শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ৩১ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ৩০ জুলাই, ২০২০ ২২:০১

কোরবানি ও হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর ইতিকথা

মেজর নাসির উদ্দিন আহাম্মেদ (অব.) পিএইচডি

কোরবানি ও হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর ইতিকথা

মহান আল্লাহর বন্ধু ইবরাহিম খলিলুল্লাহ

পবিত্র কোরআনের ১৪তম সুরার নাম ‘সুরা ইবরাহিম’। এই সুরার ৫২টি আয়াতের মধ্যে ৩৫ থেকে ৪১ নং আয়াতে ইসলাম ধর্মে বিভিন্ন কারণে গুরুত্বপূর্ণ হজরত ইবরাহিম (আ.) সমগ্র বিশ্ববাসী বিশেষত মক্কাবাসীদের জন্য এবং মক্কা শহরের জন্য মহান আল্লাহর কাছে বিশেষ অনুগ্রহ কামনা করেছেন। ইসলাম ধর্ম ছাড়াও ইহুদি এবং খ্রিস্টান ধর্মেও হজরত ইবরাহিম (আ.)-কে বিশেষ মর্যাদা সহকারে স্মরণ করা হয়। ইহুদিদের ধর্মগ্রন্থ ‘তাওরাত’ এবং খ্রিস্টানদের ধর্ম গ্রন্থ ‘বাইবেল’ ও ‘ইঞ্জিল’-এ হজরত ইবরাহিম (আ.) সম্পর্কে নানাবিধ বর্ণনা রয়েছে এবং তাঁর বিভিন্ন উক্তি উদ্ধৃত করা হয়েছে। তবে একাধিক সূত্র, বিশেষত উইকিপিডিয়াতে পবিত্র কোরআনে হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর নাম ৬৯ বার উল্লিখিত বলে তথ্য পাওয়া যায়। এর মধ্যে পবিত্র কোরআনের ৪নং সুরা নিসার ১২৫ নং আয়াতে হজরত ইবরাহিম (আ.)-কে মহান আল্লাহ ‘খলিল’ বা বন্ধু হিসেবে এই মর্মে ঘোষণা করেন যে, ‘আর তাঁর অপেক্ষা ধর্মে কে উত্তম যে পরোপকারী হয়ে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করে এবং একনিষ্ঠভাবে ইবরাহিমের ধর্মাদর্শ অনুসরণ করে? আর আল্লাহ ইবরাহিমকে তো বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করেছেন।’ তাই মুসলমানদের কাছে তাঁর পরিচয় ‘ইবরাহিম খলিলুল্লাহ’ বা আল্লাহর বন্ধু হিসেবে। অন্যান্য ধর্মগ্রন্থে তাঁকে আব্রাহাম নামে উল্লেখ করা হয়েছে। বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ এবং ধর্মীয় বিশ্বাস ও রীতিনীতি অনুসরণ করে একত্ববাদ বা এক সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাসী সব ধর্মকে ‘ইবরাহিমি ধর্ম (আব্রাহামিক রিলিজিয়নস) এবং ‘ইব্রাহিমীয় পৌরাণিক কথা’ (আব্রাহামিক মিথোলজি) নামে অভিহিত করা হয়। বিভিন্ন ধর্মের পবিত্র গ্রন্থসমূহে হজরত ইবরাহিম (আ.)-কে ঘিরে যেসব বাস্তব কিংবা অলৌকিক ঘটনার বর্ণনা রয়েছে, তা সম্মিলিতভাবে ‘ইবরাহিমীয় ধর্মের পুরাণ’ (দ্য মিথ অব ইবরাহিমিক রিলিজিয়ন) নামে পরিচিতি পেয়েছে।

 

মূর্তি ভাঙার ঘটনা

পবিত্র কোরআনের ৬ নং সুরা ‘আনআম’-এর ৭৫ নং আয়াতে মহান আল্লাহ হজরত ইবরাহিম (আ.)-কে আকাশ এবং পৃথিবীর পরিচালনা ব্যবস্থা প্রদর্শনের ব্যাখ্যা প্রদান করেন যেন হজরত ইবরাহিম (আ.) দৃঢ় বিশ্বাসীদের একজন হয়। এর ফলে অবিশ্বাসীরা যদিও আকাশের তারা, চাঁদ বা সূর্যকে দেখে এসবের পূজা করত, তখন ইবরাহিম (আ.) তারা, চাঁদ বা সূর্যের অস্তমিত হওয়ায় বা নিষ্ক্রিয় হয়ে যাওয়ার কথা ভাবতেন এবং যে মহান স্রষ্টা এই তারা, চাঁদ ও সূর্য সৃষ্টি করেছেন তাঁর (আল্লাহর) কথা ভাবতেন। প্রচলিত মূর্তিপূজার বিরুদ্ধে হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর অবস্থান গ্রহণের তথ্য একাধিক সুরায় বর্ণিত হয়েছে। এর মধ্যে ২১ নং সুরা আম্বিয়ার ৫১ নং থেকে ৬৬ নং আয়াতের বর্ণনা অনুসারে হজরত ইবরাহিম (আ.) তাঁর সম্প্রদায়কে তাদের পূর্বপুরুষদের মতো মূর্তিপূজা ত্যাগ তথা বিভ্রান্তি ছেড়ে মহান আল্লাহর পথে আহ্বান করেন। প্রতি উত্তরে তাঁর সম্প্রদায় তাঁর বিরুদ্ধে তাদের ধর্মীয় বিষয়ে বিদ্রুপ করার অভিযোগ আনে। তবুও তিনি পিছপা না হয়ে প্রকাশ্যে মূর্তিগুলোর বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ তথা ভেঙে ফেলার ঘোষণা দেন। এরপর সত্যিই তিনি অবিশ্বাসীদের প্রধান মূর্তি ছাড়া সব মূর্তি ভঙে ফেলেন। তাফসিরবিদ ও ইতিহাসবিদদের মতে এ সময় তিনি যে কুঠার দিয়ে বাকি মূর্তিগুলো ভেঙে ছিলেন, তা সবচেয়ে বড় মূর্তির গলায় ঝুলিয়ে দেন। এতে অবিশ্বাসীদের মধ্যে চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। তারা হজরত ইবরাহিম (আ.)-কে মূর্তি ভাঙার বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তিনি তার বদলে বড় মূর্তি বা অন্যান্য মূর্তিদের এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করতে বলেন। এটি বড় মূর্তির কাজ বলে তাচ্ছিল্য করেন। তখন অবিশ্বাসীরা বলে যে, ‘তুমি তো ভালোই জান যে, এরা কথা বলতে পারে না।’ আর এই সুযোগ নিয়ে হজরত ইবরাহিম (আ.) পাল্টা প্রশ্ন করেন, ‘তবে কি তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে এমন কিছুর উপাসনা কর, যা তোমাদের কোনো উপকার করতে পারে না, ক্ষতিও করতে পারে না? ঠিক তোমাদের এবং তোমরা যাদের উপাসনা কর তাদের। তবুও কি তোমরা বুঝবে না?

 

বংশ পরিচয় ও পিতার সঙ্গে দ্বন্দ্ব

ইতিহাসবিদ এবং গবেষকদের মতে, তাঁর বাবা আজর সে সময়কার জালেম শাসক নমরুদের আস্থাভাজন ছিলেন এবং একজন মূর্তি নির্মাতা বা ভাস্কর হিসেবে বিখ্যাত ছিলেন। এমন গোঁড়া মূর্তি উপাসকের ঘরে জন্ম নিলেও হজরত ইবরাহিম (আ.) মহান আল্লাহর কৃপায় একত্ববাদের সন্ধান লাভ করেন

হজরত ইবরাহিম (আ.) অনেক আগে জন্মগ্রহণ করেছিলেন বলে তাঁর সঠিক জন্মসাল নির্ণয় করা কষ্টসাধ্য। তবে একদল গবেষকের মতে, খ্রিষ্টপূর্ব ১৮১৩ অব্দে অর্থাৎ আজ থেকে প্রায় ৩৮৩৩ বছর আগে তৎকালীন প্রাচীন শহর চাল ডিসের উর নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন হজরত ইবরাহিম (আ.)। গবেষকদের দাবি, বর্তমান ইরাকে এই শহর অবস্থিত ছিল। যার ধ্বংসাবশেষ আজো বিদ্যমান। আবার আরেকদল গবেষক মনে করেন, বর্তমান তুরস্কের প্রডেসা অঞ্চলের ‘আসিরিয়ান’ শহরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন হজরত ইবরাহিম (আ.)। ইসলাম ধর্ম মতে, তাঁর বাবার নাম ছিল ‘আজর’। তবে অন্যান্য ধর্মগ্রন্থে তাঁর বাবার নাম ‘তেরাহ’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ইসলাম ধর্ম মতে, পৃথিবীর প্রথম মানব হজরত আদম (আ.)-এর পর বংশ পরম্পরায় হজরত শীষ (আ.) এবং পরবর্তীতে হজরত নূহ (আ.)-এর আগমন ঘটে। আর হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর বংশের শিকড় হজরত নূহ (আ.)-এর সঙ্গে সম্পৃক্ত। পবিত্র কোরআনের ২৯ নং সুরা আনকাবুত-এর ১৪ নং আয়াত মতে, হজরত নুহ (আ.) দীর্ঘ ৯৫০ বছর বেঁচে ছিলেন এবং তাঁর সম্প্রদায়কে মহান আল্লাহর পথে আহ্বান জানিয়েছিলেন। আর গবেষকদের দাবি, এই ৯৫০ বছরের মধ্যে প্রথম দিককার মানুষ হেদায়েতপ্রাপ্ত হলেও শেষ দিকে তারা পাপাচারে লিপ্ত হয়, যার ফলে মহাপ্লাবনের মধ্য দিয়ে তারা ধ্বংস হয়ে যায়, যার বর্ণনা পবিত্র কোরআনের ২৯ নং সুরা ‘আনকাবুত’ এবং ৫৪ নং সুরা ‘কমর’-এ বর্ণিত হয়েছে। একদল গবেষকের মতে, হজরত নূহ (আ.)-এর দীর্ঘ জীবনের শেষে হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর আগমন ঘটে।

পবিত্র কোরআনের ৬নং সুরা আনআমের ৭৪ নং আয়াতে হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর বাবার নাম আজর বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ইতিহাসবিদ এবং গবেষকদের মতে, তাঁর বাবা আজর সে সময়কার জালেম শাসক নমরুদের আস্থাভাজন ছিলেন এবং একজন মূর্তি নির্মাতা বা ভাস্কর হিসেবে বিখ্যাত ছিলেন। এমন গোঁড়া মূর্তি উপাসকের ঘরে জন্ম নিলেও হজরত ইবরাহিম (আ.) মহান আল্লাহর কৃপায় একত্ববাদের সন্ধান লাভ করেন। মূর্তির বদলে মহান স্রষ্টার উপাসনায় ব্রত ছিলেন এর ফলে পিতা-পুত্রের বিপরীতমুখী অবস্থান এবং পিতাকে সত্যের পথে আনার জন্য হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর আন্তরিক প্রচেষ্টার তথ্য পাওয়া যায় পবিত্র কোরআনের সুরা আনআম, সুরা মারিয়াম, সুরা  আম্বিয়া ও সুরা সাফ্ফাতসহ বেশ কিছু সুরায়। এর মধ্যে ১৯তম সুরা মারিয়ামের ৪২ থেকে ৪৯তম আয়াত মোতাবেক হজরত ইবরাহিম (আ.) নিষ্প্রাণদের দেবী, যারা দেখে না বা শোনে না, তাদের উপাসনা করার কারণ জানতে চান বাবার কাছে। তিনি নিজের পিতাকে শয়তানের কুমন্ত্রণা গ্রহণ ও শয়তানের বন্ধুরূপে পরিগণিত হওয়ার বিরুদ্ধে সতর্ক করেন এবং এমন ভুলের জন্য কঠোর শাস্তির বিষয়ে সতর্ক করেন। প্রত্যুত্তরে বাবা রাগান্বিত ও উত্তেজিত হয়ে হজরত ইবরাহিম (আ.)-কে পাথর ছুড়ে মেরে ফেলার হুমকি প্রদান করেন এবং তাড়িয়ে দেন। তথাপি তিনি ধৈর্য না হারিয়ে পিতার জন্য দোয়া করেন।

 

মক্কা শরিফ ও কাবাগৃহে হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর স্মৃতি

পবিত্র কোরআনের ৩ নং সুরা আলে ইমরানের ৯৫ ও ৯৬ নং আয়াতে মহান আল্লাহর নির্দেশনা- ‘তোমরা একনিষ্ঠ ইবরাহিমের সমাজকে অনুসরণ কর। সে অংশীবাদীদের (বহু দেবতার পূজারি) অন্তর্ভুক্ত ছিল না। নিশ্চয়ই মানব জাতির জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ প্রথম যে গৃহ (উপাসনালয়) প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তা তো বাক্কায় (মক্কায়), তা আশীর্বাদপ্রাপ্ত ও বিশ্ব জগতের দিশারি। সেখানে বহু স্পষ্ট নিদর্শন রয়েছে, (যেমনÑ ইবরাহিমের দাঁড়াবার স্থান...)। এভাবেই পবিত্র মক্কা নগরী ও কাবাঘরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর নাম।

পবিত্র কোরআনের বর্ণনা এবং ঐতিহাসিক গবেষণায় দেখা যায়, পৃথিবীর প্রথম মানব হজরত আদম (আ.)-এর হাতেই পবিত্র কাবাগৃহের গোড়াপত্তন ঘটে। কারণ মহান আল্লাহর উপাসনার জন্য তিনিই সর্বপ্রথম আদিঘর বা উপাসনালয় তৈরি করেছিলেন। পরবর্তীতে কাবা শরিফের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয় এবং এক সময় তা মূর্তি উপাসকদের এবাদতের কাজেও ব্যবহৃত হয়। তবে হজরত ইবরাহিম (আ.) যে পবিত্র কাবা গোড়াপত্তন করেন, সে ঘোষণা পবিত্র কোরআনেই রয়েছে। সুরা বাকারার ১২৭ নং আয়াতে বর্ণিত ‘আর যখন ইব্রাহিম ও ইসমাইল (কাবা) ঘরের ভিত্তি স্থাপন করেছিল, তখন তারা বলেছিল, হে আমাদের প্রতিপালক, তুমি আমাদের এই কাজ গ্রহণ কর। তুমি তো সব শোন এবং সব জান’। বিভিন্ন তাফসির এবং ঐতিহাসিক বর্ণনামতে হজরত ইবরাহিম (আ.) ও তাঁর পুত্র হজরত ইসমাইল (আ.) নিকটবর্তী পাহাড় থেকে নিজ কাঁধে পাথর বহন করে কাবাঘর নির্মাণ করেন। কাবা ঘরের দেয়ালের উপরের ভাগ ও ছাদ নির্মাণের সময় হজরত ইবরাহিম (আ.) নির্দিষ্ট একটি পাথরের উপর দাঁড়াতেন। এই পাথর প্রয়োজন অনুসারে নিজ থেকে উঁচু বা নিচু হয়ে হজরত ইবরাহিম (আ.)-কে নির্মাণ কাজে সাহায্য করত। এই পাথরের বুকে হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর পবিত্র পায়ের ছাপ খোদাই হয়ে যায়। ‘মাকাম-ই ইবরাহিম’ নামের এই পাথর আজো কাচে ঘেরা অবস্থায় পবিত্র কাবা শরিফের দরজা ও জমজম কূপের মাঝে স্থাপিত। হজ ও ওমরা পালনকালে কাবা শরিফ সাতবার প্রদক্ষিণ (তাওয়াফ) করার পর হজ পালনকারীরা মাকাম-ই-ইবরাহিমের পেছনে দাঁড়িয়ে দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করে থাকেন। পবিত্র কোরআনের ২য় সুরা বাকারার ১২৫ নং আয়াতে মহান আল্লাহর নির্দেশনা- ‘তোমরা ইবরাহিমের দাঁড়ানোর জায়গাকেই নামাজের জায়গা রূপে গ্রহণ কর।’ একই আয়াতে হজরত ইবরাহিম (আ.) ও ইসমাইল (আ.)-কে মহান আল্লাহ সব পুণ্যার্থীর তাওয়াফ, এতেকাফ, রুকু ও সেজদা করার সুবিধার্থে পবিত্র কাবাঘরকে পবিত্র রাখার নির্দেশ দেন বলে বর্ণিত হয়েছে। এভাবেই পবিত্র কাবাঘরের ইতিহাসের সঙ্গে অমর হয়ে আছে হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর নাম। একইভাবে সাফা ও মারওয়া পাহাড় এবং বরকতময় জমজম কূপের সঙ্গে জড়িয়ে আছে হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর স্ত্রী হাজর (মতান্তরে সারাহ) এবং পুত্র হজরত ইসমাইল (আ.)-এর নাম।

 

হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর মাধ্যমে কোরবানির প্রচলন

২২ নং সুরা হজের ৩৭ নম্বর আয়াত মতে, ‘মহান আল্লাহর কাছে ওদের (কোরবানির পশুর) গোস্ত বা রক্ত পৌঁছায় না, বরং পৌঁছায় তোমাদের (কোরবানিকারীর) ধর্মনিষ্ঠা।’

পবিত্র কোরআনের ৫ নং সুরা মায়িদা এবং ৩৭ নং সুরা সাফ্ফাত-এ কোরবানি প্রসঙ্গে পৃথক দুটি ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। সুরা মায়িদার ২৭ নং আয়াত মতে, হজরত আদম (আ.)-এর দুই পুত্র (হাবিল ও কাবিল) সৃষ্টির আদিলগ্নে কোরবানি করে ছিলেন। তবে তাদের মধ্যে একজনের (হাবিলের কোরবানি কবুল হলেও সীমালঙ্ঘন ও ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করায় অপরজনের (কাবিল) কোরবানি কবুল হয়নি। পবিত্র কোরআনের একই সুরার পরবর্তী আয়াতে কাবিল কর্তৃক হাবিলকে খুন করার ঘটনা বলা হয়েছে, যার ফলে কাবিল ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়।

অপরদিকে বর্তমান বিশ্বে মুসলমানদের মধ্যে বহুল প্রচলিত ঈদুল আজহা উপলক্ষে এবং হজের অংশরূপে পশু কোরবানির নেপথ্যে রয়েছে হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর ইমানি পরীক্ষায় শতভাগ অর্জন, যা তাঁকে যথার্থই ‘খলিলুল্লাহ’ বা আল্লাহর বন্ধু রূপে প্রমাণের সাক্ষ্য বহন করে। আর এ ঘটনাটি অতি সংক্ষেপে বর্ণিত হয়েছে পবিত্র কোরআনের ৩৭ নং সুরায়। এই সুরার তাফসির মতে, হজরত ইবরাহিম (আ.) একদা স্বপ্নযোগে তাঁর প্রিয় পুত্র হজরত ইসমাইল (আ.)কে কোরবানি করার আদেশপ্রাপ্ত হন। তাৎক্ষণিকভাবে তিনি স্বীয় বিষয়টি হজরত ইসমাইল (আ.)-কে জানালে তিনি সানন্দে পিতা ইবরাহিম (আ.)-কে স্বপ্নে পাওয়া আদেশ পালনের জন্য উপদেশ দেন। আদর্শ পিতার এই আদর্শ পুত্র তদুপরি নিজে ধৈর্য ধরে বাবা হজরত ইবরাহিম (আ.) নানাভাবে কোরবানির কাজ দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য উৎসাহ দিতে থাকেন। এভাবে হজরত ইবরাহিম (আ.) এবং তাঁর প্রিয় পুত্র হজরত ইসমাইল (আ.) উভয়েই যখন মহান আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে কোরবানি সম্পন্ন করতে প্রস্তুত হন, তখনই শয়তান নানাভাবে তাদের কুমন্ত্রণা দিতে থাকে। এ বিষয়ে তাফসির, হাদিস ও ঐতিহাসিক বর্ণনায় দুটি তথ্য পাওয়া যায়। প্রথমত, হজরত ইবরাহিম (আ.) যখন নিজ পুত্রকে কোরবানির উদ্দেশে পাহাড়ের দিকে যাত্রা করেন, তখন শয়তান এমন কোরবানি জঘন্য হত্যাকান্ড হবে বলে কুমন্ত্রণা দেয়। হজরত ইবরাহিম (আ.) তখন সাতটি  পাথর নিক্ষেপ করে শয়তানকে তাড়িয়ে দেন। পথিমধ্যে শয়তান আবারও রূপ বদল করে পুত্রকে কোরবানি না করার উপদেশ দিলে হজরত ইবরাহিম (আ.) আবারও সাতটি পাথর নিক্ষেপ করে শয়তান থেকে পরিত্রাণ পান। এ ঘটনার অনুকরণে আজো হজের সময় বড় শয়তান ও ছোট শয়তানের উদ্দেশে হজপালনকারীরা সাতটি করে ছোট পাথর নিক্ষেপ করে থাকেন। দ্বিতীয় বর্ণনা মতে, শয়তান হজরত ইবরাহিম (আ.) ছাড়াও তাঁর স্ত্রী হাজর ও পুত্র হজরত ইসমাইল (আ.)-কে একই কথা বলে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে। কিন্তু মহান আল্লাহর কাছে পরিপূর্ণভাবে আত্মসমর্পণকারী পরিবারের প্রতিটি সদস্য শয়তানের সব কথা ও কাজ ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেন।

পবিত্র কোরআনের ৩৭ নং সুরা সাফ্ফাত-এর ১০৩ নং আয়াতের বর্ণনা মতে, পিতা হজরত ইবরাহিম (আ.) ও পুত্র ইসমাইল (আ.) উভয়েই মহান আল্লাহর প্রতি অনুগত্য প্রকাশ করে কোরবানির প্রস্তুতি নিলেন।

এরপর হজরত ইসমাইল (আ.)-কে কাত করে শুইয়ে দেওয়া হলো। ঐতিহাসিক বর্ণনা মতে এ সময় পিতা ইবরাহিম (আ.) প্রিয় পুত্র ইসমাইল (আ.)-এর মুখ দেখে কোরবানি করতে দ্বিধা করতে পারেন বিবেচনায় পুত্রকে কাত করে শোয়ানো হয়। এরপর হজরত ইবরাহিম (আ.) ধারালো ছুরি নিয়ে পুত্রকে কোরবানির উদ্যোগ নিলে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে কোরবানি কবুলের ঘোষণা আসে। সুরা সাফ্ফাতের ১০৪ থেকে ১০৯ আয়াতের বর্ণনা মতে, এ সময় মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে ইবরাহিম তুমি তো স্বপ্নের আদেশ সত্যিই পালন করলে।’ এরপর পুত্র ইসমাইল (আ.)-এর স্থলে সেখানে একটি জন্তু কোরবানি করা হলো। বিভিন্ন বর্ণনা মতে এই জন্তু ছিল শিংযুক্ত সাদা ভেড়া বা ছাগল।

আবার অপর বর্ণনা মতে বেহশত থেকে মহান আল্লাহ আধিম নামের ভেড়া বা ছাগল পাঠিয়ে ছিলেন কোরবানির জন্য। আবার হজরত আদম (আ.)-এর পুত্র হাবিল যে পশু কোরবানি করেছিলেন, সেই একই পশু মহান আল্লাহর ইচ্ছায় বেহেশত থেকে হজরত ইসমাইল (আ.)-এর বদলে শুইয়ে দেওয়া হয় এবং কোরবানি করা হয় বলে বর্ণিত হয়। মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নিজ পুত্র কোরবানির যে মহান শিক্ষা ও নজির হজরত ইবরাহিম (আ.) স্থাপন করেছেন, তারই স্মরণে মুসলমান সমাজ ও হাজীগণ প্রতি বছর আরবি জিলহজ মাসের ১০, ১১ বা ১২ তারিখে একটি পশু কোরবানি করে থাকেন। পবিত্র কোরআনের ২২ নং সুরার হজের ৩৭ নম্বর আয়াত মতে মহান ‘আল্লাহর কাছে ওদের (কোরবানির পশুর) গোস্ত বা রক্ত পৌঁছায় না, বরং পৌঁছায় তোমাদের (কোরবানিকারীর) ধর্মনিষ্ঠা।’

 

আগুনে নিক্ষেপের পরও পরিত্রাণ

তাফসির মতে, মহান আল্লাহর এই আদেশের পর হজরত ইবরাহিম (আ.) সেই মহান অগ্নিকুন্ডে পর পর সাত দিন বেশ আরাম-আয়েশে অবস্থান করেন। তার আশপাশের সবকিছু এমন কি তাঁর হাত-পা বাঁধার জন্য ব্যবহৃত রশিও পুড়ে ছাই হয়ে যায়

মূর্তি ভাঙার প্রেক্ষাপটে হজরত ইবরাহিম (আ.)-কে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার সীদ্ধান্ত নেয় তাঁর সম্প্রদায়, যার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা রয়েছে পবিত্র কোরআনের ২১ নং সুরা আম্বিয়ার ৬৮ ও ৬৯ নং আয়াতে। গবেষক এবং ইতিহাসবিদগণ হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর আবাসস্থলকে ব্যাবিলন (বৃহত্তর ইরাক) বলে মত প্রদান করেন। যার সম্রাট ছিলেন নমরুদ নামের জালেম। এই নমরুদের সঙ্গে হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর দ্বন্দ্ব ছিল। পবিত্র কোরআনের দ্বিতীয় সুরা বাকারার ২৫৮ নং আয়াত অনুসারে হজরত ইবরাহিম (আ.) মহান আল্লাহই আমাদের রিজিকদাতা ও জীবন-মরণের মালিক বলে দাবি করলে অহঙ্কারী নমরুদ বলে, ‘আমিও তো জীবন দান করি ও মৃত্যু ঘটাই।’ এরপর হজরত ইবরাহিম (আ.) বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ সূর্যকে পূর্ব দিক থেকে উদিত করেন, (দেখি) তুমি তাকে পশ্চিম দিক থেকে উঠাও।’ তখন নমরুদ হতভম্ব হয়ে যায়। নমরুদ মূর্তি ভাঙার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট উত্তেজনাকর পরিস্থিতির পূর্ণ সুযোগ গ্রহণ করে। ঐতিহাসিক বর্ণনামতে, দীর্ঘ এক মাস ধরে এলাকাবাসী গর্ত করে, জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করে এবং আগুন জ্বালানোর যাবতীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করে। এই আয়োজনের খবর ছড়িয়ে পড়লে দলে দলে লোকজন জড়ো হতে থাকে। এরপর আগুন জ্বালানো হয় এবং সাতদিন ধরে আগুনের মাত্রা ক্রমেই বাড়ানো হয়। সাতদিনের মাথায় আগুনের তীব্রতা এত বেড়ে যায় যে, কোনো মানুষ এমনকি পশু-পাখির পক্ষেও আগুনের নিকটবর্তী হওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে হজরত ইবরাহিম (আ.)-কে আগুনে নিক্ষেপ করা সম্ভব হচ্ছিল না, এরপর শয়তান এসে ‘মিনজালিক’ নামক দূর থেকে আগুনে নিক্ষেপের একটি পদ্ধতি বা যন্ত্র নির্মাণ পদ্ধতি শিখিয়ে দেয়। তাফসির মতে, হজরত ইবরাহিম (আ.)-কে যখন এভাবে ‘মিনজালিক’ ব্যবহার করে আগুনে নিক্ষেপের প্রস্তুতি চলছিল, তখন বেহেশত ও আসমানের সব ফেরেশতা ও জগতের প্রাণীকুল চিৎকার করে মহান আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ জানিয়ে বলে, হে আমাদের প্রতিপালক, আপনার বন্ধুর (খলিলুল্লাহর) এ কী বিপদ? মহান আল্লাহ তাদের সবাইকে অনুমতি দিলেন হজরত ইবরাহিম (আ.) কে সাহায্য করার জন্য। ফেরেশতাগণ সাহায্য করার জন্য হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর অনুমতি চাইলেন। আর ইমানি শক্তিতে বলীয়ান হজরত ইবরাহিম (আ.) উত্তর দিলেন, ‘আমার জন্য আমার আল্লাহই যথেষ্ট। তফসিরবিদ মাজহারির মতানুসারে এ সময় হজরত ইবরাহিম (আ.) বলেন, কোনো প্রয়োজন হলে আমি (জিব্রাইল) হাজির আছি। উত্তরে হজরত ইবরাহিম (আ.) বলেন, প্রয়োজন তো আছেই, তবে আপনার (জিব্রাইল (আ.)-এর নিকট নয়, পালনকর্তা (আল্লাহর) কাছে।

এমন শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশে ‘মিনজালিক’ নামক নিক্ষেপযন্ত্র ব্যবহার করে দূর থেকে হজরত ইবরাহিম (আ.)-কে আগুনে নিক্ষেপ করা হয়। পবিত্র কোরআনের ২১ নং সুরা আম্বিয়ার ৬৯ নং আয়াত অনুসারে এ সময় মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে আগুন, তুমি ইবরাহিমের জন্য শীতল ও নিরাপদ হয়ে যাও।’

তাফসির মতে, মহান আল্লাহর এই আদেশের পর হজরত ইবরাহিম (আ.) সেই মহান অগ্নিকুন্ডে পর পর সাত দিন বেশ আরাম-আয়েশে অবস্থান করেন। তার আশপাশের সবকিছু এমন কি তাঁর হাত-পা বাঁধার জন্য ব্যবহৃত রশিও পুড়ে ছাই হয়ে যায়। কিন্তু হজরত ইবরাহিম (আ.) বলেন, এই সাত দিন আমি যে সুখ ভোগ করেছি, সারা জীবনেও তা ভোগ করিনি।’

 

বিভিন্ন স্থানে নির্মিত স্মৃতিসৌধ ও সমাধি

ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে জেরুজালেম ও হেবরন শহরের দখল ও আধিপত্য নিয়ে যুদ্ধ চলছে অনাদিকাল ধরে। বহু প্রাণহানি, বসতবাড়ি ধ্বংস এবং বাস্তুচ্যুত হওয়ার করুণ সাক্ষী এ দুটি শহর। এই শহর দুটি মুসলমান, খ্রিস্টান ও ইহুদিদের ধর্মীয় আবেগের অন্যতম উৎস। এই তিন ধর্মেই বিশেষত মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর কথিত সমাধিস্থল, উপাসনালয় এবং বাসস্থান। এর মধ্যে হেবরন শহরে হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর সমাধি রয়েছে। তিন ধর্মেরই একদল মানুষের বদ্ধমূল ধারণা- হজরত ইবরাহিম (আ.) ছাড়াও তাঁর পুত্র হজরত ইসহাক (আ.), নাতি ইয়াকুব (আ.), স্ত্রী সারাহ, পুত্রবধূ রেবেকাসহ অন্যান্য বহু নবী বা পয়গম্বর এবং তাঁদের নিকাত্মীয়ের অসংখ্য স্মৃতিচিহ্ন এবং সমাধি এই হেবরন শহরে বলে গবেষকদের দাবি। তাই হেবরনের আধিপত্য বজায় রাখতে মরিয়া তিন সম্প্রদায়ের উগ্র ধর্মাবলম্বীরা। তবে হেবরনের সবচেয়ে স্পর্শকাতর স্থান বলে বিবেচিত হয় ‘ইবরাহিম মসজিদ’ কিংবা ইবরাহিমের স্মৃতিসৌধ নামে পরিচিত একটি সমাধিস্থল। এখানেই হজরত ইবরাহিম (আ.) তাঁর স্ত্রী হাজরে মতান্তরে সারাহকে সমাহিত করা হয়েছে বলে অনেকের ধর্মীয় বিশ্বাস। মসজিদে ও সমাধিস্থলে প্রবেশের তিনটি মূল গেট রয়েছে। এই সমাধিস্থলে কালক্রমে মসজিদ ও গির্জা নির্মাণ ও অপর পক্ষের তা ভাঙার ইতিহাস দীর্ঘদিনের। এই বৈরিতার সূত্র ধরে ১৯৯৪ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি মুসলমানদের পবিত্র ১৪ রমজান শুক্রবারের জুমার নামাজ এবং ইহুদিদের পবিত্র পুরিম ধর্মীয় উৎসব পালনকালে দাঙ্গা বাধে। এই দাঙ্গার সময় ইসরায়েলি বংশোদ্ভূত আমেরিকান ডাক্তার উগ্রাবাদী ইহুদি বেনজামিন গোল্ডস্টেইন মুসলমানদের লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়ে। এতে ঘটনাস্থলেই ২৯ জন প্রাণ হারায় ও ১২৫ জন আহত হন। এ ঘটনার পর এই সমাধিস্থলকে বুলেট প্রুফ গ্লাস দিয়ে দুই ভাগ করা হয়। এক অংশে বর্তমানে মুসলমানরা প্রবেশ করে এবং নামাজ ও জেয়ারত করে। অপর অংশে ইহুদিরা তাদের ধর্মীয় রীতিতে প্রার্থনা করে থাকে। অন্যদিকে তুরস্কের সানলিন উরফা নামক স্থানে হজরত ইব্রাহিমের (আ.)-এর জন্মস্থান ও আগুনে নিক্ষেপের স্থানকে কেন্দ্র করে নির্মিত হয়েছে ‘খলিলুল্লাহ মসজিদ’। সেখানে একটি আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্রও গড়ে উঠেছে। এখানে একটি গুহা রয়েছে, যেখানে নমরুদের ভয়ে গোপনে ইবরাহিম (আ.)-কে জন্ম দিয়েছিলেন তাঁর মা। দীর্ঘ সাত বছর এই গুহাতেই তাকে গোপনে লালন-পালন করা হয়েছিল বলে কথিত রয়েছে। আর যেখানে আগুন জ্বালানো হয়েছিল, সেখানে একটি মাছভর্তি বড় লেক রয়েছে। একদল মানুষ বিশ্বাস করে যে, আগুনের জন্য ব্যবহৃত কাঠ বা লাকড়ি পরবর্তীতে মাছে পরিণত হয়, তাই এই মাছ কেউ খায় না বরং খাবার কিনে মাছের জন্য ছিটিয়ে দেয়।

আর লেকের পাশে রয়েছে মনোরম বাগান, আগুনের মাঝেই মহান আল্লাহর তাঁর বন্ধু ইবরাহিম (আ.)-এর জন্য এরকম সুশোভিত বাগান তৈরি করেছিলেন বলে একাধিক বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে।

 

খন্ডিত পাখির জীবন লাভ

মহান আল্লাহ যে জীবন-মরণের মালিক এবং অসীম ক্ষমতাধর, তার বহু প্রমাণ ও ঘটনার বিবরণ কোরআন ও হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। এর মধ্যে দ্বিতীয় সুরা বাকারার ২৫৯ নং আয়াতে একটি শহরের কথা বর্ণিত হয়েছে, যা একদা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। একই আয়াতে এমন এক ব্যক্তির কথা বর্ণিত হয়েছে যাকে মহান আল্লাহ তার মৃত্যুর ১০০ বছর পর আবারও জীবিত করেন অথচ ওই ব্যক্তি মনে করেছিল সে এক দিন বা তারও কম সময় ঘুমিয়ে ছিল। সুরা বাকারায় এই ব্যক্তির নাম উল্লেখ না থাকলেও ঐতিহাসিক বর্ণনা মতে ৯নং সুরা তওবায় ৩০ নং আয়াতে ওজাইর নামক যে ব্যক্তির নাম বর্ণিত হয়েছে, তিনিই ছিলেন পুনরায় জীবন লাভ করা এই ব্যক্তি। ইরাকের বসরা নগরে তাঁর স্মৃতিসৌধ রয়েছে।

তাফসিরবিদ ও ঐতিহাসিকদের বর্ণনা মতে, কিয়ামতের সময় কীভাবে মৃত মানুষদের জীবন ফিরিয়ে আনা সম্ভব; এই প্রশ্নের বিপরীতে মহান আল্লাহর নির্দেশে এই অলৌকিক ঘটনা ঘটে। এই ঘটনার কথা বিধর্মীরা বিশ্বাস করত না। বরং ভাবত তাদের সম্রাট নমরুদই কেবল যাকে ইচ্ছা মেরে ফেলতে পারে এবং যাকে ইচ্ছা তার প্রাণ ভিক্ষা দিতে পারে। এর বিপরীতে হজরত ইবরাহিম (আ.) মৃতকে জীবিত করার বাস্তব দৃশ্য দেখার জন্য আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করেন বলে সুরা বাকারার ২৬০ নং আয়াতে উল্লিখিত। মহান আল্লাহ তখন হজরত ইবরাহিম (আ.)-কে চারটি পাখি সংগ্রহ করে তা খন্ড বিখন্ড করে একেক খন্ড একেক পাহাড়ে ছিটিয়ে দেওয়ার আদেশ দেন। আদেশ মোতাবেক তাই করা হলো। পরবর্তীতে মহান আল্লাহর আদেশে পাখিগুলোকে ডাক দিলেন হজরত ইবরাহিম (আ.)। ডাক শোনা মাত্র পাখিগুলো জীবিত হয় ও হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর কাছে চলে আসে।


আপনার মন্তব্য