শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ১৩ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৩ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:৩৩

নোবেল পুরস্কার ২০১৭

নোবেল পুরস্কার ২০১৭

পৃথিবীর সবচেয়ে সম্মানজনক নোবেল পুরস্কার প্র্রবর্তিত হয় ১৯০১ খ্রিস্টাব্দে। ওই বছর থেকে সারা পৃথিবীর বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে সফল এবং অনন্যসাধারণ গবেষণা ও উদ্ভাবন এবং মানবকল্যাণমূলক তুলনারহিত কর্মকাণ্ডের জন্য এ পুরস্কার প্রদান করা হচ্ছে। মোট ছয়টি বিষয়ে পুরস্কার প্রদান করা হয়। বিষয়গুলো হলো— পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, চিকিৎসাশাস্ত্র, অর্থনীতি, সাহিত্য এবং শান্তি। ২০১৭ সালের নোবেল বিজয়ীদের নিয়ে আজকের রকমারি। লিখেছেন— তানভীর আহমেদ

 

যার নামে নোবেল প্রাইজ

১৯০১ সালে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা শুরু হয়। বর্তমান পৃথিবীতে এটিই সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত। ১৯০১ সাল থেকেই বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে সফল এবং অনন্যসাধারণ গবেষণা ও উদ্ভাবন এবং মানবকল্যাণমূলক তুলনারহিত কর্মকাণ্ডের জন্য এই পুরস্কার প্রদান করা হচ্ছে। মোট ছয়টি বিষয়ে পুরস্কার প্রদান করা হয়। বিষয়গুলো হলো— পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, চিকিৎসাশাস্ত্র, অর্থনীতি, সাহিত্য এবং শান্তি।

সুইডিশ বিজ্ঞানী আলফ্রেড নোবেলের ১৮৯৫ সালে করে যাওয়া একটি উইলের মর্মানুসারে নোবেল পুরস্কার প্রচলন করা হয়। নোবেল মৃত্যুর আগে উইলের মাধ্যমে এ পুরস্কার প্রদানের ঘোষণা করে যান। শুধু শান্তিতে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয় অসলো, নরওয়ে থেকে। বাকি ক্ষেত্রে স্টকহোম ও সুইডেনে এ পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অর্থনীতি ছাড়া অন্য বিষয়গুলোতে ১৯০১ সাল থেকে পুরস্কার প্রদান করা হচ্ছে। কিন্তু অর্থনীতিতে পুরস্কার প্রদান শুরু হয়েছে ১৯৬৯ সালে। আলফ্রেড নোবেল তার উইলে অর্থনীতির কথা উল্লেখ করেননি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জন্য ১৯৪০ থেকে ১৯৪২ সাল পর্যন্ত পুরস্কার প্রদান বন্ধ ছিল। প্রতি বছর পুরস্কারপ্রাপ্তদের প্রত্যেকে একটি স্বর্ণপদক, একটি সনদ ও নোবেল ফাউন্ডেশন কর্তৃক কিছু পরিমাণ অর্থ পেয়ে থাকেন। ২০১২ খ্রিস্টাব্দে এই অর্থের পরিমাণ ছিল ৮০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা। নোবেল পুরস্কার মৃত কাউকে দেওয়া হয় না। লরিয়েটকে অবশ্যই পুরস্কার প্রদানের সময় জীবিত থাকতে হবে। আলফ্রেড নোবেল, নোবেল পুরস্কারের প্রবক্তা। আলফ্রেড নোবেল ২১ অক্টোবর ১৮৩৩ সালে সুইডেনের স্টকহোমে একটি প্রকৌশল পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি একাধারে রসায়নবিদ, প্রকৌশলী ও একজন উদ্ভাবক ছিলেন। ১৮৯৪ সালে তিনি একটি বফর লোহা ও ইস্পাত কারখানা ক্রয় করেন, যা পরে একটি অন্যতম অস্ত্র তৈরির কারখানায় পরিণত করেন। তিনি ব্যালাস্টিক উদ্ভাবন করেন, যা বিশ্বব্যাপী ধোঁয়াবিহীন সামরিক বিস্ফোরক হিসেবে ব্যবহূত হয়। তার ৩৫৫টি উদ্ভাবনের মাধ্যমে তিনি জীবদ্দশায় প্রচুর ধনসম্পদের মালিক হন, যার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল ডিনামাইট। ১৮৮৮ সালে তিনি মৃতের তালিকা দেখে বিস্মিত হন, যা একটি ফরাসি পত্রিকায় এ মার্চেন্ট অব ডেথ হু ডেড প্রকাশিত হয়। যেহেতু নোবেলের ভাই লুডভিগ মারা যান। এ নিবন্ধটি তাকে ভাবিয়ে তোলে এবং খুব সহজেই বুঝতে পারেন যে, ইতিহাসে তিনি কীভাবে স্মরণীয় হতে চান, যা তাকে তার উইলটি পরিবর্তন করতে অনুপ্রাণিত করে। ১০ ডিসেম্বর ১৮৯৬ সালে আলফ্রেড নোবেল তার নিজ গ্রাম স্যান রিমো, ইতালিতে মৃত্যুবরণ করেন। সেই সময় তার বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর। নোবেল তার জীবদ্দশায় অনেক উইল লিখে গেছেন। সর্বশেষটা লেখা হয়েছিল তার মৃত্যুর মাত্র এক বছর আগে ২৭ নভেম্বর, ১৮৯৫ সালে প্যারিসে অবস্থিত সুইডিশ-নরওয়ে ক্লাবে। বিস্ময় ছড়িয়ে যায়, নোবেল তার সর্বশেষ উইলে উল্লেখ করেন যে, তার সব সম্পদ পুরস্কার আকারে দেওয়া হবে। যারা পদার্থ, রসায়ন, চিকিৎসা, শান্তি ও সাহিত্যে বৃহত্তর মানবতার স্বার্থে কাজ করবেন। নোবেল তার মোট সম্পদের (৩১ মিলিয়ন সুইডিশ ক্রোনা) ৯৪ শতাংশ এ পাঁচটি পুরস্কারের জন্য উইল করেন। ২৬ এপ্রিল, ১৮৯৭-এর আগ পর্যন্ত সন্দেহপ্রবণতার জন্য নরওয়ে থেকে এই উইল অনুমোদন করা হয়নি। নোবেলের উইলের সমন্বয়কারী রগনার সোলম্যান ও রুডলফ লিলজেকুইস্ট নোবেল ফাউন্ডেশন তৈরি করেন। যার কাজ তার সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণ ও নোবেল পুরস্কার অনুষ্ঠানের আয়োজন করা। নোবেল পাঁচটি ক্ষেত্রে পুরস্কার দেওয়ার জন্য তার মোট সম্পত্তির শতকরা ৯৪ ভাগ দান করে যান। এর মোট পরিমাণ ৩১ মিলিয়ন এসইকে (৩.৪ মিলিয়ন ইউরো, ৪.৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার)।

 

শান্তিতে ‘আইক্যান’

শান্তিতে নোবেল পুরস্কার কে পাচ্ছেন— এ নিয়ে সারা বিশ্বেই প্রবল আগ্রহ রয়েছে। ২০১৭ সালে শান্তিতে নোবেল লাভ করেছে ইন্টারন্যাশনাল ক্যাম্পেইন টু অ্যাবলিশ নিউক্লিয়ার ওয়েপনস (আইসিএএন)। পরমাণু নিরস্ত্রীকরণে প্রশংসনীয় ভূমিকা রাখায় ওই প্রতিষ্ঠানটিকে এই পুরস্কার দেওয়া হয়। ২০০৭ সালের ২৩ ও ৩০ এপ্রিল অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে ও অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় পৃথক দুটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এটি প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেওয়া হয়। অলাভজনক এই প্রতিষ্ঠানের সদর দফতর সুইজারল্যান্ডের জেনেভায়। ৪৬৮টি সহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ১০১টি দেশে এ প্রতিষ্ঠান তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। নোবেল কমিটি এক বিবৃতিতে জানায়, পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারে যে মানবিক বিপর্যয় নেমে আসতে পারে সে বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টির ক্ষেত্রে এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য এ পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। চুক্তি করে এ ধরনের অস্ত্রের ব্যবহার বন্ধ করার ক্ষেত্রেও এটি বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭২তম অধিবেশনে ট্রিটি অন দ্য প্রহিবিটেশন অব নিউক্লিয়ার ওয়েপনস প্রস্তাবের খসড়ার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এ পর্যন্ত ১০৮টি দেশ পরমাণু নিরস্ত্রীকরণে প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছে। আইক্যানের নির্বাহী পরিচালক বেটরিস কেইন বলেন, আইক্যানের উদ্দেশ্য হচ্ছে পরমাণু অস্ত্রধারী দেশগুলোর কাছে একটি ম্যাসেজ দেওয়া, তারা যে পরমাণু অস্ত্রের ওপর নির্ভর করছে তা অগ্রহণযোগ্য আচরণ। আমরা নিরাপত্তার নামে হাজার হাজার মানুষকে হত্যার মতো কোনো অস্ত্রকে মেনে নিতে পারি না।’

 

সাহিত্যে কাজুয়ো ইশিগুরো

২০১৭ সালে সাহিত্যে নোবেল পেয়েছেন জাপানি বংশোদূ্ভত ব্রিটেনের ঔপন্যাসিক কাজুয়ো ইশিগুরো। সুইডিশ কমিটির পক্ষ থেকে এই ব্রিটিশ লেখকের ব্যাপক প্রশংসা করে বলা হয়, ‘এই লেখক নিজের আদর্শ ঠিক রেখে, আবেগপ্রবণ শক্তি দিয়ে বিশ্বের সঙ্গে আমাদের সংযোগ ঘটিয়েছেন।’ ৮টি বই লিখেছেন তিনি। আর এই ৮টি বই মোট ৪০টি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। ১৯৮২ সালে তার প্রথম উপন্যাস ‘এ পেইল ভিউ অব হিলস’ বা পাহাড়ের একটি বিবর্ণ দৃশ্য প্রকাশ পায়। ১৯৮৬ সালে তার দ্বিতীয় বই ‘এন আর্টিস্ট অব দ্য ফ্লোটিং ওয়ার্ল্ড’ বা ‘ভাসমান পৃথিবীর এক শিল্পী’ বের হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা হামলার প্রেক্ষাপট নিয়ে লেখা হয়েছে উপন্যাসটি। তবে দ্য রিমেইনস অব দ্য ডে লিখেই তিনি সবচেয়ে বেশি পরিচিতি পান। পরবর্তীতে এই উপন্যাস অবলম্বনে একটি চলচ্চিত্র তৈরি হয়। জেমস আইভরির পরিচালনায় তাতে অভিনয় করেন ব্রিটিশ অভিনেতা এ্যান্তনি হপকিনস। ব্রিটিশ কবি এন্ড্রু মোশন বলেন, ইশিগুরোর কাল্পনিক বিশ্ব ব্যাপক উত্কর্ষ ও মূল্যবান, একসঙ্গে খুবই ব্যক্তিতান্ত্রিক। যেটা বিচ্ছিন্নতা, পর্যবেক্ষণ, হুমকি, বিস্ময় ও ধাঁধার দুনিয়ার সঙ্গে ব্যাপক পরিচিত। সুইডিশ একাডেমির সেক্রেটারি সারা ডেনিয়াস বলেন, ‘জেন অস্টিন ও ফ্রান্স কাফকার লেখার সংমিশ্রণ হিসেবে আখ্যা দেন। এর সঙ্গে ফরাসি ঔপন্যাসিক মার্শেল প্রাউস্টকেও কিছুটা মেশাতে হবে। এখন যা দাঁড়াল তা-ই হলো ইশিগুরোর লেখা।’ এই খ্যাতিমান লেখক চারবার ম্যান বুকার পুরস্কার অর্জন করেছেন তার চারটি উপন্যাসের জন্য।

 

পদার্থে তিন ব্রিটিশ বিজ্ঞানীর চমক

মহাকর্ষীয় তরঙ্গ নিয়ে গবেষণার জন্য ২০১৭ সালে পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন তিন মার্কিন পদার্থবিদ। তারা হলেন রেইনার ওয়েস, ব্যারি সি ব্যারিশ ও কিপ এস থ্রোন। তাদের গবেষণার বিষয় ছিল মহাকর্ষীয় তরঙ্গ বা গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভ। মহাকর্ষীয় তরঙ্গ মূলত এমন একটি তরঙ্গ যেটি সবসময় আমাদের চারপাশেই থাকে। ভিন্ন ভিন্ন উৎস থেকে ভিন্ন ভিন্ন সময় সৃষ্ট হওয়া এসব তরঙ্গ আমাদের এখানে আসছে। তবে এসব তরঙ্গ খুবই দুর্বল। এরা সাধারণত বস্তুর সঙ্গে কোনো মিথস্ক্রিয়ায় লিপ্ত হয় না। ফলে আমরা তাদের অনুভব করতে পারছি না। দুটো কৃষ্ণগহ্বরের সংঘর্ষে এদের জন্ম। লাইগোর বিজ্ঞানীরা যে মহাকর্ষ তরঙ্গ শনাক্ত করেছেন তাদের প্রায় তিনটি সূর্যের সমান ভর শক্তিতে রূপান্তরিত হয়ে জন্ম। কিন্তু এ সম্পর্কে বলতে গেলে আমরা তেমন কিছুই জানি না। তাই এর শক্তিকে কাজে লাগানোর উপায়ও এখন পর্যন্ত জানতে পারেননি বিজ্ঞানীরা। মহাকর্ষীয় তরঙ্গ আবিষ্কারের কথা ২০১৬ সালের ১১ ফেব্রুয়ারিতে এর ঘোষণা দেন লাইগোর বিজ্ঞানীরা। তবে এটির দেখা পাওয়া যায় তার আগের বছর। ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি, ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি এবং লেজার ইন্টারফেরোমিটার গ্র্যাভিটেশনাল-ওয়েব অবজারভেটরির (লাইগো-ভিরগো) হয়ে কাজ করেছেন এ বছর পদার্থে নোবেল পাওয়া তিন বিজ্ঞানী। রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেসের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত বিশ বছর ধরে এক হাজারেরও বেশি গবেষক কাজ করে যাচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের লেজার ইন্টারফেরোমিটার গ্র্যাভিটেশনাল-ওয়েব অবজারভেটরি (এলআইজিও)-তে। তাদের গবেষণা, ধৈর্য এবং সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে এ বছর নোবেল কমিটি রেইনার ওয়েস, ব্যারি সি ব্যারিশ এবং কিপ এস থ্রোনকে পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। পুরস্কারের ৮০ লাখ সুইডিশ ক্রোনারের অর্ধেক পাবেন ওয়েস। আর বাকি অর্ধেক পাবেন ব্যারিশ ও থ্রোন।

 

অর্থনীতিতে অধ্যাপক রিচার্ড এইচ থেলার

শিকাগো ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক রিচার্ড এইচ থেলার। তিনি এ বছর অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত হন। অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে মনস্তত্ত্বের প্রভাব নিয়ে কাজ করে আগে থেকেই আলোচনায় ছিলেন রিচার্ড থেলার। মানুষ যখন বিনিয়োগ করে তখন তার সার্বিক প্রস্তাবনা ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে মনের সায় দেওয়া ও না দেওয়ার ক্রিয়াকলা নিয়ে আলোচনা করেছেন তিনি। সামাজিক অভিরুচির ক্ষেত্রে থেলার হাজির করেন ন্যায্যতার প্রসঙ্গ। তিনি দেখিয়েছেন, উচ্চ চাহিদার সময়ে ভোক্তাদের ন্যায্যতা বিষয়ে সচেতনতা পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। আবার দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সময় এ সচেতনতা ও এর প্রভাবটি কাজ করে না। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের এ অর্থনীতিবিদের লেখা ‘নাজ’ নামের বইটি সব ধরনের মানুষেরই প্রশংসা কুড়িয়েছে। সুইডিশ একাডেমির পক্ষ থেকে বলা হয়, বিহ্যাভিয়রাল ইকোনমিকস বা আচরণগত অর্থনীতিতে অনন্য অবদানের জন্য থেলারকে এবার অর্থনৈতিক বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করা হচ্ছে। নোবেল কমিটির অন্যতম বিচারক পার স্ট্রোমবার্গ বলেন, থেলারের গবেষণা অর্থনীতির ওপর সাধারণ মানুষের আচরণ ও মানসিকতার প্রভাবকে সামনে এনেছে। অর্থনৈতিক বিভিন্ন বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার জন্য সাধারণ মানুষকে উদ্দীপ্ত করার প্রক্রিয়াটিই ছিল তার গবেষণার মূল ক্ষেত্র। নোবেল কমিটির দেওয়া সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, অর্থনৈতিক বিভিন্ন সিদ্ধান্ত বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে থেলার মানসিক ও আচরণের বিভিন্ন বাস্তবানুগ অনুমানকে ব্যবহার করার প্রস্তাব করেন। তিনি এক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি বিষয় সামনে হাজির করেন। এর মধ্যে রয়েছে যুক্তিবোধের সীমাবদ্ধতা, সামাজিক অভিরুচি ও আত্মনিয়ন্ত্রণের ঘাটতি। ৭২ বছর বয়সী থেলার বর্তমানে ইউনিভার্সিটি অব শিকাগো ও বুথ স্কুল অব বিজনেসের আচরণগত বিজ্ঞান ও অর্থনীতির অধ্যাপক। তিনি বিশ্বব্যাপী পরিচিতি লাভ করেন আচরণগত অর্থনীতির তাত্ত্বিক হিসেবে। ১৯৬৮ সালে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার প্রবর্তন করা হয়। এক বছর পর ১৯৬৯ সাল থেকে এ পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে। এ পর্যন্ত ৭৯ জন অর্থনীতিতে নোবেল পেয়েছেন। নোবেল পুরস্কারের অর্থমূল্য হিসেবে ৯০ লাখ ক্রোনা বা ১১ লাখ ডলার হাতে পেলে থেলার তা ‘সর্বোচ্চ অযৌক্তিক’ পন্থায় ব্যয় করবেন বলে জানিয়েছেন।

 

চিকিৎসায় তিন মার্কিন বিজ্ঞানী

মানুষের দেহের ভিতর লুকিয়ে থাকা ঘড়ি সময় মেনে দেহের ভিতরের সব কাজ যে সুশৃঙ্খলভাবে করে চলেছে সেটাই প্রমাণ করেছেন তিন বিজ্ঞানী। তারা হলেন জেফরি সি হল, মাইকেল রসবাশ ও মাইকেল ডব্লিউ ইয়ং। বায়োলজিক্যাল ঘড়ির কর্মপদ্ধতি আবিষ্কার করার জন্য ২০১৭ সালে চিকিৎসায় নোবেল লাভ করেছেন তারা। নোবেল কমিটি বলেছে, জীবজগৎ পৃথিবীর আবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়। অনেক দিন ধরেই আমরা জানি মানুষসহ সব প্রাণীর একটি বায়োলজিক্যাল ঘড়ি রয়েছে, যার মাধ্যমে দিনটি কেমন যাবে সেটা অনুমান করার পাশাপাশি নিজেকে মানিয়ে নেয়। সেই ঘড়ির কর্মপদ্ধতি জেফরি সি হল, মাইকেল রসবাশ ও মাইকেল ডব্লিউ ইয়ং ব্যাখ্যা করেছেন এবং কীভাবে সেটি কাজ করে তার ধারণা দিয়েছেন। তাদের আবিষ্কার দেখিয়েছে কীভাবে গাছ, প্রাণী ও মানুষ কীভাবে পৃথিবীর আবর্তনের সঙ্গে তাদের জৈবিক ছন্দ মিলিয়ে নেয়। নোবেল কমিটির সেক্রেটারি থমাস পার্লম্যান বলেন, ‘এ বছরের নোবেল লরিয়েটরা আমাদের শরীরের অভ্যন্তরীণ ঘড়ি কীভাবে কাজ করে সে রহস্য সমাধান করেছেন। দেখিয়েছেন, কীভাবে তা দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় বিভিন্ন তারতম্যের সঙ্গে মানিয়ে নেয়। দিন ও রাতের পরিবর্তনে আমাদের আচরণ ও শারীরিক স্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে।’ গবেষণায় তারা ব্যাখ্যা করেছেন, দেহের অভ্যন্তরীণ ঘড়ি নিয়ন্ত্রণের নেপথ্যে অণুগুলো কীভাবে কাজ করে। মানবদেহের কোষ কীভাবে সময় হিসাব করে, তা দেহতত্ত্বের একটি অন্যতম মৌলিক বিষয়। আর মানবদেহের এই অন্তর্নিহিত বিষয়টি আবিষ্কারের কৃতিত্ব এই তিন বিজ্ঞানীর। পুরস্কার বিজয়ী বিজ্ঞানী জেফরি সি হল ইউনিভার্সিটি অব মাইনের শিক্ষক। এছাড়া মাইকেল রসবাশ ও মাইকেল ডব্লিউ ইয়ং ব্রান্ডেইস ইউনিভার্সিটির শিক্ষক। এবার চিকিৎসাশাস্ত্রে নোবেল পুরস্কার ৮০ লাখ সুইডিশ ক্রোনার এই তিন বিজ্ঞানী ভাগ করে নেবেন।

 

 

রসায়নে তিন দেশের তিন বিজ্ঞানী

ক্রিয়ো-ইলেকট্রন মাইক্রোস্কপি উদ্ভাবনের জন্য ২০১৭ সালে রসায়নে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন তিন বিজ্ঞানী ও গবেষক। তিনজন তিন দেশের নাগরিক। তারা হলেন জ্যাকস ডুবোশেট, জোয়াকিম ফ্রাঙ্ক ও রিচার্ড হ্যান্ডারসন। তিন বিজ্ঞানীর মধ্যে সুইজারল্যান্ডের নাগরিক জ্যাকস ডোবেশেট ল্যুজান বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন। জার্মানিতে জন্মগ্রহণকারী জোয়াকিম ফ্রাঙ্ক অধ্যাপনা করেন নিউইয়র্কের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে। আর রিচার্ড হ্যান্ডারসন যুক্তরাজ্যের ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। এ বছর নোবেল পুরস্কারের অর্থমূল্য প্রায় নয় মিলিয়ন সুইডিশ ক্রোনা (প্রায় নয় কোটি টাকা)। পুরস্কারপ্রাপ্ত তিন বিজ্ঞানীর মাঝে এই অর্থ সমান ভাগে ভাগ করে দেওয়া হবে।

তাদের এই উদ্ভাবনে দ্রবণে জৈব অণু পর্যবেক্ষণ করা যাবে আরও স্পষ্ট ও নিখুঁতভাবে। নোবেল কমিটির ঘোষণায় বলা হয়, ক্রিয়ো-ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপির মাধ্যমে জৈবিক অণুর উন্নতমানের প্রতিচ্ছবি ধারণ আগের চেয়ে অনেক সহজে করা যাবে। এর ফলে জীবদেহের জটিল সব কলকব্জা সম্পর্কে গভীরভাবে জানা সম্ভব হবে। এ পদ্ধতি প্রাণরসায়নের ক্ষেত্রে বড় ধরনের অগ্রগতি নিয়ে আসবে। এতদিন ব্যবহার হয়ে আসা বিভিন্ন প্রযুক্তির মাধ্যমে জীবদেহের আণবিক পর্যায়ের বহু কলকব্জার পূর্ণাঙ্গ ছবি পাওয়া কঠিন ছিল। ক্রিয়ো-ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপি ঠিক এ জায়গাটিকেই আমূল বদলে দিয়েছে। এ কৌশল ব্যবহার করে গবেষকরা এখন সহজেই গতিশীল যে কোনো জৈবিক অণুকে স্থবির করে দিতে পারবেন। আর নিতে পারবেন এমন সব কর্মকাণ্ডের প্রতিচ্ছবি, যা এতদিন একেবারেই অদৃশ্য ছিল। এ কৌশল প্রাণরসায়নের পাশাপাশি জীবন রক্ষাকারী ওষুধ তৈরির গবেষণাকেও বহুলাংশে এগিয়ে নেবে। তিন বিজ্ঞানীর এই আবিষ্কারের সুফল হিসেবে দেখা গেছে, প্রোটিন থেকে শুরু করে জিকা ভাইরাস— সব ধরনের জৈবিক অণুর প্রতিচ্ছবি ধারণ করা সম্ভব হচ্ছে এই আবিষ্কারের ফলে।


আপনার মন্তব্য