানমন্ত্রী কোনো হাওয়াই কথাবার্তা বলেন না। তিনি যা বলেন, সলিড গ্রাউন্ডের ওপর দাঁড়িয়েই বলেন। এটা কোনো হাওয়াই কথা নয়, কোনো চোরাবালিও নয়, এটা কোনো ফানুসও নয়। আমরা লবণসহিষ্ণু জাত উদ্ভাবনের পাশাপাশি গবেষণাও চালাচ্ছি এবং কিছু লাইন চলেও গেছে। বিআর-৪৭ ও ৪৮ এখন মাঠে আছে। লবণসহিষ্ণু অনেক জাত আমরা আবিষ্কার করেছি এবং এগুলোর পারফরম্যান্সও ভালো। ট্রায়াল বেসিস এগুলো কৃষককে দেওয়া হয়েছে।

প্রশ্ন : আপনি তো আফ্রিকান নেরিকা জাতের ধানের ওপর জোর দিয়েছিলেন। তার কী অবস্থা?

মতিয়া চৌধুরী : এটার কাজ চলছে। অনেক এলাকাতেই কৃষক ভালোভাবে নিয়েছে। এ ধানে সময় কম লাগে। ১০০ থেকে ১০৫ দিনের মধ্যেই ধান চলে আসে। অনেকখানে ৯০ দিনেও চলে আসে।

প্রশ্ন : দেশে প্রতিনিয়ত কৃষিজমি কমছে। এটা রোধ করার কোনো উপায়...

মতিয়া চৌধুরী : এজন্য আইন আছে। বাস্তবতা হচ্ছে, জমির মালিক কৃষক। সে এটা দিয়ে কী করবে... সে যদি চুপি চুপি সেটা বিক্রি করে দেয় তাহলে কী করবেন? পাশাপাশি এটাও ঠিক যে, কৃষক ফসল ফলিয়ে তার খাবার সংগ্রহ করবে।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow